বিজিবির অভিযানে ৮৩০ কোটি টাকার চোরাচালান পণ্য জব্দ

প্রকাশিত: ৩:০৫ অপরাহ্ণ, আগস্ট ১৭, ২০২৬

বিজিবির অভিযানে ৮৩০ কোটি টাকার চোরাচালান পণ্য জব্দ

Manual7 Ad Code

নিজস্ব প্রতিবেদক | শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার), ১৭ আগস্ট ২০২৬ : মৌলভীবাজার সীমান্ত এলাকায় চোরাচালান, মাদক ও অস্ত্র পাচার প্রতিরোধে চলতি বছরের শুরু থেকে ধারাবাহিক অভিযান চালিয়ে প্রায় ৮৩০ কোটি ৪৮ লাখ ৮৯ হাজার ৪৭৭ টাকা মূল্যের বিভিন্ন ধরনের মাদক ও চোরাচালান পণ্য জব্দ করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। একই সময়ে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র, গোলাবারুদ, উচ্চ বিস্ফোরক, ডেটোনেটর, অবৈধভাবে উত্তোলন করা বালু-পাথরসহ বিভিন্ন অবৈধ মালামাল উদ্ধার করা হয়েছে।

সোমবার (১৭ আগস্ট ২০২৬) দুপুরে শ্রীমঙ্গল ব্যাটালিয়ন (৪৬ বিজিবি) আয়োজিত এক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানানো হয়।

বিজিবি উত্তর-পূর্ব রিজিয়ন, সরাইলের অধীন সীমান্ত এলাকার সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি, চোরাচালানবিরোধী অভিযান, অস্ত্র উদ্ধার, প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা এবং দুর্যোগকালীন মানবিক কার্যক্রম তুলে ধরতে এ ব্রিফিংয়ের আয়োজন করা হয়।

মিডিয়া ব্রিফিংয়ে শ্রীমঙ্গল ব্যাটালিয়ন (৪৬ বিজিবি)-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল সরকার আসিফ মাহমুদ বিজিবির বিভিন্ন অভিযানের বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন।

১০ আগস্ট পর্যন্ত ৮৩০ কোটি টাকার মালামাল জব্দ

মিডিয়া ব্রিফিংয়ে ৪৬ বিজিবি’র অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল সরকার আসিফ মাহমুদ জানান, উত্তর-পূর্ব রিজিয়ন, সরাইলের দায়িত্বপূর্ণ সীমান্তের দৈর্ঘ্য প্রায় ১ হাজার ২০৪ কিলোমিটার। এ বিশাল সীমান্তে চারটি সেক্টরের অধীনে ১৩টি ইউনিটের মোট ২১১টি বর্ডার আউটপোস্ট (বিওপি) চোরাচালান প্রতিরোধ ও সীমান্ত নিরাপত্তায় দায়িত্ব পালন করছে।

চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ১০ আগস্ট পর্যন্ত নিয়মিত টহলের পাশাপাশি গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে বিজিবি। এসব অভিযানে মাদকদ্রব্য, অস্ত্রসহ বিভিন্ন ধরনের অবৈধ ও চোরাচালানি পণ্য জব্দ করা হয়। জব্দ করা এসব পণ্যের আনুমানিক মূল্য ৮৩০ কোটি ৪৮ লাখ ৮৯ হাজার ৪৭৭ টাকা।

তিনি জানান, সীমান্তের দুর্গম এলাকা, চোরাচালানের সম্ভাব্য রুট এবং বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্টে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। নিয়মিত টহলের পাশাপাশি গোয়েন্দা তৎপরতা জোরদার করে চোরাচালান চক্রের গতিবিধি শনাক্ত করা হচ্ছে।

উদ্ধার হয়েছে পিস্তল, পাইপ গান ও বিস্ফোরক

Manual5 Ad Code

সীমান্ত এলাকায় অস্ত্রের চোরাচালান ঠেকাতেও বিশেষ অভিযান পরিচালনা করছে বিজিবি। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অস্ত্র চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত সংঘবদ্ধ চক্রের তৎপরতা শনাক্ত করে পূর্বপরিকল্পিত অভিযান চালানো হচ্ছে বলে ব্রিফিংয়ে জানানো হয়।

এসব অভিযানে দেশীয় ও বিদেশি বিভিন্ন ধরনের আগ্নেয়াস্ত্র, গোলাবারুদ ও সংশ্লিষ্ট সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে চারটি পিস্তল, ছয়টি এয়ারগান, পাঁচটি পাইপগান, একটি ওয়ান শুটার গান এবং ৪০ রাউন্ড কার্তুজ।

এ ছাড়া অভিযানে ১৮ দশমিক ৩৩ কেজি উচ্চ বিস্ফোরক, ১১৭টি ডেটোনেটর এবং ৩০ মিটার ডেটোনেটর তার উদ্ধার করা হয়েছে। সীমান্ত দিয়ে যাতে কোনো ধরনের অস্ত্র ও বিস্ফোরক দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে না পারে, সে জন্য গোয়েন্দা নজরদারি ও অভিযান অব্যাহত রাখার কথা জানিয়েছে বিজিবি।

অবৈধ বালু-পাথর উত্তোলনেও অভিযান

সীমান্ত নিরাপত্তার পাশাপাশি প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষায়ও অভিযান চালাচ্ছে বিজিবি। বিশেষ করে সিলেট অঞ্চলের বিভিন্ন নদী ও সীমান্তবর্তী এলাকায় অবৈধভাবে বালু ও পাথর উত্তোলনের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান ও নজরদারি করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, কালাসাদেক, গুচ্ছগ্রাম, ধলাই ব্রিজ এলাকা, পিয়াইন নদী, বাল্লাঘাট ও জাফলং ব্রিজ এলাকায় অবৈধ বালু ও পাথর উত্তোলনের প্রবণতা বেশি। এসব এলাকায় স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে মনিটরিং ও অভিযান জোরদার করা হয়েছে।

চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ১০ আগস্ট পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে অবৈধভাবে উত্তোলন করা ২ হাজার ১২১ ঘনফুট বালু এবং ৭ হাজার ৪৬৫ ঘনফুট পাথর জব্দ করেছে বিজিবি।

লেফটেন্যান্ট কর্নেল সরকার আসিফ মাহমুদ বলেন, অবৈধভাবে পাথর ও বালু উত্তোলনের ফলে নদী, পাহাড় ও পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষায় এ ধরনের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে।

বন্যায় দুর্গম এলাকায় ড্রোনে ত্রাণ

সীমান্ত নিরাপত্তার পাশাপাশি প্রাকৃতিক দুর্যোগে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর কথাও তুলে ধরা হয় মিডিয়া ব্রিফিংয়ে। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়সহ বিভিন্ন দুর্যোগে উদ্ধার তৎপরতা, ত্রাণ বিতরণ, চিকিৎসাসেবা এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে বিজিবি সদস্যরা স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছেন।

এরই অংশ হিসেবে হবিগঞ্জের বানিয়াচং উপজেলার সুজাতপুর ইউনিয়নের দুর্গম হাওর এলাকায় বন্যার সময় ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নেয় বিজিবি। দুর্গম ও পানিবন্দি এলাকায় সরাসরি পৌঁছানো কঠিন হওয়ায় কোথাও কোথাও ড্রোনের মাধ্যমে বন্যাকবলিত অসহায় মানুষের কাছে ত্রাণ ও খাদ্যসামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হয়।

তিনি জানান, দুর্যোগের সময় দ্রুত প্রতিক্রিয়া নিশ্চিত করা, মানুষের জীবন ও সম্পদ রক্ষা এবং উদ্ধার-পরবর্তী সহায়তা দিতে বাহিনীর সদস্যরা প্রস্তুত থাকেন। স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে এসব কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়।

Manual1 Ad Code

সীমান্ত নিরাপত্তায় বহুমুখী তৎপরতা

Manual3 Ad Code

লেফটেন্যান্ট কর্নেল সরকার আসিফ মাহমুদ জানান, দেশের সার্বভৌমত্ব ও সীমান্তের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি মাদক, অস্ত্র, মানবপাচার এবং অন্যান্য অবৈধ পণ্যের চোরাচালান প্রতিরোধকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সীমান্ত এলাকায় অপরাধী চক্রের তৎপরতা ঠেকাতে টহল, গোয়েন্দা নজরদারি এবং বিশেষ অভিযান একযোগে পরিচালিত হচ্ছে।

Manual5 Ad Code

তার ভাষ্য, সীমান্তের দুর্গম ভূপ্রকৃতি ও দীর্ঘ সীমান্তরেখার কারণে দায়িত্ব পালনে নানা চ্যালেঞ্জ থাকলেও বিজিবির সদস্যরা নিয়মিতভাবে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অভিযান পরিচালনা করছেন। চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত চক্রগুলোর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি সীমান্তবাসীর মধ্যে সচেতনতা তৈরিতেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

মিডিয়া ব্রিফিংয়ে বিজিবির পক্ষ থেকে বলা হয়, দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা, সীমান্তে শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা, চোরাচালান ও অস্ত্র-গোলাবারুদ পাচার প্রতিরোধ, মাদকমুক্ত সমাজ গঠন এবং দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষায় বাহিনীটি অঙ্গীকারবদ্ধ। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে নিয়মিত অভিযান ও নজরদারি আরও জোরদার করা হবে।

বিজিবি মনে করে, সীমান্ত এলাকায় চোরাচালান ও অন্যান্য অপরাধ দমনে স্থানীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সীমান্তবর্তী জনগণের সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং দেশের স্বার্থে সীমান্তকে নিরাপদ রাখতে সমন্বিতভাবে কাজ করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ