গণমানুষের ইতিহাস নতুন করে সামনে আসছে

প্রকাশিত: ১০:১৬ পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ৫, ২০২১

গণমানুষের ইতিহাস নতুন করে সামনে আসছে

রাজনৈতিক প্রতিবেদক | ঢাকা, ০৫ নভেম্বর ২০২১ : এখনও উপমহাদেশের সবচেয়ে বড় শত্রু সাম্প্রদায়িকতা। সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প থেকেই জন্ম নেয় শোষণের অবকাঠামো। রাজনীতি, অর্থনীতি, সাংস্কৃতিক আগ্রাসন চলে সাম্প্রদায়িক হীন মানসিকতা থেকে। দেশে দেশে ক্ষমতার মসনদ আঁকড়ে ধরে থেকে জন্মলাভ করে নয়া ফ্যাসিবাদ। ইতিহাসও তা থেকে বাদ যায় না। দরবারি ইতিহাসে নিম্নবর্ণের ইতিহাস উপেক্ষিত থেকে যায়।

অনেকেই বলে থাকেন, যেকোনও দেশের নির্মোহ বা প্রকৃত ইতিহাস রচনার সময়কাল ঘটনার প্রায় একশো বছর পর। সে বিবেচনায়, বিশেষ করে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর স্বাধীনতা লাভের প্রকৃত ইতিহাস রচনার সময়কাল সবে শুরু হচ্ছে। এখনও আফ্রো-এশিয়া-ল্যাটিন আমেরিকার নির্যাতিত নিপীড়িত মেহনতি মজলুম মানুষের লড়াই সংগ্রামের ইতিহাস ক্ষমতার বলয়ের ঘূর্ণাবর্তে অনেকটাই চাপা পড়ে রয়েছে। এ থেকে বাদ যায়নি বাংলার মুক্তিসংগ্রামের অবিসংবাদিত নেতা ও স্বাধীনতার স্বপ্নদ্রষ্টা মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নাম। সারা জীবন ধরে যিনি মেহনতি মজলুম মানুষের জন্য রাজনীতি করেছেন। নিজে ক্ষমতায় না গিয়ে মন্ত্রী এমপি প্রধানমন্ত্রী বানিয়েছেন। তাঁর ইতিহাসই যেন আজও অনাদর অবহেলায় বাক্সবন্দি হয়ে আছে। তবে আশার কথা হচ্ছে, এই ইতিহাসের গেরো ক্রমেই খুলতে শুরু করেছে। পটপরিবর্তনের নতুন এই যাত্রা শুরু যাঁদের হাত ধরে, সৌমিত্র দস্তিদার নিঃসন্দেহে তাঁদেরই একজন। এর আগে সৈয়দ আবুল মকসুদ যে ধারাটির সূচনা করে গিয়েছিলেন, সেই ধারা অনুসরণ করে দেশেবিদেশে ভাসানী-চর্চা আজ নতুন মাত্রা পেয়েছে। ইতিহাসের দায়বোধ আর মজলুমের পক্ষে দেশের বাইরে কলকাতা থেকে জানা মতে সৌমিত্রবাবুই প্রথম, যিনি মওলানা ভাসানীকে নিয়ে এমন বস্তুনিষ্ঠ আর সাহসী এক বই লিখলেন।
‘আমি ও আমার মওলানা ভাসানী’ বইটির নাম থেকেই অনুধাবন করা যায় এর লেখনীর ধরনধারণ। নিঃসন্দেহে বইটি লেখকের ব্যক্তিগত চর্চা ও উপলব্ধির ফসল। ব্যক্তিগত উপলব্ধি এই রচনার ভিত্তি হলেও বইটির নিবিড় পাঠে ক্রমে শোনা যেতে থাকে মুক্তিকামী জনতার কণ্ঠস্বর। এই বইয়ে কথাপ্রসঙ্গে লেখক বলেছেন, ‘মওলানা ভাসানী আমার জীবনবোধ পাল্টে দিয়েছেন।’ আমিও বিশ্বাস করি এই বইটি পাঠ করলে স্বচ্ছ চিন্তা ও শুভবোধসম্পন্ন যেকোনও ব্যক্তির জীবনবোধ পাল্টে যাবে। সত্যিকার অর্থেই লেখক বইটিতে অন্য এক মওলানা ভাসানীকে তুলে ধরেছেন। শুধু তুলে ধরেছেন বললে ভুল হবে— নেতা ও আধ্যাত্মিক পীরের পাশাপাশি নতুন এক ‘দার্শনিক’ ভাসানীকে আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়েছেন। মহাত্মা গান্ধি, হো চি মিন কিংবা মাও সে তুং-এর পাশে মহান মওলানাকে বসিয়েছেন। লেখক বলেছেন, “মওলানা-গবেষণা করতে গিয়ে কখনও কখনও মনে হয় ভাসানী তাঁর সময়ের অনেক আগেই এ পৃথিবীতে এসেছিলেন এবং জন্ম নিয়েছিলেন ভুল জায়গায়।” না হলে মওলানা নিজে কমিউনিস্ট না হলেও, সান ইয়াৎসেন বা বিশপ টুডু বা সুহার্তো, আলেন্দে কিংবা হুগো সাভেজের মতো প্রবল জাতীয়তাবাদী অসাম্প্রদায়িক, সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী হিসেবে যথাযোগ্য সম্মানটুকু দিতে অন্তত তাঁর নিন্দুকেরাও কার্পণ্য করতেন না। আর ঠিক এখানেই লেখক ভিন্ন এক দৃষ্টিতে মওলানা ভাসানীকে তুলে ধরেছেন। যা সচরাচর বাংলায় আমরা আগে দেখিনি। বিতর্কিত কিছু বিষয়ও উঠে এসেছে বইটিতে। তবে আমি চাই এইসব বিতর্কের মধ্য দিয়েই সত্য উদ্ভাসিত হোক সমাজ বদলের হাতিয়ার হিসেবে।
মওলানা ভাসানীর রাজনৈতিক জীবনের শুরু কংগ্রেস ও স্বরাজ দিয়ে হলেও তাঁর উত্থান একজন দুর্বিনীত কৃষক নেতা হিসেবে। অষ্টন মোল্লার কৃষক বিদ্রোহ প্রসঙ্গে লেখক বলেন, “ভাসানী ততদিনে সীমিত শক্তি নিয়ে কৃষক স্বার্থে সতত সোচ্চার। রাজশাহীর ধুপঘাটে জমিদারদের লেঠেল বাহিনীর সঙ্গে ভাসানী ও তার সমর্থকদের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। যে কৃষক আন্দোলন আজও বাংলার ইতিহাসে বিখ্যাত হয়ে আছে অষ্টন মোল্লার কৃষক বিদ্রোহ বলে।” এছাড়াও টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, পাবনা, রাজশাহী, রংপুর, কুড়িগ্রাম অঞ্চলে তিনি কৃষকদের সংগঠিত করে জমিদারদের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলেছিলেন। এর রেশ ধরে বেশ কয়েকবার তাঁকে পূর্ব বাংলা থেকে বহিষ্কার করা হয়। ফলে অসমে তাঁকে থিতু হতে হয়। সেখানেও তিনি স্লোগান তোলেন লাঙল যার জমি তার। এই ভাসান চরে অনুষ্ঠিত কৃষক সম্মেলন থেকেই তিনি ‘ভাসানী’ উপাধি লাভ করেন। শুরু করেন বিখ্যাত লাইন প্রথা ও বাঙাল খেদা বিরোধী আন্দোলন। এছাড়া অসম প্রাদেশিক বিধানসভার ইতিহাসে মওলানাই প্রথম, যিনি বিধানসভায় বাংলা ভাষার স্বীকৃতি আদায় করে ছেড়েছিলেন।
সাতচল্লিশে ভারত-পাকিস্তান বিভক্তির পর পাকিস্তানে নতুন ধারার রাজনীতি ও আওয়ামি লিগ গঠনের ইতিহাস লেখকের কলমে উঠে এসেছে। তেমনি মওলানার দল ক্ষমতায় থাকার পরও স্বায়ত্তশাসন ও সাম্রাজ্যবাদী শক্তির সঙ্গে আপস না করার প্রশ্নে দল ছাড়ার কারণও লেখক বিস্তারিত বিবৃত করেছেন এতে। ‘৫৭-র কাগমারী সম্মেলন লেখকের চোখে অত্যধিক গুরুত্বের সঙ্গে ধরা দিয়েছে। কেন মওলানা ভাসানী ন্যাশনাল আওয়ামি পার্টি বা ন্যাপ গড়ে তুললেন, তার বিশদ বর্ণনা রয়েছে বইটিতে। ভাষা আন্দোলন, গণ অভ্যুত্থান, স্বাধীনতা যুদ্ধে তাঁর নেতৃত্ব দানের প্রতিটি অধ্যায় সাবলীলভাবে উঠে এসেছে এই লেখায়।
সন্তোষে মওলানা ভাসানীর বাড়িতে সৌমিত্র দস্তিদার
তবে স্বাধীনতোত্তর বাংলাদেশের টালমাটাল অবস্থা, স্বজনপোষণ, দুর্নীতি, দুর্ভিক্ষ, বিরোধী মত দমনের মতো পরিস্থিতিতে মওলানা ভাসানীর ভূমিকা নিয়ে আরও বিশদভাবে আলোচনা লেখকের কাছ থেকে প্রত্যাশিত ছিল। আমার মতে, এই সময়ে মওলানা ভাসানীর পরামর্শ ও গঠনমূলক সমালোচনাগুলোকে তৎকালীন সরকার যদি গণতান্ত্রিকভাবে নিতে পারত তবে আজ বাংলাদেশের এত বেহাল দশা তৈরি হত না। স্বাধীন বাংলাদেশে পল্টনের প্রথম জনসভায় মওলানা ভাসানী এই সরকারকে গণতান্ত্রিক পথে হাঁটার শর্তে সর্বতো সমর্থনের আশ্বাস দিয়েছিলেন। আসন্ন দুর্ভিক্ষের সঙ্কেত দিয়েছিলেন। ভারতীয় মাড়োয়ারি ও চোরাকারবারিদের অপ-তৎপরতা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছিলেন। আমেরিকার মতো জঘন্য সাম্রাজ্যবাদীদের ষড়যন্ত্র সম্পর্কে সজাগ করে দিয়েছিলেন। কিন্তু তৎকালীন সরকার মওলানা ভাসানীর এসব পরামর্শ ও গঠনমূলক সমালোচনা স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করেনি। যদিও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের সঙ্গে তাঁর একান্ত ব্যক্তিগত ও প্রায় পিতাপুত্রের ন্যায় সম্পর্কের ক্ষেত্রে এর প্রভাব খুব একটা পড়েনি। কিন্তু দেশ নিঃসন্দেহে জটিল এক সমীকরণের দিকে ধাবিত হয়েছে। রক্তের বিনিময়ে বাঙালি জাতিকে যার মূল্য দিতে হয়েছে। সমাজ দ্বিধাবিভক্ত হয়েছে। রাজনীতি কলুষিত হয়েছে। মওলানার পরামর্শ ও গঠনমূলক সমালোচনা মেনে নিলে হয়তো এসব অনেকাংশে এড়ানো সম্ভব হত। এসব নিয়ে লেখকের বিশদ আলোচনার সুযোগ ছিল। আশা করছি, পরবর্তীতে আমরা লেখকের কাছ থেকে তা পাব।
সারা বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষ আজ জেগে ওঠার প্রহর গুনছে। সেখানে লেখকের মওলানা ভাসানী চর্চা আমাদের সকল প্রকার বিভেদের প্রাচীর ডিঙাতে সাহায্য করবে। জাতি, ধর্ম, বর্ণ, নির্বিশেষে সবার ওপরে মানুষের স্থান নিশ্চিত করবে। মওলানার রবুবিয়াত দর্শন অনুধাবনের মাধ্যমে সমাজে সাম্য, শান্তি, ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হবে। এমন মানুষ মওলানা ভাসানী যিনি তাঁর আঙিনায় লিখে রাখেন, “আমার দরগায় যেই-ই আসবে, তাকে রুটি দাও। তার বিশ্বাস-আচার কী তা জিজ্ঞেস করবে না। সেজন্য কোনও তারতম্যও করবে না। কারণ, আমার প্রভুর কাছে যার জীবনের মূল্য আছে, তার তুলনায় আমার রুটির মূল্য অত্যন্ত নগণ্য ও তুচ্ছ।” লেখকের ভাষায়, “এখন যে কমিউনিটি রান্নাঘর শব্দটা প্রায়ই আমরা শুনি, তা অনেক আগের ১৯৩৯-৪০-এ অসমে চালু করেছিলেন মওলানা ভাসানী। প্রতিদিন এক হাজার লোক খেতেন সেই মুসাফিরখানায়।” এক কথায় ক্ষুধা, দারিদ্র্য আর বৈষম্যহীন পৃথিবীই ছিল তাঁর আরাধ্য।
সারা দুনিয়ায় আজ সভ্যতার সঙ্কট বিরাজ করছে। বিশেষ করে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো ঔপনিবেশিক আমলের শোষণকাঠামোর ঘেরাটোপ থেকে বেরুতে প্রাণপণ চেষ্টা করছে। আর তাতেই গণমানুষের ইতিহাস নতুন করে সামনে আসছে। লেখকের ভাষায়, “যত দিন যাচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ায় শুধু নয়, সারা দুনিয়ায় নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে ভাসানীর সময়, চিন্তা, লড়াইয়ের দর্শন নিয়ে। নিম্নবর্গের রাজনীতি থেকে গণআন্দোলনের ধারা, পরিবেশ আন্দোলন— সব আধুনিক ডিসকোর্সের পথিকৃৎ হিসেবে উঠে আসছে মওলানা ভাসানীর নাম।” যুগ যুগ জিও তুমি, মওলানা ভাসানী।
আজাদ খান ভাসানী
[ক্ষুধা, দারিদ্র্য আর বৈষম্যহীন পৃথিবীই ছিল মওলানা ভাসানীর আরাধ্য
October 10, 2021 চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম বইপত্রের কথা | অক্টোবর ২০২১]