মোমের আলোয় বন্যায় নিহতদের স্মরণ বাকৃবির নেপালি শিক্ষার্থীদের

প্রকাশিত: ৮:৫৫ পূর্বাহ্ণ, আগস্ট ২৯, ২০২৬

মোমের আলোয় বন্যায় নিহতদের স্মরণ বাকৃবির নেপালি শিক্ষার্থীদের

Manual8 Ad Code
  • দেশের এই সংকটে নেপালের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান, ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তার আশ্বাস বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের

নিজস্ব প্রতিবেদক | ময়মনসিংহ, ২৯ আগস্ট ২০২৬ : নেপালে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে প্রাণহানি এবং ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির ঘটনায় গভীর শোক ও সংহতি প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে (বাকৃবি) অধ্যয়নরত নেপালি শিক্ষার্থীরা।

দেশটির তিব্বত সীমান্তবর্তী এলাকায় হিমবাহ ধস ও ভূমিধস থেকে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যায় নিহতদের স্মরণে মোমবাতি প্রজ্বলন ও এক মিনিট নীরবতা পালন করেছেন তারা। একই সঙ্গে প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিপর্যস্ত নেপালের মানুষের পাশে দাঁড়াতে বাংলাদেশ ও সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি সহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

শুক্রবার (২৮ আগস্ট ২০২৬) সন্ধ্যায় বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তমঞ্চের সামনে এ মোমবাতি প্রজ্বলন কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক ডেস্কের উদ্যোগে আয়োজিত এ কর্মসূচিতে বাকৃবিতে অধ্যয়নরত নেপালি শিক্ষার্থীরা অংশ নেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা, বিভিন্ন হলের প্রভোস্ট, শিক্ষার্থী ও ছাত্রসংগঠনের নেতারাও কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন।

কর্মসূচির শুরুতে নেপালে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে নিহতদের স্মরণ করা হয়। পরে নেপালি শিক্ষার্থীরা ধর্মীয় রীতিনীতি অনুসরণ করে মোমবাতি প্রজ্বলন করেন। নিহতদের আত্মার শান্তি কামনা এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। মোমের আলোয় পুরো আয়োজনজুড়ে নেমে আসে শোক ও আবেগঘন পরিবেশ।

‘আমরা বড় কিছু করতে না পারলেও শোক ও সংহতি জানাতে চাই’

কর্মসূচিতে বক্তব্য দিতে গিয়ে বাকৃবির কৃষি অনুষদের নেপালি শিক্ষার্থী জরুরি বলেন, নেপালের ভয়াবহ দুর্যোগে অসংখ্য মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। অনেকে পরিবারের সদস্য, ঘরবাড়ি ও সম্পদ হারিয়েছেন। এই পরিস্থিতিতে দেশে থাকা স্বজনদের নিয়ে নেপালি শিক্ষার্থীদের মধ্যেও উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘আমরা আজ এখানে সবাই ভারাক্রান্ত হৃদয়ে সমবেত হয়েছি। নেপালে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় অনেক মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। অনেকে তাদের পরিবারের সদস্য, ঘরবাড়ি ও সম্পদ হারিয়েছেন। আমরা এখান থেকে হয়তো তাদের জন্য বড় কিছু করতে পারছি না। তবে অন্তত তাদের প্রতি আমাদের শোক, সমবেদনা ও সংহতি প্রকাশ করতে চাই।’

নেপালের এই দুর্যোগ শুধু দেশটির সাধারণ মানুষের জন্য নয়, বিদেশে অবস্থানরত নেপালি শিক্ষার্থীদের জন্যও গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে জানান শিক্ষার্থীরা। তাদের ভাষ্য, পরিবারের সদস্য ও স্বজনদের নিরাপত্তা নিয়ে অনেকেই উদ্বিগ্ন। এমন পরিস্থিতিতে নিজ দেশের মানুষের পাশে দাঁড়ানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতাও প্রয়োজন।

‘নেপালের পাশে থাকার বার্তা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী’

বাকৃবির আন্তর্জাতিক ডেস্কের পরিচালক ও মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ড. এম. আরিফুল ইসলাম বলেন, নেপালের ভয়াবহ এই ট্র্যাজেডিতে ক্ষতিগ্রস্তদের প্রতি গভীর শোক ও সমবেদনা জানাতেই এ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘বাকৃবিতে শতাধিক নেপালি শিক্ষার্থী রয়েছেন। তারা আমাদের পরিবারেরই সদস্য। তাদের দেশের এই দুর্যোগে আমরা তাদের একা মনে করতে দিতে চাই না। আমাদের প্রধানমন্ত্রীও নেপালের পাশে থাকার কথা জানিয়েছেন। আমরা বাকৃবি একটি পরিবার। উপাচার্যের নির্দেশনায় আমরা সবসময় তাদের পাশে আছি।’

Manual8 Ad Code

তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাদের সুখ-দুঃখের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ও সম্পৃক্ত। নেপালে দুর্যোগের কারণে কোনো শিক্ষার্থী বা তার পরিবার সমস্যায় পড়লে বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হবে।

ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের পাশে থাকার আশ্বাস

বাকৃবির ছাত্র বিষয়ক উপদেষ্টা ড. রফিকুল ইসলাম সরদার বলেন, নেপালে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় প্রাণহানি ও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির ঘটনায় বাকৃবি পরিবার গভীরভাবে সমব্যথী।

তিনি বলেন, ‘বন্যায় ঘরবাড়ি, দালানকোঠা, রাস্তাঘাট ও সেতু ভেসে যাওয়ার দৃশ্য অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। এমন পরিস্থিতিতে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো মানবিক দায়িত্ব। বাংলাদেশ সরকারও নেপালকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে।’

বাকৃবির নেপালি শিক্ষার্থীদের পরিবারের কেউ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন কি না, তাৎক্ষণিকভাবে তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘কোনো শিক্ষার্থীর পরিবার সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কি না তা এখনো নিশ্চিত নয়। তবে বিশ্ববিদ্যালয় ও সংশ্লিষ্ট বিভাগ তাদের যেকোনো প্রয়োজনে পাশে থাকবে।’

তিনি নেপালি শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, দুর্যোগের কারণে কারও পরিবার বা স্বজন ক্ষতিগ্রস্ত হলে কিংবা দেশে যোগাযোগ, আর্থিক সহায়তা বা অন্য কোনো ধরনের সহযোগিতার প্রয়োজন হলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে।

‘সহায়তার প্রয়োজন হলে নিঃসংকোচে যোগাযোগ করুন’

Manual4 Ad Code

বাকৃবির প্রক্টর অধ্যাপক ড. মো. আবদুল আলীম বলেন, নেপালের ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে যারা প্রাণ হারিয়েছেন, তাদের মৃত্যুতে বাকৃবি পরিবার গভীরভাবে শোকাহত।

তিনি বলেন, ‘শোকসন্তপ্ত পরিবারগুলোর প্রতি আমরা গভীর সমবেদনা জানাই এবং এই অপূরণীয় ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার শক্তি ও ধৈর্য কামনা করি। শিক্ষার্থীদের বলব, যেকোনো ধরনের সহযোগিতা বা সহায়তার প্রয়োজন হলে নিঃসংকোচে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করবে।’

Manual1 Ad Code

উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা

মোমবাতি প্রজ্বলন কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন বাকৃবির ছাত্র বিষয়ক উপদেষ্টা ড. রফিকুল ইসলাম সরদার, ভেটেরিনারি অনুষদের ডিন ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য অধ্যাপক ড. মো. বাহানুর রহমান, প্রক্টর অধ্যাপক ড. মো. আবদুল আলীম, সহযোগী ছাত্রবিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মো. শহিদুল ইসলাম, শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক মো. আতিকুর রহমানসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হলের প্রভোস্ট, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা।

কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া নেপালি শিক্ষার্থীরা বলেন, দেশের বাইরে থাকলেও নেপালের মানুষের সঙ্গে তাদের আত্মিক সম্পর্ক অটুট। দেশে ঘটে যাওয়া এমন ভয়াবহ দুর্যোগে স্বজনদের নিরাপত্তা নিয়ে তারা যেমন উদ্বিগ্ন, তেমনি ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্যও তারা নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী উদ্যোগ নিতে চান।

তাদের মতে, মোমবাতি প্রজ্বলন কেবল নিহতদের স্মরণ করার আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং এটি নেপালের দুর্যোগপীড়িত মানুষের প্রতি সহমর্মিতা, সংহতি এবং সংকটের সময়ে একে অপরের পাশে থাকার প্রতীক।

Manual3 Ad Code

বাকৃবির নেপালি শিক্ষার্থীদের এই উদ্যোগে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও প্রশাসনের অংশগ্রহণ দুই দেশের মানুষের পারস্পরিক বন্ধুত্ব ও মানবিক সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করবে বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

নেপালের ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের দ্রুত পুনর্বাসন, আহতদের চিকিৎসা এবং দুর্গত এলাকায় প্রয়োজনীয় মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীরা। একই সঙ্গে তারা বাংলাদেশসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি দুর্যোগকবলিত নেপালের মানুষের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান।