প্রকাশিত হলো এফ এম শাহীনের ‘ধানমণ্ডি ৩২, পোড়াবাড়ির সংলাপ’

প্রকাশিত: ১২:৫১ অপরাহ্ণ, আগস্ট ২৭, ২০২৬

প্রকাশিত হলো এফ এম শাহীনের ‘ধানমণ্ডি ৩২, পোড়াবাড়ির সংলাপ’

Manual6 Ad Code

নিজস্ব প্রতিবেদক | কলকাতা (ভারত), ২৭ আগস্ট ২০২৬ : লেখক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা এফ এম শাহীনের নতুন গ্রন্থ ‘ধানমণ্ডি ৩২, পোড়াবাড়ির সংলাপ’ প্রকাশিত হয়েছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার এবং সমকালীন বাংলাদেশের নানা সংকট ও প্রশ্নকে সাহিত্যিক সংলাপের মধ্য দিয়ে তুলে ধরার প্রয়াস রয়েছে গ্রন্থটিতে।

Manual1 Ad Code

গত ২৩ আগস্ট ২০২৬, রবিবার বিকেল ৫টায়, কলকাতার রবীন্দ্র সদন চত্বরের অবনীন্দ্র সভাঘরে গ্রন্থটির প্রকাশনা অনুষ্ঠিত হয়েছে। কলকাতার প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান পরম্পরা প্রকাশন থেকে বইটি প্রকাশিত হয়।

গ্রন্থ প্রকাশনা অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন পদ্মশ্রী ড. নারায়ন চক্রবর্তী। বক্তব্যে তিনি বলেন, এফ এম শাহীন অতীতের চোখ দিয়ে ভবিষ্যতের বাংলাদেশকে দেখার ক্ষেত্রে অসাধারণ মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন। বইটিতে বর্তমান বাংলাদেশের রাজনীতি, অর্থনীতি ও সমাজবাস্তবতার নানা দিক উঠে এসেছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

Manual8 Ad Code

ড. নারায়ন চক্রবর্তী বলেন, বাংলাদেশের মানুষকে নিজেদেরই ঠিক করতে হবে, তারা কোন পরিচয়ে টিকে থাকবে—বাঙালি পরিচয়ে, নাকি অন্য কোনো পরিচয়ে। তাঁর ভাষায়, ‘পোড়াবাড়ির সংলাপ যেন আজকের বাংলাদেশের জীবন্ত প্রতীক হয়ে উঠেছে।’

অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে বর্ষীয়ান সাংবাদিক মানস ঘোষ এফ এম শাহীনের সাহিত্যিক প্রয়াসের প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, ধানমণ্ডি ৩২-এর শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক স্মৃতিবিজড়িত বাড়িকে কেন্দ্র করে শাহীন অসাধারণ সাহিত্যচর্চা করেছেন। ইতিহাস কেবল রাষ্ট্রীয় দলিল বা ক্ষমতাসীনদের বয়ান নয়, সাধারণ মানুষও যে ইতিহাস নির্মাণ করে চলেছেন—উপন্যাসটিতে সেই বিষয়টি দারুণভাবে ফুটে উঠেছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে মানস ঘোষ বলেন, একাত্তরে পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যার প্রতিবেদন থেকে শুরু করে বাংলাদেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক পরিবর্তন তিনি দীর্ঘ সময় ধরে পর্যবেক্ষণ করেছেন। ২০২৪ সালে শেখ হাসিনা সরকারের পরিবর্তনের পর ধানমণ্ডি ৩২-এর বাড়িতে অগ্নিসংযোগ এবং পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থাপনা ও স্মৃতিচিহ্ন ঘিরে সংঘটিত ঘটনাগুলো নিয়েও তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন। এসব ঘটনা বাংলাদেশের ইতিহাস, রাজনৈতিক স্মৃতি ও জাতীয় পরিচয় নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে বলে তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে।

অধ্যাপক রুবি সাইন বলেন, এফ এম শাহীনের উপন্যাস বাংলাদেশের বাঙালির অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎকে একটি সেতুর মাধ্যমে যুক্ত করার চেষ্টা করেছে। তাঁর মতে, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যতিক্রমী ভাবনা। একই সঙ্গে বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতায় যে পরিবর্তন ঘটছে, তা গভীরভাবে ভাবার বিষয়।

গ্রন্থের লেখক এফ এম শাহীন বলেন, মানবসভ্যতার বিকাশ সংলাপের মধ্য দিয়েই হয়েছে। তাই যেকোনো সময়, যেকোনো পরিস্থিতিতে সংলাপ চালু রাখা প্রয়োজন। তাঁর মতে, সংকট যত গভীরই হোক, তা মোকাবিলায় সংলাপের কোনো বিকল্প নেই।

‘ধানমণ্ডি ৩২, পোড়াবাড়ির সংলাপ’ বইটির কেন্দ্রীয় প্রতীক হিসেবে রয়েছে ধানমণ্ডি ৩২। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ধানমণ্ডি ৩২ একটি গুরুত্বপূর্ণ স্মারক ও আবেগের স্থান। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক জীবন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন এবং রাষ্ট্রের জন্মের ইতিহাসের সঙ্গে স্থানটি ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। সেই ঐতিহাসিক স্মৃতি যখন রাজনৈতিক সংঘাত, পরিবর্তন ও ধ্বংসের মুখোমুখি হয়, তখন অতীত ও বর্তমানের সম্পর্ক কীভাবে পুনর্বিবেচিত হতে পারে—বইটির সংলাপনির্ভর কাঠামোয় সেই প্রশ্নই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

অনুষ্ঠানে বক্তাদের আলোচনায় উঠে আসে ইতিহাসের পাঠ, জাতীয় পরিচয়, রাজনৈতিক উত্তরাধিকার এবং বাংলাদেশের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা প্রশ্ন। তাঁদের মতে, বইটির শিরোনাম ‘ধানমণ্ডি ৩২, পোড়াবাড়ির সংলাপ’ নিছক কোনো স্থানের বর্ণনা নয়; বরং এটি একটি প্রতীকী উচ্চারণ। ধ্বংসপ্রাপ্ত একটি ঐতিহাসিক স্থাপনার স্মৃতি, তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা রাজনৈতিক ইতিহাস এবং পরিবর্তিত সময়ের বাস্তবতাকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে লেখক একটি বৃহত্তর সামাজিক ও রাজনৈতিক সংলাপের ক্ষেত্র তৈরি করেছেন।

এফ এম শাহীন দীর্ঘদিন ধরে লেখালেখি, চলচ্চিত্র নির্মাণ ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত। তাঁর সৃষ্টিশীল কাজের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো ইতিহাস, সমাজ, রাষ্ট্র, মানবিকতা ও রাজনৈতিক বাস্তবতাকে শিল্পের ভাষায় উপস্থাপন করা। মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশের ইতিহাসকে কেন্দ্র করে তাঁর বিভিন্ন সৃজনশীল কাজ ইতোমধ্যে পাঠক ও দর্শকমহলে আলোচিত হয়েছে। তাঁর নির্মিত চলচ্চিত্র ‘মাইক’ ইতোমধ্যে মুক্তি পেয়েছে।

Manual8 Ad Code

গ্রন্থটির প্রকাশক গৌতম দাস বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাস ও রাজনৈতিক স্মৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কে নতুনভাবে ভাবার সুযোগ তৈরি করতে পারে বইটি। বিশেষ করে দুই বাংলার পাঠকের কাছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস, ঐতিহাসিক স্মৃতি ও বর্তমান বাস্তবতাকে ভিন্ন একটি সাহিত্যিক পরিসরে বিবেচনার সুযোগ তৈরি হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

গ্রন্থ প্রকাশনা অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন গণজাগরণ মঞ্চের অন্যতম সংগঠক ও সাবেক ছাত্রনেতা বাপ্পাদিত্য বসু, বিশিষ্ট ভারতীয় কলামিস্ট, গবেষক এবং রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক প্রতিম রঞ্জন বোস, বিশিষ্ট লেখক বিজয় দত্ত এবং বিশিষ্ট লেখক শরবিন্দু সাহা।

অনুষ্ঠানের শুরু ও শেষে সংগীত পরিবেশন করেন কমলিকা চক্রবর্তী। সাহিত্য, সংস্কৃতি, সাংবাদিকতা ও রাজনৈতিক অঙ্গনের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠানটি দুই বাংলার ইতিহাস, রাজনীতি ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক নিয়ে একটি তাৎপর্যপূর্ণ আলোচনার ক্ষেত্র তৈরি করে।

লেখকের বক্তব্য অনুযায়ী, ‘সংলাপ’ই বইটির মূল দর্শন। অতীতের সঙ্গে বর্তমানের, ইতিহাসের সঙ্গে সমকালের এবং ভিন্ন মতের মানুষের মধ্যে সংলাপ অব্যাহত রাখার প্রয়োজনীয়তাই গ্রন্থটির অন্যতম প্রধান বার্তা। ধানমণ্ডি ৩২-এর স্মৃতিকে কেন্দ্র করে সেই সংলাপ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের পাঠ এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবনার নতুন দুয়ার খুলবে—এমন প্রত্যাশাই প্রকাশনা অনুষ্ঠানে উঠে আসে।

Manual1 Ad Code

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ