সিলেট ১২ই আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৮শে শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ১১:৫০ অপরাহ্ণ, আগস্ট ১১, ২০২৬
নিজস্ব প্রতিবেদক | হাভানা (কিউবা), ১১ আগস্ট ২০২৬ : কিউবার বিপ্লবী নেতা ও সাবেক রাষ্ট্রপ্রধান কমরেড ফিদেল কাস্ত্রোর শততম জন্মবার্ষিকী সামনে রেখে দেশটির প্রেসিডেন্ট ও কমিউনিস্ট পার্টির প্রথম সম্পাদক কমরেড মিগেল মারিও দাজ-কানেল বেরমুদেস বলেছেন, ফিদেল কাস্ত্রোর রাজনৈতিক চিন্তা ও উত্তরাধিকার বর্তমান বিশ্বের সংকট মোকাবিলায় আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। তাঁর মতে, ফিদেলের উত্তরাধিকার শুধু স্মরণ করার বিষয় নয়; বরং বর্তমান কিউবার অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক সংকট মোকাবিলায় তা প্রয়োগ করার বিষয়।
সোমবার (১০ আগস্ট ২০২৬) হাভানার কনভেনশন সেন্টারে প্রথম আন্তর্জাতিক সম্মেলন ‘ফিদেল: উত্তরাধিকার ও ভবিষ্যৎ’-এর উদ্বোধনী অধিবেশনে দেওয়া মূল বক্তব্যে দাজ-কানেল এসব কথা বলেন।
ফিদেলের শততম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে বিশ্বের পাঁচ মহাদেশ থেকে শিক্ষাবিদ, বুদ্ধিজীবী, শিল্পী, সামাজিক ও রাজনৈতিক নেতা এবং তরুণ শিক্ষার্থীরা অংশ নেন।
দাজ-কানেল বলেন, কিউবার জনগণ ও কমিউনিস্ট পার্টির পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক অতিথিদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছেন তিনি। তাঁর দাবি, অর্থনৈতিক অবরোধ, ‘ভুল তথ্যের প্রচারণা’ ও নিজ নিজ সরকারের চাপ উপেক্ষা করে কিউবায় আসা ফিদেলের উত্তরাধিকারের প্রতি সংহতির বহিঃপ্রকাশ।
‘কিউবার বিপ্লব রক্ষা করাই প্রজন্মের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ’
কিউবার বর্তমান পরিস্থিতিকে বিপ্লবের ৬৭ বছরের ইতিহাসে অন্যতম গুরুতর সংকট হিসেবে বর্ণনা করেন দাজ-কানেল। তিনি বলেন, কিউবার বিপ্লব ও সমাজতন্ত্রকে রক্ষা করা এবং দেশের ওপর আরোপিত অবরোধ ও বিভিন্ন ধরনের চাপ ভেঙে সামনে এগিয়ে যাওয়াই বর্তমান প্রজন্মের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।
তাঁর ভাষায়, এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কিউবার রয়েছে ‘বীরত্বে পরিপূর্ণ ইতিহাস’, প্রতিরোধে প্রশিক্ষিত জনগণ এবং এমন একজন নেতার উত্তরাধিকার, যিনি পরাজয় ও বিপর্যয়কে বহুবার বিজয়ে পরিণত করেছিলেন।
দাজ-কানেলের বক্তব্যে বারবার উঠে আসে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক ও আর্থিক নিষেধাজ্ঞা বা অবরোধের প্রসঙ্গ। তিনি এটিকে কিউবার অর্থনীতি ও সমাজকে দুর্বল করার একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশল হিসেবে উল্লেখ করেন।
তবে একই সঙ্গে তিনি স্বীকার করেন, বর্তমান কিউবার জনগণ কঠিন বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিদ্যুৎ বিভ্রাট, মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি সংকট, খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ঘাটতি এবং তরুণদের দেশত্যাগ—এসব সমস্যা কিউবার দৈনন্দিন জীবনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করছে।
বিপ্লব-পূর্ব কিউবার চিত্র তুলে ধরলেন দাজ-কানেল
ফিদেল কাস্ত্রোর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার ব্যাখ্যা করতে গিয়ে দাজ-কানেল ১৯৫৯ সালের বিপ্লবের আগের কিউবার সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কথা তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, বিপ্লবের আগে প্রায় ছয় লাখ কর্মক্ষম মানুষ বেকার ছিলেন। ছয় মিলিয়নের কিছু বেশি জনসংখ্যার দেশটিতে প্রায় ৩০ লাখ মানুষ বিদ্যুৎ ও বিদ্যুৎনির্ভর মৌলিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত ছিলেন। প্রায় ৩৫ লাখ মানুষ বসবাস করতেন বস্তি, ব্যারাক বা অনুন্নত আবাসনে।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সে সময় দেশের ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশ মানুষ নিরক্ষর ছিলেন। গ্রামীণ অঞ্চলের ৭০ শতাংশ শিশুর জন্য কোনো শিক্ষক ছিল না এবং ৯৫ শতাংশ শিশু পরজীবী সংক্রমণে আক্রান্ত ছিল। ক্ষুদ্র কৃষকদের বড় অংশ জমির জন্য ভাড়া দিতেন, আর দেশের বিপুল পরিমাণ জমি অল্পসংখ্যক মালিকের নিয়ন্ত্রণে ছিল।
দাজ-কানেল আরও দাবি করেন, কিউবার বিদ্যুৎ, টেলিফোন, ব্যাংকিং, তেল শোধনাগার, চিনি শিল্প, আমদানি বাণিজ্য ও গুরুত্বপূর্ণ শিল্পের বড় অংশ মার্কিন কোম্পানি ও একচেটিয়া ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে ছিল।
তাঁর বক্তব্যে ১৯৬০ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ফিদেল কাস্ত্রোর দেওয়া ঐতিহাসিক ভাষণের কথাও উঠে আসে। সেই ভাষণে ফিদেল যুদ্ধ ও শোষণের পেছনে সম্পদ লুণ্ঠনের প্রবণতাকে দায়ী করেছিলেন বলে উল্লেখ করেন দাজ-কানেল।
স্বাস্থ্য ও শিক্ষাকে বিপ্লবের বড় অর্জন হিসেবে তুলে ধরা
বর্তমান সংকটের মধ্যেও কিউবার স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বিজ্ঞান, সংস্কৃতি ও ক্রীড়া খাতের অর্জনকে বিপ্লবের গুরুত্বপূর্ণ উত্তরাধিকার হিসেবে তুলে ধরেন দাজ-কানেল।
তিনি বলেন, কিউবায় প্রতি হাজার মানুষের বিপরীতে ৯ জনের বেশি চিকিৎসক রয়েছেন এবং দেশটির গড় আয়ু ৭৭ দশমিক ৭ বছর। তাঁর দাবি, কিউবা দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে সহায়তা দিয়ে আসছে।
দাজ-কানেলের বক্তব্য অনুযায়ী, ফিদেল কাস্ত্রোর নেতৃত্বে ১৯৬১ সালে ব্যাপক গণঅভিযানের মাধ্যমে কিউবা নিরক্ষরতা দূর করে। ওই অভিযানে আড়াই লাখের বেশি স্বেচ্ছাসেবক অংশ নেন।
এ ছাড়া তিনি কিউবার বিনামূল্যের শিক্ষা ব্যবস্থা, সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা এবং আন্তর্জাতিক চিকিৎসা সহযোগিতার বিষয়গুলোকে ফিদেলের উত্তরাধিকারের অংশ হিসেবে উল্লেখ করেন।
তাঁর দাবি, কিউবা বিভিন্ন সময়ে ১৬৫টি দেশে ছয় লাখের বেশি স্বাস্থ্যকর্মী পাঠিয়েছে। তবে এসব তথ্যের স্বাধীন যাচাই বা বর্তমান সময়ের সঙ্গে তুলনামূলক পরিসংখ্যান তিনি বক্তব্যে উপস্থাপন করেননি।
ফিদেলের উত্তরাধিকার: ‘রেসিপি নয়, একটি পদ্ধতি’
দাজ-কানেলের মতে, ফিদেল কাস্ত্রোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উত্তরাধিকার কেবল তাঁর রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বা বিভিন্ন ঐতিহাসিক কর্মকাণ্ড নয়; বরং সমস্যা বিশ্লেষণ, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নের একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতি।
তিনি বলেন, ফিদেল কোনো ‘রেসিপি’ রেখে যাননি; তিনি রেখে গেছেন একটি ‘পদ্ধতি’। বাস্তব অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে তৈরি সেই পদ্ধতির মূল বৈশিষ্ট্য ছিল—সমস্যার গভীর বিশ্লেষণ, কর্মসূচি প্রণয়ন এবং দৃঢ়ভাবে তা বাস্তবায়ন।
দাজ-কানেল বিশেষভাবে ফিদেলের ১৯৫৩ সালের আত্মপক্ষসমর্থনের ভাষণে উত্থাপিত পাঁচটি বিপ্লবী কর্মসূচির কথা উল্লেখ করেন। এগুলোর মধ্যে ছিল ভূমি সংস্কার, শ্রমিকের অধিকার, নগর সংস্কার, অবৈধভাবে অর্জিত সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা এবং শিল্পে শ্রমিকদের অংশগ্রহণ।
তাঁর মতে, ফিদেলের কাছে অর্থনীতি ও রাজনীতি পরস্পর বিচ্ছিন্ন বিষয় ছিল না। অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তকে তিনি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হিসেবেও বিবেচনা করতেন।
চার নীতির কথা বললেন দাজ-কানেল
ফিদেলের কাজের ধরন ব্যাখ্যা করতে গিয়ে দাজ-কানেল চারটি নীতির কথা তুলে ধরেন। এগুলো হলো—
প্রথমত, রাজনীতির অগ্রাধিকার। তাঁর মতে, প্রতিটি অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক তাৎপর্য রয়েছে।
দ্বিতীয়ত, কৌশল ও দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যের সমন্বয়। পরিস্থিতির সঙ্গে কৌশল পরিবর্তিত হতে পারে, কিন্তু সার্বভৌমত্ব, সামাজিক ন্যায়বিচার, আন্তর্জাতিকতাবাদ ও সংহতির মতো মৌলিক নীতি অপরিবর্তিত থাকবে।
তৃতীয়ত, জনগণের অংশগ্রহণ। ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া শৃঙ্খলার চেয়ে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ও সম্মিলিত দায়িত্ববোধকে বেশি শক্তিশালী বলে বিবেচনা করেন তিনি।
চতুর্থত, সীমাবদ্ধতার মধ্যেও উদ্ভাবন। সংকট ও সম্পদের ঘাটতিকে শুধু সমস্যা হিসেবে না দেখে সৃজনশীলতার প্রেরণা হিসেবে ব্যবহার করার কথা বলেন দাজ-কানেল।
আন্তর্জাতিকতাবাদ ও তৃতীয় বিশ্বের সঙ্গে সংহতি
ফিদেলের উত্তরাধিকারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে আন্তর্জাতিকতাবাদকে তুলে ধরেন কিউবার প্রেসিডেন্ট। তাঁর মতে, ফিদেল কাস্ত্রো কিউবার বিপ্লবকে কখনো একটি বিচ্ছিন্ন জাতীয় প্রকল্প হিসেবে দেখেননি। বরং বিশ্বের বিভিন্ন মুক্তিকামী জনগণের সংগ্রামের সঙ্গে কিউবার ভবিষ্যৎকে যুক্ত করেছিলেন।
আফ্রিকার মুক্তিসংগ্রাম, ফিলিস্তিনের প্রতি সমর্থন, বর্ণবাদবিরোধী অবস্থান এবং বিভিন্ন দেশের জনগণের জন্য কিউবার চিকিৎসা ও শিক্ষা সহায়তার কথা উল্লেখ করেন তিনি।
লাতিন আমেরিকায় সাবেক ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট হুগো চাভেজের সঙ্গে ফিদেলের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সম্পর্ক এবং আঞ্চলিক সংহতির উদ্যোগকেও তিনি ফিদেলের উত্তরাধিকারের অংশ হিসেবে উল্লেখ করেন।
১৯৯৮ সালের ব্যাপক স্বাস্থ্য কর্মসূচি, ১৯৯৯ সালে লাতিন আমেরিকান স্কুল অব মেডিসিন প্রতিষ্ঠা, ‘অপারেশন মিরাকল’, ‘ইয়েস, আই ক্যান’ সাক্ষরতা কর্মসূচি এবং হেনরি রিভ কনটিনজেন্টের মতো উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন তিনি।
বর্তমান বিশ্বের সংকট ও ফিদেলের চিন্তা
দাজ-কানেলের বক্তব্যে শুধু কিউবার অভ্যন্তরীণ সংকট নয়, বৈশ্বিক পরিস্থিতির একটি বিস্তৃত রাজনৈতিক মূল্যায়নও উঠে আসে।
তিনি বলেন, পুঁজিবাদী ব্যবস্থার সংকট আরও গভীর হয়েছে। আঞ্চলিক যুদ্ধ, জলবায়ু পরিবর্তন, খাদ্যসংকট, জোরপূর্বক অভিবাসন এবং সম্পদবৈষম্য বিশ্বকে ক্রমবর্ধমান অস্থিরতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
তাঁর মতে, আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় একদিকে একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলছে, অন্যদিকে বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থা স্থায়ী বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। এই পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র কিউবার ওপর চাপ আরও বাড়িয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
কিউবাকে ‘রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদের পৃষ্ঠপোষক’ তালিকায় রাখার মার্কিন সিদ্ধান্তেরও সমালোচনা করেন দাজ-কানেল। একই সঙ্গে তিনি কিউবাকে ‘ব্যর্থ রাষ্ট্র’ হিসেবে তুলে ধরার প্রচেষ্টার অভিযোগ করেন।
তবে এসব বক্তব্য মূলত কিউবার সরকারি অবস্থানের প্রতিফলন। যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে কিউবার রাজনৈতিক ব্যবস্থা, মানবাধিকার পরিস্থিতি ও সরকারের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে আসছে এবং কিউবার ওপর নিষেধাজ্ঞাকে তাদের নীতিগত অবস্থানের অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করে।
কিউবার বর্তমান সংকটের ভয়াবহ চিত্র
বক্তৃতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোর একটি ছিল কিউবার স্বাস্থ্য ও জ্বালানি সংকটের পরিসংখ্যান।
দাজ-কানেল বলেন, বর্তমানে কিউবার বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার প্রায় ১ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট জ্বালানির অভাবে কাজে লাগানো যাচ্ছে না। এই সক্ষমতা পুরোপুরি কাজে লাগানো গেলে দৈনিক বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সময় ২০ ঘণ্টার বেশি থেকে প্রায় তিন ঘণ্টায় নামিয়ে আনা সম্ভব হতো বলে দাবি করেন তিনি।
স্বাস্থ্য খাতের সংকটের চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রায় ৯৮ হাজার ৫০০ রোগী অস্ত্রোপচারের অপেক্ষায় রয়েছেন, যাদের মধ্যে প্রায় ১২ হাজার শিশু।
এ ছাড়া প্রায় ৩৪ হাজার গর্ভবতী নারী পর্যাপ্ত প্রসবপূর্ব আল্ট্রাসাউন্ড সেবা পাচ্ছেন না বলে দাবি করেন তিনি। এক বছরের কম বয়সী প্রায় ৬৭ হাজার শিশুর টিকাদানও হালনাগাদ করা সম্ভব হয়নি বলে জানান কিউবার প্রেসিডেন্ট।
ক্যানসার চিকিৎসায়ও সংকটের কথা তুলে ধরেন তিনি। তাঁর দাবি, প্রায় ১ লাখ ১৭ হাজার প্রাপ্তবয়স্ক এবং ১ হাজার ২০০ শিশু প্রয়োজনীয় প্রাথমিক চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। রেডিওথেরাপি, কেমোথেরাপি ও হেমোডায়ালাইসিস সেবাতেও বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে।
দাজ-কানেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কিউবায় বর্তমানে প্রয়োজনীয় ওষুধের মাত্র প্রায় ৩০ শতাংশ সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে। অ্যাম্বুলেন্সের কার্যকর সক্ষমতাও নেমে এসেছে প্রায় ২২ শতাংশে।
শিশুমৃত্যুর হার নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। তাঁর দাবি, একসময় কিউবায় শিশুমৃত্যুর হার ৪ থেকে ৫-এর মধ্যে থাকলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তা বেড়ে ৯ দশমিক ৮-এর বেশি হয়েছে।
‘প্রতিরোধ মানে নিষ্ক্রিয় থাকা নয়’
বর্তমান সংকট মোকাবিলায় কিউবার কৌশল সম্পর্কে দাজ-কানেল বলেন, ফিদেল কাস্ত্রোর শিক্ষা অনুযায়ী প্রতিরোধ কখনো নিষ্ক্রিয়তার নাম নয়; বরং প্রতিরোধকে সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে রূপান্তর করতে হবে।
তিনি কিউবার নিজস্ব টিকা উন্নয়ন, নগর ও উপনগরীয় কৃষি, কৃষিতে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ব্যবহার এবং স্থানীয় বৈজ্ঞানিক সক্ষমতার কথা তুলে ধরেন।
তাঁর মতে, অর্থনৈতিক সংকট কিউবাকে আরও দক্ষ, উদ্ভাবনী ও অংশগ্রহণমূলক হতে বাধ্য করছে। বিজ্ঞানী, শিক্ষক, চিকিৎসক, কৃষক ও শ্রমিকদের সম্মিলিত জ্ঞান ও সক্ষমতাকে দেশের অন্যতম প্রধান সম্পদ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
সমাজতন্ত্রের কাঠামো বজায় রেখে অর্থনৈতিক সংস্কারের বার্তা
বর্তমান অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় কিউবা অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোয় পরিবর্তন আনছে বলেও জানান দাজ-কানেল।
তিনি বলেন, দেশের লক্ষ্য হলো উৎপাদন বাড়ানো, সম্পদ সৃষ্টি করা এবং সেই সম্পদ সামাজিক ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে বণ্টন করা। রাষ্ট্রীয় ও বেসরকারি খাতসহ বিভিন্ন ধরনের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার সমন্বয়ে একটি সমৃদ্ধ ও টেকসই সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি গড়ে তোলার কথা বলেন তিনি।
তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, এই অর্থনৈতিক সংস্কারের লক্ষ্য পুঁজিবাদ প্রতিষ্ঠা নয়। ব্যাপক বেসরকারীকরণের পথেও কিউবা যাবে না এবং উৎপাদনের মৌলিক উপকরণ জনগণের নিয়ন্ত্রণেই থাকবে বলে জানান তিনি।
কিউবার কমিউনিস্ট পার্টি রাষ্ট্র ও সমাজের নেতৃত্বদানকারী প্রধান শক্তি হিসেবে এই পরিবর্তন প্রক্রিয়াকে পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ করবে বলেও বক্তব্যে উল্লেখ করেন তিনি।
তরুণদের ওপর বিশেষ গুরুত্ব
ফিদেলের উত্তরাধিকার প্রসঙ্গে কিউবার তরুণদের ভূমিকাকে বিশেষ গুরুত্ব দেন দাজ-কানেল।
তিনি বলেন, ফিদেল সবসময় তরুণদের ওপর আস্থা রাখতেন। বিপ্লবের বিভিন্ন পর্যায়ে তরুণরাই সামরিক সংগ্রাম, সাক্ষরতা অভিযান, আন্তর্জাতিকতাবাদী কর্মকাণ্ড, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং সামাজিক কর্মসূচিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
বর্তমান প্রজন্মের তরুণদের সামনে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি, জ্বালানি রূপান্তর, আমদানি নির্ভরতা কমানো, অর্থনৈতিক সংস্কার এবং জনগণের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের মতো বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
গত শিক্ষাবর্ষে কিউবার বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে ৩০ হাজার ১৮৫ জন তরুণ পেশাজীবী স্নাতক হয়েছেন বলে জানান দাজ-কানেল। তাঁদের মধ্যে ৬২টি দেশের ৭৩৫ জন শিক্ষার্থী কিউবায় পড়াশোনা করেছেন। তাঁদের মধ্যে ফিলিস্তিনের ২০ জনের বেশি এবং যুক্তরাষ্ট্রের পাঁচজন চিকিৎসকও রয়েছেন বলে জানান তিনি।
‘ফিদেল শুধু কিউবার নন’
দাজ-কানেল বলেন, ফিদেল কাস্ত্রো শুধু কিউবার সম্পদ নন; বিশ্বের যেসব মানুষ একটি ভিন্ন ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজের জন্য সংগ্রাম করেন, তাঁদের সবার কাছেই ফিদেলের উত্তরাধিকার গুরুত্বপূর্ণ।
কিউবার বিষয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ‘সত্য তুলে ধরার’ আহ্বান জানিয়ে তিনি অংশগ্রহণকারীদের বই, নিবন্ধ, বক্তৃতা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে কিউবার বাস্তব পরিস্থিতি তুলে ধরার আহ্বান জানান।
তাঁর মতে, বর্তমান যুগে রাজনৈতিক ও মতাদর্শিক লড়াইয়ের বড় ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। ফলে প্রযুক্তিগত ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে নতুন ধরনের প্রভাব বিস্তারের বিরুদ্ধে সচেতনতা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে তিনি কিউবার প্রতি আন্তর্জাতিক সংহতিকে কেবল বক্তব্য বা প্রতীকী সমর্থনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বাণিজ্য, বিজ্ঞান, সংস্কৃতি ও স্বাস্থ্য খাতে বাস্তব সহযোগিতায় রূপ দেওয়ার আহ্বান জানান।
ফিদেলকে স্মরণ নয়, অধ্যয়ন করার আহ্বান
বক্তৃতার শেষাংশে দাজ-কানেল বলেন, ফিদেলের শততম জন্মবার্ষিকী কোনো আনুষ্ঠানিক স্মরণোৎসবের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার বিষয় নয়। ফিদেলের চিন্তাকে বর্তমান সময়ের সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে ব্যবহার করাই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য।
তিনি বলেন, ফিদেলের উত্তরাধিকার অতীতের কোনো স্মারক নয়; বরং বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নির্মাণের একটি নির্দেশনা।
তাঁর ভাষায়, ‘ফিদেলকে শুধু স্মরণ করাই যথেষ্ট নয়; তাঁকে অধ্যয়ন করতে হবে। তাঁকে শুধু শ্রদ্ধা করাই যথেষ্ট নয়; তাঁর আদর্শ অনুসরণ করতে হবে।’
ফিদেলের সঙ্গে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার প্রসঙ্গও সংক্ষেপে তুলে ধরে দাজ-কানেল বলেন, ফিদেলের আনুগত্য, সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে দৃঢ়তা, ঐক্যের ধারণা, সংকটের সময় আশাবাদ ধরে রাখার ক্ষমতা এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রতি দায়বদ্ধতা তাঁকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে।
শেষে তিনি ফিদেলের বহুল উদ্ধৃত প্রতিরোধের বার্তা পুনরুচ্চারণ করেন এবং কিউবার বিপ্লব আত্মসমর্পণ করবে না বলে ঘোষণা দেন।
বক্তৃতার সমাপ্তিতে তিনি বলেন, ‘ফিদেল একটি দেশ, ফিদেল কিউবা।’ এরপর ‘কিউবার জন্য, ফিদেলের সঙ্গে—চিরকাল বিজয়ের পথে’ এবং ‘সমাজতন্ত্র অথবা মৃত্যু’, ‘মাতৃভূমি অথবা মৃত্যু’—এসব বিপ্লবী স্লোগান উচ্চারণ করেন।
ফিদেল কাস্ত্রোর জন্ম ১৯২৬ সালের ১৩ আগস্ট। তাঁর শততম জন্মবার্ষিকীর প্রাক্কালে হাভানায় আয়োজিত এই আন্তর্জাতিক কলোাকিয়ামকে কিউবার বর্তমান নেতৃত্ব শুধু স্মরণানুষ্ঠান হিসেবে নয়, বরং দেশের বর্তমান সংকট, সমাজতন্ত্রের ভবিষ্যৎ এবং ফিদেল কাস্ত্রোর রাজনৈতিক চিন্তার সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হিসেবে উপস্থাপন করছে।

সম্পাদক : সৈয়দ আমিরুজ্জামান
ইমেইল : rpnewsbd@gmail.com
মোবাইল +8801716599589
৩১/এফ, তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০।
© RP News 24.com 2013-2020
Design and developed by ওয়েব নেষ্ট বিডি