টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্র বিস্ফোরণ: ৪২ মিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ পাচ্ছে বাংলাদেশ

প্রকাশিত: ৯:১৫ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ২৯, ২০২৬

টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্র বিস্ফোরণ: ৪২ মিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ পাচ্ছে বাংলাদেশ

Manual1 Ad Code

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা, ২৯ জানুয়ারি ২০২৬ : ২০০৫ সালে সুনামগঞ্জের ছাতকে টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্রে ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনায় কানাডাভিত্তিক জ্বালানি কোম্পানি নাইকো রিসোর্সেসকে বাংলাদেশ সরকারকে ৪২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে আন্তর্জাতিক সালিশি আদালত।

বিশ্বব্যাংকের অধিভুক্ত আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ বিরোধ নিষ্পত্তি কেন্দ্র ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর সেটেলমেন্ট অফ ইনভেস্টমেন্ট ডিসপিউটস (ICSID) এই রায় প্রদান করে।

Manual7 Ad Code

পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান রেজানুর রহমান বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, রায়টি কয়েক দিন আগে আনুষ্ঠানিক চ্যানেলের মাধ্যমে সরকারের কাছে পৌঁছেছে। তবে এখনো পূর্ণাঙ্গ রায়ের অনুলিপি হাতে পাওয়া যায়নি, কেবল একটি সারসংক্ষেপ পাওয়া গেছে।

রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে পরবর্তী পদক্ষেপ

পেট্রোবাংলা চেয়ারম্যান বলেন, “এটি একটি রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের বিষয়। আমরা পূর্ণাঙ্গ রায় হাতে পেলে সেটি আইনি মতামতের জন্য অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ে পাঠাব এবং সেই অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।”

Manual4 Ad Code

পেট্রোবাংলা সূত্র জানায়, গত মঙ্গলবার বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেড (বাপেক্স)-এর এক বোর্ড সভায় এই রায় নিয়ে প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে।

প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার দাবির বিপরীতে ৪২ মিলিয়ন

উল্লেখ্য, টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্র বিস্ফোরণের ফলে প্রাকৃতিক সম্পদের মারাত্মক ক্ষতি, পরিবেশগত বিপর্যয় এবং অর্থনৈতিক লোকসানের কথা উল্লেখ করে বাংলাদেশ সরকার আন্তর্জাতিক সালিশি আদালতে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দাবি করেছিল।

এর মধ্যে
বাপেক্সের জন্য ১১৮ মিলিয়ন ডলার,
এবং সরকারের জন্য অতিরিক্ত ৮৯৬ মিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দাবি করা হয়।

তবে ট্রাইব্যুনাল সব দাবির সঙ্গে একমত না হয়ে তুলনামূলকভাবে কম অঙ্কের ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ করে।

নাইকো-বাপেক্স চুক্তি ও টেংরাটিলা বিপর্যয়

২০০৩ সালে কানাডাভিত্তিক নাইকো রিসোর্সেসের সহযোগী প্রতিষ্ঠান নাইকো রিসোর্সেস (বাংলাদেশ) লিমিটেড ফেনী ও ছাতক গ্যাসক্ষেত্র উন্নয়নের লক্ষ্যে বাপেক্সের সঙ্গে একটি যৌথ অংশীদারিত্ব চুক্তি করে। একই সঙ্গে একটি পৃথক চুক্তির আওতায় ফেনী গ্যাসক্ষেত্র থেকে উত্তোলিত গ্যাস ক্রয়ের প্রতিশ্রুতি দেয় পেট্রোবাংলা।

কিন্তু ছাতকের টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্রে খনন কাজ চালাতে গিয়ে ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে।
২০০৫ সালের জানুয়ারিতে একটি কূপ খননের সময় প্রথম বিস্ফোরণ,
এবং একই বছরের জুনে দ্বিতীয় দফায় আরও ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে।

Manual8 Ad Code

এই বিস্ফোরণে গ্যাসক্ষেত্রের বড় অংশ ধ্বংস হয়ে যায়, আশপাশের এলাকা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, প্রাণহানি ঘটে এবং পরিবেশের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

পরবর্তী সময়ে সরকারি তদন্তে নাইকোর খনন প্রক্রিয়ায় গুরুতর কারিগরি ত্রুটি ও অবহেলার প্রমাণ পাওয়া যায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ক্ষতিপূরণ আদায়ের লক্ষ্যে পেট্রোবাংলা নাইকোর বিরুদ্ধে বাংলাদেশি আদালতে মামলা করে এবং আন্তর্জাতিক সালিশি প্রক্রিয়ায় যায়।

Manual1 Ad Code

কমরেড সৈয়দ আমিরুজ্জামানের প্রতিক্রিয়া

আন্তর্জাতিক আদালতের এই রায়কে “একটি ঐতিহাসিক নজির” হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন মাগুরছড়ার গ্যাস সম্পদ ও পরিবেশ ধ্বংসের ক্ষতিপূরণ আদায় জাতীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির মৌলভীবাজার জেলা সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য, আরপি নিউজের সম্পাদক ও বিশিষ্ট কলামিস্ট কমরেড সৈয়দ আমিরুজ্জামান।

তিনি রায়ের প্রতিক্রিয়ায় বলেন, “টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্র বিস্ফোরণ ছিল বিদেশি কোম্পানির অবহেলা ও মুনাফালোভের নির্মম উদাহরণ। আইসিএসআইডির এই রায় প্রমাণ করে, বহুজাতিক কোম্পানির অপরাধ আন্তর্জাতিক পর্যায়েও প্রশ্নবিদ্ধ করা সম্ভব। যদিও ক্ষতিপূরণের অঙ্ক প্রত্যাশার তুলনায় কম, তবুও এটি বাংলাদেশের পক্ষে একটি গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক ও আইনি বিজয়।”

তিনি আরও বলেন, প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষায় ভবিষ্যতে বিদেশি বিনিয়োগ চুক্তিতে আরও কঠোর শর্ত আরোপ করা এবং রাষ্ট্রীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার বিকল্প নেই।

কী হতে পারে পরবর্তী ধাপ

আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, পূর্ণাঙ্গ রায় বিশ্লেষণের পর বাংলাদেশ সরকার চাইলে রায়ের কিছু অংশ নিয়ে পুনর্বিবেচনা বা বাস্তবায়ন সংক্রান্ত কৌশল নির্ধারণ করতে পারে। তবে আন্তর্জাতিক সালিশি রায়ের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের কূটনৈতিক ও আইনি সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত ভূমিকা রাখবে।

টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্র বিস্ফোরণ আজও বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের ইতিহাসে একটি বেদনাদায়ক অধ্যায়। দীর্ঘ দুই দশক পর আন্তর্জাতিক আদালতের এই রায় সেই ঘটনার দায় ও ক্ষতির প্রশ্নকে নতুন করে সামনে আনল।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ