ইয়াসমিন হত্যা দিবস: ৩১ বছরেও শেষ হয়নি নিরাপত্তাহীনতার সেই ক্ষত

প্রকাশিত: ১২:৩১ পূর্বাহ্ণ, আগস্ট ২৪, ২০২৬

ইয়াসমিন হত্যা দিবস: ৩১ বছরেও শেষ হয়নি নিরাপত্তাহীনতার সেই ক্ষত

Manual3 Ad Code

বিশেষ প্রতিবেদন | ঢাকা, ২৪ আগস্ট ২০২৬: আজ থেকে ৩১ বছর আগে ২৪ আগস্ট দিনাজপুরে কিশোরী ইয়াসমিনকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় যে প্রতিবাদ ও গণআন্দোলনের সূচনা হয়েছিল, তার স্মৃতি এখনো বাংলাদেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসে গভীরভাবে প্রোথিত।

১৯৯৫ সালের সেই নৃশংস হত্যাকাণ্ড শুধু একটি কিশোরীর জীবন কেড়ে নেয়নি, বরং নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে সারাদেশে তীব্র জনমত গড়ে তুলেছিল। ইয়াসমিন হত্যার প্রতিবাদে দিনাজপুরে সংঘটিত আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে নিহত হন আরও সাতজন। আহত হন তিন শতাধিক মানুষ।

Manual7 Ad Code

এরপর থেকে ২৪ আগস্ট দিনাজপুরে ‘ইয়াসমিন হত্যা দিবস’ হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। একই সঙ্গে দিনটি সারাদেশে ‘নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস’ হিসেবেও নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে পালন করা হয়।

তিন দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও ইয়াসমিনের হত্যাকাণ্ড ও পরবর্তী গণআন্দোলনের স্মৃতি নারীর নিরাপত্তা, বিচারহীনতা এবং রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির প্রশ্নকে নতুন করে সামনে নিয়ে আসে।

ইয়াসমিনকে স্মরণ এবং নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে জনসচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে দিনাজপুরের বিভিন্ন সংগঠন আজ কবর জিয়ারত, দোয়া মাহফিল, আলোচনা সভা ও বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছে। এসব কর্মসূচিতে ইয়াসমিন হত্যার বিচার, নারী ও শিশু নির্যাতন বন্ধ এবং নিরাপদ সমাজ প্রতিষ্ঠার দাবি জানানো হচ্ছে।

ইয়াসমিনের মা শরিফা বলেন, দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও তিনি আন্দোলন-সংগ্রামে নিজেকে কখনো একা মনে করেননি। তিনি দেশবাসীর প্রতি নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে আন্দোলন অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান।

তৎকালীন আন্দোলনের অন্যতম নেতা ও দিনাজপুর-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মনোরঞ্জলশীল গোপাল বলেন, ইয়াসমিন আন্দোলনের যে লক্ষ্য ছিল, তা এখনো পুরোপুরি অর্জিত হয়নি। নারীরা এখনো নিরাপদ নন। তাঁর এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তিন দশক পরও নারী নিরাপত্তা নিয়ে বিদ্যমান উদ্বেগের বিষয়টি সামনে এসেছে।

যে নির্মমতা নাড়িয়ে দিয়েছিল দেশকে

১৯৯৫ সালের ২৪ আগস্ট। দীর্ঘদিন পর মায়ের কাছে ফিরছিল কিশোরী ইয়াসমিন। ঢাকা থেকে দিনাজপুরে ফেরার পথে দিনাজপুরের কোচে উঠতে না পেরে তিনি পঞ্চগড়গামী একটি কোচে ওঠেন। পরে কোচের লোকজন তাকে দিনাজপুরের দশমাইল এলাকায় নামিয়ে দেয় এবং একটি চায়ের দোকানে বসতে বলে।

ভোরের সময় একা কিশোরীকে দেখে নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে স্থানীয় লোকজন তাকে দিনাজপুর শহরে মায়ের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য পুলিশের হাতে তুলে দেন। কিন্তু নিরাপদে মায়ের কাছে পৌঁছানোর বদলে পুলিশের কয়েকজন সদস্যের হাতে ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হন ইয়াসমিন।

অভিযোগ অনুযায়ী, পথে পুলিশ সদস্যরা তাকে সংঘবদ্ধভাবে ধর্ষণের পর হত্যা করেন। পরে দিনাজপুর শহর থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে দিনাজপুর সদর উপজেলার ব্র্যাক অফিসের পাশের সড়কে তার মরদেহ ফেলে রেখে যান তারা।

পরদিন ঘটনাটি জানাজানি হলে ক্ষোভে ফেটে পড়ে দিনাজপুর। কয়েক হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ মিছিল করেন। তারা ইয়াসমিন হত্যার সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।

ঘটনাকে ধামাচাপা দেওয়ার অভিযোগ, বাড়ে ক্ষোভ

ইয়াসমিন হত্যার পর তৎকালীন পুলিশ প্রশাসনের বিরুদ্ধে ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা এবং ইয়াসমিনকে ‘যৌনকর্মী’ হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টার অভিযোগ ওঠে। এমন অভিযোগ জনমনে ক্ষোভ আরও বাড়িয়ে দেয়।

Manual2 Ad Code

দিনাজপুরের সর্বস্তরের মানুষ প্রতিবাদে রাজপথে নেমে আসেন। শুরু হয় ধারাবাহিক বিক্ষোভ। পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষের পরিস্থিতি তৈরি হয়। বিক্ষুব্ধ জনতার ওপর পুলিশ লাঠিচার্জ করে। এতে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

২৬ আগস্ট রাতে বিক্ষুব্ধ জনতা কোতয়ালি থানা ঘেরাও করে বিক্ষোভ করতে থাকলে পুলিশ আবারও তাদের ওপর লাঠিচার্জ করে। একপর্যায়ে হাজারো মানুষ কোতয়ালি থানার সীমানাপ্রাচীর ভেঙে ফেলে।

পরদিন ২৭ আগস্ট দিনাজপুরের মানুষ প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকর্তার বদলি এবং ইয়াসমিন হত্যায় জড়িত পুলিশ সদস্যদের শাস্তির দাবিতে বিশাল মিছিল বের করেন। আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে শহরের বিভিন্ন এলাকায়।

পুলিশের গুলিতে নিহত সাত

২৭ আগস্ট আন্দোলন দমাতে শহরের বিভিন্ন স্থানে পুলিশ নির্বিচারে গুলি চালায় বলে আন্দোলনসংশ্লিষ্টদের বর্ণনায় উঠে আসে। এতে সামু, কাদের ও সিরাজসহ নাম না জানা সাতজন নিহত হন। আহত হন তিন শতাধিক মানুষ।

ইয়াসমিন হত্যার প্রতিবাদে শুরু হওয়া আন্দোলন তখন রূপ নেয় বৃহত্তর গণআন্দোলনে। একপর্যায়ে বিক্ষুব্ধ জনতা দিনাজপুর শহরের চারটি পুলিশ ফাঁড়িতে আগুন দেয়।

তবে এই বিক্ষোভের সুযোগে কতিপয় স্বার্থান্বেষী ও দুষ্কৃতকারী দিনাজপুর প্রেসক্লাব, দৈনিক উত্তরবাংলাসহ স্থানীয় পাঁচটি পত্রিকা অফিসে আগুন দেয় বলে তৎকালীন ঘটনাবলিতে উল্লেখ রয়েছে। এতে আন্দোলনের মূল দাবির পাশাপাশি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিও বড় হয়ে ওঠে।

কারফিউ, পুলিশ প্রত্যাহার

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দিনাজপুর শহরে কারফিউ জারি করা হয়। টানা তিন দিন কারফিউ চলার পর পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে থাকে।

ঘটনার পর তৎকালীন পুলিশ সুপার আব্দুল মোতালেবসহ শহরের পুলিশ সদস্যদের বরখাস্ত করা হয়। শহরের নিয়ন্ত্রণ নেয় তৎকালীন বিডিআর বাহিনী। পরে দিনাজপুরের জেলা প্রশাসক জব্বার ফারুককেও প্রত্যাহার করা হয়।

এ ঘটনায় তৎকালীন দিনাজপুর সিআইডি জোনের সিনিয়র এএসপি আফজাল হোসেন বাদী হয়ে পুলিশের এএসআই ময়নুল ইসলাম, কনস্টেবল আব্দুস সাত্তার এবং পিকআপ ভ্যানচালক কনস্টেবল অমৃত লালকে আসামি করে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে কোতয়ালি থানায় মামলা করেন।

আদালতে অভিযোগপত্র, তিন পুলিশ সদস্যের মৃত্যুদণ্ড

Manual6 Ad Code

মামলাটি তদন্ত করেন পুলিশের সিনিয়র এএসপি মাহফুজুর রহমান। তদন্ত শেষে এএসআই ময়নুল ইসলাম, কনস্টেবল আব্দুস সাত্তার, পিকআপ ভ্যানচালক কনস্টেবল অমৃত লাল, তৎকালীন দিনাজপুরের পুলিশ সুপার আব্দুল মোতালেব, কোতয়ালি থানার তৎকালীন ওসি এসআই মাহতাব উদ্দীন, এএসআই স্বপন কুমার, এসআই মতিয়ার রহমান, এএসআই জাহাঙ্গীর আলম এবং ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক মহসিনকে আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়।

নিরাপত্তাজনিত কারণে ইয়াসমিন হত্যা মামলাটি দিনাজপুর থেকে রংপুরে স্থানান্তর করা হয়।

১৯৯৭ সালে রংপুর বিশেষ আদালতে মামলার সাক্ষ্য-প্রমাণ শেষে এএসআই ময়নুল ইসলাম, পুলিশ কনস্টেবল আব্দুস সাত্তার এবং পিকআপ চালক কনস্টেবল অমৃত লাল বর্মণকে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।

রায়ের পরও দীর্ঘ সময় ধরে দণ্ড কার্যকরের অপেক্ষা চলতে থাকে। অবশেষে ২০০৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ইয়াসমিন ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত তিন আসামির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

তিন দশক পরও স্বজনদের প্রশ্ন

ইয়াসমিন হত্যার বিচার সম্পন্ন এবং দণ্ড কার্যকর হলেও আন্দোলনে নিহত ও আহতদের পরিবারের প্রত্যাশা পুরোপুরি পূরণ হয়েছে কি না—৩১ বছর পরও সেই প্রশ্ন রয়ে গেছে।

নিহত সামু, সিরাজ ও কাদেরের স্ত্রীদের চাকরি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়। কিন্তু দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

ইয়াসমিনের পরিবারসহ আন্দোলনে নিহতদের স্বজনদের অনেকেই মনে করেন, শুধু একটি মামলার রায় ও দণ্ড কার্যকর করলেই একটি ঐতিহাসিক গণআন্দোলনের দায় শেষ হয় না। নিহত ও আহতদের পরিবারের সামাজিক ও অর্থনৈতিক পুনর্বাসন, প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন এবং নারী নির্যাতন প্রতিরোধে কার্যকর রাষ্ট্রীয় উদ্যোগও প্রয়োজন।

ইয়াসমিনের স্মৃতি এখন প্রতিরোধের প্রতীক

ইয়াসমিনের নাম এখন শুধু ১৯৯৫ সালের একটি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত নয়; এটি বাংলাদেশের নারী নির্যাতনবিরোধী আন্দোলনের একটি প্রতীক হয়ে উঠেছে। একটি কিশোরীকে নিরাপদে তার মায়ের কাছে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব নেওয়ার পর যারা তার জীবন ও সম্ভ্রমের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বদলে অপরাধে জড়িয়ে পড়েছিল, সেই ঘটনা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি নিয়েও বড় প্রশ্ন তৈরি করেছিল।

ইয়াসমিন হত্যার পর দিনাজপুরে যে গণআন্দোলন হয়েছিল, তার অভিঘাত ছড়িয়ে পড়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা আরও জোরালোভাবে সামনে আসে।

কিন্তু ৩১ বছর পরও নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতার বিভিন্ন ঘটনা সমাজকে নাড়া দেয়। ফলে ইয়াসমিন দিবসের তাৎপর্য কেবল অতীত স্মরণে সীমাবদ্ধ নয়; এটি বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সতর্কবার্তাও।

নারী যেন পথে, কর্মক্ষেত্রে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, গণপরিবহনে কিংবা রাষ্ট্রীয় কোনো প্রতিষ্ঠানের আশ্রয়ে থেকেও নিরাপত্তাহীনতায় না ভোগেন—এই নিশ্চয়তা প্রতিষ্ঠাই হতে পারে ইয়াসমিন হত্যার স্মৃতির প্রতি সবচেয়ে বড় সম্মান।

৩১ বছর আগে ইয়াসমিনের মায়ের কাছে ফেরার পথ থেমে গিয়েছিল। সেই পথের রক্তাক্ত স্মৃতি আজও দিনাজপুরের মানুষ বহন করছে। বিচার হয়েছে, দণ্ড কার্যকর হয়েছে; কিন্তু ইয়াসমিন যে প্রশ্ন রেখে গেছেন—নারীর নিরাপত্তা ও মর্যাদা কি সত্যিই নিশ্চিত হয়েছে—তার পূর্ণাঙ্গ উত্তর এখনো খুঁজে ফিরছে বাংলাদেশ।

Manual4 Ad Code