ডেঙ্গু প্রতিরোধে শ্রীমঙ্গলে বসুন্ধরা শুভসংঘের সচেতনতামূলক সভা

প্রকাশিত: ৭:৪০ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২৩, ২০২৬

ডেঙ্গু প্রতিরোধে শ্রীমঙ্গলে বসুন্ধরা শুভসংঘের সচেতনতামূলক সভা

Manual4 Ad Code

নিজস্ব প্রতিবেদক | শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার), ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ : ডেঙ্গুর সংক্রমণ প্রতিরোধে জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে সচেতনতামূলক সভা করেছে বসুন্ধরা শুভসংঘ।

সভায় বক্তারা ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা, বাসাবাড়ি ও আশপাশে জমে থাকা পানি অপসারণ এবং এডিস মশার বিস্তার রোধে সম্মিলিতভাবে কাজ করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬) বিকেলে শ্রীমঙ্গল পৌরসভার সভাকক্ষে বসুন্ধরা শুভসংঘের শ্রীমঙ্গল উপজেলা শাখার উদ্যোগে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়।

এ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির মৌলভীবাজার জেলা সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য, ইংরেজি দৈনিক দ্য ফিনান্সিয়াল পোস্ট ও সাপ্তাহিক নতুন কথার বিশেষ প্রতিনিধি, আরপি নিউজের সম্পাদক ও বিশিষ্ট কলামিস্ট কমরেড সৈয়দ আমিরুজ্জামান।

Manual7 Ad Code

দৈনিক কালের কণ্ঠের মৌলভীবাজার জেলা প্রতিনিধি মো. সাইফুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিসহ বসুন্ধরা শুভসংঘের শ্রীমঙ্গল উপজেলা শাখার সদস্যরা অংশ নেন।

সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে কমরেড সৈয়দ আমিরুজ্জামান ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ডেঙ্গু এখন শুধু স্বাস্থ্যগত সমস্যা নয়; এটি জনস্বাস্থ্য ও নাগরিক ব্যবস্থাপনার সঙ্গেও সরাসরি সম্পৃক্ত। ডেঙ্গু প্রতিরোধে একদিকে যেমন মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে, অন্যদিকে মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম এবং কার্যকর মশকনিধন কর্মসূচি জোরদার করতে হবে।

তিনি বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে স্থানীয় প্রশাসন, পৌরসভা, স্বাস্থ্য বিভাগ, বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন এবং সাধারণ মানুষকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। শুধু আক্রান্ত হওয়ার পর চিকিৎসা নেওয়ার পরিবর্তে রোগের বিস্তার ঠেকাতে আগে থেকেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি।

সভায় বক্তারা মৌলভীবাজারে ডেঙ্গুর পাশাপাশি হামের সংক্রমণ ও রোগীর চাপ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তারা বলেন, জেলার বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে এসব রোগে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। ফলে জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সচেতনতা ও দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রয়োজন।

বক্তারা ডেঙ্গু প্রতিরোধে পৌরসভা ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মশকনিধন ও স্প্রে কার্যক্রম নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তাদের বক্তব্য, শুধু নির্দিষ্ট সময়ে ওষুধ ছিটিয়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়; একই সঙ্গে এডিস মশার প্রজননস্থল চিহ্নিত করে তা ধ্বংস করতে হবে। নিয়মিতভাবে বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন এবং জমে থাকা পানি অপসারণের কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার ওপরও তারা গুরুত্ব দেন।

সভায় বক্তারা জানান, মৌলভীবাজার জেলায় চলতি সময়ে ডেঙ্গু ও হামের সংক্রমণ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জেলার সরকারি হাসপাতালগুলোতে এখন পর্যন্ত ৩৭ জনের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে মৌলভীবাজার ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট সদর হাসপাতালে ৩২ জন, শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে তিনজন, কুলাউড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে একজন এবং বড়লেখা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে একজনের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে।

বর্তমানে মৌলভীবাজার সদর হাসপাতালের ডেঙ্গু ওয়ার্ডে দুজন রোগী ভর্তি রয়েছেন বলেও সভায় জানানো হয়। এর বাইরে জেলার বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালে আরও রোগী ডেঙ্গুর চিকিৎসা নিচ্ছেন বলে বক্তারা উল্লেখ করেন।

সভায় হামের পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। বক্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে এখন পর্যন্ত ১ হাজার ৮৮৪ জন রোগী হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন। সদর হাসপাতালের আইসোলেশন ওয়ার্ডে বর্তমানে প্রায় ৫০ জন হাম রোগী ভর্তি আছেন। তাদের মধ্যে প্রায় ৩০ জন শিশু এবং ২০ জন প্রাপ্তবয়স্ক।

বক্তারা আরও জানান, চলতি বছরে মৌলভীবাজার জেলায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় হামে অন্তত ১৫ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর বাইরে বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালে আরও প্রায় শতাধিক হাম ও ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন বলে সভায় দাবি করা হয়। একই সময়ে জেলায় ৭৭৬ জনের ডেঙ্গু পরীক্ষা করা হয়েছে এবং তাদের মধ্যে ৩৭ জনের দেহে ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে বলে জানানো হয়।

তবে সরকারি হাসপাতালের পরিসংখ্যানের বাইরে বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে চিকিৎসা নেওয়া রোগীর সংখ্যা থাকায় জেলার প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে সভায় বক্তারা উল্লেখ করেন।

ডেঙ্গু প্রতিরোধে করণীয় তুলে ধরে বক্তারা বলেন, এডিস মশা সাধারণত পরিষ্কার ও জমে থাকা পানিতে বংশবিস্তার করে। ফলে বাড়ি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, অফিস-আদালত ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশে কোথাও পানি জমে থাকতে দেওয়া যাবে না। ফুলের টব, টবের নিচের প্লেট, পরিত্যক্ত পাত্র, ডাবের খোসা, প্লাস্টিকের বোতল, নির্মাণাধীন ভবনের বিভিন্ন অংশ, ড্রেন ও অন্যান্য স্থানে জমে থাকা পানি নিয়মিত অপসারণ করতে হবে।

Manual6 Ad Code

তারা বলেন, একটি বাড়ি বা একটি এলাকার পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করলেই ডেঙ্গুর ঝুঁকি পুরোপুরি কমবে না। আশপাশের প্রতিটি বাড়ি, প্রতিষ্ঠান ও জনপরিসর পরিষ্কার রাখা জরুরি। কারণ একটি জায়গায় এডিস মশার প্রজনন হলে সেখান থেকে আশপাশের এলাকাতেও মশার বিস্তার ঘটতে পারে।

Manual4 Ad Code

বক্তারা আরও বলেন, দীর্ঘ সময় কোনো পাত্র বা স্থানে পানি জমে থাকলে তা দ্রুত অপসারণ করতে হবে। যেসব পাত্র বা স্থানে পানি রাখা প্রয়োজন, সেগুলো ঢেকে রাখতে হবে। একই সঙ্গে মশার কামড় থেকে সুরক্ষার জন্য মশারি ব্যবহার, প্রয়োজন অনুযায়ী মশা প্রতিরোধক ব্যবহার এবং দিনের বেলায়ও সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন তারা।

ডেঙ্গুর উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বক্তারা বলেন, জ্বর, মাথাব্যথা, শরীর ও পেশিতে ব্যথা, দুর্বলতা, চোখের পেছনে ব্যথাসহ বিভিন্ন উপসর্গ দেখা দিতে পারে। এসব উপসর্গকে অবহেলা না করে দ্রুত স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গিয়ে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

Manual2 Ad Code

সভায় বক্তারা বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধের দায়িত্ব শুধু প্রশাসন, পৌরসভা বা স্বাস্থ্য বিভাগের ওপর ছেড়ে দিলে চলবে না। ব্যক্তি, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন—সবাইকে নিজ নিজ জায়গা থেকে দায়িত্ব পালন করতে হবে। স্থানীয় পর্যায়ে নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা অভিযান, জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম এবং এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংসের মাধ্যমে ডেঙ্গুর ঝুঁকি কমানো সম্ভব।

সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শ্রীমঙ্গল ব্যবসায়ী সমিতির যুগ্ম সম্পাদক মো. আখতার হোসেন, শ্রীমঙ্গল বস্ত্র ব্যবসায়ী সমিতির উপদেষ্টা ও শ্রীমঙ্গল ব্যবসায়ী সমিতির হাফিজ আহমেদ, সিনিয়র সাংবাদিক ইসমাইল মাহমুদ, শ্রীমঙ্গল প্রেসক্লাবের সাবেক যুগ্ম সম্পাদক এম এ রকিব এবং দৈনিক খোলা কাগজের মৌলভীবাজার জেলা প্রতিনিধি এহসান বিন মুজাহির।

এ ছাড়া সভায় বক্তব্য দেন বসুন্ধরা শুভসংঘের শ্রীমঙ্গল উপজেলা শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক ওমর ফারুক, কোষাধ্যক্ষ জুলহাকাম, সদস্য তপন ও মো. ফজলে রাব্বিসহ সংগঠনের অন্যান্য সদস্য।

সভায় বক্তারা ডেঙ্গু প্রতিরোধে শ্রীমঙ্গলসহ মৌলভীবাজার জেলার বিভিন্ন এলাকায় নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম জোরদার, এডিস মশার প্রজননস্থল চিহ্নিত করে তা ধ্বংস এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে সামাজিক সংগঠনগুলোর কার্যক্রম আরও সম্প্রসারণের আহ্বান জানান।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ