সিলেট ১৩ই আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৯শে শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ৩:৫৫ অপরাহ্ণ, আগস্ট ১২, ২০২৬
বগুড়ায় জাতীয় আদিবাসী পরিষদের সংবাদ সম্মেলন
নিজস্ব প্রতিবেদক | বগুড়া, ১২ আগস্ট ২০২৬ : আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস ২০২৬ উপলক্ষে আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি, সমতলের আদিবাসীদের জন্য পৃথক মন্ত্রণালয় ও স্বাধীন ভূমি কমিশন গঠন, ভূমি অধিকার সুরক্ষা, মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা এবং শিক্ষা ও চাকরিতে ৫ শতাংশ কোটা সংরক্ষণসহ ১৬ দফা দাবি জানিয়েছে জাতীয় আদিবাসী পরিষদ। একই সঙ্গে গাইবান্ধার সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্মের ১ হাজার ৮৪২ দশমিক ৩০ একর জমি প্রকৃত মালিকদের ফিরিয়ে দেওয়া এবং ২০১৬ সালে পুলিশের গুলিতে নিহত তিন সাঁওতালের হত্যার বিচার ও ক্ষতিপূরণের দাবিও জানানো হয়েছে।
শনিবার (৮ আগস্ট ২০২৬) দুপুর ১২টায় বগুড়া প্রেসক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি জানায় জাতীয় আদিবাসী পরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটি। আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস ২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির নেতারা বলেন, সমতলের আদিবাসীদের ভূমি, শিক্ষা, কর্মসংস্থান, ভাষা, সংস্কৃতি ও মানবাধিকারের সুরক্ষায় রাষ্ট্রীয়ভাবে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।
সংবাদ সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন জাতীয় আদিবাসী পরিষদের কেন্দ্রীয় প্রেসিডিয়াম সদস্য ফিলিমন বাস্কে। সাংগঠনিক সম্পাদক সূভাষ চন্দ্র হেমব্রম অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন। লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সংগঠনের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক খোকন সুইটেন মূর্মূ।
এ সময় বক্তব্য দেন জাতীয় আদিবাসী পরিষদের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নরেন চন্দ্র পাহান, সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ও নাটোর জেলা সভাপতি রঘুনাথ এক্কা, কোষাধ্যক্ষ মার্টিন মূর্মূ, রংপুর বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক রবি সরেন, বগুড়া জেলা সভাপতি সন্তেুাষ সিং বাবু এবং পাবনা জেলা সভাপতি আশিক বানিয়াস। এ ছাড়া সংহতি বক্তব্য দেন বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ বগুড়া জেলা সমন্বয়ক অ্যাডভোকেট সাইফুল ইসলাম পল্টু।
সাংবিধানিক স্বীকৃতির দাবি
সংবাদ সম্মেলনে জাতীয় আদিবাসী পরিষদের নেতারা বলেন, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাসরত আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জাতিগত পরিচয়, ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং তাদের অধিকার নিশ্চিত করতে সংবিধানে ‘আদিবাসী’ হিসেবে স্বীকৃতি প্রয়োজন। তাদের অভিযোগ, সাংবিধানিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে যথাযথ স্বীকৃতি না থাকায় বিভিন্ন ক্ষেত্রে আদিবাসীরা বৈষম্য ও বঞ্চনার শিকার হচ্ছেন।
তারা বলেন, আদিবাসীদের উন্নয়ন ও অধিকার রক্ষার জন্য সমতলের আদিবাসীদের বিষয়গুলো দেখভালে পৃথক মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ভূমি দখল, বেহাত হওয়া জমি পুনরুদ্ধার এবং ভূমি-সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য পৃথক ও স্বাধীন ভূমি কমিশন গঠনের দাবি জানান তারা।
ভূমি অধিকার ও আইনের বাস্তবায়ন
জাতীয় আদিবাসী পরিষদের অন্যতম প্রধান দাবি রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইনের ৯৭(৮) ধারার যথাযথ বাস্তবায়ন। সংগঠনটির নেতারা বলেন, আদিবাসীদের ভূমি অধিকার সুরক্ষায় বিদ্যমান আইন কার্যকরভাবে প্রয়োগ না হলে তাদের ভূমি হারানোর ঝুঁকি থেকেই যাবে।
এ ছাড়া দখলি শর্তে খাস জমি, বসতভিটা, কবরস্থান ও পুকুর আদিবাসীদের নামে প্রদানের দাবি জানানো হয়েছে। বনায়নের নামে বন বিভাগের মাধ্যমে আদিবাসীদের জমি দখল এবং জমি-সংক্রান্ত মামলা ও হয়রানি বন্ধেরও দাবি জানান নেতারা।
তাদের ভাষ্য, উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের নামে আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকায় কোনো প্রকল্প গ্রহণের আগে সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর সঙ্গে আলোচনা করতে হবে। প্রয়োজনে পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন (Environmental Impact Assessment—EIA) প্রতিবেদনের বিস্তারিত তথ্য তাদের সামনে উপস্থাপন করতে হবে।
সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্মের জমি ফেরতের দাবি
সংবাদ সম্মেলনে গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্মের ১ হাজার ৮৪২ দশমিক ৩০ একর জমি প্রকৃত মালিকদের ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জোরালোভাবে তুলে ধরা হয়।
একই সঙ্গে ২০১৬ সালের ৬ নভেম্বর ওই এলাকায় পুলিশের গুলিতে নিহত তিন সাঁওতালের হত্যার বিচার এবং ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণের দাবি জানানো হয়।
জাতীয় আদিবাসী পরিষদের নেতারা বলেন, ভূমি নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ ও সংঘাতের স্থায়ী সমাধানে রাষ্ট্রকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে এবং আদিবাসীদের ভূমি অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
মাতৃভাষায় শিক্ষা ও ৫ শতাংশ কোটা
প্রতিটি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর নিজস্ব মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি। আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে অন্তত একজন করে আদিবাসী শিক্ষক নিয়োগেরও দাবি করা হয়েছে।
নেতারা বলেন, মাতৃভাষায় শিক্ষার সুযোগ না থাকায় অনেক আদিবাসী শিশুকে শিক্ষাজীবনের শুরুতেই নানা প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়তে হয়। এ পরিস্থিতি দূর করতে মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রম সম্প্রসারণের পাশাপাশি পর্যাপ্ত সংখ্যক আদিবাসী শিক্ষক নিয়োগ প্রয়োজন।
শিক্ষা ও চাকরির ক্ষেত্রে আদিবাসীদের এগিয়ে নিতে ৫ শতাংশ কোটা সংরক্ষণের দাবিও জানানো হয়েছে। সংগঠনটির মতে, উচ্চশিক্ষা ও সরকারি-বেসরকারি কর্মসংস্থানে পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব বাড়াতে বিশেষ ব্যবস্থা প্রয়োজন।
ভাষা-সংস্কৃতি সংরক্ষণে সাংস্কৃতিক একাডেমি
আদিবাসীদের ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি সংরক্ষণ এবং চর্চার জন্য প্রতিটি আদিবাসী অধ্যুষিত জেলায় সাংস্কৃতিক একাডেমি প্রতিষ্ঠার দাবি জানানো হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে গবেষণার ক্ষেত্র তৈরির পাশাপাশি আদিবাসীদের মধ্য থেকে দ্রুত জনবল নিয়োগের কথাও বলা হয়েছে।
জাতীয় আদিবাসী পরিষদ বলেছে, দেশের বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি রয়েছে। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় এসব ভাষা ও সংস্কৃতির সংরক্ষণ ও বিকাশের উদ্যোগ না নিলে তা ভবিষ্যতে সংকটের মুখে পড়তে পারে।
পৃথক আদিবাসী ও সংখ্যালঘু কমিশনের দাবি
আদিবাসী ও সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর অধিকার সুরক্ষায় পৃথক কমিশন গঠনের দাবিও সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরা হয়। পাশাপাশি জাতীয় সংসদে আদিবাসীদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে রাজশাহী ও রংপুর বিভাগ থেকে চারটি সংরক্ষিত নির্বাচনী এলাকা গঠনের জন্য আইন প্রণয়ন এবং আদিবাসী নারীদের জন্য দুটি সংরক্ষিত আসনের ব্যবস্থা করার দাবি জানানো হয়েছে।
সংগঠনটির নেতারা বলেন, রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আদিবাসীদের কার্যকর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা গেলে তাদের অধিকার ও সমস্যা নিয়ে সরাসরি কথা বলার সুযোগ তৈরি হবে।
মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচার দাবি
আদিবাসীদের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি হত্যা, ধর্ষণ, নিপীড়নসহ সব ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় জড়িতদের বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে জাতীয় আদিবাসী পরিষদ।
এ ছাড়া সরকারি গেজেট থেকে বাদ পড়া আদিবাসী জনগোষ্ঠীগুলোকে গেজেটে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানানো হয়েছে। সংগঠনটির নেতারা মনে করেন, সরকারি স্বীকৃতির বাইরে থাকা জনগোষ্ঠীগুলোর অধিকার ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
চা শ্রমিকদের মজুরি ৫০০ টাকা করার দাবি
চা-বাগানে কর্মরত শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি ৫০০ টাকা বাস্তবায়নের দাবিও জানানো হয়েছে সংবাদ সম্মেলন থেকে। একই সঙ্গে ক্ষমতাসীন দলের নির্বাচনী ইশতেহারে আদিবাসীদের জন্য দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নের দাবি জানানো হয়।
নেতারা বলেন, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে আদিবাসীদের অধিকার, উন্নয়ন ও জীবনমানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যেসব অঙ্গীকার রয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়নে সরকারের দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।
১৬ দফা দাবি
সংবাদ সম্মেলনে জাতীয় আদিবাসী পরিষদের পক্ষ থেকে যে ১৬ দফা দাবি উত্থাপন করা হয়, সেগুলো হলো—সমতলের আদিবাসীদের জন্য পৃথক মন্ত্রণালয় ও ভূমি কমিশন গঠন; আদিবাসীদের ‘আদিবাসী’ হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি; রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইনের ৯৭(৮) ধারার বাস্তবায়ন; দখলি শর্তে খাস জমি, বসতভিটা, কবরস্থান ও পুকুর আদিবাসীদের নামে প্রদান; বনায়নের নামে জমি দখল ও মামলা-হয়রানি বন্ধ; উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণের আগে আদিবাসীদের সঙ্গে আলোচনা এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়নের তথ্য প্রকাশ; সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্মের জমি প্রকৃত মালিকদের ফিরিয়ে দেওয়া এবং ২০১৬ সালে নিহত তিন সাঁওতালের হত্যার বিচার ও ক্ষতিপূরণ।
এ ছাড়া নিজস্ব ভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত ও আদিবাসী অধ্যুষিত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আদিবাসী শিক্ষক নিয়োগ; উচ্চশিক্ষা ও চাকরিতে ৫ শতাংশ কোটা; আদিবাসী অধ্যুষিত জেলায় ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি সংরক্ষণে সাংস্কৃতিক একাডেমি প্রতিষ্ঠা; আদিবাসী ও সংখ্যালঘু কমিশন গঠন; সংসদে আদিবাসী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে চারটি সংরক্ষিত নির্বাচনী এলাকা এবং দুইটি সংরক্ষিত নারী আসনের ব্যবস্থা; বাদপড়া আদিবাসীদের গেজেটে অন্তর্ভুক্তি; মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি; চা শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি ৫০০ টাকা বাস্তবায়ন এবং বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে আদিবাসীদের জন্য দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের দাবি জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, আদিবাসীদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শুধু নীতিগত ঘোষণা নয়, বরং আইন, প্রশাসন ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে কার্যকর বাস্তবায়ন প্রয়োজন। ভূমি, শিক্ষা, কর্মসংস্থান, ভাষা-সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব—প্রতিটি ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের বৈষম্য ও বঞ্চনা দূর করে সমঅধিকার নিশ্চিত করার জন্য সরকারকে দ্রুত উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান তারা।

সম্পাদক : সৈয়দ আমিরুজ্জামান
ইমেইল : rpnewsbd@gmail.com
মোবাইল +8801716599589
৩১/এফ, তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০।
© RP News 24.com 2013-2020
Design and developed by ওয়েব নেষ্ট বিডি