আমাদের মোজাহার ভাই শ্রদ্ধাঞ্জলি তোমাকে: স্মৃতির কন্দরে রবে তুমি নীরবে

প্রকাশিত: ৩:৩৭ অপরাহ্ণ, মে ৩১, ২০২০

আমাদের মোজাহার ভাই শ্রদ্ধাঞ্জলি তোমাকে: স্মৃতির কন্দরে রবে তুমি নীরবে

শহীদুল ইসলাম, ঢাকা, ৩১ মে ২০২০ : প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে পৃথিবীর সকল বন্ধন ছিন্ন করে না ফেরার দেশে চলে গেলেন মোজহারুল ইসলাম চৌধুরী। করোনায় আক্রান্ত হয়ে ২৬ মে ঢাকার আনোয়ার খান হাসপাতালে চিকিৎসা অবস্থায় তিনি ইন্তেকাল করেন (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মোজহারুল ইসলাম চৌধুরী ছিলেন উচ্চতর মূল্যবোধের অধিকারী একজন আদর্শিক মানুষ। বিষ্ময়কর রকম শক্তিমান মানুষটির বিষ্ময়কর শ্রমশক্তি ও চিন্তাশক্তি ছিল। তিনি তার কর্মের চেয়েও অনেক বড়ো। তাই নিজ কর্মগুণে পাহাড়সম সুনামও কুড়িয়েছেন।

মাজহারুল ইসলাম চৌধুরী দেশের কাস্টমস সিএন্ডএফ অঙ্গনের অগনিত মানুষের কাছে মোজাহার ভাই হিসেবেই অতি পরিচিত-অতি আপনজন।
নব্বইয়ের দশকে তাঁর সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয়। কাস্টমস সিএন্ডএফ জগতের কিংবদন্তি পুরুষ আমার পরম শ্রদ্ধেয় ম. ছলিম উল্লাহ সাহেব যখন চিটাগাং এসোসিয়েশনের সভাপতি তখন মোজাহার ভাই ছিলেন তাঁর অন্যতম সহযোদ্ধা, অসম্ভব কর্মনিষ্ঠ ও তারুণ্যদীপ্ত সাধারণ সম্পাদক। ম. ছলিম উল্লাহ সাহেব আমাদের নিউজ লেটার পত্রিকার প্রধান উপদেষ্টা হওয়ায় তিনি তাঁর অসাধারণ মেধাবী সাংগঠনিক দক্ষতায় উদ্দীপ্ত সদাহাস্যজ্বল মোজাহার ভায়ের সাথে আমাকে পরিচয় করিয়ে দেন। এবং তাকে বললেন সিএন্ডএফ কমিউনিটিকে সার্বজনীনভাবে মানুষের কাছে সুপরিচিত করতে এবং রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে সুসম্পর্ক গড়ে তুলতে নিউজ লেটার পত্রিকার ভুমিকা অপরিহার্য। তাই সম্পাদক এম. সহিদুল ইসলাম সাহেবকে সার্বিকভাবে সহযোগিতার অনুরোধ করছি।
সেই নব্বইয়ের দশক থেকে অদ্যাবধি তাঁর হাস্যজ্বল মুখচ্ছবি ছাড়া একটি মূহুর্তও দেখিনি।
আমার অত্যন্ত প্রিয় কর্মবীরকে নিয়ে এভাবে শোক গাঁথা লিখতে হবে এটা কখনো ভাবিনি। বর্ণাঢ্য কর্মময় জীবন তার। তাঁর জীবদ্দশায় তার সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ার কিছু স্মৃতি এখন খুব নাড়া দেয়।
করোনা সম্মোহিত এ দুঃসময়ে কর্মনিষ্ঠ এ বীরের মতো প্রিয় ভাইয়ের এভাবে চলে যাওয়া, তাঁর জানাজায় যোগ দিতে না পারা এবং প্রকাশ্যে শোক ও দোয়ার কোন অনুষ্ঠানে যোগদানের সুযোগ না থাকায় বেদনায় এ মূহুর্তে আমি মূহ্যমান। করোনাকালে তাঁর এ প্রস্থানে আমি কিংকর্তব্যবিমুঢ়।
১৯৪৮ সালে মোজহারুল ইসলাম চৌধুরীর পিতা মরহুম আমিনুল ইসলাম ১নং সিএন্ডএফ লাইসেন্স নিয়ে এই ব্যবসায় আত্মনিয়োগ করেন। সেই ব্যবসা প্রতিষ্ঠান “পাকিস্তান কর্পোরেশন” পরবর্তীতে “বাংলাদেশ কর্পোরেশন” হিসেবে পরিচিত হয়। এবং তাঁর পিতাই তাঁকে প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার বানিয়ে দেন।
সিএন্ডএফ এসোসিয়েশনের সকল স্তরের মানুষের সাথে তাঁর একটা ভ্রাতৃত্বের সুদৃঢ় বন্ধন ছিলো। তাই তিনি এসোসিয়েশনকে একটি বিশাল পরিবার মনে করতেন। এবং সকলের ভালোবাসায় তিনি চারবার সাধারণ সম্পাদক (৮০-৮১, ৮২-৮৩, ৮৪-৮৫, ৯২-৯৩); দুবার ১ম সহসভাপতি (৮৬-৮৭, ৮৮-৮৯); একবার প্রচার সম্পাদক ৭৮-৭৯); তিনবার সদস্য (৯০-৯১, ৯৪-৯৫, ২০১৬-২০১৯) এবং দু’বার ২য় সহসভাপতি (২০১১-২০১২, …..) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। যোগ্যতা,অভিজ্ঞতা ও মেধার বিচারেই তিনি দীর্ঘকাল এ দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া তিনি অত্যন্ত সুনামের সাথে চিটাগাং চেম্বার অব কমার্সের পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, এসোসিয়েশনের জন্মলগ্ন থেকে নেতৃত্বে থাকার কারণে তিনি কপর্দকহীন এসোসিয়েশনকে অন্যান্য নেতৃবৃন্দের সাথে সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে এক হৃষ্টপুষ্ট ফান্ড গঠন এবং বিশাল বহুতল ভবন নির্মাণের অন্যতম সহযোগী হতে পেরেছেন।
অত্যন্ত নির্লোভ ও বিশাল হৃদয়ের একজন মানুষ হিসেবে তিনি নিজের ব্যক্তি জীবনে অনেক সৎ, নিষ্ঠাবান ও পরিচ্ছন্ন থেকেছেন। এবং এসোসিয়েশনকেও অত্যন্ত পরিচ্ছন্নভাবে পরিচালনা করতে সর্বদা সচেষ্ট থেকেছেন। শুধু তাই নয় কাস্টমস কর্মকর্তাসহ এ অঙ্গন থেকে যেকোনো সহযোগিতার ডাক পেলে তিনি নিঃশঙ্ক চিত্তে হাত প্রসারিত করেছেন। এবং সরকারের রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে দেশপ্রেমের কাছে ব্যক্তিস্বার্থকে তিনি বিসর্জন দিয়েছেন।
পৈত্রিক সিএন্ডএফ ব্যবসা ছাড়াও মোজহারুল ইসলাম চৌধুরী দেশের একজন স্বনামধন্য শিল্পপতি ছিলেন। তিনি গড়ে তুলেছিলেন এক্সপার্ট ইমপোর্ট ও পোশাক শিল্প প্রতিষ্ঠান। চট্টলার ঐতিহ্যবাহি চৌধুরী পরিবারের সন্তান জনাব মোজাহারুল ইসলাম চৌধুরী বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের একজন আদর্শিক একনিষ্ঠ কর্মী ছিলেন। তাই কেন্দ্রীয় নেত্রীবৃন্দের অনুরোধে এবং নিজ এলাকার মানুষের ভালোবাসায় নিবেদিত প্রাণ জনপ্রতিনিধি হিসেবে মৃত্যুর পূর্ব মূহুর্ত পর্যন্ত জনসেবা করে গেছেন। তিনি সদরঘাট থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও পূর্ব মাদারবাড়ি ৩০নং ওয়র্ডের জনপ্রিয় কমিশনার ছিলেন। তিনি তাঁর এলাকাকে সন্ত্রাস ও মাদক মূক্ত করতে নিরলসভাবে কাজ করে গেছেন। এবং সরকারের সুবিধা না নিয়ে নিজের অর্থে কর্মচারীদের বেতন ভাতা প্রদান করতেন। বিনামূল্যে জন্ম সনদ – মৃত্যু সনদ প্রদান করতেন এবং তার ব্যক্তিগত তহবিল থেকে মাসে ৬৫-৭০ হাজার টাকা রাষ্ট্রিয় কোষাগারে জমা দিতেন।
অত্যন্ত বিনয়ী, মিষ্টভাষী, সৎ, নিষ্ঠাবান ও মানব দরদী মোজহারুল ইসলাম চৌধুরী খুব ভ্রমণ বিলাসী মানুষ ছিলেন ; তিনি ইতোমধ্যে ইংল্যান্ড, আমেরিকা, কানাডা, ফ্রান্স, বেলজিয়াম, জার্মানি, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, হংকং, ইন্দোনেশিয়া, চায়না, তাইওয়ান, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ইন্ডিয়া, পাকিস্তান, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেছেন। ক্রীড়ামোদি মোজহারুল ইসলাম চট্টগ্রাম ক্লাবের মেম্বার এবং খুব ভালো একজন লং টেনিস প্লেয়ার ছিলেন।
চট্টগ্রাম শহরের পূর্ব মাদারবাড়ির সন্তান মোজহারুল ইসলাম চৌধুরীর পূর্বপুরুষ (দাদার নানা) হাজী নছুমালুম চট্টগ্রাম বন্দরের প্রথম চেয়ারম্যান ছিলেন। হাজী নছুমালুম নামে চট্টগ্রাম শহরের প্রধান সড়ক ও মসজিদের নামকরণ করা হয়। চট্টগ্রাম বন্দরের শতবর্ষ পূর্তিতে তার প্রখ্যাত সিএন্ডএফ প্রতিষ্ঠান “বাংলাদেশ কর্পোরেশন” কে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের প্রথম লাইসেন্সধারী হিসেবে বিশেষ পুরস্কার প্রদান করা হয়। বহু গুণের অধিকারী বিশিষ্ট শিল্পপতি ও জনহিতৈষী ব্যক্তিত্ব মাজহারুল ইসলাম চৌধুরী ব্যক্তি জীবনে দু’পুত্র ও এক কন্যা সন্তানের জনক ছিলেন।

মেধাবী সন্তানরাই দেশের সম্পদ। একটি দেশ এগিয়ে যাওয়ার মূল শক্তিই এই মেধাবীরা। এদেশের এমনই একজন মেধাবী কর্মবীরের নাম মোজহারুল ইসলাম চৌধুরী। আমি তাঁর আকস্মিক মৃত্যুতে মুহ্যমান, নির্বাক। আমি তার রুহের মাগফেরাত কামনা করছি এবং আল্লাহ পাক যেন তাকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসীব করেন এই দোয়া করছি।