সৈয়দ আমিরুজ্জামান |
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান দিবস ৪ নভেম্বর। ১৯৭২ সালের এই দিনে স্বাধীন বাংলাদেশের গণপরিষদে দেশের সংবিধান গৃহীত হয়। পরবর্তী সময়ে ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭২, মহান বিজয় দিবস থেকে তা কার্যকর হয়। দীর্ঘ ঔপনিবেশিক শাসন, পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বৈষম্য, শোষণ, বঞ্চনা ও জাতিগত নিপীড়নের বিরুদ্ধে দীর্ঘ সংগ্রাম এবং একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত স্বাধীনতার অন্যতম প্রধান রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক অর্জন হলো বাংলাদেশের সংবিধান। এটি কেবল রাষ্ট্র পরিচালনার একটি আইনগত দলিল নয়; বরং স্বাধীনতা, মুক্তি, গণতন্ত্র, সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ঐতিহাসিক অঙ্গীকার।
বাংলাদেশের সংবিধান স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন। একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের রাজনৈতিক দর্শন, রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি, নাগরিকের মৌলিক অধিকার, রাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গের ক্ষমতা ও দায়িত্ব এবং জনগণের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্ক সংবিধানের মাধ্যমে নির্ধারিত হয়। বাংলাদেশের সংবিধানের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। বরং আমাদের সংবিধানের পেছনে রয়েছে একটি রক্তাক্ত মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাস, লাখো শহীদের আত্মত্যাগ এবং কোটি মানুষের স্বপ্ন ও প্রত্যাশা।
সংবিধান প্রণয়নের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
স্বাধীনতার পরপরই একটি স্বাধীন, গণতান্ত্রিক ও জনগণের অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সংবিধান প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ১৯৭২ সালের ১১ এপ্রিল ড. কামাল হোসেনকে সভাপতি করে ৩৪ সদস্যবিশিষ্ট সংবিধান প্রণয়ন কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি ১৭ এপ্রিল থেকে ৩ অক্টোবর পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে বৈঠক করে। সংবিধানের খসড়া প্রণয়নের ক্ষেত্রে জনগণের মতামত আহ্বান করা হয় এবং সংগৃহীত মতামতের মধ্য থেকে ৯৮টি সুপারিশ গ্রহণ করা হয়।
১৯৭২ সালের ১২ অক্টোবর গণপরিষদের দ্বিতীয় অধিবেশনে খসড়া সংবিধান বিল আকারে উত্থাপন করা হয়। দীর্ঘ আলোচনা ও পর্যালোচনার পর ৪ নভেম্বর গণপরিষদে সংবিধান গৃহীত হয়। অবশেষে ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭২ থেকে তা কার্যকর হয়।
সংবিধান গ্রহণের দিন গণপরিষদে বক্তব্য রাখতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন, ‘এই সংবিধান শহীদের রক্তে লিখিত, এ সংবিধান সমগ্র জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার মূর্ত প্রতীক হয়ে বেঁচে থাকবে।’
এই বক্তব্যের মধ্যেই বাংলাদেশের সংবিধানের অন্তর্নিহিত দর্শন ও ঐতিহাসিক তাৎপর্য নিহিত রয়েছে। সংবিধান কোনো ব্যক্তি, পরিবার, গোষ্ঠী কিংবা বিশেষ রাজনৈতিক দলের সম্পত্তি নয়। এটি সমগ্র জনগণের অর্জন এবং রাষ্ট্রের সব নাগরিকের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষার সর্বোচ্চ অঙ্গীকার।
মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র ও বিপ্লবী সরকার
বাংলাদেশের সংবিধানের ইতিহাস আলোচনা করতে গেলে ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল গৃহীত স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র এবং মুজিবনগর সরকারের ঐতিহাসিক ভূমিকা বিশেষভাবে স্মরণ করতে হয়।
১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার পর স্বাধীনতার ঘোষণাকে আনুষ্ঠানিক ও সাংবিধানিক ভিত্তি দেওয়ার লক্ষ্যে ১০ এপ্রিল স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র জারি করা হয়। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তান থেকে নির্বাচিত জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যদের সমন্বয়ে গঠিত গণপরিষদ স্বাধীন বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার গঠন করে। এই সরকার ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায়, পরবর্তীকালে মুজিবনগর নামে পরিচিত স্থানে, আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ গ্রহণ করে।
স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার যে অঙ্গীকার ব্যক্ত হয়েছিল, তা পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের সংবিধানের অন্যতম মূল ভিত্তিতে পরিণত হয়। ঘোষণাপত্রটি ২৬ মার্চ ১৯৭১ থেকে কার্যকর বলে ঘোষণা করা হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে এটিই স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্র পরিচালনার অন্তর্বর্তীকালীন সাংবিধানিক ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।
মূল সংবিধান ইংরেজি ভাষায় রচিত হয় এবং তা বাংলায় অনুবাদ করা হয়। তাই, এটি বাংলা ও ইংরেজি উভয় ভাষায় বিদ্যমান। তবে, ইংরেজি ও বাংলার মধ্যে অর্থগত বিরোধ দৃশ্যমান হলে বাংলা রূপ অনুসরণীয় হবে।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশের প্রথম অন্তর্বর্তীকালীন সংবিধান ‘স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র’ প্রণয়ন ও ঐতিহাসিক বিপ্লবী মুজিবনগর সরকার গঠন করা হয়েছিল ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল।
১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ চট্টগ্রাম স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করা হয়। এই ঘোষণাকে অনুমোদন দানের জন্য তথা বাংলাদেশের জনগণের স্বাধীনতার দাবীতে ১০ এপ্রিল তারিখে ‘স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র’ জারি করা হয়।
১৯৭০ সালে সাধারণ নির্বাচনে যারা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান থেকে জাতীয় আইন পরিষদের সদস্য (M.N.A.) নির্বাচিত হয়েছিলেন এবং যারা প্রাদেশিক আইন পরিষদের সদস্য (M.P.A.) নির্বাচিত হয়েছিলেন তাদের অধিকাংশই স্বাধীনতা ঘোষণার পর ভারতে চলে যান এবং তারা ১০ এপ্রিল কুষ্টিয়া জেলার মুজিবনগরে গণপরিষদ গঠনের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার গঠন করেন এবং এই অস্থায়ী সরকারের মাধ্যমে স্বাধীনতার ঘোষণাকে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন করা হয়। ঘোষণা অনুযায়ী এটা ছিল স্বাধীন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের বিপ্লবী সরকার। বিপ্লবী সরকারের এই ঘোষণা ২৬ মার্চ থেকে কার্যকরী করা হয়।
১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল স্বাধীন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের অস্থায়ী বিপ্লবী সরকার মুজিবনগরে আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ গ্রহণ করে।
যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে ‘স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র’ সাময়িকভাবে অন্তর্বর্তীকালীন সংবিধানের কাজ করেছে। এটা যদিও একটা ঘোষণা ছিল তথাপিও এটাকে আমরা সংবিধান বলবো। কারণ ইহাতে রাষ্ট্রের প্রকৃতি, সরকার পদ্ধতি, সরকারের বিভাগ, সরকারের রূপরেখা পাওয়া যায়।
অতএব, বাংলাদেশের সংবিধানের ইতিহাস কেবল ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর থেকে শুরু হয়নি; এর শিকড় প্রোথিত রয়েছে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতার ঘোষণা এবং মুজিবনগর সরকারের রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক কাঠামো প্রতিষ্ঠার ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ায়।
মুক্তিযুদ্ধ ছিল সমগ্র জনগণের মুক্তিসংগ্রাম
বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের ইতিহাস কোনো একক ব্যক্তি বা একটি রাজনৈতিক দলের একক কৃতিত্বের ইতিহাস নয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক নেতৃত্বে স্বাধীনতার আন্দোলন চূড়ান্ত পরিণতি লাভ করলেও মুক্তিযুদ্ধ ছিল সমগ্র জনগণের অংশগ্রহণে পরিচালিত একটি জাতীয় মুক্তিসংগ্রাম।
বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের পাশাপাশি মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ-ভাসানী), অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের নেতৃত্বাধীন ন্যাপ, কমরেড মণি সিংহের নেতৃত্বাধীন কমিউনিস্ট পার্টি, বামপন্থী বিপ্লবী রাজনৈতিক সংগঠন, ছাত্র ইউনিয়নের বিভিন্ন ধারা, শ্রমিক-কৃষক সংগঠন এবং অসংখ্য প্রগতিশীল রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তি মুক্তিসংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
কাজী জাফর আহমদ, রাশেদ খান মেনন, হায়দার আকবর খান রনোসহ বিভিন্ন বামপন্থী নেতার নেতৃত্বাধীন সংগঠন ও রাজনৈতিক কর্মীরাও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। বাংলাদেশ জাতীয় মুক্তি সংগ্রাম সমন্বয় কমিটিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও গণসংগঠনের নেতাকর্মীরা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সংগঠিত প্রতিরোধ ও সংগ্রামে অংশ নেন।
কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, সংস্কৃতিকর্মী, নারী, যুবক, সাধারণ মানুষ—ধর্ম-বর্ণ-জাতি-শ্রেণি ও রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে অসংখ্য মানুষ মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। তাঁদের সম্মিলিত প্রতিরোধ, আত্মত্যাগ ও বীরত্বপূর্ণ সংগ্রামের মধ্য দিয়েই পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর পরাজয় ঘটে এবং পৃথিবীর মানচিত্রে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে।
অবশ্যই রাজাকার, আলবদর, আলশামস ও শান্তি কমিটির সদস্যদের মতো স্বাধীনতাবিরোধী সহযোগীদের ভূমিকা ছিল মুক্তিযুদ্ধের বিপরীত মেরুতে। তাঁদের অপরাধ ও বিশ্বাসঘাতকতার ইতিহাসও আলোচনা ও বিতর্কের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
মুক্তিযুদ্ধের বহুমাত্রিক ইতিহাস যথাযথভাবে সংরক্ষণ ও মূল্যায়ন করা জাতীয় দায়িত্ব। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর অবদানকে অস্বীকার করে কিংবা কোনো রাজনৈতিক ধারার ভূমিকা আড়াল করে মুক্তিযুদ্ধের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস রচনা সম্ভব নয়। মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস হবে সব দেশপ্রেমিক শক্তির অবদান ও আত্মত্যাগের যথাযথ স্বীকৃতির ইতিহাস।
সংবিধানের মূলনীতি ও রাষ্ট্রের অঙ্গীকার
বাংলাদেশের সংবিধানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো এর চার মূলনীতি—জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা। এই চার মূলনীতির মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটেছে।
জাতীয়তাবাদ আমাদের স্বাধীন রাষ্ট্রের আত্মপরিচয় ও জাতীয় ঐক্যের ভিত্তি। সমাজতন্ত্রের লক্ষ্য শোষণমুক্ত, বৈষম্যহীন ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা। গণতন্ত্র জনগণের সার্বভৌমত্ব, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থার নিশ্চয়তা দেয়। ধর্মনিরপেক্ষতা ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব নাগরিকের সমান অধিকার, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ভিত্তি।
সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি এবং তৃতীয় ভাগে নাগরিকের মৌলিক অধিকার সন্নিবেশিত হয়েছে। আইনের দৃষ্টিতে সমতা, বৈষম্য থেকে সুরক্ষা, জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকার, চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা, বাক্স্বাধীনতা, সংগঠনের স্বাধীনতা এবং ধর্মীয় স্বাধীনতা—এসব অধিকার একটি গণতান্ত্রিক ও মানবিক রাষ্ট্রের অপরিহার্য উপাদান।
কিন্তু সংবিধানে অধিকার লিপিবদ্ধ থাকলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান, সরকার, প্রশাসন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং বিচারব্যবস্থার দায়িত্ব হলো এসব অধিকার কার্যকরভাবে নিশ্চিত করা। সংবিধানের মর্যাদা রক্ষার অর্থ কেবল সংবিধানের প্রতি আনুষ্ঠানিক আনুগত্য প্রকাশ নয়; বরং এর প্রতিটি নীতি ও বিধানের বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করা।
সংবিধান সংশোধন ও সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের সংবিধানে বিভিন্ন সময়ে সংশোধনী আনা হয়েছে। এসব সংশোধনীর মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রব্যবস্থা, রাজনৈতিক কাঠামো ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন পরিবর্তন ঘটেছে। সংবিধান এ পর্যন্ত ১৭ বার সংশোধিত হয়েছে।
তবে সংবিধান সংশোধনের প্রশ্নে সর্বাগ্রে বিবেচ্য হওয়া উচিত জনগণের অধিকার, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা এবং মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা। কোনো সাময়িক রাজনৈতিক স্বার্থে সংবিধানের মৌলিক আদর্শ ও জনগণের অধিকার ক্ষুণ্ন করা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
সংবিধান একটি জীবন্ত রাষ্ট্রীয় দলিল। সময়ের প্রয়োজন ও জনগণের আকাঙ্ক্ষার আলোকে এর প্রয়োজনীয় প্রগতিশীল পরিবর্তন হতে পারে। কিন্তু সেই পরিবর্তন অবশ্যই হতে হবে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায়, জনস্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে এবং সাংবিধানিক মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে।
সংবিধানের বাস্তবায়নই হোক প্রধান অঙ্গীকার
আজ সংবিধান দিবসে আমাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হওয়া উচিত—সংবিধানে বর্ণিত জনগণের অধিকার ও রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকার কতটুকু বাস্তবায়িত হয়েছে?
আমরা কি এমন একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছি, যেখানে প্রত্যেক নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান? যেখানে রাজনৈতিক পরিচয়, ধর্ম, বর্ণ, ভাষা, লিঙ্গ, শ্রেণি কিংবা মতাদর্শের কারণে কেউ বৈষম্যের শিকার হবেন না? যেখানে শ্রমিক তাঁর শ্রমের ন্যায্য মূল্য পাবেন, কৃষক তাঁর উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য দাম পাবেন, নারী সমান মর্যাদা ও নিরাপত্তা পাবেন, শিক্ষার্থী শিক্ষার অধিকার পাবেন এবং সাধারণ মানুষ ন্যায়বিচার লাভ করবেন?
আমরা কি এমন একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছি, যেখানে জনগণের ভোটাধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক সংগঠনের অধিকার সুরক্ষিত? রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান কি জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য? আইনের শাসন কি সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে কার্যকর?
এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে আত্মসমালোচনা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে। সংবিধানের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের প্রকৃত অর্থ হলো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা রক্ষা করা, প্রশাসনকে দলীয় প্রভাবমুক্ত ও জনমুখী করা, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ করা এবং নাগরিকের মৌলিক অধিকার সমুন্নত রাখা।
বিশেষ করে অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্য দূরীকরণ, বেকারত্ব হ্রাস, শ্রমজীবী মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা, কৃষি ও শিল্পের বিকাশ, মানসম্মত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে রাষ্ট্রকে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে। কারণ রাজনৈতিক স্বাধীনতা তখনই অর্থবহ হয়ে ওঠে, যখন জনগণ অর্থনৈতিক মুক্তি, সামাজিক মর্যাদা ও ন্যায়বিচারের স্বাদ পায়।
একই সঙ্গে সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মীয় উগ্রবাদ, বর্ণবাদ, নারী নির্যাতন, সামাজিক নিপীড়ন ও সব ধরনের বৈষম্যের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র ও সমাজকে দৃঢ় অবস্থান নিতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক, মানবিক ও বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকারকে বাস্তব রূপ দিতে হবে।
জনগণের সংবিধান, জনগণের রাষ্ট্র
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের প্রস্তাবনায় জনগণের সার্বভৌমত্বের যে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, তা আমাদের রাষ্ট্রচিন্তার কেন্দ্রবিন্দু। রাষ্ট্রের মালিক জনগণ। সরকার জনগণের সেবক এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা জনগণের কল্যাণে ব্যবহারের জন্যই অর্পিত।
সুতরাং সংবিধানকে কোনো দলীয় রাজনৈতিক বিতর্কের সংকীর্ণ পরিসরে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। সংবিধান হবে সব নাগরিকের অভিন্ন অধিকার ও মর্যাদার রক্ষাকবচ। সরকার পরিবর্তিত হতে পারে, রাজনৈতিক নেতৃত্ব পরিবর্তিত হতে পারে, কিন্তু জনগণের অধিকার, সাংবিধানিক মূল্যবোধ ও রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব অক্ষুণ্ন থাকতে হবে।
আজকের দিনে আমাদের অঙ্গীকার হোক—মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস সংরক্ষণ, সব মুক্তিকামী মানুষের অবদানকে যথাযথ স্বীকৃতি প্রদান, সংবিধানের মূলনীতি সমুন্নত রাখা এবং একটি জনগণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক, শোষণমুক্ত, বৈষম্যহীন ও মানবিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করা।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সেই ঐতিহাসিক বক্তব্য আজও আমাদের রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক জীবনের জন্য গভীর তাৎপর্য বহন করে—‘এই সংবিধান শহীদের রক্তে লিখিত, এ সংবিধান সমগ্র জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার মূর্ত প্রতীক হয়ে বেঁচে থাকবে।’
আমরা চাই, এই বক্তব্য কেবল ইতিহাসের পাতায় কিংবা আনুষ্ঠানিক দিবস পালনের বক্তৃতায় সীমাবদ্ধ না থাকুক। আমরা সংবিধানের প্রতিটি অঙ্গীকারের বাস্তবায়ন দেখতে চাই। শহীদের রক্তের মর্যাদা রক্ষা করে জনগণের অধিকার, জনগণতন্ত্র, সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হোক।
সংবিধান হোক জনগণের অধিকার রক্ষার কার্যকর হাতিয়ার, রাষ্ট্র হোক জনগণের কল্যাণের প্রতিষ্ঠান। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান সমগ্র জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার মূর্ত প্রতীক হয়ে বেঁচে থাকুক।
#
সৈয়দ আমিরুজ্জামান, এলএল.বি
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট।
বিশেষ প্রতিনিধি, দ্য ফিনান্সিয়াল পোস্ট (ইংরেজি দৈনিক) ও সাপ্তাহিক নতুনকথা;
সম্পাদক, আরপি নিউজ;
কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, জাতীয় কৃষক সমিতি; ’৯০-এর মহান গণঅভ্যুত্থানের সংগঠক ও বাংলাদেশ ছাত্রমৈত্রীর সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য;
বাংলাদেশ খেতমজুর ইউনিয়নের সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য;
সাধারণ সম্পাদক, মাগুরছড়ার গ্যাস সম্পদ ও পরিবেশ ধ্বংসের ক্ষতিপূরণ আদায় জাতীয় কমিটি (General Secretary, National Committee to Compensation for the Destruction of Gas Resources and the Environment at Magurchhara);
বাংলাদেশ আইন ছাত্র ফেডারেশনের প্রাক্তন সভাপতি।
WhatsApp : +8801716599589
Post Views:
৩,১৬৯