অগ্নিযুগের মহান বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসু’র ১৩২তম জন্মবার্ষিকী অাজ

প্রকাশিত: ৬:১১ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ৩, ২০২১

অগ্নিযুগের মহান বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসু’র ১৩২তম জন্মবার্ষিকী অাজ

ঢাকা, ০৩ ডিসেম্বর ২০২১: বৃটিশ ঔপনিবেশিক শাসন শোষণ থেকে মুক্তি পেতে ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসের কিংবদন্তি ও অগ্নিযুগের মহান বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসু’র ১৩২তম জন্মবার্ষিকী অাজ।

ক্ষুদিরাম বসুকে নিয়ে কবি আল মাহমুদ লিখেছিলেন, ‘চিনতে নাকি সোনার ছেলে ক্ষুদিরামকে চিনতে? রুদ্ধশ্বাসে প্রাণ দিল যে মুক্ত বাতাস কিনতে।’
প্রায় দুইশ বছর শাসন করা ব্রিটিশদের হাত থেকে মুক্তি পেতে আন্দোলন সংগ্রামে যারা অগ্রগামী ভূমিকা রেখেছেন, যারা অস্ত্র হাতে অত্যাচারী ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে গিয়ে প্রাণ দিয়েছেন সেই তালিকার শুরুর দিকে রয়েছে তাঁর নাম।
কিশোর ক্ষুদিরাম বসু’র স্বপ্ন ছিলো স্বদেশকে মুক্ত করা। এর নির্মম পরিণতির কথা তাঁর অজানা ছিলো না। তারপরও দুঃখ, কষ্ট, বিপদ এবং মৃত্যুর কথা জেনেও তিনি দেশকে মুক্ত করতে পিছপা হননি। মুক্ত হাওয়া, মুক্ত পরিবেশ এবং বাধাহীন শৈশবে বেড়ে ওঠার সঙ্গে আত্মপরিচয়ে বাঁচতে শেখার নাম স্বাধীনতা। বাংলার ইতিহাসে নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার পতনের পর থেকে বাংলার স্বাধীনতা ব্রিটিশের হাতে চলে যায়। সেখান থেকে স্বাধীনতা ফিরিয়ে আনতে প্রাণ দিয়েছেন বহু দেশপ্রেমিক। ক্ষুদিরামের ফাঁসির পর ১৯০৮ সালের ১২ আগস্ট অমৃতবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত সেই সময়ের বর্ণনায় জানা যায়:
‘মুজাফফরপুর, ১১ আগস্ট অদ্য ভোর ছয় ঘটিকার সময় ক্ষুদিরামের ফাঁসি হইয়া গিয়াছে। ক্ষুদিরাম দৃঢ় পদক্ষেপে প্রফুল্ল চিত্তে ফাঁসির মঞ্চের দিকে অগ্রসর হয়। এমন কি তাহার মাথার ওপর যখন টুপি টানিয়া দেওয়া হইল, তখনও সে হাসিতে ছিল। স্বদেশের জন্য মৃত্যুকে কিভাবে হাসিমুখে বরণ করতে হয় তা শিখেছিলেন ক্ষুদিরাম বসু। আঠারো বছর বয়স যে কি সাহসী হয় তারও প্রমাণ ক্ষুদিরামের দৃঢ় মনোবল। তার স্মরণে রচিত বিখ্যাত গান, একবার বিদায় দে মা ঘুরে আসি- আজ মানুষের অন্তরে প্রবাহিত। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামও তাকে নিয়ে কবিতা লিখেছেন। ক্ষুদিরাম আজও আছে এই বাংলায়। প্রতিটি সাহসী দেশপ্রেমিক কিশোরই আজ একজন ক্ষুদিরাম।

ক্ষুদিরাম বসুর জন্ম ১৮৮৯ সালের ৩ ডিসেম্বর মেদেনীপুর জেলার হাবিবপুর গ্রামে। পিতা ত্রৈলক্যনাথ বসু এবং মাতা লক্ষ্মীপ্রিয়া দেবী। ক্ষুদিরাম নামকরণের পেছনেও রয়েছে ছোট্টি ইতিহাস। তিনকন্যা সন্তান জন্মের পর তিনি ছিলেন চতুর্থ সন্তান। তার আগেই দুই পুত্র জন্মের পর মারা গিয়েছিল বলে জন্মের পরই তিন মুঠ ক্ষুদের বিনিময়ে তাকে তার দিদির কাছে দেন। এর থেকে তার নাম হয় ক্ষুদিরাম। ১৮৯৫ সালে তার মা-বাবা মৃত্যুবরণ করলে তার বড় বোন অপরূপা তাকে প্রতিপালনের দায়িত্ব নেন। তার ভেতরে স্বদেশের চেতনা জন্ম নিতে সময় নেয়নি। ১৯০৬ সালের মার্চ মাসে মেদেনীপুরের এক কৃষি ও শিল্পমেলায় বিপ্লবী পত্রিকা ’সোনার বাংলা’ বিলি করার সময় ক্ষুদিরাম প্রথম পুলিশের হাতে ধরা পড়লেও পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। এরপর থেকে ক্ষুদিরাম বসু ক্রমেই ব্রিটিশবিরোধী বিভিন্ন কাজে অংশ নেন। স্বদেশি আন্দোলনে সম্পৃক্ত থাকার জন্য তার জামাইবাবুর সরকারি চাকরিতে অসুবিধা হলে তাকে আশ্রয় দেন মেদেনীপুরের উকিল সৈয়দ আব্দুল ওয়েজেদের বোন। এ সময় কিংসফোর্ড নামটি ছিল বাঙালিদের কাছে ঘৃণার।

বঙ্গভঙ্গ বিরোধী ও স্বদেশী আন্দোলনের কর্মীদের কঠোর সাজা ও দমননীতির কারণে, কলকাতার প্রধান প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট কিংসফোর্ড ঘৃণার পাত্রে পরিণত হয়েছিলেন। ক্ষুদিরাম জীবন বাজি রেখে ১৯০৮ সালের ৩০ এপ্রিল বিহারে ইউরোপিয়ান ক্লাবের সামনে বোমা ছুড়ে হত্যা করতে গিয়েছিলেন কিংসফোর্ডকে। তার সঙ্গে ছিলেন বিপ্লবী প্রফুল্ল চাকী। কিন্তু ভাগ্য সহায় ছিল না। যে গাড়িটিতে তাদের থাকার কথা ছিল তারা ছিলেন না সেদিন। তার বদলে মারা যায় দুই ইংরেজ মহিলা। দুই বিপ্লবী নিজের রাস্তায় পালিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তার সঙ্গী বিপ্লবী প্রফুল্ল চাকী ধরা পড়ে নিজের কাছে থাকা রিভলবার দিয়ে আত্মহত্যা করেন। কিন্তু ব্রিটিশদের হাতে ধরা পড়েন ক্ষুদিরাম বসু। বিচারে তার ফাঁসির রায় দেন বিচারক মি. কর্নডফ। তিনি ক্ষুদিরামকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন- ফাঁসিতে যে মরতে হবে সেটা বুঝেছো? জবাবে ক্ষুদিরাম বলেছিলেন, বুঝেছি। তার মুখের অবিচলিত হাসি হাসি ভাব দেখেই বিচারক প্রশ্নটি করেছিলেন।

এ প্রসঙ্গে ‘সঞ্জিবনী’তে লেখা হয়, ‘মৃত্যুদণ্ডাজ্ঞার পর ক্ষুদিরামকে সম্পূর্ণ অবিচলিত দেখিয়া এবং তাহার নির্বকার ভাব লক্ষ্য করিয়া বিদেশী রাজার স্বজাতীয় বিচারকের মনে সম্ভবতঃ এইরূপ ধারণা জন্মিয়াছিল যে, আসামীর প্রতি যে চরমদণ্ড প্রদত্ত হইয়াছে তাহা সে বুঝিতে পারে নাই। এই ধারণাতে বিচারক ক্ষুদিরামকে উক্ত প্রশ্নটি করেছিলেন। মৃত্যুকে যে জীবনের সাথে মিলিয়ে নিয়েছে তার কাছে মৃত্যু আর জীবনের মাঝে কোনো বিভেদ নেই সেকথা তখন বিচারকও বুঝতে অক্ষম ছিল।’

মৃত্যু যে কত সহজে বরণ করে নেওয়া যায় তা শিখিয়ে গেছে ক্ষুদিরাম। ফাঁসির আগে শেষ ইচ্ছা জানতে চাওয়া হয়। ক্ষুদিরামের কাছেও জানতে চাওয়া হয়েছিল। জবাবে ক্ষুদিরাম বলেছিল, তিনি বোমা বানাতে জানেন। ব্রিটিশদের অনুমতি পেলে তিনি তার বোমা বানানোর বিদ্যা ভারতবাসীকে শিখিয়ে যেতে চান। কি অসীম সাহস থাকলে মৃত্যুকূপে দাঁড়িয়েও দেশের কথা ভাবা যায়, মানুষের মুক্তির কথা চিন্তা করা যায় তার উদাহরণ ক্ষুদিরাম বসু।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ