ধর্ম যখন সন্ত্রাসীর হাতিয়ার-৮: অসাম্প্রদায়িকতা – ধর্মনিরপেক্ষতার সংগ্রাম এবং চলমান হেফাজতী তান্ডব সংস্কৃতি

প্রকাশিত: ৫:৫৪ পূর্বাহ্ণ, এপ্রিল ১৫, ২০২১

ধর্ম যখন সন্ত্রাসীর হাতিয়ার-৮: অসাম্প্রদায়িকতা – ধর্মনিরপেক্ষতার সংগ্রাম এবং চলমান হেফাজতী তান্ডব সংস্কৃতি

|| হাফিজ সরকার ||

১৫ এপ্রিল ২০২১ : পর্ব-১ (পুর্বে প্রকাশের পর)
যুদ্ধাপরাধী এবং নতুন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা ও দ্রুত কার্যকর করাঃ
আজকে বাংলাদেশ যখন আর একটি মৌলিক জায়গায় পৌঁছে গেছে ঠিক তখনই প্রশ্ন এসে মুখোমুখি হয়েছে – বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পথে এগোবে, নাকি অন্ধকারের পথে হাঁটবে, তালেবানী রাষ্ট্রের দিকে এগোবে?
এদেশে অসম্প্রদায়িক চেতনা বিকাশে বামপন্থীদের পাশাপাশি আওয়ামী লীগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে, এটাই ইতিহাসের বাস্তবতা।
অন্যদিকে ১৯৭১ সালে যে চারটি দল তাজউদ্দিন সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়েছিল তার একটি হচ্ছে মুসলিম লীগ; বিএনপি হচ্ছে তার আজকের পরিবর্তিত নাম। নিষিদ্ধ আর একটি হচ্ছে নেজামে ইসলাম যার এখনকার পরিবর্তিত নাম হচ্ছে হেফাজতে ইসলাম। আর তখন ছিল জামায়াতে ইসলাম, পাকিস্থান আর এখন হচ্ছে জামায়াতে ইসলাম, বাংলাদেশ আর নুরুল আমীনের পিডিবি। ধর্মভিক্তিক এই চারটি রাজনৈতিক দল, ৭১-এর সেই পরাজিত দলগুলো, নতুন জামা পরে বা জামা বদল করে আবির্ভূত হয়েছে। জামায়াতে ইসলামী, যেটি নিষিদ্ধ
রাজনৈতিক দল ছিল, সেই দলটিকে বাংলাদেশে রাজনীতি করার সুযোগ করে দিয়েছেন জেনারেল জিয়াউর রহমান এবং গোলাম আজমকে তিনি দেশে ফিরিয়ে এনেছেন। এখানে মৌলবাদের রাজনৈতিক পূনরুত্থানে প্রধান ধাত্রীর ভূ মিকা রেখেছে বিএনপি।

চাপের কাছে নতি শিকার নয়ঃ

এখানে যে ধর্মীয় মৌলবাদকে পৃষ্ঠপোষকতা ও ধারণ করেছে বিএনপি, সেই মৌলবাদ আজ উগ্ররূপ ধারণ করেছে। আর সেই উগ্রবাদ ভর করছে বিএনপির উপর। আমরা আরও দেখছি দেশের প্রায় সকল ওয়াজ মহফিলে ইদানিং আওয়ামীলীগের নেতারা সভাপতিত্ব করেন যেখান থেকে বিদ্বেষ ছড়ানো হয়। কাওমি মাদ্রাসার পরিচালনা কমিটির নেতৃত্বে আছেন তারা, এমনকি পাড়ায় পাড়ায় যেসব মসজিদ রয়েছে সেগুলো পাড়ার মুরুব্বিরা পরিচালনা করতো সেগুলোও আজ আওয়ামীলীগের দখলে। তারপরও সেখান থেকে বিদ্বেষ ছড়ানো হচ্ছে। তাহলে কি সরসের মধ্যেই ভুত লুকিয়ে আছে? আমরা দেখছি যে, ১৯৭১-এ যে শক্তিগুলো মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল সেই শক্তিগুলো আজকে আবার ঐক্যবদ্ধ হয়েছে আওয়ামীলীগের বগলের মধ্যে থেকে এবং তাদের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মূরুব্বিরা তাদের সাথে এসে হাত মেলাচ্ছে। ১৯৭১-এ যেমন মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ তাদের পক্ষ অবলম্বন করেছিল, আজকেও দেখছি সেই শক্তির প্রত্যক্ষ মদদ। আজকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সার্টিফিকেট দিচ্ছে যে, জামাত ইসলাম একটি গণতান্ত্রিক দল এবং ওকালতি করছে যেন সকল দলকে নিয়ে নির্বাচন হয়। মৌলবাদীদের সব বাধা আর বিদেশীদের চাপ উপেক্ষা করে সরকারের উচিত দ্রুত সতর্কতার সাথে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কার্যকর করা।

জামাত-শিবিরকে পুর্ণভাবে নিষিন্ধকরণঃ

বাঙালি জাতির অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট অসাম্প্রদায়িকতা ও উদারতা, যা হাজার বছর ধরে বাঙালি ধারণ ও লালন করে আসছে। এ বৈশিষ্ট পাকিস্থান-চেতনার পরিপন্থী হওয়ার কারণেই ১৯৪৭ সাল থেকে পাকিস্থানের বিরোধিতা করে আসছে। এর সর্বাত্মক প্রকাশ ঘটে ১৯৭১ সালের মূক্তিযুদ্ধে মুক্তিকামী মানুষের উপর বর্বরোচিত নির্যাতনের মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের সময়ে তাই এদেশের মাটিতে রাজাকার-আলবদর নামক মৌলবাদী শক্তি মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম চেতনা অসাম্প্রদায়িকতাকে নস্যাত্‍ করতে পাকিস্থান বাহিনীর দোসরে পরিণত হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে মুক্তিযুদ্ধের পরাজয়কে একটি কৌশলগত পশ্চাদাপসারণ হিসেবে ধরে নিয়ে এক নতুন আঙ্গিকে নতুন শক্তিতে নিজেদের তারা বিন্যস্ত করেছে। এ শক্তি তাদের উগ্র ও মৌলবাদী চিনত্মাধারাকে জোরপূর্বক চাপিয়ে দেওয়ার অপপ্রয়াসের মাধ্যমে, এদেশের মানুষের সহজাত ধর্মবিশ্বাসকে ব্যবহার করে, জাতীয় উন্নয়নকে প্রতিনিয়ত ব্যবহার করে চলেছে। এজন্য এ শক্তি হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করছে। নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করে নতুন প্রজন্মকে লক্ষ্য (Target) করে তাদের মুক্ত- চিন্তার বিকাশকে ব্যাহত করে মৌলবাদী ভাবধারায় রূপান্তরের জন্য এক বিশাল নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে।

আমরা দেখতে পাচ্ছি ক্রমাগতভাবে জঙ্গীবাদ বিস্তৃত হচ্ছে। তারা আদর্শগত প্রেক্ষাপটে তো হচ্ছেই, অর্থনৈতিক ভিত্তিতেও বিস্তৃতি হচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় জাময়াতে ইসলাম মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশের কাছে আপিল করেছে, একাত্তরে মুক্তি বাহিনী এবং ভারতীয় বাহিনী বাংলাদেশে সব মসজিদ ভেঙ্গে ধ্বংস করে ফেলেছে এবং সেই মসজিদ পূননির্মাণের জন্য অর্থ দরকার এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার এসেছে। এভাবে জামায়ত ইসলামী মিথ্যাচার করে আন্তর্জাতিকভাবে অর্থ সংগ্রহ করেছে। এই আন্তর্জাতিক অর্থ সংগ্রহের তাদের যে সুযোগ, তাদের যে পদ্ধতি সেটা কিন্তু ক্রমান্বয়ে বিস্তৃত হয়েছে। আজকে আল-কায়েদাসহ আন্তর্জাতিক যেসব জঙ্গী নেটওয়ার্ক আছে, সেই জঙ্গী নেটওয়ার্কের অংশ হিসেবে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ, ইসলামী ছাত্র শিবির-সহ এখানকার মিলিট্যান্ট আউফ্ফিটগুলো কাজ করছে। মৌলবাদ ও জঙ্গীবাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হলে তাদের অর্থায়ণের যে আন্তর্জাতিক এবং অভ্যন্তরীণ উত্‍সগুলো আছে সেগুলোকে বন্ধ করতে হবে। আমাদের সরকার কি পারে না ইসলামী ব্যাঙ্কসহ এইখানে মৌলবাদী যে প্রতিষ্ঠানগুলো আছে – তাদের ব্যাঙ্ক, বীমা, হাসপাতাল, শিক্ষায়াতনসহ – এই সমস্ত প্রতিষ্ঠানকে জাতীয়করণ করতে? তাদের অর্থ সংগ্রহের এই মৌলিক জায়গাগুলোকে চিহ্নিত করে এবং সেগুলোকে জাতীয়করণ করলে সমস্যা দ্রুত সমাধানের একটা উপায় হয়।

প্রাধানমন্ত্রীর কাছে প্রত্যাশাঃ

এখন দরকার যুদ্ধাপরাধী সংগঠন হিসেবে জামায়াত-এর বিচার এবং একটা স্থায়ী ট্রাইবুনাল গঠন করা, সাক্ষী সুরক্ষা আইন প্রণয়ন করা। এটি অত্যন্ত জরুরি। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রইবুনলের মামলায় অনেক ক্ষেত্রে তদন্তদলকে সাক্ষীর কাছে যেতে হয়েছে, সাক্ষীরা প্রাণের ভয়ে সাক্ষ দিতে ট্রাইবুনালে আসেননি। এই সাক্ষীদের সুনিরাপত্তার জন্য আইন অপরিহার্য।
বিচারক, প্রসিকিউটরদেরও একইভাবে পেশাগত দায়িত্ব পালনের জন্য সুরক্ষার ব্যবস্থা প্রয়োজন। যথোপযুক্ত ট্রাইবুনাল গঠনসহ এই প্রেক্ষিতে প্রয়োজনীয় সমস্ত কাজ দ্রুততার সঙ্গে নিষ্পন্ন করা দরকার। আইন মন্ত্রণালয় সমস্ত রকম পদক্ষেপ দ্রুত নেবে আশা করা অন্যায় নয়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী গত ১৬ ফেব্রুয়ারী, ২০১৩ রাজিব হত্যার প্রতিক্রিয়ায় বলেছিলেন
“জামাতের রাজনীতি করার কোন অধিকার নাই”৷ দেশবাসীর প্রত্যাশা ছিল তিনি তার বক্তব্যের অনুকুলে দ্রুততার সঙ্গে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেবেন।

মাদ্রাসা শিক্ষাকে মূলধারায় একীভূত করাঃ

একইসাথে মাদ্রাসা শিক্ষার প্রতি নজর দেওয়া উচিত। মাদ্রাসা শিক্ষায় যুক্ত আছে গরিষ্ঠসংখ্যক ছাত্রসমাজ, বাংলাদেশের বাস্তবতা এই যে, আজ অবধি যত সংখ্যক ছাত্র স্কুলে যায় তার চেয়ে বেশি সংখ্যক মাদ্রাসায় যায়। তাছাড়া, ছাত্র হিসাবে তাদেরও যথাযথ শিক্ষা লাভের অধিকার আছে। মাদ্রাসা শিক্ষাকে দীর্ঘকাল রাষ্ট্রের নজরদারির বাইরে রাখা হয়েছে, তাকে নজরদারির মধ্যে আনা দরকার।
মাদ্রাসার কারিকুলাম উন্নয়ন ও আধুনিকায়ণ করে পুর্ন কারিগরি শিক্ষার আওতায় আনা দরকার এবং কওমী মাদ্রাসাসহ সমস্ত শিক্ষাকে ক্রমান্বয়ে মুলধরায় একীভূত করা দরকার। মাদ্রাসা
শিক্ষার মাধ্যমে অন্য কোন ধর্মের ব্যাপারে বিদ্বেষ ছড়ানোসহ সকল ধর্মের সমানাধিকার পরিপন্থী সমস্ত বক্তব্য অবিলম্বে প্রত্যাহার করা প্রয়োজন।

বহুদিন ধরে বাংলাদেশের প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনগুলো মাদ্রাসা শিক্ষাকে মুলধারার শিক্ষার সাথে যুক্ত করার দাবী করে আসছে। মাদ্রাসা শিক্ষার আধুনিকীকরণ এবং একে ক্রমশ মুলধারার শিক্ষার সাথে যুক্ত করার কথা। এক্ষেত্রে যুক্তি হ’ল – মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের যুগোপযোগী শিক্ষার মধ্যে নিয়ে আসা, যাতে তাদের মাঝে শ্রম বাজারে প্রতিযোগিতা করার মতো দক্ষতা তৈরী হয়। একমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা সমাজে অসমতা হ্রাস করতে সহযোগিতা করবে। মূলধারার শিক্ষায় বৃহত্তর ছাত্র সমাজের সাথে অংশ গ্রহণের ফলে এই ছাত্র ছাত্রীরা মূলধারার বাঙালী সংস্কৃতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ শিক্ষা ও সংস্কৃতির সাথে সংযক্তু হতে পারবে। সর্বোপরি, এই সকল শিশুরা জেনো, আজকের অগ্রসর পৃথিবীর নানান বিষয়ের সঙ্গে পরিচিত হতে পারে। (সূত্র মুক্তমনা ব্লগ, ২০ মে, ২০১৬)

সংখ্যালঘুদের উপর হামলা বন্ধে করনীয়ঃ

সাম্প্রদায়িক হামলা প্রতিরোধে রাজনৈতিক দলগুলোর উদ্যোগ অপর্যাপ্ত। এই প্রতিরোধের দায়িত্ব শুধু পুলিশ বাহিনীর নয়; আর পুলিশ বাহিনী একা এটি প্রতিরোধ করতে পারবেও না। এসব হামলাকে প্রতিরোধ করার জন্য জনগণকে পাশে থাকতে হবে। আর সংগঠিত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যেই জনগণ কার্যকরভাবে থাকেন। সংখ্যালঘুদের পাশে সংগঠিতভাবে দাঁড়াতে হবে। দেশের রাজনৈতিক দলগুলো সাম্প্রদায়িক হামলা প্রতিরোধে একা কার্যকর ভূমিকা রাখবে, এমন আশা করা নাগরিক সমাজের উচিত হবে না। সেক্ষেত্রে সামাজিক প্রতিরোধের
প্রক্রিয়াটি জোরদার হওয়াটা জরুরি। তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান মিলে “সাম্প্রদায়িকতা প্রতিরোধ কমিটি” এবং তার পাশাপাশি তরুণদের নিয়ে “সাম্প্রদায়িকতা প্রতিরোধ বিগ্রেড” গঠন করা দরকার। বাংলাদেশের এখনকার বাস্তবতায় সংখ্যালঘুদের রক্ষার জন্য তাদের নিয়ে আলাদা ইলেক্টরেট বা নির্বাচকমন্ডলী গড়ার প্রয়োজন আছে। এছাড়া আজকের এই পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য সাম্প্রদায়িকতা প্রতিরোধের নতুন বিশেষ আইন প্রয়োজন। প্রচলিত আইনে অপরাধীদের সাজা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না, যাবেও না। তাছাড়া শাস্তিদানের দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় অপরাধীর সাজা হ’তে হ’তে ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা এদেশ
থেকে বিলীন হয়ে যাবেন। তাদেরকে রক্ষা করতে বিশেষ আইন দরকার এবং বিশেষ আইনকে কার্যকর করার জন্য ৬৪ জেলায় কমপক্ষে ৬৪টি বিশেষ ট্রাইবুনাল প্রয়োজন।

গড়তে হবে জনগণের ঐক্যঃ

মৌলবাদের বিরোধিতা করে, সাম্প্রদায়িকতার বিরোধীতা করে এদেশে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের মৌল চেতনায় লালনের উত্তরাধিকার, শাহ আব্দুল করিম, রাধারমন দত্ত রবীন্দ্রনাথের উত্তরাধিকার আছে। যে দেশে ঐতিহাসিক কাল থেকে নানা ধর্ম ও জাতির মানুষ একসঙ্গে শান্তিতে বসবাস করে এসেছে, সেখানে সংখ্যালঘুর উপর নিপীড়ন হবে কেন? তবে আমরা যারা সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে একযোগে লড়াই করবো তারা কিন্তু আজ তাত্ত্বিকভাবে তৈরি নই, সাংগঠনিকভাবে নই শক্তিশালী। আমাদের শক্তি হ’চ্ছে আমাদের সংস্কৃতি। আমাদের সংস্কৃতির মধ্যে যে বহুত্ববাদী উপাদান আছে সেগুলোকে কাজে লাগাতে হবে। লালন শাহ, রবীন্দ্রনাথ, কাজী নজরুল,
সুকান্ত, জীবনানন্দ ও বিভূতি ভূষণের মতো মনিষীদের জীবনাদর্শকে কাজে লাগাতে হবে।চিরায়ত নববর্ষ, ভাষা আন্দোলন, স্বাধীনতা ও বিজয় দিবসের চেতনা আমাদের বড় হাতিয়ার।
১৯৭১-এ যেমন জাতীয় জীবনে বৃহত্তর ঐক্য ছিল, যেখানে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের নানা দল ছিল এবং সেইসাথে দলীয় পরিরচয়বিহীন লক্ষ-কোটি জনগণ ছিল, সেই ঐক্যটাকে আবার গড়তে তুলতে হবে। তাহলেই ইতিহাসের দায়কে আমরা মেটাতে পারবো।

উপসংহারঃ

বাংলাদেশ বহু জাতির, বহু ভাষার, বহু ধর্মের বহু বর্ণের মানুষের দেশ। এই দেশের জন্মের পেছনে বাঙালির পাশাপাশি আদিবাসীর অবদান আছে; কৃষকের পাশাপাশি চা-শ্রমিক, দলিত জনগোষ্ঠীর ভূমিকা আছে, পুরুষের পাশাপাশি নারীর অবদান রয়েছে। বাংলাদেশের সংবিধানে ধর্মীয় বৈচিত্রের প্রতিফলন থাকলেও জাতি-বৈচিত্র্য, ভাষা-বৈচিত্র্য, ও সাংস্কৃতিক-বৈচিত্র্যের প্রতিফলণ নেই। আমরা কতকগুলো আদর্শের উপর দাঁড়িয়ে থাকি। এই আদর্শগুলোকে ধারণ করে
আমরা বেঁচে থাকতে চাই, সামনে এগোতে চাই। আমরা একটা অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র গড়তে চাই। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মধ্যে আছে সমানাধিকারের চেতনা। আমরা যে সমাজ চাই সেখানে ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গ-গোত্র নির্বিশেষে সবাই সমমর্যাদা ভোগ করবে।

বন্ধ হোক রাষ্ট্রের ধর্মের প্রতি পক্ষপাতিত্বঃ

আজকের প্রয়োজন বাংলাদেশকে মানবিকতার প্রশ্নে একটি মৌলিক জায়গায় নিয়ে যাওয়া। জনগনের ধর্ম পালনের অধিকার নিশ্চয়ই থাকবে এবং তারা নিজ নিজ ধর্ম পালন করবেন। কিন্তু রাষ্ট্রের নির্দিষ্ট কোন ধর্ম থাকবে না বা কোন বিশেষ ধর্মের প্রতি পক্ষপাত থাকবে না। ধর্ম হবে যার যার, রাষ্ট্র হবে সবার। রাষ্ট্র কোন নিদিষ্ট ধর্মকে পৃষ্টপোষকতা করবে না। দেশের এই পরিস্থিতি থেকে বের হয়ে আসতে হলে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি বন্ধ করতে হবে। ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করার সুযোগ ১৯৭২-এর সংবিধানে বন্ধ করা হয়েছিল। যতদিন পর্যন্ত ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করার সুযোগ থাকবে ততদিন পর্যন্ত সাম্প্রদায়িকতা থাকবে। যতদিন রাষ্ট্রধর্মের নামে একটি বিশেষ ধর্মের প্রতি পক্ষপাতিত্ব থাকবে ততদিন এই সাম্প্রদায়িকতা অব্যাহত থাকবে। যেসব শক্তি এসব সহিংসতার
জন্য দায়ী তাদের চিহ্নিত করে রাজনৈতিক ও সাংবিধানিকভাবে নির্মূল করা দরকার।