বীর মুক্তিযোদ্ধা মাহবুবা রাশিদা চপলের পঞ্চম মৃত্যুবার্ষিকী স্মরণে

প্রকাশিত: ১:০১ পূর্বাহ্ণ, আগস্ট ২৫, ২০২৬

বীর মুক্তিযোদ্ধা মাহবুবা রাশিদা চপলের পঞ্চম মৃত্যুবার্ষিকী স্মরণে

Manual3 Ad Code

বিশেষ প্রতিনিধি | ঢাকা, ২৫ আগস্ট ২০২৬ : ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন)-এর সাবেক নেত্রী, বীর মুক্তিযোদ্ধা, দক্ষ সংগঠক ও শিক্ষাবিদ বেগম মাহবুবা রাশিদা চপলের পঞ্চম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। ২০২১ সালের এই দিনে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং সহযোদ্ধা ও শুভানুধ্যায়ীরা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে তাঁকে স্মরণ করছেন।

মাহবুবা রাশিদা চপল ছিলেন প্রগতিশীল ও বামপন্থি রাজনৈতিক-সামাজিক আন্দোলনের সঙ্গে দীর্ঘদিন যুক্ত এক সাহসী নারী সংগঠক। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। মহান মুক্তিযুদ্ধেও তিনি সরাসরি অংশ নেন এবং সম্মুখসমরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সাহসিকতার সঙ্গে লড়াই করেন।

মুক্তিযুদ্ধে সাহসী ভূমিকা

Manual5 Ad Code

মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় নরসিংদীর শিবপুরে বামপন্থিদের ঘাঁটি এলাকায় অবস্থান নিয়ে চপল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। যুদ্ধের উত্তাল সময়ে তিনি শুধু সংগঠকের ভূমিকা পালন করেননি, অস্ত্র হাতে সরাসরি পাকসেনাদের মোকাবেলাও করেছেন।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানি বাহিনীর সশস্ত্র আক্রমণের সময় তিনি মাথায় গুলিবিদ্ধ হন। গুরুতর আহত হওয়ার পরও তাঁর সাহস ও মনোবল ছিল অটুট। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও দেশপ্রেম তাঁর রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনের অন্যতম প্রধান প্রেরণা হয়ে ওঠে।

ছাত্র আন্দোলন ও নারী মুক্তি আন্দোলনে অবদান

মাহবুবা রাশিদা চপল ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন)-এর সাবেক নেত্রী হিসেবে প্রগতিশীল ছাত্র আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি সংগঠন গড়ে তোলা, মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন।

নারীর অধিকার ও মুক্তির আন্দোলনেও তাঁর ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। তিনি ‘বাংলাদেশ নারী মুক্তি সংসদ’-এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের একজন। সংগঠনটির মাধ্যমে নারী নির্যাতন, বৈষম্য ও সামাজিক পশ্চাৎপদতার বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরি এবং নারীর রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে তিনি সক্রিয় ছিলেন।

Manual4 Ad Code

প্রগতিশীল রাজনীতি ও নারী মুক্তি আন্দোলনের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামেও তাঁর ছিল দীর্ঘ সম্পৃক্ততা। সংগঠক হিসেবে তিনি ছিলেন দৃঢ়চেতা, দায়িত্বশীল ও মানুষের প্রতি সংবেদনশীল।

সাংবাদিকতা থেকে শিক্ষকতা

মাহবুবা রাশিদা চপল তাঁর পেশাজীবন শুরু করেন সাংবাদিকতার মাধ্যমে। পরবর্তীতে তিনি শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত হন। শিক্ষাজীবনের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পৃক্ততায় তিনি অসংখ্য শিক্ষার্থীর শিক্ষক ও অভিভাবকের ভূমিকা পালন করেন।

Manual5 Ad Code

দীর্ঘ ৩৫ বছর তিনি ঢাকার আজিমপুর অগ্রণী বালিকা বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন। শিক্ষক হিসেবে তিনি শুধু পাঠ্যক্রমের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিলেন না; শিক্ষার্থীদের নৈতিক মূল্যবোধ, দেশপ্রেম, মানবিকতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা সম্পর্কে সচেতন করার ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখেন। তাঁর দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবন তাঁকে শিক্ষার্থী ও সহকর্মীদের কাছে একজন শ্রদ্ধেয় শিক্ষক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।

বিপ্লবী ছাত্র আন্দোলনের নেতার সহধর্মিণী

মাহবুবা রাশিদা চপল ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এবং প্রয়াত বামপন্থি নেতা হায়দার আনোয়ার খান জুনোর সহধর্মিণী। রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত দুই মানুষের এই পরিবার ছিল প্রগতিশীল চিন্তা ও আদর্শচর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র।

ব্যক্তিজীবনের পাশাপাশি রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডেও চপল তাঁর স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি করেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ, ছাত্র আন্দোলন, নারী মুক্তি আন্দোলন এবং শিক্ষকতা—বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁর অবদান তাঁকে প্রজন্মের পর প্রজন্মের কাছে স্মরণীয় করে রেখেছে।

মৃত্যুকালে তিনি এক কন্যা ও এক পুত্র রেখে যান।

ওয়ার্কার্স পার্টির শ্রদ্ধা

মাহবুবা রাশিদা চপলের পঞ্চম মৃত্যুবার্ষিকীতে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির পক্ষ থেকে গভীর শ্রদ্ধা জানানো হয়েছে।

এক বিবৃতিতে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি কমরেড মাহমুদুল হাসান মানিক ও ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক কমরেড নূর আহমেদ বকুল বীর মুক্তিযোদ্ধা মাহবুবা রাশিদা চপলের স্মৃতির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

তাঁরা বলেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, প্রগতিশীল রাজনীতি, ছাত্র আন্দোলন ও নারী মুক্তির সংগ্রামে মাহবুবা রাশিদা চপলের অবদান স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তাঁর জীবন ও সংগ্রাম নতুন প্রজন্মের কাছে অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।

সৈয়দ আমিরুজ্জামানের শ্রদ্ধা

মৃত্যুবার্ষিকীতে মাহবুবা রাশিদা চপলের স্মৃতির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানিয়েছেন বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির মৌলভীবাজার জেলা সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য, আরপি নিউজের সম্পাদক ও বিশিষ্ট কলামিস্ট কমরেড সৈয়দ আমিরুজ্জামান।

তিনি মাহবুবা রাশিদা চপলকে মুক্তিযুদ্ধের সাহসী যোদ্ধা, প্রগতিশীল ছাত্র আন্দোলনের নেত্রী, নারী মুক্তি আন্দোলনের সংগঠক এবং নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক হিসেবে স্মরণ করেন।

সৈয়দ আমিরুজ্জামান বলেন, বেগম মাহবুবা রাশিদা চপলের জীবন ছিল সংগ্রাম, সাহস ও আদর্শের সমন্বয়ে গড়া। মহান মুক্তিযুদ্ধে তাঁর সাহসিকতা, প্রগতিশীল ছাত্র রাজনীতিতে তাঁর ভূমিকা এবং নারী মুক্তির আন্দোলনে তাঁর অবদান ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকবে। একজন শিক্ষক হিসেবেও তিনি দীর্ঘদিন নতুন প্রজন্মকে গড়ে তুলতে ভূমিকা রেখেছেন।

তিনি আরও বলেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও অসাম্প্রদায়িক-গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠার যে স্বপ্ন নিয়ে মাহবুবা রাশিদা চপল জীবনভর সংগ্রাম করেছেন, সেই আদর্শ বাস্তবায়নের মধ্য দিয়েই তাঁর প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা জানানো সম্ভব।

সংগ্রামী জীবনের প্রতি শ্রদ্ধা

মাহবুবা রাশিদা চপলের জীবনকে শুধু একজন মুক্তিযোদ্ধা কিংবা রাজনৈতিক কর্মীর জীবন হিসেবে দেখলে তাঁর অবদানের পূর্ণ মূল্যায়ন হয় না। তিনি ছিলেন একই সঙ্গে সংগঠক, সাংবাদিক, শিক্ষক, নারী অধিকারকর্মী এবং প্রগতিশীল রাজনৈতিক আন্দোলনের কর্মী। জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে তিনি যে দায়িত্বই পালন করেছেন, সেখানে মানুষের অধিকার, মুক্তি ও মর্যাদার প্রশ্নকে গুরুত্ব দিয়েছেন।

মহান মুক্তিযুদ্ধে তাঁর সরাসরি অংশগ্রহণ এবং গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা তাঁর সাহসিকতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। স্বাধীনতার পরও তিনি মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক চেতনাকে ধারণ করে বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন।

Manual6 Ad Code

পঞ্চম মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁর সহযোদ্ধা, রাজনৈতিক সহকর্মী, শিক্ষার্থী, শুভানুধ্যায়ী এবং পরিবারের সদস্যরা শ্রদ্ধার সঙ্গে তাঁকে স্মরণ করছেন। মুক্তিযুদ্ধ ও প্রগতিশীল আন্দোলনের ইতিহাসে মাহবুবা রাশিদা চপলের অবদান ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা এবং তাঁর আদর্শ ও সংগ্রামী জীবন থেকে শিক্ষা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তাঁর সহযোদ্ধারা।

বীর মুক্তিযোদ্ধা মাহবুবা রাশিদা চপল তাঁর কর্ম, সাহস ও আদর্শের মধ্য দিয়ে যে স্মৃতি রেখে গেছেন, তা প্রগতিশীল রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনের ইতিহাসে দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।