২০২৫ সালে ঘুষ লেনদেন ১২ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকা: দুর্নীতির বোঝা বেড়েছে সাধারণ মানুষের কাঁধে

প্রকাশিত: ১০:৫১ অপরাহ্ণ, জুন ২৫, ২০২৬

২০২৫ সালে ঘুষ লেনদেন ১২ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকা: দুর্নীতির বোঝা বেড়েছে সাধারণ মানুষের কাঁধে

Manual1 Ad Code
  • টিআইবির জাতীয় খানা জরিপে উদ্বেগজনক চিত্র; স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও কৃষি খাতে অনিয়মের বিস্তার

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা, ২৫ জুন ২০২৬ : দেশে বিভিন্ন সেবা খাতে দুর্নীতি ও ঘুষের বিস্তার উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) পরিচালিত ‘সেবা খাতে দুর্নীতি: জাতীয় খানা জরিপ ২০২৫’-এর ফলাফলে দেখা গেছে, ২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে দুর্নীতি ও ঘুষের শিকার পরিবারের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। একই সঙ্গে জাতীয় পর্যায়ে প্রাক্কলিত মোট ঘুষ লেনদেনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ৬৩৩ কোটি ২০ লাখ টাকা, যা দুই বছর আগের তুলনায় ১৫ দশমিক ৯ শতাংশ বেশি।

বৃহস্পতিবার (২৫ জুন ২০২৬) রাজধানীর ধানমন্ডিতে টিআইবির কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে জরিপের ফলাফল প্রকাশ করা হয়। দেশের আটটি বিভাগের গ্রাম ও শহরাঞ্চলের ১৫ হাজার ৭১৫টি পরিবারের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে দুই ধাপের স্তরায়িত গুচ্ছ নমুনা পদ্ধতিতে জরিপটি পরিচালিত হয়েছে।

দুর্নীতির শিকার ৮১ শতাংশের বেশি পরিবার

জরিপে দেখা যায়, অন্তত একটি সেবা খাতে ৮১ দশমিক ৬ শতাংশ পরিবার দুর্নীতির শিকার হয়েছে, আর ৬৩ দশমিক ৬ শতাংশ পরিবারকে ঘুষ দিতে বাধ্য হতে হয়েছে। ২০২৩ সালের তুলনায় দুর্নীতির শিকার পরিবারের হার ১৫ দশমিক ১ শতাংশ এবং ঘুষ দিতে বাধ্য হওয়া পরিবারের হার ২৫ দশমিক ২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

টিআইবির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, দুর্নীতি এখন কেবল বিচ্ছিন্ন কোনো সমস্যা নয়; বরং স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি, স্থানীয় প্রশাসনসহ বিভিন্ন সেবা খাতে এটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিচ্ছে। ফলে সাধারণ মানুষ সরকারি ও বেসরকারি সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে নানা ধরনের অনিয়ম, দালালচক্র, অতিরিক্ত অর্থ দাবি এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের মুখোমুখি হচ্ছে।

বাজেটের ১.৫৮ শতাংশের সমান ঘুষ লেনদেন

Manual3 Ad Code

জরিপে উল্লেখ করা হয়, ২০২৫ সালে প্রাক্কলিত ঘুষ লেনদেনের মোট অর্থের পরিমাণ ১২ হাজার ৬৩৩ কোটি ২০ লাখ টাকা, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরের সংশোধিত জাতীয় বাজেটের ১ দশমিক ৫৮ শতাংশ এবং দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) শূন্য দশমিক ২৩ শতাংশ সমপরিমাণ।

বিশ্লেষকদের মতে, এত বিপুল অঙ্কের অর্থ উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ না হয়ে দুর্নীতির মাধ্যমে অপচয় হওয়া অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের ক্ষতির কারণ। একই সঙ্গে এটি জনসেবার মান, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং অর্থনৈতিক বৈষম্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

খানাপ্রতি গড় ঘুষ কমলেও বেড়েছে লেনদেনের ঘটনা

জরিপে একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় উঠে এসেছে। ২০২৩ সালে যেখানে একটি পরিবারের গড় ঘুষ ব্যয় ছিল ৫ হাজার ৬৮০ টাকা, সেখানে ২০২৫ সালে তা কমে ৫ হাজার ১২৪ টাকায় নেমে এসেছে।

তবে টিআইবি বলছে, গড় অঙ্ক কমে যাওয়ার অর্থ দুর্নীতি কমে যাওয়া নয়। বরং অনেক সেবায় তুলনামূলক কম অঙ্কের ঘুষের ঘটনা আগের চেয়ে অনেক বেশি ঘটছে। বিশেষ করে স্বাস্থ্যসেবায় টিকিট সংগ্রহ, কৃষি খাতে সার প্রাপ্তি, এবং বিভিন্ন মৌলিক সেবার ক্ষেত্রে ঘুষ বা নিয়মবহির্ভূত অর্থ প্রদানের হার দ্বিগুণ থেকে প্রায় পাঁচ গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে।

অর্থাৎ, দুর্নীতির পরিধি এখন আরও বিস্তৃত জনগোষ্ঠীর মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে।

শিক্ষা খাতে বেড়েছে অনিয়ম

জরিপে শিক্ষা খাতেও দুর্নীতির মাত্রা বৃদ্ধির তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন ধরনের নিয়মবহির্ভূত অর্থ আদায়ের হার প্রায় ১৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩৫ শতাংশে পৌঁছেছে।

ভর্তি, সনদপত্র প্রদান, পরীক্ষাসংক্রান্ত কার্যক্রম, বিভিন্ন ফি ও প্রশাসনিক সেবার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ বেড়েছে বলে জরিপে উল্লেখ করা হয়েছে।

শিক্ষাবিদদের মতে, শিক্ষা খাতে অনিয়ম বাড়লে তা কেবল শিক্ষার্থীদের ওপর আর্থিক চাপ সৃষ্টি করে না; বরং পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

দরিদ্র পরিবারের ওপর দুর্নীতির চাপ বেশি

Manual2 Ad Code

জরিপের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হলো, দুর্নীতির আর্থিক বোঝা নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর তুলনামূলকভাবে বেশি পড়ে।

তথ্য অনুযায়ী, একটি পরিবার বছরে গড়ে তাদের মোট আয়ের ১ দশমিক ৭ শতাংশ ঘুষ বাবদ ব্যয় করেছে। কিন্তু সবচেয়ে দুর্নীতিপ্রবণ পাঁচটি খাতে দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকা পরিবারগুলোর ক্ষেত্রে এ হার ৫ দশমিক ১ শতাংশ, যেখানে দারিদ্র্যসীমার ওপরে থাকা পরিবারগুলোর জন্য ৩ দশমিক ২ শতাংশ।

অর্থাৎ, একই ধরনের সেবা গ্রহণ করতে গিয়ে দরিদ্র পরিবারগুলো তাদের আয়ের তুলনায় অনেক বেশি অর্থ ঘুষ হিসেবে ব্যয় করতে বাধ্য হচ্ছে।

টিআইবির মতে, এ প্রবণতা সামাজিক বৈষম্য আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নের পথে বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে।

আয়ের চেয়েও বেশি ঘুষ ব্যয়ের নজির

জরিপে কিছু চরম উদাহরণও উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৩টি পরিবারের ক্ষেত্রে ঘুষ বাবদ ব্যয় তাদের বার্ষিক আয়ের চেয়েও বেশি ছিল। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এ ব্যয় পরিবারের মোট বার্ষিক আয়ের পাঁচ থেকে ছয় গুণ পর্যন্ত পৌঁছেছে।

Manual1 Ad Code

গবেষকদের মতে, এমন পরিস্থিতি পরিবারগুলোকে ঋণগ্রস্ততা, সম্পদ বিক্রি কিংবা দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সংকটের দিকে ঠেলে দিতে পারে।

গ্রামাঞ্চলে দুর্নীতির শিকার বেশি মানুষ

টিআইবির জরিপে দেখা গেছে, শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলের মানুষ দুর্নীতির শিকার হয়েছেন বেশি। সরকারি সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে তথ্যের সীমাবদ্ধতা, মধ্যস্বত্বভোগী ও দালালচক্রের প্রভাব এবং জবাবদিহিতার ঘাটতি এ অবস্থার অন্যতম কারণ বলে মনে করা হচ্ছে।

একই সঙ্গে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর ওপর দুর্নীতির আর্থিক প্রভাব তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি পড়ছে।

Manual2 Ad Code

দুদকের ওপর আস্থার সংকট

সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, দুর্নীতি সমাজের সব স্তরের মানুষের জন্য ক্ষতিকর হলেও এর প্রভাব সমান নয়।

তিনি বলেন, “যারা ক্ষমতার অপব্যবহার করেন তারা দুর্নীতির মাধ্যমে লাভবান হন, কিন্তু এর সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হয় দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষকে। জরিপে দেখা গেছে, গ্রামাঞ্চলের মানুষ বেশি দুর্নীতির শিকার হয়েছেন এবং নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর দুর্নীতির বোঝা তুলনামূলকভাবে প্রায় তিনগুণ বেশি।”

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। জরিপে অংশগ্রহণকারী উত্তরদাতাদের ২৯ দশমিক ৫ শতাংশ দুদক সম্পর্কে জানেন বলে জানিয়েছেন, কিন্তু অভিযোগ করেছেন মাত্র শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ।

এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “এটি দুদকের প্রতি জনগণের আস্থার ঘাটতির স্পষ্ট ইঙ্গিত। দুর্নীতি প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে প্রতিষ্ঠানটির দক্ষতা, গ্রহণযোগ্যতা এবং স্বাধীনতা বাড়াতে হবে।”

কমিশনার শূন্য দুদক নিয়ে উদ্বেগ

ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বর্তমানে এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যেখানে দুদক কার্যত স্থবির অবস্থায় রয়েছে। দীর্ঘ প্রায় চার মাস ধরে কমিশনারদের পদ শূন্য থাকায় প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম প্রশ্নের মুখে পড়েছে।

তিনি বলেন, “এই পরিস্থিতির দায় সরকারকে নিতে হবে। অবিলম্বে সার্চ কমিটির মাধ্যমে যোগ্য, স্বাধীন ও গ্রহণযোগ্য নেতৃত্ব নিয়োগের উদ্যোগ নিতে হবে, যাতে দুদকের প্রতি জনগণের আস্থার সংকট দূর করা সম্ভব হয়।”

বিশেষজ্ঞদের মতামত

রাজনীতি, সুশাসন ও অর্থনীতির বিশ্লেষক ও গবেষক, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির মৌলভীবাজার জেলা সম্পাদক মণ্ডলীর সদস্য, আরপি নিউজের সম্পাদক ও বিশিষ্ট কলামিস্ট কমরেড সৈয়দ আমিরুজ্জামানের মতে, দুর্নীতি কেবল আইনশৃঙ্খলা বা প্রশাসনিক সমস্যা নয়; এটি অর্থনৈতিক উন্নয়ন, বিনিয়োগ পরিবেশ, দারিদ্র্য বিমোচন এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের জন্য বড় হুমকি।

তিনি মনে করেন, দুর্নীতি কমাতে সেবা খাতের ডিজিটালাইজেশন, প্রশাসনিক জবাবদিহিতা বৃদ্ধি, অভিযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, স্বাধীন তদন্ত ব্যবস্থা এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের কার্যকর ভূমিকা নিশ্চিত করা জরুরি।

সারসংক্ষেপ

টিআইবির জাতীয় খানা জরিপ ২০২৫ দেশের সেবা খাতে দুর্নীতির একটি উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেছে। ঘুষ লেনদেনের পরিমাণ বৃদ্ধি, দুর্নীতির শিকার পরিবারের সংখ্যা বেড়ে যাওয়া, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ওপর অতিরিক্ত চাপ এবং দুর্নীতি প্রতিরোধকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থাহীনতা—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

দেশের উন্নয়ন ও সুশাসনের স্বার্থে দুর্নীতিবিরোধী কার্যকর পদক্ষেপ এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি জরুরি বলে মনে করছেন কমরেড সৈয়দ আমিরুজ্জামান।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ