ধর্ম যখন সন্ত্রাসীর হাতিয়ার-১২: আজকের ভারতে অসহিষ্ণুতার উৎস সন্ধানে

প্রকাশিত: ১০:২৯ পূর্বাহ্ণ, এপ্রিল ১৯, ২০২১

ধর্ম যখন সন্ত্রাসীর হাতিয়ার-১২: আজকের ভারতে অসহিষ্ণুতার উৎস সন্ধানে

।।|| হাফিজ সরকার ||।।

১৯ এপ্রিল ২০২১ : (শেষাংশ)
ধর্মীয় উগ্রবাদের ক্ষমতায়ণঃ
১৯৭৭ সাল ছিল এক সন্ধিক্ষণ, এই সময়ে বিভিন্ন রাজ্যে কংগ্রেসে-বিরোধী জোট সরকার গড়ে উঠেছিল। জনসংঘ আরএসএস-এর নির্দেশ মেনেই বিভিন্ন রাজ্যে রাজনৈতিক ক্ষমতায় অংশ নিতে শুরু করল। দেওরসের সময়কালে জরুরি অবস্থার বিরুদ্ধে জয়প্রকাশের সঙ্গে সমঝোতা গড়ে উঠেছিল। জনসংঘ জনতা দলের সঙ্গে সংযুক্ত হয়েছিল। এই সমঝোতার কালে, আরএসএস তার স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখতে পেরেছিল। ১৯৭৭ সালে জনতা সরকারের সময় দেওরস সংঘ পরিবারের সাংগঠনিক জাল দ্রুততার সঙ্গে বৃদ্ধি ঘটিয়ে ছিলেন। প্রচারকরা কর্মীবাহিনীকে আরএসএস-এর মতবাদে দীক্ষিত করেছিলেন। শেষ পর্যন্ত জনতা পরীক্ষা ব্যর্থ হয়ে যায় এবং ১৯৮০ সালে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) প্রতিষ্ঠিত হয়। শক্তিবৃদ্ধি ও প্রভাব সম্প্রসারণের ব্যবস্থা উত্তর ভারতবর্ষ রাজনৈতিক ব্যবস্থার দাবি অনুযায়ী নানা অনিশ্চয়তার পর্ব অতিক্রম করছে। এই রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা (Political Contingency) হিন্দুবাদী মৌলবাদের সব বর্বরতাকে বরদাস্ত করার জায়গা করে দিয়েছে। শিলান্যাস, রথযাত্রা, বাবরি মসজিদের
ধ্বংসসাধন,গুজরাটের গণহত্যা সবকিছুকে সহ্য করে নিয়েছে এক নিষ্ক্রিয় ভাগ্যবাদী সমাজ। এই ঘটনা যে ঘটতে পারল তার একটা বড় কারণ, কংগ্রেস ব্যবস্থা উত্তর পাবলিক ডিসকোর্সের আর কোন নির্ভরযোগ্য ধারাই নাগরিকদের কাছে উন্মুক্ত নেই। আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে জনজীবনের হতাশা আশ্রয় পেতে চাইছে ধর্মীয় অন্ধতায় ও উগ্রতায়। ইতিমধ্যে দেশে শুরু হয়ে গেছে নয়া উদারনীতি অর্থনৈতিক জমানা, যাকে মদত দিতে তৈরি হয়ে গেছে উচ্চ-মধ্যবিত্তের এক শ্রেণী যারা আগে ছিল স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, যুক্তিবাদ ও উদারতাবাদের পক্ষে।
এই পর্ব গণকমিউনিকেশনের দায়িত্ব নিল কর্পোরেটপন্থি প্রচারমাধ্যম, যা মোদীতন্ত্র প্রতিষ্ঠায়জান কবুল করেছে। সুতরাং এর স্বাভাবিক পরিণতি হলো মধ্যযুগীয় ধর্মীয় অন্ধতায় প্রত্যাবর্তন।

হিন্দু মানস ও মুসলিম উগ্রপন্থাঃ

উচ্চবর্গীয় হিন্দুসমাজকে বারবার ইসলাম ব্রিটিশ ও অন্য শক্তির হাতে অবমাননাকর পরাজয় মেনে নিতে হয়েছে। হিন্দুস্তানের যদি কোন ইতিহাস থাকে তাহলো ধারাবাহিক ভাবে এই বিজিত হওয়ার ইতিহাস। আবর, তুর্কী, তাতার, মুঘল, সব শেষে পর্তুগীজ ও ব্রিটিশ শক্তি হিন্দুস্তানকে বিধ্বস্ত করে দিয়েছে। তাই হিন্দু মানসিকতার গভীরে থেকে যায় অবদমিত অহংবাদ। এই অন্তর্নিহিত বিপর্যয়বোধ তাদের আবেগ ও ক্রোধকে নোঙ্গরাবদ্ধ করতে চাইছে প্রাক-আধুনিক স্থূল বিকৃত অসহিষ্ণুতা হিংসায়। এর পেছনে দুটি কারণ উল্লেখযোগ্য- এক. যুক্তিভিত্তিক
মানসিকতার অনুপস্থিতি; দুই. উচ্চবর্গীয় শ্রেণীস্বার্থ। মৃদু বিরোধিতাও এই মানসিকতা মেনে নেয় না। তাই কথা, লেখা, ভালোবাসার ধরণ, আনন্দ-উপভোগের পদ্ধতি, খাদ্য-তালিকা, জীবনযাত্রা ও সামাজিক রীতিনীতির অনুশীলন প্রভৃতি সবকিছুকে হিন্দুত্ববাদীদের মনঃপূত হতে হবে।

সাম্প্রদায়িক চেতনার আবির্ভাবঃ

কেন এমন হলো – ইসলাম বাইরের জগতে সৃষ্ট হয়ে, ভারতবর্ষে প্রবেশ করে ভিন্ন মতাবলম্বী একটি দল হিসেবে। তার আগের ভারতবর্ষ মুখ্যত হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈব, আজীবিক- এদের বিভিন্ন শাখা এবং অগণ্য আধিবাসীর দেশ ছিল। ইসলাম এখানে তেমনই একটি সম্প্রদায় হয়ে পাশাপাশি শান্তিতে থাকতে পারত। সিন্ধুপ্রদেশে আসার পর থেকে পাঠান রাজত্বকাল পর্যন্ত তাই ছিল। মোগল রাজত্বকালে বিধর্মী হিন্দুকে ধর্মান্তরিত করার চেষ্টার সঙ্গে সঙ্গে হিন্দু-মুসলমানের স্বতন্ত্র সম্প্রদায়গত চেতনা কিছুটা উগ্র হয়ে ওঠে। তখন অন্য সব পরিচয় ছাপিয়ে শুধু সাম্প্রদায়িক পরিচয়ই মুখ্য হয়ে ওঠে।

হিন্দু ও মুসলমান সংঘাতঃ

অন্যদিকে কট্টরপন্থী মুসলিমরা গোটা মুসলিম সমাজকে ইসলামীকরণের জালে বেঁধে ফেলতে চায়। তারা নারীদের আধুনিক জীবনযাত্রার ধারাকে বরদাস্ত করে না, মাদ্রাসা গুলোর আধুনিকীকরণের বিপক্ষে, অভিন্ন দেওয়ানী আইন চালু করতে অসম্মত এবং গো-হত্যা বন্ধেঅ-রাজি। সঙ্গে সঙ্গে ইসলামিক সন্ত্রাসবাদ, তালিবান পন্থা ও ইসলামিক স্টেটের বর্বরতা হিন্দু
মৌলবাদী শক্তিগুলোকে বৈধতা প্রদান করছে। ভারতবর্ষ ও পাকিস্তান, দুই দেশের শাসকশ্রেণী পারস্পরিক বৈরিতা বজায় রাখার যে পরম্পরা চালু রেখেছে, তাতে দুই দেশের শত্রুতারূপান্তরিত হয়ে যাচ্ছে দুই ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মধ্যকার সংঘাতে। তাই ঘটছে হিন্দু-মুসলিম অগুণতি দাঙ্গা ও সাম্প্রদায়িক হানাহানি।

বলবার কেউ নেইঃ

এই পরিস্থিতি মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ভারতীয় হিন্দু সমাজের মধ্যে আপামর মানুষ, যারা ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে সহাবস্থানের পক্ষে এবং সাধারণ ভাবে সহিষ্ণু , তাদের এমন ইচ্ছাশক্তিনেই যে বিজেপির শয়তান সুলভ পরিকল্পনার ও নারকীয় কাজকর্মের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারে। কারণ, নিষ্ক্রিয়তা ভারতীয় সমাজের অনন্য বৈশিষ্ট্য। নয়া উদারনীতিক ব্যবস্থার কোন দায় নেই
প্রাক-আধুনিক সংস্কৃতির বিরোধিতায় যতক্ষণ না তাদের সম্পদ লুণ্ঠনের তা বাধা হয়ে দাঁড়ায় বাসহযোগীর দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হয়।

ভারতীয় রাষ্ট্র : হিন্দুত্ব ও ধর্মনিরপেক্ষতাঃ

স্বাধীনতা-উত্তর ভারতীয় রাষ্ট্রের যে পরিচয় আমরা পাই, তাতে মনে হয় এই রাষ্ট্র নরম হিন্দুত্বের পর্যায় অতিক্রম করে চরম হিন্দুত্বের পর্যায়ে পৌঁছেছে। আবার অন্যভাবে বলতে গেলে, ভারতীয় রাষ্ট্রের উপরোক্ত দুটি বৈশিষ্ট্যই বিদ্যমান, কখনও কখনও একটি বা অন্যটি প্রাধান্যের জায়গায় চলে আসে। এই প্রসঙ্গে Perry Anderson-এর বক্তব্যের উল্লেখ করা যেতে পারে। তিনি ভারতীয় রাষ্ট্রকে এইভাবে চিহ্নিত করেছেন যে এটি একটি হিন্দু সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র, যেটি সেক্যুলারিজম-কে ব্যবহার করে তার বৈধতাদানকারী আদর্শ হিসাবে। মতটি অত্যুক্তিকর। কিন্তু ভারতবর্ষ এমন একটি রাষ্ট্র, যা সব ধরণের সাম্প্রদায়িকতাকে ধারণ করতে পারে।
এমনকি মুসলিম সাম্প্রদায়িকতাকেও, যদি সাম্প্রদায়িক হিংসা একটা সীমার মধ্যে আবদ্ধ থাকে। সুতরাং ধর্মনিরপেক্ষতা একটা কথার কথা। আমাদের মতো বহুধা বিভক্ত একটা সমাজে বিলম্বিত পুঁজিবাদ ধর্মনিরপেক্ষতা-কে রাষ্ট্রীয় জীবনে প্রয়োগ করতে পারে না। তাই চোখের সামনেই ঘটতে পারে গুজরাটের গণহত্যা বা বাবরি মসজিদের ধ্বংসসাধন। কী করতে পেরেছে রাষ্ট্র? রাষ্ট্র সবকিছুকে মানিয়ে নিয়েছে। তাই আজকের হিন্দুত্ববাদীদের অসহিষ্ণুতাকে রাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত মানিয়েই নেয়।

কেন এই অসহিষ্ণুতাঃ

এই দেশে রয়েছে দুই ধরণের আইডেনটিটি রাজনীতি; একটি ক্ষুদ্র, অপরটি বৃহৎ। ক্ষুদ্র বলতে বোঝানো হচ্ছে জাতপাতের রাজনীতি আর বৃহৎটি হলো ধর্মভিত্তিক রাজনীতি। দু’য়ের মধ্যে দ্বন্দ্ব আছে, ক্ষুদ্রটি বৃহৎকে মাঝে মাঝে বেকায়দায় ফেলে দেয়, কিন্তু চূড়ান্তভাবে পরাভূতকরতে পারে না। কারণ দু’য়েরই গোত্র এক, দুটিই পশ্চাদ্গামী বা প্রত্যাবর্তী রাজনীতি। কেউ ব্যক্তি নাগরিক স্বাধীনতার পক্ষে নয়, উভয়েই নয়া উদারনীতির পক্ষে। সবাই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার জন্য যে কোন উপায় অবলম্বন করতে পারে। এদের মধ্যে এতখানি সাদৃশ্য থাকা সত্ত্বেও দুই রাজনীতিকে একই ঝু ড়িতে রাখা যায় না। বৃহৎ আইডেনটিটি রাজনীতি আরও ধ্বংসাত্মক। কারণ তার প্রবণতা রয়েছে একটা সামাজিক প্রতিবিপ্লব ঘটানোর, যা সে করতে চায় সহাবস্থানের
সামাজিক ফরম্যাটটা ভেঙে দিয়ে এবং প্রাক-আধুনিকতার মরুভূমিতে যুক্তিবাদী জলধারাকে শুষ্ক করে দিয়ে। তাই এতখানি হিংসা, জবরদস্তি ও ধ্বংসাত্মক অমানবিক বর্বরতা।

শ্রেণী সংগ্রামেই সমাধানঃ

এই প্রেক্ষিতে, নাগরিক স্বাধীনতা ও অধিকার রক্ষার ঐতিহাসিক দায় এসে পড়েছে বামপন্থীদের ওপরে। বুর্জুয়া রাষ্ট্র যেহেতু ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি অনুসরণ করতে আর পারে না, তাই এই নীতি কার্যকর করাটা গণতান্ত্রিক বিপ্লবের অংশ হয়ে পড়েছে।কিন্তু পরিস্থিতি আত্মবিরোধী,Paradoxical। কারণ যে সমাজে সামাজিক প্রতিবিপ্লব জোরদার হচ্ছে, সেখানে স্বাভাবিক নিয়মে
বামপন্থীদের শক্তি খর্বিত হওয়ার কথা, হচ্ছেও। এক্ষেত্রে একটি কারণ উল্লেখ করাই যথেষ্ট যে, আউডেনটিটি রাজনীতি, তা যে ধরণেরই হোক না কেন, তা শ্রেণী রাজনীতিকে পেছনের দিকে ঠেলে দেয়। আর শ্রেণীরাজনীতিই বামপন্থীদের সাধারণ ভিত্তিভূমি। কিন্তু বামপন্থীদের যতটুকু শক্তি এখনও রয়েছে, যেমন পশ্চিমবঙ্গ বা কেরালায়, সেখানে রয়েছে সামাজিক আন্দোলনের ইতিহাস, আলোকায়নের প্রভাব। তাহলে সামাজিক আন্দোলনের গুরুত্ব অনস্বীকার্য হয়ে পড়েছে। অথচ
নয়া উদারনীতিবাদ ধর্মকে ব্যবহার করে সাম্রাজ্যবাদী আকাঙ্খাকে চরিতার্থ করতে। তার বিরুদ্ধে না দাঁড়ালে এ দেশে ধর্মনিরপেক্ষতা-কে প্রতিষ্ঠিত করা যাবে না। অর্থাৎ, এটি একটি শ্রেণীভিত্তিক রাজনৈতিক আন্দোলনের কার্যক্রম কিভাবে ঘটানো যাবে এই দু’য়ের মধ্যে সমন্বয়? মার্কসবাদের ফলিত চর্চার এই সমস্যাকে সমাধান করার চ্যালেঞ্জ বামপন্থীদের নিতে হবে। গ্যাটে বলেছেন, তত্ত্বধূসর, জীবন সর্বদাই সবুজ। কারণ জীবন গতিশীল। জীবন থেকে জ্ঞান নিয়েই তত্ত্বকে সমদ্ধৃ হতে হবে। সম্পন্ন করতে হবে ধর্ম নিরপেক্ষ ভারতবর্ষ গড়ার কাজ।

[লেখক একজন স্বনামধন্য প্রাবন্ধিক এবং লেখাটি ‘দেশকাল ভাবনা’ পত্রিকায় প্রকাশিত]