জেন্ডার সমতা অর্জনে আইন প্রণয়ন ও দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন জরুরি: ঢাবি উপাচার্য

প্রকাশিত: ৩:১০ অপরাহ্ণ, আগস্ট ১১, ২০২৬

জেন্ডার সমতা অর্জনে আইন প্রণয়ন ও দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন জরুরি: ঢাবি উপাচার্য

Manual4 Ad Code

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা, ১১ আগস্ট ২০২৬ : জেন্ডার সমতা ও নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে শুধু আইন প্রণয়ন করলেই হবে না, একই সঙ্গে সমাজের প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গি ও মানসিকতার পরিবর্তন ঘটাতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম।

Manual8 Ad Code

তিনি বলেন, নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধ এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত জনসচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। এ ক্ষেত্রে শিক্ষিত তরুণ প্রজন্মকে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে।

মঙ্গলবার (১১ আগস্ট ২০২৬) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মুজাফফর আহমেদ চৌধুরী মিলনায়তনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সেন্টার ফর জেন্ডার অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ (সিজিডিএস) ও ইউএন উইমেন বাংলাদেশ-এর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ‘CDGS-UN Women Policy Dialogue Series’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

উপাচার্য বলেন, জেন্ডার বৈষম্য দূরীকরণ এবং নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় কার্যকর আইন ও নীতিমালা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে আইন থাকলেই সমাজে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। আইনের যথাযথ প্রয়োগের পাশাপাশি মানুষের চিন্তা, মূল্যবোধ ও সামাজিক আচরণে পরিবর্তন আনতে হবে। নারীর প্রতি বৈষম্য ও সহিংসতার বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হলে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় পর্যায় থেকে সচেতনতা তৈরির উদ্যোগ নিতে হবে।

তিনি বলেন, নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন একটি বৈষম্যহীন ও টেকসই সমাজ প্রতিষ্ঠার অন্যতম পূর্বশর্ত। নারীদের শিক্ষা, কর্মসংস্থান, সম্পদে অধিকার এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাদের প্রতি বিদ্যমান সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিবন্ধকতা দূর করতে হবে। এজন্য আইন ও নীতিমালার কার্যকর বাস্তবায়নের সঙ্গে সঙ্গে সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণ প্রয়োজন।

Manual7 Ad Code

অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে জনসচেতনতার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, নারীর প্রতি সহিংসতা শুধু ব্যক্তিগত বা পারিবারিক সমস্যা নয়; এটি একটি গুরুতর সামাজিক ও মানবাধিকার বিষয়। এ ধরনের সহিংসতা প্রতিরোধে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, বিচারব্যবস্থা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, নাগরিক সমাজ এবং সাধারণ মানুষকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। তৃণমূল পর্যায়ে মানুষের মধ্যে আইন সম্পর্কে ধারণা এবং নারী-পুরুষের সমঅধিকারের বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে।

উপাচার্য আরও বলেন, জেন্ডার সমতা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তরুণ প্রজন্মের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তরুণদের মধ্যে সচেতনতা ও নেতৃত্বের বিকাশ ঘটিয়ে তাদের সামাজিক পরিবর্তনের সক্রিয় অংশীদার করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা শুধু শ্রেণিকক্ষের জ্ঞান অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে গবেষণা ও নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত হলে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তনের গতি আরও বাড়বে।

তিনি গবেষণাভিত্তিক পলিসি পেপার তৈরির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের বাস্তব নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তাঁর মতে, শিক্ষার্থীদের গবেষণালব্ধ জ্ঞান ও বিশ্লেষণকে নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে কাজে লাগানো গেলে বাস্তবসম্মত ও কার্যকর নীতি প্রণয়নের সুযোগ তৈরি হবে। তরুণদের জ্ঞান, উদ্ভাবনী চিন্তা ও গবেষণাকে কাজে লাগিয়ে বৈষম্যহীন, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগকে আরও এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।

Manual8 Ad Code

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সেন্টার ফর জেন্ডার অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ-এর পরিচালক অধ্যাপক ড. সানজীদা আখতার। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান এবং ইউএন উইমেন বাংলাদেশ-এর ডেপুটি রিপ্রেজেন্টেটিভ নবনীতা সিনহা।

অনুষ্ঠানে ‘Achieving Gender Equality before the Law in Bangladesh’ শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. শাহনাজ হুদা। প্রবন্ধে বাংলাদেশের আইন ও বিচারব্যবস্থায় জেন্ডার সমতা প্রতিষ্ঠার বিভিন্ন দিক, বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ এবং সমতা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়।

পরে অনুষ্ঠিত প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. তাসলিমা ইয়াসমীন, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী সারা হোসেন, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও আইনজীবী মাসুদা রেহেনা বেগম এবং উত্তরা ইউনিভার্সিটির আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ জয়শ্রী সমাদ্দার।

আলোচনায় বক্তারা জেন্ডার সমতা নিশ্চিত করতে বিদ্যমান আইন ও নীতিমালার কার্যকর প্রয়োগ, বিচারপ্রাপ্তিতে নারীর সমান সুযোগ, নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধ, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং আইনগত অধিকার সম্পর্কে সাধারণ মানুষের জ্ঞান বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তারা বলেন, নারীর অধিকার সুরক্ষায় আইন প্রণয়নের পাশাপাশি আইনের বাস্তব প্রয়োগ এবং বিচারপ্রক্রিয়ায় নারীবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।

বক্তারা আরও বলেন, জেন্ডার বৈষম্যের অনেক ক্ষেত্রই সামাজিক ও সাংস্কৃতিক রীতিনীতি এবং প্রচলিত মানসিকতার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। ফলে শুধু আদালত বা প্রশাসনিক ব্যবস্থার মাধ্যমে এ বৈষম্য দূর করা সম্ভব নয়। পরিবার থেকে শুরু করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্র পর্যন্ত নারী-পুরুষের সমান মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।

অনুষ্ঠানে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক অদিতি সবুর। উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী আলিমা জাইম ও ফারহানা আলী শুচি অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন।

Manual6 Ad Code

‘CDGS-UN Women Policy Dialogue Series’ আয়োজনের মধ্য দিয়ে জেন্ডার সমতা, নারীর অধিকার, আইন, নীতি এবং সামাজিক পরিবর্তনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে গবেষক, শিক্ষক, আইনজীবী, নীতিনির্ধারক, নাগরিক সমাজ ও তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ধারাবাহিক সংলাপের একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি হলো। সংশ্লিষ্টরা আশা প্রকাশ করেন, এ ধরনের নীতিসংলাপ থেকে উঠে আসা গবেষণা ও সুপারিশ জেন্ডার সমতা প্রতিষ্ঠা এবং নারীর অধিকার সুরক্ষায় ভবিষ্যৎ নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ