নিষ্ঠাবান সাংবাদিক শামসুল আলম তারা

প্রকাশিত: ৪:৩৬ পূর্বাহ্ণ, জুন ২০, ২০২০

নিষ্ঠাবান সাংবাদিক শামসুল আলম তারা

Manual8 Ad Code

জহুরুল কাইয়ুম, ২০ জুন ২০২০ : গাইবান্ধা শহরের মধ্যপাড়ায় ১৯৩৪ খৃস্টাব্দের ২ মার্চ এ.টি.এম শামসুল আলম তারা জন্মগ্রহণ করেন। পিতামহ আব্দুল কুদ্দুস মিয়ার ধারাবাহিকতায় পিতা আব্দুর রহমান মিয়া দীর্ঘকাল সাঘাটা থানার পদুমশহর ইউনিয়নের পন্ঞ্চায়েত, প্রেসিডেন্ট ও চেয়ারম্যান ছিলেন। মা জোবেদা খাতুন ছিলেন বগুড়া জেলার সোনাতলার নিকটবর্তী বালুয়া গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান। সাত ভাই ও সাত বোনের মধ্যে শামসুল আলম তারা ছিলেন তৃতীয়।

Manual8 Ad Code

শামসুল আলম তারার শৈশব কাটে সাঘাটা থানার ভরতখালি ইউনিয়নের পোড়াগ্রামে ফুপু আমিরন খাতুন এবং ফুপা গোলাম রহমানের বাড়িতে। দীর্ঘদিন নিঃসন্তান এই দম্পতি পুত্রস্নেহে লালন করেন তাঁকে। অবশ্য অনেক পরে তাঁদের এক পুত্রসন্তান জন্মলাভ করে। ফুপুর বাড়িতে থাকার সময় ফুলছড়ি থানার উদাখালী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তাঁর পড়াশোনার সূচনা ঘটে। প্রাথমিক শিক্ষাশেষে তিনি গাইবান্ধা ইসলামিয়া হাইস্কুলে ভর্তি হন। কিছুদিন পর তিনি ভরতখালি হাইস্কুলে স্থানান্তরিত হন এবং হোস্টেলে থেকে পড়ালেখা করেন। পরে তিনি বগুড়ার সোনাতলা হাইস্কুলে ভর্তি হয়ে ওই স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপরে গাইবান্ধা কলেজে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হন। এসময় ১৯৫১-১৯৫২ সালে গাইবান্ধা কলেজ ছাত্র সংসদের জি.এস নির্বাচিত হয়েছিলেন শামসুল আলম তারা।
একটি রাজনীতি সচেতন ও প্রগতিশীল পারিবারিক আবহে বেড়ে ওঠা শামসুল আলম তারা কলেজ জীবনেই যুক্ত হয়ে পড়েন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের সাথে। পাশাপাশি সম্পৃক্ত হন সাংবাদিকতায়। ১৯৫৪ খৃস্টাব্দে সাপ্তাহিক ইত্তেফাক দৈনিক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলে সাপ্তাহিক ইত্তেফাকে জড়িত থাকার সুবাদে রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই গাইবান্ধা মহকুমা রিপোর্টার হিসেবে শামসুল আলম তারাকে নিয়োগপত্র প্রদান করেন। সেই শুরু হলো তাঁর আনুষ্ঠানিক সাংবাদিকতা জীবনের। তারপর জীবনের পেশা হয়ে গেল সাংবাদিকতা। আমৃত্যু ওই পেশাতেই রয়ে গেলেন। ষাটের দশকের মধ্যভাগে দৈনিক ইত্তেফাকে মফস্বল বিভাগের সহসম্পাদক হিসেবে যোগদান করেন। পরবর্তীকালে তৎকালীন দৈনিক পাকিস্তান পত্রিকার মফস্বল বিভাগের সম্পাদক হিসেবে যোগ দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশে দৈনিক বাংলায় একই পদে কর্মরত ছিলেন।

গাইবান্ধায় সাংবাদিকতা করার সময়ে ছোট মহকুমা শহরে সাংবাদিকতার চর্চা ও বিকাশে তিনি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। গাইবান্ধা প্রেসক্লাব প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকায় ছিলেন তিনি এবং প্রথম কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সাংগঠনিক দক্ষতার কারণে ১৯৬১ সালে গাইবান্ধায় অনুষ্ঠিত রংপুর জেলা সাংবাদিক সমিতির সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন শামসুল আলম তারা।

Manual2 Ad Code

ঢাকায় তিনি ইত্তেফাক ও দৈনিক পাকিস্তান ছাড়াও কিছুদিন ঢাকা টাইমস এর সাথে যুক্ত ছিলেন। তিনি ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (ডি. ইউ.জে) -এর একজন সংগঠক ছিলেন এবং একসময় কর্মকর্তা নির্বাচিত হয়েছিলেন। একটানা ত্রিশ বছর সততা, নিষ্ঠা, সাহস ও দক্ষতার সাথে সাংবাদিকতা পেশায় সম্পৃক্ত থাকায় তিনি সুনাম ও খ্যাতি অর্জন করেন। এর স্বীকৃতি হিসেবে বিভিন্ন সংগঠন তাঁকে সম্মাননা প্রদান করে। ১৯৯৫ সালে জাতীয় গ্রন্হসপ্তাহ উপলক্ষে আয়োজিত জেলা বই মেলায়, ২০০৩ সালে গাইবান্ধা প্রেসক্লাব এবং গাইবান্ধা ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁকে বিশেষ সম্মাননা জানানো হয়।

Manual7 Ad Code

রাজনীতি সচেতন পরিবারের মানুষ হিসেবে শামসুল আলম তারা পাকিস্তান শাসনামলে বাঙালিদের সকল অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে সক্রিয় ছিলেন। ১৯৫১ সালের মধ্যবর্তী সময়ে মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী ও টাঙ্গাইলের শামসুল হক গাইবান্ধায় এসে মহকুমা আওয়ামী মুসলিম লীগের যে আহ্বায়ক কমিটি গঠন করেন সেই কমিটিতে শামসুল আলম তারাকে যুগ্ম আহ্বায়কের দায়িত্ব প্রদান করা হয়। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ১৯৫৩ সালে দ্বিতীয় মহকুমা রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠনে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। তিনি তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগ গাইবান্ধা মহকুমা কমিটির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। সাংবাদিকতার জন্য ঢাকায় চলে গেলে সরাসরি রাজনৈতিক কর্মকান্ডে শামসুল আলম তারা যুক্ত না থাকলেও গোটা জীবন দেশপ্রেমিক, অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিশীল মানুষ হিসেবে কাজ করে গেছেন।

Manual6 Ad Code

১৯৬৮ সালের ২৭ মার্চ তিনি বিয়ে করেন। সংবাদপত্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সংসারের সকল কাজে তিনি উচ্চতর কর্তব্যবোধের পরিচয় দেন। নিজের স্ত্রী-সন্তানদের প্রতি তিনি যেমন দায়িত্বশীল ছিলেন তেমনি আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশীদের প্রতিও ছিলেন সমান কর্তব্যপরায়ণ। সর্বোপরি মানুষের প্রতি ছিল তাঁর অকৃত্রিম ভালোবাসা। তার বড় ছেলে কম্পিউটার সাইন্সে, ছোট ছেলে গ্রাফিক্স আর্টস এন্ড ডিজাইনে গ্র্যাজুয়েট এবং মেয়ে সমাজকল্যাণ বিষয়ে মাস্টার্স।

শামসুল আলম তারা ২০০০ সালের জানুয়ারিতে ফুসফুসের ক্যান্সারে আক্রান্ত হন। যুক্তরাষ্ট্রে তাঁর অপারেশন হয়। কিন্তু ঐ বছরের ডিসেম্বরে আবারও মস্তিষ্কের ক্যান্সারে আক্রান্ত হলে যুক্তরাষ্ট্রে পুনরায় অপারেশন করা হয়। দুই বছর সুস্থ থাকার পর ২০০৩ সালের শেষদিকে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। ২০০৪ সালের ২০ জুন সকালে ঢাকার মোহাম্মদপুরের নূরজাহান রোডের বাসভবনে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। পরে তাকে গাইবান্ধা পৌর গোরস্হানে সমাহিত করা হয়।

জহুরুল কাইয়ুম, শিক্ষক ও সংস্কৃতিকর্মী।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ