সাংবাদিক এহসানুল হকের বিরুদ্ধে সাইবার মামলা: উদ্বেগ, প্রতিবাদ ও মামলা প্রত্যাহার দাবি

প্রকাশিত: ২:২২ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ৫, ২০২৬

সাংবাদিক এহসানুল হকের বিরুদ্ধে সাইবার মামলা: উদ্বেগ, প্রতিবাদ ও মামলা প্রত্যাহার দাবি

Manual6 Ad Code
  • শ্রীমঙ্গলে প্রেসক্লাবের মানববন্ধন ও সমাবেশে বক্তব্য রাখছেন কমরেড সৈয়দ আমিরুজ্জামান; স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের আহ্বান

নিজস্ব প্রতিবেদক | শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার), ০৫ নভেম্বর ২০২৬ : সাংবাদিক এহসানুল হকসহ সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সাইবার ট্রাইব্যুনালে দায়ের করা মামলার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও প্রতিবাদ জানিয়েছে শ্রীমঙ্গলের সাংবাদিকরা।

সংবাদ প্রকাশের জেরে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের ঘটনাকে স্বাধীন সাংবাদিকতা, মতপ্রকাশের অধিকার এবং জনস্বার্থে তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে ভীতি ও চাপ সৃষ্টির আশঙ্কা হিসেবে দেখছেন তাঁরা। এ ঘটনায় অবিলম্বে সাংবাদিক এহসানুল হকসহ সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহার, ঘটনার স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত এবং সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর ২০২৬) দুপুরে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল প্রেসক্লাবের সম্মুখে আয়োজিত এক মানববন্ধন ও সমাবেশ থেকে এসব দাবি জানানো হয়।

শ্রীমঙ্গল প্রেসক্লাবের অন্তর্বর্তীকালীন কমিটির উদ্যোগে আয়োজিত এ কর্মসূচিতে স্থানীয় ও জাতীয় বিভিন্ন গণমাধ্যমে কর্মরত সাংবাদিক, সাংবাদিক নেতা, কলামিস্ট এবং সচেতন ব্যক্তিরা অংশ নেন।

Manual6 Ad Code

শ্রীমঙ্গল প্রেসক্লাবের অন্তর্বর্তীকালীন কমিটির সদস্য সচিব রুবেল আহমেদের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত মানববন্ধন ও সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন কমিটির আহ্বায়ক সৈয়দ আবু জাফর সালাউদ্দিন।

সমাবেশে বক্তব্য দেন ইংরেজি দৈনিক দ্য ফিনান্সিয়াল পোস্ট ও সাপ্তাহিক নতুন কথার বিশেষ প্রতিনিধি, আরপি নিউজের সম্পাদক এবং বিশিষ্ট কলামিস্ট কমরেড সৈয়দ আমিরুজ্জামান। তিনি বলেন, গণমাধ্যমকে রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ বলা হয়। অপর তিনটি স্তম্ভ হচ্ছে আইনসভা, বিচার বিভাগ ও নির্বাহী বিভাগ। রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক কাঠামোকে কার্যকর, জবাবদিহিমূলক ও জনমুখী রাখতে গণমাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জনস্বার্থ অভিমুখী মুক্ত গণমাধ্যম ছাড়া একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র পূর্ণতা পেতে পারে না।

তিনি বলেন, সরকার ও প্রশাসনের অনিয়ম, অসংগতি এবং দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা জনসমক্ষে তুলে ধরার পাশাপাশি জনগণের অধিকার ও স্বার্থ রক্ষায় গণমাধ্যমকে অতন্দ্র প্রহরীর ভূমিকা পালন করতে হয়। গণমাধ্যম জনগণের সংগ্রামের সহযোদ্ধা, নীতি-আদর্শের প্রচারক এবং জনস্বার্থ ও রাষ্ট্রের পাহারাদার। গণমাধ্যম সরকার, প্রশাসন কিংবা কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রতিপক্ষ নয়; বরং জনগণের স্বার্থে তাদের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ ও প্রয়োজনীয় জবাবদিহি নিশ্চিত করার সহায়ক শক্তি।

সৈয়দ আমিরুজ্জামান আরও বলেন, একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য স্বাধীন, দায়িত্বশীল ও পেশাদার গণমাধ্যম অপরিহার্য। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সংকুচিত হলে রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাধাগ্রস্ত হয়। তাই সংবাদ প্রকাশের কারণে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা, হয়রানি কিংবা পেশাগত দায়িত্ব পালনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির যেকোনো ঘটনা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

সাংবাদিকতার পেশাগত মান ও নৈতিকতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, পেশাদার ও সৎ সাংবাদিকরাই এ পেশায় টিকে থাকবেন। সাংবাদিকতাকে কেবল জীবিকা নয়, দায়িত্ব ও ব্রত হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। সততা, নিষ্ঠা ও পেশাদারিত্ব ছাড়া প্রকৃত সাংবাদিকতা সম্ভব নয়। কারও বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ পাওয়া গেলেই যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়া সংবাদ প্রকাশ করা গ্রহণযোগ্য নয়। প্রতিটি সংবাদ প্রকাশের আগে তথ্য-প্রমাণ যাচাই করা সাংবাদিকের নৈতিক দায়িত্ব। একজন সাংবাদিকের কলমের একটি খোঁচায় যেমন কারও বড় ধরনের ক্ষতি হতে পারে, তেমনি একটি দায়িত্বশীল প্রতিবেদনের মাধ্যমে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের অনেক উপকারও হতে পারে। তাই দেশ ও দেশের মানুষের কল্যাণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সাংবাদিকদের কাজ করতে হবে।

সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন দৈনিক দেশ রূপান্তরের মৌলভীবাজার প্রতিনিধি ইসমাইল মাহমুদ, শ্রীমঙ্গল প্রেসক্লাবের অন্তর্বর্তীকালীন কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক আবুজার রহমান বাবলা, প্রেসক্লাবের সাবেক সহসভাপতি কাওছার ইকবাল, সাবেক কোষাধ্যক্ষ ও দৈনিক ইত্তেফাকের শ্রীমঙ্গল প্রতিনিধি সৈয়দ ছায়েদ আহমদ, আনন্দবাজার পত্রিকার প্রতিনিধি এম মুসলিম চৌধুরী, দৈনিক সংগ্রামের শ্রীমঙ্গল প্রতিনিধি এম এ রব, দৈনিক করতোয়ার শ্রীমঙ্গল প্রতিনিধি নূর মোহাম্মদ সাগর, দৈনিক আমাদের কণ্ঠের শাকের আহমেদ, বিজনেস বাংলাদেশের শ্রীমঙ্গল প্রতিনিধি মিজানুর রহমান আলম, বাংলাদেশ প্রতিক্ষণের বার্তা সম্পাদক আমজাদ হোসেন বাচ্চু, দৈনিক উত্তর-পূর্বকোণের শ্রীমঙ্গল প্রতিনিধি মামুন আহমেদ এবং দৈনিক সময়ের আলোর শ্রীমঙ্গল প্রতিনিধি শামসুল ইসলাম শামীম প্রমুখ।

বক্তারা বলেন, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়িত্ব পালন, সরকারি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম, অনিয়ম-অব্যবস্থাপনা এবং জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে অনুসন্ধান করা ও তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে সংবাদ প্রকাশ করা সাংবাদিকদের সাংবিধানিক অধিকার ও পেশাগত দায়িত্বের অংশ। এসব বিষয়ে সংবাদ প্রকাশের কারণে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের ঘটনা স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিবেশকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে। একই সঙ্গে সাংবাদিকদের মধ্যে ভীতি, অনিশ্চয়তা ও পেশাগত চাপ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তাঁরা বলেন, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের অধিকার এবং জনগণের জানার অধিকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে স্বাস্থ্যসেবার মতো জনজীবনের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ থাকতে হবে। এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম কিংবা দায়িত্ব পালনে কোনো ঘাটতির অভিযোগ থাকলে তা অনুসন্ধান ও প্রকাশের সুযোগ সংকুচিত হলে সাধারণ মানুষই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

বক্তারা আরও বলেন, সাংবাদিকতার নামে কেউ আইন বা পেশাগত নৈতিকতার ঊর্ধ্বে নন। কোনো সংবাদ নিয়ে অভিযোগ থাকলে তা যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া, তথ্য-প্রমাণ যাচাই এবং নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হওয়া উচিত। তবে কোনো সাংবাদিক যেন কেবল পেশাগত দায়িত্ব পালনের কারণে হয়রানি, ভয়ভীতি কিংবা অযৌক্তিক চাপের শিকার না হন, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাগুলোর ক্ষেত্রে অভিযোগের প্রকৃতি, প্রকাশিত সংবাদের তথ্যগত ভিত্তি এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচনা করা জরুরি।

যেভাবে মামলার সূত্রপাত

উল্লেখ্য, শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সাবেক উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সিনথিয়া তাসমিনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে অনিয়মের অভিযোগ তুলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়। এসব সংবাদ প্রকাশের পর গত ২৫ অক্টোবর সাংবাদিক এহসানুল হকের বিরুদ্ধে সাইবার ট্রাইব্যুনালে একটি মামলা দায়ের করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

এহসানুল হক শ্রীমঙ্গল প্রেসক্লাবের অন্তর্বর্তীকালীন কমিটির যুগ্ম সদস্য সচিব এবং দৈনিক খোলা কাগজের মৌলভীবাজার জেলা প্রতিনিধি। তিনি সাংবাদিকতা ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে সংবাদ প্রকাশের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন।

তবে প্রকাশিত সংবাদগুলোর তথ্যগত ভিত্তি, মামলায় উত্থাপিত অভিযোগ এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্যের বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই-বাছাই ও নিরপেক্ষ তদন্তের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন মানববন্ধনে অংশগ্রহণকারী সাংবাদিকেরা।

স্থানীয় সাংবাদিক মহল ও সচেতন নাগরিকদের মধ্যে এ ঘটনা উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। তাঁদের মতে, সরকারি প্রতিষ্ঠান ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের দায়িত্বশীলতা যেমন নিশ্চিত করতে হবে, তেমনি তাঁদের পেশাগত স্বাধীনতা ও নিরাপত্তাও সুরক্ষিত রাখতে হবে।

মামলা প্রত্যাহার ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি

Manual2 Ad Code

মানববন্ধন ও সমাবেশ থেকে সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ অবিলম্বে সাংবাদিক এহসানুল হকসহ সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানান। একই সঙ্গে মামলার পেছনের প্রেক্ষাপট, সংবাদ প্রকাশের বিষয়বস্তু, উত্থাপিত অভিযোগ এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য পর্যালোচনা করে স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের আহ্বান জানান তাঁরা।

Manual7 Ad Code

তাঁরা আরও দাবি করেন, সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের ভয়ভীতি, হয়রানি, চাপ কিংবা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে হবে। পাশাপাশি সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণের ক্ষেত্রে যথাযথ প্রক্রিয়া, ন্যায়বিচার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সাংবিধানিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।

Manual1 Ad Code

বক্তারা বলেন, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা কেবল সাংবাদিকদের পেশাগত স্বার্থের বিষয় নয়; এটি সাধারণ মানুষের জানার অধিকার, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই জনস্বার্থে সংবাদ প্রকাশের পরিবেশ অক্ষুণ্ন রাখা এবং সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব।

সাংবাদিক এহসানুল হকসহ সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার সুষ্ঠু নিষ্পত্তি এবং ভবিষ্যতে যাতে সাংবাদিকেরা পেশাগত দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের হয়রানি বা প্রতিকূলতার মুখে না পড়েন, সে জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানিয়ে মানববন্ধন ও সমাবেশ শেষ হয়।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ