সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতা ও সমাজতন্ত্রের শিক্ষা ফিদেল কাস্ত্রোর কাছ থেকে নিতে হবে: ওয়ার্কার্স পার্টি

প্রকাশিত: ৫:৫০ অপরাহ্ণ, আগস্ট ২৯, ২০২৬

সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতা ও সমাজতন্ত্রের শিক্ষা ফিদেল কাস্ত্রোর কাছ থেকে নিতে হবে: ওয়ার্কার্স পার্টি

Manual6 Ad Code

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা, ২৯ আগস্ট ২০২৬ : কিউবার মহান বিপ্লবী নেতা ও সাবেক প্রেসিডেন্ট কমরেড ফিদেল কাস্ত্রোর জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে আলোচনা সভা করেছে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির আন্তর্জাতিক বিভাগ।

Manual6 Ad Code

সভায় বক্তারা বলেছেন, সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন প্রতিরোধ, জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতা রক্ষা এবং সমাজতন্ত্রের পথে অবিচল থাকার ক্ষেত্রে কমরেড ফিদেল কাস্ত্রোর রাজনৈতিক জীবন ও সংগ্রাম থেকে শিক্ষা নেওয়া প্রয়োজন।

শনিবার (২৯ আগস্ট ২০২৬) রাজধানীর তোপখানা রোডে শহীদ রাসেল আহমেদ খান স্মৃতি ভবনে এ আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।

বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির আন্তর্জাতিক বিভাগ আয়োজিত সভায় দলের কেন্দ্রীয় নেতারা কমরেড ফিদেল কাস্ত্রোর বিপ্লবী সংগ্রাম, কিউবার সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে আলোচনা করেন।

সভায় সভাপতিত্ব করেন ওয়ার্কার্স পার্টির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি কমরেড মাহমুদুল হাসান মানিক। সভা পরিচালনা করেন দলের আন্তর্জাতিক বিভাগের ইনচার্জ কমরেড আলী আহমেদ এনামুল হক এমরান।

আলোচনা সভায় দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য কমরেড শরীফ শমসির ‘কমরেড ফিদেল কাস্ত্রোর জন্মশতবর্ষের আহ্বান: কিউবা থেকে হাত গুটাও মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ!’ শীর্ষক একটি প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। প্রবন্ধে কিউবার ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপ এবং কিউবার বিপ্লবের ঐতিহাসিক তাৎপর্য তুলে ধরা হয়।

পরে আলোচনায় অংশ নেন দলের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক কমরেড নুর আহমদ বকুলসহ কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ।

বক্তারা বলেন, ফিদেল কাস্ত্রো ছিলেন বিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রভাবশালী বিপ্লবী নেতা। কিউবার বিপ্লবের নেতৃত্ব দেওয়ার পাশাপাশি তিনি লাতিন আমেরিকায় সাম্রাজ্যবাদবিরোধী রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতীকে পরিণত হন। তাঁর নেতৃত্বে কিউবা দীর্ঘ সময় ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপের মুখে থেকেও নিজস্ব রাষ্ট্রীয় নীতি ও রাজনৈতিক পথ ধরে এগিয়ে যায়।

বক্তারা আরও বলেন, ফিদেল কাস্ত্রোর রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল কিউবার জাতীয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রশ্নে আপসহীন অবস্থান। কিউবার বিপ্লবের পর দেশটির ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন ধরনের চাপ, অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ফিদেল কাস্ত্রো তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান থেকে সরে আসেননি। তাঁর নেতৃত্বে কিউবা দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে মার্কিন নীতির বিরোধিতা করে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা বজায় রেখেছে।

Manual2 Ad Code

আলোচনায় ফিদেল কাস্ত্রোর ওপর একাধিক হত্যাচেষ্টার প্রসঙ্গও উঠে আসে। বক্তারা বলেন, কিউবার বিপ্লবের পর ফিদেল কাস্ত্রোকে লক্ষ্য করে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বিভিন্ন ষড়যন্ত্রের কথা ঐতিহাসিকভাবে আলোচিত হয়েছে। একই সঙ্গে কিউবার বিরুদ্ধে দীর্ঘস্থায়ী মার্কিন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও অবরোধ দেশটির অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনে ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করলেও ফিদেল কাস্ত্রোর নেতৃত্বে কিউবা তার নিজস্ব রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো ধরে রাখে।

বক্তারা বলেন, ফিদেল কাস্ত্রোর অবদান শুধু বিপ্লব ও রাষ্ট্রীয় রাজনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। কিউবায় শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, ভূমি সংস্কার এবং সামাজিক সমতা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তাঁর নেতৃত্বাধীন সরকার গুরুত্বপূর্ণ নীতি গ্রহণ করে। বিশেষ করে কিউবার সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছে। সীমিত সম্পদ নিয়েও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে কিউবার অভিজ্ঞতা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।

তাঁরা বলেন, বিপ্লবের পর কিউবায় ব্যাপক নিরক্ষরতা দূরীকরণ কর্মসূচি, শিক্ষা সম্প্রসারণ এবং স্বাস্থ্যসেবাকে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়। সমাজের সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর জন্য শিক্ষা ও চিকিৎসার সুযোগ বাড়ানো এবং সামাজিক বৈষম্য কমানোর নীতিকে কিউবার বিপ্লবী সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

সভায় বক্তারা বর্তমান বিশ্বের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার প্রসঙ্গ তুলে বলেন, সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর অর্থনৈতিক আধিপত্য, সামরিকীকরণ এবং বিভিন্ন দেশে হস্তক্ষেপের প্রবণতা এখনো বিদ্যমান। বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অসমতা, সামরিক প্রতিযোগিতা এবং পরাশক্তির প্রভাব মোকাবিলায় জাতীয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

তাঁদের মতে, সামরিক শক্তি ও অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে কোনো দেশের জনগণের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা গ্রহণযোগ্য নয়। একটি দেশের জনগণের নিজস্ব রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নির্ধারণের অধিকারকে সম্মান করতে হবে। এ ক্ষেত্রে কিউবার দীর্ঘ সংগ্রাম ও ফিদেল কাস্ত্রোর রাজনৈতিক অবস্থানকে তাঁরা গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন।

বক্তারা বলেন, ফিদেল কাস্ত্রোর জন্মশতবর্ষ শুধু একজন বিপ্লবী নেতাকে স্মরণ করার আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং তাঁর রাজনৈতিক সংগ্রাম, সাম্রাজ্যবাদবিরোধী অবস্থান এবং সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টাকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরারও একটি সুযোগ। বিশেষ করে জাতীয় সার্বভৌমত্ব, স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি এবং জনগণের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে তাঁর রাজনৈতিক দর্শন থেকে শিক্ষা নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

Manual5 Ad Code

তাঁরা আরও বলেন, সাম্রাজ্যবাদবিরোধিতা কোনো নির্দিষ্ট দেশ বা অঞ্চলের বিষয় নয়। এটি বিশ্বের নিপীড়িত ও উন্নয়নশীল জনগণের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধিকারের সঙ্গে সম্পর্কিত। বহুজাতিক পুঁজির আধিপত্য, অর্থনৈতিক অবরোধ, সামরিক হস্তক্ষেপ ও নয়াউপনিবেশিক প্রভাবের বিরুদ্ধে জনগণের ঐক্য গড়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে।

আলোচনায় ফিদেল কাস্ত্রোর নেতৃত্বে কিউবার আন্তর্জাতিকতাবাদী ভূমিকার কথাও উল্লেখ করা হয়। বক্তারা বলেন, কিউবা বিভিন্ন সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে চিকিৎসা ও মানবিক সহায়তা পাঠিয়েছে। বিশেষ করে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী পাঠানোর মাধ্যমে কিউবার আন্তর্জাতিক সংহতির নীতি বিশ্বব্যাপী পরিচিতি পেয়েছে।

Manual1 Ad Code

সভায় বক্তারা বলেন, বর্তমান সময়ে সাম্রাজ্যবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ও সামরিকীকরণের বিরুদ্ধে সংগ্রামের পাশাপাশি জনগণের জন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্য, খাদ্য, বাসস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রশ্নকে গুরুত্ব দিতে হবে। শুধু রাজনৈতিক স্বাধীনতা নয়, মানুষের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অধিকারও নিশ্চিত করতে হবে।

ওয়ার্কার্স পার্টির নেতারা বলেন, ফিদেল কাস্ত্রোর রাজনৈতিক জীবন থেকে সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও জনগণের স্বার্থ ও জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে দৃঢ় থাকা। দীর্ঘস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা, রাজনৈতিক চাপ ও আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতার মধ্যেও কিউবার নিজস্ব রাষ্ট্রীয় পথ অনুসরণের সক্ষমতাকে তাঁরা ফিদেল কাস্ত্রোর নেতৃত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে তুলে ধরেন।

আলোচনা সভায় বক্তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি কিউবার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ প্রত্যাহারের আহ্বান জানান। একই সঙ্গে কিউবার জনগণের নিজস্ব রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নির্ধারণের অধিকার এবং রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের দাবি জানান।

তাঁরা বলেন, ফিদেল কাস্ত্রো আজ কেবল কিউবার ইতিহাসের একটি অধ্যায় নন; তিনি বিশ্বের সাম্রাজ্যবাদবিরোধী রাজনৈতিক আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম। তাঁর সংগ্রাম ও রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিয়ে নতুন করে আলোচনা করার মধ্য দিয়ে বর্তমান প্রজন্ম জাতীয় স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, সামাজিক ন্যায় ও বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে নতুনভাবে ভাবার সুযোগ পেতে পারে।

আলোচনা সভা থেকে বক্তারা সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন ও আধিপত্যের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল শক্তির ঐক্য জোরদার করার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষা, জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং শোষণ-বৈষম্যমুক্ত সমাজ নির্মাণের সংগ্রামকে এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

সভায় ওয়ার্কার্স পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির নেতৃবৃন্দ ও বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ