বাংলার সমতা এবং সহিষ্ণুতার দূত কাজী নজরুল ইসলাম (৪)

প্রকাশিত: ৬:০৩ অপরাহ্ণ, জুন ২, ২০২০

বাংলার সমতা এবং সহিষ্ণুতার দূত কাজী নজরুল ইসলাম (৪)

হাফিজ সরকার, ০৩ জুন ২০২০ : সমতা এবং সহিষ্ণুতা-

নজরুল ইসলাম দৃঢ়ভাবে সামাজিক এবং অর্থনৈতিক সমতার ধারণাকে সমর্থন করতেন। নজরুল যখন সমতার ধারণা নিয়ে উচ্চকিত, তখন বাংলার সমাজতন্ত্রী কর্মীরা সবে সাম্যবাদের কথা প্রচার শুরু করেছেন। অর্থনৈতিক সমতার সঙ্গে নজরুল সচেতনভাবে ধর্মীয় সমতার কথাও প্রচার করেছেন। নজরুলের লেখা এবং অনুশীলন থেকে এটা স্পষ্টভাবে দেখা যায় যে, সাম্প্রদায়িক সহিংসতার বিরোধিতা করার পাশাপাশি আর দুটি বিষয়ে প্রচারণা চালানোকে তিনি আবশ্যক মনে করতেন— সাম্প্রদায়িক সংহতি এবং ঐক্যবদ্ধ শ্রেণী-সংগ্রাম। শ্রেণী-সংগ্রাম হতে হবে হিন্দু এবং মুসলিম শ্রমজীবী মানুষের অংশগ্রহণে। এক্ষেত্রে নজরুল ইসলাম এবং মহাত্মা গান্ধীর অবস্থানে তাত্পর্যপূর্ণ পার্থক্য ছিল। গান্ধীর মতো নজরুলও হিন্দু-মুসলিম মৈত্রীর প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ ছিলেন। গান্ধীর সঙ্গে নজরুলের পার্থক্য ছিল শ্রেণী-সংগ্রাম নিয়ে। গান্ধী আগ্রহী না হলেও নজরুল সামন্তবাদ এবং কারখানার শোষণের বিরুদ্ধে শ্রেণী-সংগ্রামের পক্ষে দ্বিধাহীন ছিলেন। প্রকৃতপক্ষে ১৯২৫-২৬ এবং পরবর্তী সময়ে বাংলার কৃষক এবং শ্রমিকদের রাজনীতিকরণে নজরুল অগ্রণী ভূমিকা রেখেছেন। ‘ধর্মঘট’ প্রবন্ধে দুর্দশাগ্রস্ত কৃষকদের প্রতি নিজের অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন, যা আজো বাংলাদেশের সমাজকর্মীদের কণ্ঠে প্রতিধ্বনিত হয়।

কৃষকদের সংগ্রামে সমর্থন দেয়ার পাশাপাশি নজরুল মজুরি শ্রমিকদের মুক্তির জন্য তাদের সংগ্রামেও উত্সাহভরে সমর্থন দিয়েছেন। শ্রেণী-শোষণ নিয়ে তার রচিত অনেক কবিতার মধ্যে কুলি-মজুর কবিতাটি অন্যতম। এ কবিতায় তিনি উপমহাদেশের ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য থেকে বিভিন্ন দৃশ্যপটের অবতারণা করেছেন। যে শ্রমিকদের মেহনতে বাষ্প-ইঞ্জিন চলে, তাদের তিনি দধীচি বলে সম্বোধন করেছেন। অসুর দানব বৃত্তসুরকে হত্যা করতে দেবতা ইন্দ্রকে নিজের হাড় উত্সর্গ করেছিলেন এক ঋষি, যার নাম ছিল দধীচি। একই কবিতায় নজরুল শ্রমিকদের সম্পর্কে আরো বলেছেন—

‘ হাতুড়ি শাবল গাঁইতি চালায়ে ভাঙিল যারা পাহাড়,

পাহাড়-কাটা সে পথের দু’পাশে পড়িয়া যাদের হাড়’

নজরুল আশা প্রকাশ করেছেন যে, শ্রমিকরা একদিন জেগে উঠবে এবং সেদিন

‘মহা-মানবের মহা-বেদনার আজি মহা-উত্থান,

ঊর্ধ্বে হাসিছে ভগবান, নীচে কাঁপিতেছে শয়তান!’

এভাবে শ্রমিকদের আত্মবিশ্বাস এবং সচেতনতা বিকাশে নজরুল বিনা দ্বিধায় আরো একবার ধর্মীয় চিত্রকল্পকে ব্যবহার করলেন।

নজরুলের লেখায় দুই ধরনের সমতার প্রতি তার অঙ্গীকারের কার্যকর প্রকাশ দেখা যায়। একটি হচ্ছে, বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মানুষের জন্য সমতা এবং অন্যটি বাংলার শ্রমজীবী জনসাধারণের জন্য সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমতা।

আধ্যাত্মবাদ এবং ধর্মীয় সমন্বয়

এবার এই প্রবন্ধের মূল বিষয়ে আসা যাক। নজরুলের গ্রেফতার হওয়া এবং কারাবরণের সময় আমি তার ধর্মীয় অনুপ্রেরণার বিষয়ে কথা বলছিলাম। এখন আমি শৈল্পিক এবং রাজনৈতিক প্রেক্ষিত বাদে ধর্ম প্রসঙ্গে নজরুলের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আলোচনা করব। ১৯৪১ সালের এপ্রিলে নজরুল মুসলিম সাহিত্য সমিতিতে একটি অনবদ্য অভিভাষণ প্রদান করেন। তার সেই বক্তৃতার বিশ্লেষণ নজরুলের ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি বুঝতে সহায়ক। ‘যদি আর বাঁশি না বাজে’ শিরোনামের এটি ছিল নজরুলের জীবনের সর্বশেষ অভিভাষণ।

১৯৪২ সালের জুলাই মাসে অল ইন্ডিয়া রেডিওতে শিশুদের একটি অনুষ্ঠানে অংশ নেয়ার সময় হঠাত্ই নজরুল তার বাকশক্তি হারান। তার মস্তিষ্কও আক্রান্ত হয়। এর পর তাকে সুস্থ করার জন্য বেশ কয়েকবার চিকিত্সার উদ্যোগ নেয়া হলেও সেসবের কোনোটাই সফল হয়নি। ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট মৃত্যুর আগ পর্যন্ত নজরুল আর কখনো সুস্থ হয়ে ওঠেননি। নজরুলের এ অসুস্থতা আনুষ্ঠানিকভাবে ‘চিকিত্সা বিজ্ঞানের রহস্য’ হিসেবে পরিচিত, যদিও সাম্প্রদায়িক রাজনীতির ঢেউ থেকে নজরুলের মনে সৃষ্ট চূড়ান্ত হতাশাকেও এজন্য দায়ী করা যায়।

নজরুলের ‘যদি আর বাঁশি না বাজে’ শিরোনামের অভিভাষণ তার ব্যক্তিগত বিশ্বাসের স্বাক্ষ্য দেয়। বক্তৃতার শুরুতেই তিনি তার আধ্যাত্মিক অনুসন্ধানের সম্পর্কে বিশদ বর্ণনা দিয়েছেন। সৃষ্টিকর্তাকে তিনি সুন্দর এবং স্নেহময় হিসেবে বর্ণনা করেছেন। নজরুলের বক্তৃতায় তার ধর্মীয় সমন্বয় চিন্তারও প্রকাশ ঘটেছে। নিজের অনুসন্ধানকে তুলে ধরতে নজরুল দুজন হিন্দু দেব-দেবীর ভূমিকাকে ব্যবহার করেছেন এবং তার মুসলিম শ্রোতাদের সতর্ক করেছেন। এখানে লক্ষণীয় হচ্ছে একজন দেবতা এবং একজন দেবীর উল্লেখ- বৈষ্ণববাদের আরাধ্য দেবতা কৃষ্ণ এবং দেবী আনন্দময়ী বা দুর্গা। নজরুলের এ ইচ্ছাপত্রসদৃশ বক্তৃতায় বারবার কৃষ্ণ এবং দুর্গার কথা এসেছে।

আনন্দময়ী বা দুর্গাকে নজরুল তার অনুসন্ধানের উত্স হিসেবে কল্পনা করেছেন। নজরুল দুর্গার ‘প্রেমের শক্তি’র কথা বলেছেন। উল্লিখিত অভিভাষণে নজরুল বলেছেন, ‘আজ আপনাদের কাছে বলে’ যাব-— আমার নিদ্রিতা সমাধিস্থা শক্তি জেগেছেন, তবে তন্দ্রার ঘোর— সমাধির বিহ্বলতা কাটেনি। আমার সেই আনন্দময়ী শক্তি যদি আবার সমাধিস্থা না হন, আমায় পরম শূন্যে নিয়ে গিয়ে চিরকালের জন্য লয় না করেন— তা’হলে এই পৃথিবীতে যে প্রেমের-যে সাম্যের-যে আনন্দের গান গেয়ে যাব— সে গান পৃথিবী বহুকাল শোনেনি।’

নজরুল আবার এই ধরায় ফিরে আসার সম্ভাবনাকে উন্মুক্ত রেখেছেন। তবে তিনি তার শ্রোতাদের বিস্মিত করে বলেছেন যে, আবার কোনো দিন এ ধরায় ফিরে এলে তিনি কোনো আনুষ্ঠানিক ধর্মের অনুসারী হবেন না। নজরুল বলেছেন, ‘যদি আপনাদের প্রেমের প্রবল টানে আমাকে আমার একাকিত্বের পরম শূন্য থেকে অসময়েই নামতে হয়, তাহলে সেদিন আমায় মনে করবেন না আমি সেই নজরুল। সে নজরুল অনেক দিন আগে মৃত্যুর খিড়কি দুয়ার দিয়ে পালিয়ে গেছে! সেদিন আমাকে কেবল মুসলমানের বলে’ দেখবেন না— আমি যদি আসি, আসব হিন্দু-মুসলমানের সকল জাতির ঊর্ধ্বে যিনি একমেবাদ্বিতীয়ম্ তাঁরই দাস হয়ে।’ ’১৪ শতকের সন্ত কবিরের দোঁহা এবং ১৯ শতকের বাঙালি গীতিকার-গায়ক লালন শাহের গানের সুদীর্ঘ ঐতিহ্যের উত্তরসূরি নজরুল। কবির এবং লালনের মতো নজরুলও উপমহাদেশের মানুষের মধ্যে ধর্মীয় বিভেদ ঘোচাতে চেয়েছেন।

ধর্মীয় সহিষ্ণুতার উত্তরাধিকার

নজরুল লেখক হিসেবে সক্রিয় সময়কালে (১৯১৯-১৯৪২ খ্রি.) যেসব সাহিত্য রচনা করেছেন এবং রাজনৈতিক প্রবন্ধ লিখেছেন, সেগুলোতে তার ব্যক্ত করা মতামত-দৃষ্টিভঙ্গি ছিল সময়ের চেয়ে অনেক অগ্রগামী। এ অগ্রসর চিন্তার মূল ছিল তার ধর্মীয় সহিষ্ণুতার রূপকল্প। এটা উল্লেখ করা জরুরি যে, ১৯৪০-এর দশকে নজরুল যখন ধর্মীয় সহিষ্ণুতার কথা প্রচার করেন, তখন শুরুতে তা বাংলার রাজনীতিবিদদের কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া পায়নি। হিন্দু-মুসলিম বিভেদের ভিত্তিতে ১৯৪৭ সালে দেশভাগ হয়। দেশভাগকে কেন্দ্র করে সাম্প্রদায়িক রাজনীতিবিদদের প্ররোচনায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছিল। তবে একটা তাত্পর্যপূর্ণ ঘটনা হচ্ছে, এ অঞ্চলের রাজনীতিবিদদের অধিকাংশ, বিশেষত যারা পরবর্তীতে তত্কালীন পূর্ব বাংলার স্বাধীনতার জন্য আন্দোলন করেছিলেন, ধর্মনিরপেক্ষতার রাজনীতিকে গ্রহণ করেছিলেন। তারা রাষ্ট্র এবং ধর্মের মধ্যে সম্পর্কোছেদের পক্ষে দৃঢ়ভাবে অবস্থান নিয়েছিলেন, অর্থাত্ তারা সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন। ১৯৫০ এবং ১৯৬০-এর দশকে নজরুলের কবিতা, গান পশ্চিম বাংলা, ভারত এবং তত্কালীন পূর্ব বাংলায় দারুণ জনপ্রিয়তা পেয়েছিল।

পূর্ব বাংলা যখন পাকিস্তানের অংশ হয়ে যায়, তখন এখানকার রাজনীতিবিদ এবং অ্যাক্টিভিস্টদের একটি বড় অংশ নজরুলের ধর্মীয় সহিষ্ণুতার ধারণাকে আপন করে নিয়েছিলেন। নজরুলের ধর্মীয় সহিষ্ণুতার ধারণার ভিত্তি ছিল ধর্মীয় এবং অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সব মানুষের সমতা। আগেই বলেছি, বাংলার দুই ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সহিংসতা ছড়ানোর বিরুদ্ধে নজরুল সোচ্চার ছিলেন। তিনি হিন্দু এবং মুসলমান কৃষক-শ্রমিকদের ঐক্যবদ্ধভাবে নিজেদের অধিকার আদায়ের জন্য ভূস্বামী এবং কারখানার মালিকদের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে আহ্বান জানিয়েছেন। ১৯৫০ এবং ১৯৬০-এর দশকে বাংলাদেশে (তত্কালীন পশ্চিম পাকিস্তান) গড়ে ওঠা শহর-গ্রামের গরিবদের স্বার্থরক্ষাকারী ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদী আন্দোলন নজরুলের ধারণাকে সঠিক বলে প্রমাণ করেছিল। স্বাধীনতা অর্জনের পর ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সদ্য গঠিত সরকার নজরুলকে বাংলাদেশের জাতীয় কবির স্বীকৃতি দেয়। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে সহিষ্ণুতা এবং ধর্মনিরপেক্ষতার মৌলিক নীতি বাতিলের জন্য চাপ তৈরি হয়েছে। স্বাধীনতার পর থেকে এ দেশে ধর্মীয় সহিষ্ণুতা এবং সামাজিক সমতার নীতি যথেষ্ট জীবন্ত। ধর্মীয় সহিষ্ণুতা নিয়ে সমসাময়িক আন্তর্জাতিক বিতর্কে নজরুল ইসলামের উদাহরণকে গুরুত্বসহকারে তুলে ধরাটা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।

হাফিজ সরকার
সাবেক ছাত্রনেতা,
কেন্দ্রীয় সদস্য
বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ