এনসিটি ইজারা ইস্যুতে উত্তাল চট্টগ্রাম বন্দর

প্রকাশিত: ৮:১১ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ৩০, ২০২৬

এনসিটি ইজারা ইস্যুতে উত্তাল চট্টগ্রাম বন্দর

Manual3 Ad Code
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া কর্মচারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা, তীব্র আন্দোলনের হুঁশিয়ারি শ্রমিক সংগঠনের

বিশেষ প্রতিবেদক | চট্টগ্রাম, ৩০ জানুয়ারি ২০২৬ : চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে ইজারা দেওয়ার সরকারি সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে বন্দর এলাকায় উত্তেজনা ক্রমেই বাড়ছে। সরকারি সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে বিক্ষোভে অংশ নেওয়া কর্মচারীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। এর পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় শ্রমিক সংগঠনগুলো তীব্র আন্দোলন ও বন্দর অচল করে দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে।

বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের পরিচালক (প্রশাসন) মো. ওমর ফারুক স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারী কর্মচারীদের শনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট সব বিভাগীয় প্রধানকে নির্দেশনা দেওয়া হয়।

অফিস চলাকালে বিক্ষোভ, শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগ

বন্দর কর্তৃপক্ষের আদেশে বলা হয়, গত ২৯ জানুয়ারি সকাল আনুমানিক ১১টা ৩০ মিনিটে অফিস চলাকালে কতিপয় কর্মচারী হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে চট্টগ্রাম বন্দর ভবন এলাকায় মিছিলে অংশ নেন, যা দাপ্তরিক শৃঙ্খলার পরিপন্থী। আদেশে উল্লেখ করা হয়, বন্দরে কর্মরত অবস্থায় সরকারি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আন্দোলনে অংশগ্রহণ বন্দর কর্মচারী প্রবিধানমালা অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

আদেশে আরও বলা হয়, বিক্ষোভকারীরা আদালতের রায়ের বিরোধিতা করে বিরূপ মন্তব্য করেছেন এবং এসব কর্মকাণ্ড সরকারি শৃঙ্খলা ভঙ্গের শামিল।
বিক্ষোভের ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং কয়েকজন কর্মচারী প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক গণমাধ্যমে বক্তব্য দেন।

এসব কর্মকাণ্ডের জন্য সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা ১৯৭৯, সরকারি চাকরি আইন ২০১৮, বন্দর কর্মচারী চাকরি বিধিমালা ১৯৯১ এবং অন্যান্য প্রযোজ্য বিধি অনুযায়ী বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

হাইকোর্টের রায় ও বিক্ষোভের পটভূমি

উল্লেখ্য, একই দিন নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনায় বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি–সংক্রান্ত চলমান প্রক্রিয়ার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে দায়ের করা রিট খারিজ করে রায় দেন হাইকোর্ট। রায় ঘোষণার পরপরই বিএনপিপন্থী শ্রমিক-কর্মচারীরা বন্দর ভবনে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেন।

মিছিলটি বন্দর ভবন চত্বর প্রদক্ষিণ করে একপর্যায়ে প্রশাসনিক ভবনের ভেতরে প্রবেশ করে এবং বন্দর চেয়ারম্যানের কক্ষের সামনে অবস্থান নিয়ে স্লোগান দেন বিক্ষোভকারীরা।

শ্রমিক সংগঠনের পাল্টা অবস্থান

Manual2 Ad Code

বন্দর কর্তৃপক্ষের নির্দেশনার বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সমন্বয়কারী মো. হুমায়ুন কবির শুক্রবার সন্ধ্যায় বলেন, “আমরা শুরু থেকেই নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন করে আসছি। আদালতের রায়ের প্রতি আমরা শ্রদ্ধাশীল। রায় নিয়ে কেউ কোনো বিরূপ মন্তব্য করেনি। এমন কোনো প্রমাণও নেই।”

Manual3 Ad Code

তিনি আরও বলেন, “এখন সরকার বা বন্দর কর্তৃপক্ষ যদি নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের পথ রুদ্ধ করতে চায় এবং কর্মচারীদের ভয়ভীতি দেখায়, তাহলে আমরা আরও কঠোর কর্মসূচি দিতে বাধ্য হব। প্রয়োজনে বন্দর অচল করে দেওয়ার মতো আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।”

Manual8 Ad Code

এনসিটি: বিনিয়োগ, পরিচালনা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে আধুনিক টার্মিনাল হিসেবে পরিচিত নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালটি ২০০৭ সালে নির্মিত হয়। নির্মাণ ও যন্ত্রপাতি সংযোজনে বন্দর কর্তৃপক্ষ ধাপে ধাপে প্রায় ২ হাজার ৭১২ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে।

প্রায় এক কিলোমিটার দীর্ঘ এই টার্মিনালে একসঙ্গে চারটি সমুদ্রগামী কনটেইনার জাহাজে আধুনিক যন্ত্রপাতির মাধ্যমে আমদানি ও রপ্তানি কনটেইনার ওঠানামা করা হয়। গত বছরের ৭ জুলাই থেকে টার্মিনালটির পরিচালনার দায়িত্ব পালন করছে নৌবাহিনীর মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান চিটাগং ড্রাইডক লিমিটেড।

এরই মধ্যে সরকার এনসিটি ১৫ বছর মেয়াদে পরিচালনার জন্য ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে কনসেশন চুক্তির প্রক্রিয়া এগিয়ে নিচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বর্তমানে দর–কষাকষির শেষ পর্যায়ের আলোচনা চলছে এবং সবকিছু চূড়ান্ত হলে আগামী সপ্তাহেই চুক্তি স্বাক্ষরের সম্ভাবনা রয়েছে।

অনিশ্চয়তার মুখে বন্দর কার্যক্রম

এনসিটি ইস্যুতে বন্দর কর্তৃপক্ষ ও শ্রমিক সংগঠনের মুখোমুখি অবস্থানের ফলে চট্টগ্রাম বন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রম নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর হিসেবে চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রমে অচলাবস্থা সৃষ্টি হলে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ী ও বন্দর ব্যবহারকারীরা।

Manual7 Ad Code

পরিস্থিতি কোন দিকে গড়ায়, সেদিকে এখন নজর দেশের নীতিনির্ধারক, বন্দর সংশ্লিষ্ট মহল এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য অংশীদারদের।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ