শায়েস্তাগঞ্জ থানায় হুমকি: কথিত এক নেতার বক্তব্যে তোলপাড়

প্রকাশিত: ৭:৫২ পূর্বাহ্ণ, জানুয়ারি ৩, ২০২৬

শায়েস্তাগঞ্জ থানায় হুমকি: কথিত এক নেতার বক্তব্যে তোলপাড়

Manual6 Ad Code

বিশেষ প্রতিনিধি | হবিগঞ্জ, ০৩ জানুয়ারি ২০২৬ : হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ থানার ভেতরে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে প্রকাশ্যে বাগবিতণ্ডা এবং অতীতের সহিংস ঘটনার উল্লেখ করে হুমকিমূলক বক্তব্য প্রদান করেছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের হবিগঞ্জ জেলা সদস্য সচিব মাহদী হাসান।

থানার ভেতরের ওই ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে দেশজুড়ে তীব্র সমালোচনা ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
ঘটনাটি ঘটে শুক্রবার (২ জানুয়ারি ২০২৬) দুপুরে শায়েস্তাগঞ্জ থানায়।

Manual2 Ad Code

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, থানার ভেতরে শায়েস্তাগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল কালামের সঙ্গে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়ের একপর্যায়ে মাহদী হাসান নিজেকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা দাবি করে প্রশাসনকে উদ্দেশ করে হুমকিমূলক বক্তব্য দেন।

Manual8 Ad Code

ভিডিওতে মাহদী হাসানকে বলতে শোনা যায়,
‘আমরা আন্দোলন করে গভমেন্টকে রিফর্ম করেছি। সেই জায়গায় প্রশাসন আমাদের লোক। আপনি আমাদের ছেলেকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে এসেছেন। আমাদের সঙ্গে বাগবিতণ্ডা করছেন। এখন বলছেন, আন্দোলনকারী হয়েছেন তো কী হয়েছে? আমাদের এইখানে ১৭ জন শহীদ হয়েছে। আমরা বানিয়াচং থানাকে পুড়িয়ে দিয়েছিলাম। এসআই সন্তোষকে জ্বালিয়ে দিয়েছিলাম। আপনি এসেছেন ঠিক আছে, কিন্তু কোন সাহসে এই কথা বললেন জানতে চাই।’
এই বক্তব্য প্রকাশ্যে আসার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি হুমকি, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের অবমাননা এবং সহিংসতার স্বীকারোক্তি দেওয়ার অভিযোগ তুলে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন—একটি থানা ভবনের ভেতরে দাঁড়িয়ে এমন বক্তব্য কীভাবে দেওয়া সম্ভব হলো এবং কেন কোনো তাৎক্ষণিক আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

কী নিয়ে শুরু হয় বিরোধ

পুলিশ সূত্র জানায়, শুক্রবার ভোরে শায়েস্তাগঞ্জ থানা পুলিশ এনামুল হাসান নয়ন নামে এক ব্যক্তিকে আটক করে থানায় নিয়ে আসে। পুলিশের দাবি, তাকে জিজ্ঞাসাবাদের উদ্দেশ্যে থানায় আনা হয়েছিল। এনামুল নয়নের বিরুদ্ধে ছাত্রলীগের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ ছিল বলে জানা যায়।
পরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের হবিগঞ্জ জেলা সদস্য সচিব মাহদী হাসানের নেতৃত্বে ছাত্রদের একটি দল থানায় গিয়ে নিজেদের ‘জুলাই যোদ্ধা’ দাবি করে আটক ব্যক্তিকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য পুলিশের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। পুলিশ প্রথমে তাকে ছেড়ে দিতে অস্বীকৃতি জানালে থানার ভেতরে ওসি আবুল কালামের সঙ্গে মাহদী হাসানের তর্ক শুরু হয়। একপর্যায়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং চাপের মুখে পুলিশ এনামুল হাসান নয়নকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

আইনগত ঝুঁকি ও প্রতিক্রিয়া

হবিগঞ্জ আদালতের একজন সিনিয়র আইনজীবী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “ভিডিওতে যে বক্তব্য শোনা যাচ্ছে, তা যদি সত্য ও অক্ষতভাবে প্রমাণিত হয়, তাহলে ভবিষ্যতে কোনো মামলায় এটি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। বিশেষ করে থানায় অগ্নিসংযোগ ও একজন পুলিশ কর্মকর্তাকে হত্যার ইঙ্গিত দেওয়া বক্তব্য গুরুতর অপরাধের পর্যায়ে পড়ে।”

এদিকে ঘটনার বিষয়ে জানতে শায়েস্তাগঞ্জ থানার ওসি আবুল কালামের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

মাহদী হাসানের বক্তব্য

অভিযোগের বিষয়ে মাহদী হাসান বলেন, তিনি ওই সময় প্রচণ্ড রাগান্বিত ছিলেন। তিনি দাবি করেন,
“রাগের মাথায় কথা বলতে গিয়ে ‘স্লিপ অব টাং’-এর কারণে ওই বক্তব্য বেরিয়ে গেছে। পরে আমি বুঝতে পেরেছি বিষয়টি ঠিক হয়নি। আমার বক্তব্য ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে।”

পুলিশের অবস্থান

হবিগঞ্জের পুলিশ সুপার ইয়াছমিন খাতুন জানান, তিনি ভিডিওটি দেখেছেন এবং বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলেছেন।
তিনি বলেন, “শায়েস্তাগঞ্জ থানার ওসির সঙ্গে কথা বলে জেনেছি, নয়ন নামের একজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় আনা হয়েছিল। পরে ছাত্র আন্দোলনের নেতারা এসে দাবি করেন, নয়ন ছাত্র আন্দোলনের পক্ষে ছিলেন। তারা ছবি ও ভিডিও দেখান। এ সময় থানার ভেতরে কথাবার্তা হয়, যার একটি অংশের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়েছে।”

আটক ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয় সম্পর্কে জানতে চাইলে পুলিশ সুপার বলেন, “নয়ন একসময় ছাত্রলীগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে মনে হয়, তবে বর্তমানে তিনি ছাত্রলীগে নেই।”

Manual5 Ad Code

উদ্বেগ ও প্রশ্ন

Manual2 Ad Code

ঘটনাটি ঘিরে সচেতন মহল মনে করছে, কোনো রাজনৈতিক বা ছাত্র সংগঠনের পরিচয় ব্যবহার করে থানার ভেতরে গিয়ে পুলিশকে চাপ দেওয়া এবং সহিংসতার কথা উল্লেখ করে হুমকি দেওয়া রাষ্ট্রের আইনের শাসনের জন্য অশনিসংকেত। তারা নিরপেক্ষ তদন্ত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
এই ঘটনায় প্রশাসনের ভূমিকা, রাজনৈতিক প্রভাব এবং ভবিষ্যতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর এর প্রভাব নিয়ে দেশজুড়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ