১৯৭৩-এর ১ জানুয়ারি: মতিউল–কাদেরের রক্ত ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী বাংলাদেশের এক অধ্যায়

প্রকাশিত: ১২:৫৩ পূর্বাহ্ণ, জানুয়ারি ১, ২০২৬

১৯৭৩-এর ১ জানুয়ারি: মতিউল–কাদেরের রক্ত ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী বাংলাদেশের এক অধ্যায়

Manual6 Ad Code

সুব্রত শুভ |

স্বাধীনতার মাত্র এক বছরের মাথায় ১৯৭৩ সালের ১ জানুয়ারি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গভীর ও বেদনাবিধুর অধ্যায় রচিত হয়। ভিয়েতনামে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বর্বর আগ্রাসনের প্রতিবাদে আয়োজিত এক শান্তিপূর্ণ ছাত্র মিছিলে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর গুলিবর্ষণে শহীদ হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জহুরুল হক হলের ছাত্রনেতা মতিউল ইসলাম এবং ঢাকা কলেজের ছাত্রনেতা মীর্জা কাদেরুল ইসলাম। আহত হন আরও অনেকে। এই ঘটনা শুধু দুটি তরুণ প্রাণের নিভে যাওয়া নয়; এটি ছিল স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম রাষ্ট্রীয় গুলিতে ছাত্র হত্যার ঘটনা—যা রাষ্ট্র, রাজনীতি ও জনগণের সম্পর্ককে নতুনভাবে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়।
ভিয়েতনাম তখন কেবল একটি দেশ নয়, ছিল বিশ্বব্যাপী সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সংগ্রামের প্রতীক। পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে মার্কিন আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ভিয়েতনামের লড়াই যেমন বিশ্ববিবেককে নাড়া দিয়েছিল, তেমনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধেও তা ছিল এক শক্তিশালী অনুপ্রেরণা। “বিশ্বজুড়ে দু’টো নাম—বাংলাদেশ আর ভিয়েতনাম”—এই স্লোগান কেবল আবেগ নয়, ছিল এক আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক অবস্থানের ঘোষণা।

Manual1 Ad Code

১৯৭২ সালের শেষদিকে যুক্তরাষ্ট্র যখন হ্যানয় ও হাইফংসহ ভিয়েতনামের বিভিন্ন শহরে নির্বিচার বোমাবর্ষণ শুরু করে, তখন বাংলাদেশের ছাত্রসমাজ বিশেষ করে ছাত্র ইউনিয়ন ও ডাকসু স্বাভাবিকভাবেই প্রতিবাদে সোচ্চার হয়। ১ জানুয়ারি ‘ভিয়েতনাম সংহতি দিবস’ পালনের সিদ্ধান্ত ছিল সেই আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতারই প্রকাশ। কিন্তু সেই শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিই পরিণত হয় রক্তাক্ত ট্র্যাজেডিতে।

কোনো ১৪৪ ধারা জারি না থাকা, কোনো সতর্কবার্তা বা লাঠিচার্জ ছাড়াই পুলিশের সরাসরি গুলিবর্ষণ স্বাধীন রাষ্ট্রের চরিত্র নিয়েই বড় প্রশ্ন তোলে। মতিউল ও কাদেরের রক্ত রাজপথে ঝরার সঙ্গে সঙ্গে আন্দোলন আর শুধু ভিয়েতনাম সংহতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি—তা রূপ নেয় রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির দাবিতে গণআন্দোলনে।

Manual7 Ad Code

পরদিন দেশজুড়ে পালিত হয় সর্বাত্মক হরতাল। ঢাকা থেকে জেলা শহর—সবখানেই রাজপথে নামে মানুষের ঢল। পল্টন ময়দানের জনসভা, শহীদদের জানাজা, শোকমিছিল—সব মিলিয়ে ১ জানুয়ারির ঘটনা পরিণত হয় স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম বড় রাজনৈতিক গণপ্রতিরোধে। এই আন্দোলনের মধ্য দিয়েই উত্থাপিত হয় সাত দফা দাবি—যার মধ্যে ছিল দায়ী মন্ত্রী ও পুলিশ কর্মকর্তাদের অপসারণ, ভিয়েতনামে মার্কিন আগ্রাসনের নিন্দা, ইউএসআইএস বন্ধ, শহীদ পরিবারকে ক্ষতিপূরণ এবং বিচার বিভাগীয় তদন্ত।
এই আন্দোলনের একটি তাৎপর্যপূর্ণ রাজনৈতিক মুহূর্ত ছিল ডাকসু থেকে বঙ্গবন্ধুর আজীবন সদস্যপদ প্রত্যাহারের ঘোষণা। আবেগতাড়িত হলেও এটি ছিল রাষ্ট্র ও সরকারের প্রতি ছাত্রসমাজের তীব্র ক্ষোভের প্রতীকী বহিঃপ্রকাশ। তবে ইতিহাসের সত্য এটাও যে, পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধু দুঃখপ্রকাশ করেন এবং বিচার বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ দেন—যা আন্দোলনের চাপেই সম্ভব হয়েছিল।

Manual6 Ad Code

সরকার শেষ পর্যন্ত পিছু হটতে বাধ্য হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে সরানো হয়, ইউএসআইএস স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত হয়, ভিয়েতনামের অস্থায়ী বিপ্লবী সরকারকে স্বীকৃতি দেয় বাংলাদেশ। উল্লেখযোগ্যভাবে, বাংলাদেশই প্রথম অ-কমিউনিস্ট রাষ্ট্র হিসেবে দক্ষিণ ভিয়েতনামের বিপ্লবী সরকারকে স্বীকৃতি দেয়—যা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এক সাহসী ও তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ।
এই প্রেক্ষাপটে স্পষ্ট হয়—মতিউল ও কাদেরের আত্মদান বৃথা যায়নি। তাদের রক্তের বিনিময়ে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী অবস্থানে বাংলাদেশ আবার দৃঢ়তা অর্জন করে। ছাত্র আন্দোলন প্রমাণ করে যে, স্বাধীন রাষ্ট্রেও গণতান্ত্রিক অধিকার ও আন্তর্জাতিক ন্যায়ের প্রশ্নে রাজপথের ভূমিকা অপরিহার্য।

আজ, পাঁচ দশকের বেশি সময় পর দাঁড়িয়ে ১ জানুয়ারির দিকে তাকালে এটি কেবল অতীতের একটি রক্তাক্ত দিন নয়। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—রাষ্ট্র যতই প্রগতিশীল দাবি করুক, জনগণের প্রতিবাদ দমন করলে তা ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড়াতেই হয়। একই সঙ্গে এটি প্রমাণ করে যে, সংগঠিত ছাত্র আন্দোলন ও গণপ্রতিরোধ রাষ্ট্রকে সংশোধনের পথে বাধ্য করতে পারে।

মতিউল–কাদের আজও কেবল দুটি নাম নয়; তারা বাংলাদেশের সাম্রাজ্যবাদবিরোধী চেতনার প্রতীক। ‘সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সংহতি দিবস’ হিসেবে ১ জানুয়ারি পালনের মধ্য দিয়ে আমরা শুধু অতীত স্মরণ করি না—আমরা ভবিষ্যতের জন্যও এক রাজনৈতিক শপথ গ্রহণ করি। এই চেতনা যতদিন বেঁচে থাকবে, ততদিন মতিউল–কাদের বেঁচে থাকবেন বাংলাদেশের রাজপথে, ইতিহাসে এবং সংগ্রামের স্মৃতিতে।

Manual1 Ad Code

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ