ধর্ম যখন সন্ত্রাসীর হাতিয়ার-৭: অসাম্প্রদায়িকতা – ধর্মনিরপেক্ষতার সংগ্রাম এবং চলমান হেফাজতী তান্ডব সংস্কৃতি

প্রকাশিত: ৬:৩০ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ১৪, ২০২১

ধর্ম যখন সন্ত্রাসীর হাতিয়ার-৭: অসাম্প্রদায়িকতা – ধর্মনিরপেক্ষতার সংগ্রাম এবং চলমান হেফাজতী তান্ডব সংস্কৃতি

|| হাফিজ সরকার ||

১৪ এপ্রিল ২০২১ : (পুর্বে প্রকাশের পর)
সহিংস রাজনীতি ও জনগণের নিরাপত্তাহীনতাঃ
২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত হেফাজত এবং বিরোধী-রাজনীতির নামে দেশে এক জঘন্য সহিংসতা চলেছে। এমন অমানবিক মর্মান্তিক সহিংসতা এর আগে স্বাধীন বাংলাদেশে কখনও সংঘটিত হয়নি। আগেও এদেশে হরতাল-অবরোধ হয়েছে। অবরোধ হলে রাজপথ-জলপথের পাশাপাশি রেলপথও অবরোধ করা হয়েছে, কিন্তু রেললাইন তুলে ফেলা হয়নি। রেল লাইনকে টার্গেট করা হয়নি। রেলে বা বাসে যেসব সাধারণ যাত্রী যাতায়াত করেন তাদের জীবন আগে কখনও এভাবে হুমকিগ্রস্থ করা হয়নি। এবারে সহিংসতার নতুন একটা বিশেষ ধরণ তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশে হরতাল বরাবরই হয়। কিন্তু এবার হরতাল অবরোধের নামে যেভাবে পেট্রোল বোমা মেরে সাধারণ মানুষকে পুড়িয়ে মারা হয়েছে, তাতে মনে হয়েছে দেশে যেন মানুষ মারার উত্‍সব চলেছে। বিএনপি-জামায়াত জোট যেভাবে রাজনৈতিক কর্মসূচি নিয়েছে, তাতে মনে হয়েছে দেশে যেন অগ্নিপুজার একটি মহড়া শুরু হয়েছে। যাদের নিয়ে এই গণতন্ত্র সেই জনগণকে পুড়িয়ে মারার খেলা শুরু হয়েছে। এই সবকিছুকে ঘিরে দেশ একটা সহিংসতার বৃত্তে প্রবেশ করেছে। দেশের বিভিন্ন জায়গায় হাজার হাজার গাছ কেটে ফেলা হয়েছে এবং তার জন্য স্বয়ংক্রিয় করাত ব্যবহার করা হয়েছে। এটাও একটা নতুন ধারনা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।বিরোধী দলের উচিত ছিল জনগণের নিরাপত্তার কথা ভাবা, জনগণের মন-মানসিকতা বুঝে রাজনৈতিক কর্মসূচি নেওয়া। কিন্তু তারা দেশকে সংঘাতের দিকে ঠেলে দিয়ে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু আগুনে দগ্ধ হওয়া মানুষগুলোর হত্যার দায় কার উপর বর্তাবে? যাদের রাজনৈতিক আহ্বানে এই সহিংসতা সৃষ্টি হয়েছে তারাই এর জন্য প্রধানত দায়ী; তবে সরকারও এই পরিস্থিতির দায় কোনভাবেই এড়াতে পারে না, কেননা জনগণের নিরাপত্তা বিধানের দায়িত্ব প্রধানত ক্ষমতাসীন সরকারের। তাছাড়া পরিস্থিতি জননিরাপত্তহীনতার পর্যায়ে পৌঁছানোর আগেই তা নিয়ন্ত্রণে আনার প্রয়োজন ছিল। সরকার উদ্যোগী হয়ে ঝঞ্ঝাটময় অধ্যায়ের নিস্পত্তি সাধন দরকারি ছিল। সময়মত ও কার্যকরভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারায় নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

সহিংসতার বিস্তারঃ

বাংলাদেশে ২০১৩ সালে যেভাবে সহিংসতা হয়েছে পাকিস্থানেও এরকম সহিংসতা হয় না। পাকিস্থানে বোমা হামলা হয়, লোক মারা যায়। যেখানে বোমা হামলা হয় সংঘর্ষ ওখানেই সীমিত থাকে। আর বাংলাদেশে সহিংসতা গ্রামে গ্রামে ছড়িয়ে গেছে। দেশে যেন এক নতুন যদ্ধু শুরু হয়েছে। কার্যত দু’রকমভাবে সহিংসতা হয়েছে :

১) গণহত্যা
তবে গণহত্যার ফর্মটাতে একাত্তরের থেকে একটু পরিবর্তন এসেছে। এবার রেললাইন তুলে ফেলে, বাসের মধ্যে আগুনে-বোমা নিক্ষেপ করে গণহত্যা হয়েছে।

২) চিহ্নিত করে হত্যা
দ্বিতীয় ধরণের সহিংসতা হচ্ছে বিশেষ বিশেষ রাজনৈতিক দল বা মতের মানুষকে চিহ্নিত করে হত্যা করা। কোন দলের কর্মী, কোন চিন্তার মানুষ তা চিহ্নিত করে হত্যা করা হয়েছে। কাজেই ১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধীদের পাশাপাশি ২০১৩ সালে বর্তমানে হেফাজত এর মত অনেক নতুন যুদ্ধাপরাধী তৈরি হয়েছে।

১০ম জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও সংখ্যালঘুদের উপর হামলাঃ

বিএনপি-জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোটের বেপরোয়া সন্ত্রাস ও সহিংসতায় সারাদেশের সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে সংখ্যালঘু ধর্ম ও জাতির মানুষেরা আক্রান্ত হয়েছেন। প্রতিটি নির্বাচনের সময়ে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের উপর নির্যাতন-নিপীড়ন আমাদের দেশে একটি সাধারণ ঘটনা। কারণে অকারণে তাদের উপর হামলা হয়, আক্রমণ হয়। এবারও এটি সুস্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছিল যে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের উপর হামলা হতে পারে।
কিন্তু সরকার সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তায় জোরালো কোন পদক্ষেপ নিতে পারেনি। ভোটের সময় সেনাবাহিনীকে reserve striking force হিসেবে রেখে শুধুমাত্র রক্ষাত্মক নিরাপত্তা কেন নিশ্চিত করা হলো এবং ঝুকিপুর্ণ নির্বাচনী এলাকাসমুহের সংখ্যালঘুসহ সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা বিধানে তাদের কেন নিয়োজিত করা হল না এটা বোধগম্য নয়। নির্বাচন কেন্দ্রের
ভোটাররা যেন নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারেন এবং নির্বাচন-পরবর্তী সময়েও যেন তারা নিরাপদে থাকতে পারেন সে ব্যবস্থা করা হয়নি। অনেক এলাকায় ভোটাদাতাদের হাতের অমোচনীয়কালি দেখে হামলা করা হয়েছে, নির্যাতন করা হয়েছে। অনেক নির্বাচনী এলাকায় এমনিভাবে সনাক্ত করে সংখ্যালঘুদের উপর হামলা করা হয়েছে। সরকারকে এ ব্যাপারগুলো গভীরভাবে খতিয়ে দেখতে হবে। আর নিরাপত্তা বিধান কেবল সরকারের দায়িত্ব নয়, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিরোধী দলেরও এ ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু এসব সহিংসতা প্রতিরোধে খুব বেশী জায়গায় রাজনৈতিক কর্মীবৃন্দকে সক্রিয় ভূমিকায় দেখা যায়নি। শুধু আওয়ামীলীগ নয়, কোন দলের নেতাকর্মীরাই মাঠে সক্রিয় নেই। এই জায়গা থেকে সংখ্যালঘু মানুষগুলো বড় অসহায় অবস্থায় পড়েছেন। ফল হিসেবে এবারও আবার দেশান্তরকরণ ঘটেছে এবং ভারতের সীমান্তবর্তী বিভিন্ন এলাকায় দেশান্তরিত এসব মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। আর দেশের ভিতরের সাধারণ মানুষ বিশেষত সংখ্যালঘুরা ভুগছেন চরম নিরাপত্তাহীনতায়। ২০১৩ ও ২০২১-এর এই সন্ধিক্ষণে দেশের বিভিন্ন জায়গায় যে সাম্প্রদায়িক হামলা হয়েছে তার পেছনে মুল ভুমিকায় রয়েছে হেফাজতে ইসলামী এবং তাদের সঙ্গী হিসেবে রয়েছে পড়েছেন। ফল হিসেবে এবারও আবার দেশান্তরকরণ ঘটেছে এবং ভারতের সীমান্তবর্তী বিভিন্ন এলাকায় দেশান্তরিত এসব মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। আর দেশের ভিতরের সাধারণ মানুষ বিশেষত সংখ্যালঘুরা ভুগচ্ছেন চরম নিরাপত্তাহীনতায়। ২০১৩ ও ২০১৪-এর এই সন্ধিক্ষণে দেশের বিভিন্ন জায়গায় যে সাম্প্রদায়িক হামলা হয়েছে তার পেছনে মুল ভুমিকায় রয়েছে জামাতে ইসলামী এবং তাদের সঙ্গী হিসেবে রয়েছে বিএনপি। কিন্তু আওয়ামী লীগের একাংশও পিছিয়ে নেই, তারাও এসব সাম্প্রদায়িক হামলায় সংযুক্ত থেকেছে এবং ব্যক্তিস্বার্থে তাকে ব্যবহার করছে।

‘সংখ্যালঘু’ শব্দের ব্যবহারঃ

আজকাল অনেকে “সংখ্যালঘু” শুব্দটি বলতে পছন্দ করেন না বা বলতে চান না। কিন্তু দেশে যে সংখ্যালঘুরা আছেন এটা তো বাস্তব। আর বাস্তবকে অস্বীকার করে লাভ কি? এটা ঠিক যে বাংলাদেশের সংবিধানে সংখ্যালঘু শুব্দটি নেই। ১৯৭২ সালে যখন সংবিধান প্রণয়ন করা হয় তখন সংখ্যালঘু বিষয়টি রাজনৈতিক পড়েছেন। ফল হিসেবে এবারও আবার দেশান্তরকরণ ঘটেছে এবং ভারতের সীমান্তবর্তী বিভিন্ন এলাকায় দেশান্তরিত এসব মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। আর দেশের ভিতরের সাধারণ মানুষ বিশেষত সংখ্যালঘুরা ভুগচ্ছেন চরম নিরাপত্তাহীনতায়। ২০১৩ ও ২০১৪-এর এই সন্ধিক্ষণে দেশের বিভিন্ন জায়গায় যে সাম্প্রদায়িক হামলা হয়েছে তার পেছনে মুল ভুমিকায় রয়েছে হেফাজতে ইসলামী এবং তাদের সঙ্গী হিসেবে রয়েছে জামাত-বিএনপি। কিন্তু আওয়ামী লীগের
একাংশও পিছিয়ে নেই, তারাও এসব সাম্প্রদায়িক হামলায় সংযুক্ত থেকেছে এবং ব্যক্তিস্বার্থে তাকে ব্যবহার করছে।

বাস্তব অবস্থাঃ

সমাজে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় এবং সাংস্কৃতিক অধিকারের চিত্র থেকে বোঝা যায় সমাজে কতটা গণতন্ত্র বিরাজ করছে। গণতান্ত্রিক সমাজের মধ্যে নিহিত আছে সংখ্যালঘুর জীবনের নিরাপত্তা, স্বাধীনতা ও মর্যাদার প্রকৃত নিশ্চয়তা। ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতন্ত্রমনা রাষ্ট্রগুলোতে মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতির মধ্যে আদর্শগত দ্বন্দ্ব রয়েছে। ফ্যাসিবাদী সন্ত্রাস হিন্দুত্ববাদের নামে ভারত ও নেপালে গণতন্ত্র এবং সংখ্যালঘুদের প্রতি সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে বিরাজমান, অন্যদিকে ইসলামের নামে উগ্রবাদ ও সন্ত্রাসবাদ পাকিস্থান ও বাংলাদেশে গণতন্ত্র ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের জন্য ভয়াবহ বিপদ হিসেবে কাজ করছে। বেশ কিছুদিন আগে বাংলাদেশের রামু, টেকনাফ, উখিয়া, পটিয়ায় বৌদ্ধপল্লির ১৯টি বৌদ্ধ বিহারে অগ্নিসংযোগ, মানুষ হত্যা ও তান্ডব (প্রথম আলো, ১ অক্টোবর ২০১২); বাঙালি সেটেলারদের হামলায় খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গা উপজেলার তাইদংয়ে গ্রাম ছেড়ে ২১৫টি আদিবাসী পরিবারের সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতের ত্রিপুরার কাছে নোম্যানস্’ ল্যান্ডে আশ্রয় গ্রহণ (দৈনিক ইত্তেফাক, ৫ আগষ্ট ২০১৩); পাকিস্থানের পেশোয়ারে ঐতিহাসিক গির্জায় জঙ্গিদের আত্মঘাতি বোমা হামলায় কমপক্ষে ৭৮ জনের মৃত্যুৃ (প্রথম আলো, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৩) এমনতরো সংবাদগুলো গোটা বিশ্বকেই স্তম্ভিত ও শঙ্কিত করে তোলে।

দশম জাতীয় নিবার্চনের গ্রহণযোগ্যতাঃ

দেশের মানুষ চায় শান্তি ৷ কিন্তু দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্যদিয়ে মানুষের শান্তি সুনিশ্চিত হয়েছে এটা বলা যায় না। যে নির্বাচনের উপর ভর করে সরকার ক্ষমতায় এসেছে সে নির্বাচন নিয়ে অনেক সমালোচনা ও অনেক রাজনৈতিক দলের আপত্তি রয়েছে। সংবিধানিকভাবে এই নির্বাচনকে সরাসরি অবৈধ বলা যাবে না। আবার এই নির্বাচনের যে সর্বৈব গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে তাও বলা যায় না। তবে, যেভাবেই হোক নির্বাচন হয়ে গেছে এবং নিবার্চনের পর একটি সরকারও দায়িত্ব নিয়েছে। নির্বাচনের বৈধতা নিয়ে সমালোচনা হয়েছে। দ্রুত একাদশ জাতীয়
নিবার্চন করার দেশী-বিদেশী চাপও ছিল। কিন্তু সরকার কোনও চাপের কাছে নতি স্বীকার করেনি। কারণ দশম জাতীয় নিবার্চন তো আইনের বাইরে হয়নি, তা সে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হোক বা না হোক। এই নিবার্চন যে বেআইনী এটা কেউ বলতে পারবে না।

সরকারের চ্যালেঞ্জ অব্যাহতঃ

কিন্তু বিএনপি সরকার বা বিরোধী দলে নেই বলেই যে রাজনৈতিকভাবে তাদের সব গ্রহণযোগ্যতা হারিয়ে গেছে এমন ধারনা পোষণ করলে বড় ভুল হবে। কারণ জনগণের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এখনও বিএনপির মতার্দশ ধারণ করে। ২০১৪ সালের নিবার্চনের মধ্যদিয়ে গঠিত সরকারকে ৫ বছর টিকে থাকতে হলে এবং পুনর্নিবাচিত হ’তে হ’লে দেশের জন্য কাজ করে দেখাতে হবে। দেশকে নতুন করে সাজাতে হবে। জনসম্পৃক্ত থাকতে হবে। সরকার গঠনই চিরস্থায়ী বা দীর্ঘস্থায়ী জনসম্পৃক্ততার গ্যারান্টি প্রদান করে না।

বিরোধীদের কর্তব্যঃ

অন্যদিকে, সরকারকে নাড়া দেওয়ার মাত্র একটি পথ বিএনপির জন্য খোলা ছিল – তাকে আগে গণতান্ত্রিক পন্থায় নিজেকে গড়ে তুলতে হ’ত। কেবলমাত্র তারপরেই কোন আন্দোলনের কথা তারা ভাবতে পারত। নিবার্চন প্রতিহত করার নামে বিএনপি-জামাত যেভাবে নাশকতা করেছে, তা দেশের জনগণ গ্রহণ করেনি, করার কোন কারণও নেই। বিএনপি-জামায়াত জোটকে জনগণ প্রত্যাখান করেছে। তাই মানুষের কাছে যেতে হলে জনগনের প্রতি মায়া-মমতা রেখে কর্মসূচি প্রণয়ন করতে হ’ত। সরকার-বিরোধী আন্দোলন করলেও জনসম্পৃক্ত কর্মসূচি দিতে হ’ত। কিন্তু সে পথে তাঁরা হাঁটতে পেরেছে কি?

নির্বাচনী সমস্যা নিয়ে আশু ও দীর্ঘমেয়াদী করণীয়ঃ

নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশে সৃষ্ট যে রাজনৈতিক সমস্যা তাকে মূলত দুই পর্বে সমাধানের উদ্যোগ নিতে হ’ত। একটা স্বল্পমেয়াদী, আরেকটি দীর্ঘমেয়াদী। স্বল্পমেয়াদী সমাধান হিসেবে একাদশ নির্বাচনের জন্য বিএনপি-সহ নির্বাচন-বর্জনকারী সকল রাজনৈতিক দলের সাথে মতবিনিময়। রাষ্ট্রপতির উদ্যোগ পারত এ ব্যাপারে দুই দলকে সমঝোতায় আনতে৷ তার পদ ও ব্যক্তিত্বের প্রতি সরকারের পাশাপাশি বিরোধী পক্ষেরও সম্মান ছিল। যদিও কিছু সাংবিধানিক সীমাবন্ধতা আছে, কিন্তু তার উদ্যোগ নেওয়ার নৈতিক সক্ষমতা ছিল। দেশের অভ্যন্তরে একমাত্র তিনিই উদ্যোগ নিয়ে সমঝোতার একটি পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারতেন।

সরকারের করণীয়ঃ

দেশকে নিরাপদ জায়গায় নিয়ে যেতে হলে যেমন সরকারের ভূমিকা রয়েছে, তেমনি বিরোধী দলেরও গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রয়েছে এবং তার সেই ভূমিকার স্বীকৃতি দিতে হবে। তবে সাম্প্রদায়িক রাজনীীত, সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করতে হবে এবং তাদের প্রতি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহায়তাকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করতে হবে। একাদশ নির্বাচন যেন জনগনের কাছে গ্রহণযোগ্যভাবে করা যায় সে ব্যাপারে উদ্যোগ রাখতে হবে। যে জোটকে নিয়ে মহাজোট আন্দোলন করেছে এবং সরকার গঠন করেছে, সেই জোটকে যথাযোগ্য মর্যাদা দিতে শিখতে হবে। সব যোগ্য মানুষ দলের মধ্যে থাকেন না, দলের বাইরেও অনেক যোগ্য মানুষ আছেন;
সেই যোগ্য মানুষদেরকে যথাযথ জায়গায় স্থান দিতে হবে।

যা করা উচিৎঃ

দীর্ঘমেয়াদী সমাধান হিসেবে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের উত্তরাধিকার হিসেবে আমরা যে ওয়েস্টমিনিষ্টার গনতন্ত্রের মডেল পেয়েছি তাকে পরিবর্তনের কথা ভাবতে হবে। “উইনার
টেক অল” সম্বলিত এই ব্যবস্থা পৃথিবীর বহু জায়গা থেকে পরিবর্তিত হয়ে গেছে এবং সেখানে প্রোপোশনাল রিপ্রেজেনটেশন ব্যবস্থা এসেছে। বাংলাদেশেও প্রোপোশনাল রিপ্রেজেনটেশন ব্যবস্থা প্রবর্তন হওয়া উচিত। পৃথিবীর অনেক দেশে ১০০% প্রোপোশনাল রিপ্রেজেনটেশন, কোথাও কোথাও ৫০% (যেমন জাপান বা নেপালে)৷ বাংলাদেশে অন্তত ৫০% প্রোপোশনাল রিপ্রেজেনটেশন এবং ৫০% প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচন হওয়া উচিত।এছাড়া ৪ বছর মেয়াদী সরকার এবং সংসদ হতে পারে। সরকারের পাশাপাশি ছায়া সরকারের কনসেপ্টটা খুব গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার। সরকারের যেমন প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের জন্য একজন মন্ত্রী থাকবেন, তেমনি প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের জন্য একজন ছায়া-মন্ত্রী বাধ্যতামূলকভাবে বিরোধীদল রাখবে যাতে করে তারা পলিসি অল্টারনেটিভ দিতে পারেন। তাহলে ইস্যুভিত্তিক পলিটিক্যাল ডিবেটটা হবে।

প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠাঃ

এখন বাংলাদেশে প্রধানমন্ত্রীর যে ক্ষমতা, এই ক্ষমতাটা হল এরশাদের স্বৈরতান্ত্রিকতার ধারাবাহিকতা। হোসেইন মোহাম্মদ এরশাদ যখন ১৯৯০ সালে গণ-অভ্যুত্থানের মধ্যে দিয়ে উত্‍খাত হলেন, তখন তার যে Rules of Business ছিল তাতে ‘রাষ্ট্রপতি’ শব্দটি পরিবর্তন করে ‘প্রধানমন্ত্রী’ বসানো হয়েছে। পরবর্তী সকল সরকার একই Rules of Business অনুসরণ করেছে ৷ কাজেই এর মধ্য দিয়ে স্বৈরাচারী ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর হাতে হস্তান্তরিত হচ্ছে, তা তার নাম খালেদা জিয়া বা শেখ হাসিনা যাই হোক না কেন। তাই প্রধানমন্ত্রীর Rules of Business-কে পরিবর্তন করা দরকার। এছাড়া রাষ্ট্রপতির ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার মধ্যে সমন্বয় সাধন করা দরকার। বিশেষ করে, নির্বাচনকালীন সময়ে প্রধানমন্ত্রীর একতিয়ারের কিছু দপ্তর রাষ্ট্রপতির অধীনে ন্যস্ত করলে তা নির্বাচনকে দেশে বিদেশে গ্রহণযোগ্য করতে সহায়ক হবে। রাষ্ট্রের সাংবিধানিক পথসমূহ প্রধাননমন্ত্রীর বদলে রাষ্ট্রপতির হাতে ন্যস্ত করলে একদিকে যেমন ক্ষমতার ন্যায়সঙ্গত বিভাজন ঘটবে তেমনি সরকারের অজাচিত কর্তৃত্ব থেকে মূক্ত হয়ে ঐসব প্রতিষ্ঠানগুলো জনস্বার্থে বিকশিত হয়ে উঠতে পারবে। সর্বোপরি, প্রতিটি রাজনৈতিক দলের মধ্যে গণতন্ত্র চর্চার বিষয়টি বিকশিত করা দরকার।

(হাফিজ সরকার)
(চলবে)