তরুণদের উচ্চ রক্তচাপজনিত হৃদরোগ ঝুঁকি কমাতে স্বাস্থ্য বাজেট বাড়ানোর দাবি

প্রকাশিত: ৪:০০ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২৮, ২০২৬

তরুণদের উচ্চ রক্তচাপজনিত হৃদরোগ ঝুঁকি কমাতে স্বাস্থ্য বাজেট বাড়ানোর দাবি

Manual6 Ad Code
  • হৃদরোগে দেশে বছরে মৃত্যু প্রায় ২ লাখ ৮৩ হাজার ৮০০, উচ্চ রক্তচাপ দায়ী ৫২ শতাংশের জন্য

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ : তরুণদের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগের ঝুঁকি ক্রমেই বাড়ছে। এ ঝুঁকি মোকাবিলায় স্বাস্থ্য বাজেটে বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি উচ্চ রক্তচাপ শনাক্তকরণ, নিয়মিত চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন বিশেষজ্ঞ ও জনস্বাস্থ্যসংশ্লিষ্টরা। তাঁদের মতে, উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর বিনিয়োগ করা গেলে হৃদরোগজনিত অকালমৃত্যু উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব।

বিশ্ব হার্ট দিবস ২০২৬ উপলক্ষে সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬) গবেষণা ও অ্যাডভোকেসি প্রতিষ্ঠান প্রজ্ঞা (প্রগতির জন্য জ্ঞান) আয়োজিত এক ওয়েবিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন।

গ্লোবাল হেলথ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবেটরের (জিএইচএআই) সহায়তায় আয়োজিত ওয়েবিনারের বিষয় ছিল ‘তরুণদের উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগ ঝুঁকি মোকাবেলায় স্বাস্থ্য বাজেট: বাংলাদেশ প্রেক্ষিত’।

ওয়েবিনারে বক্তারা বলেন, বাংলাদেশে অসংক্রামক রোগের বোঝা দ্রুত বাড়ছে। এর মধ্যে হৃদরোগ মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ। উচ্চ রক্তচাপ হৃদরোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি হলেও জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থায় এর প্রতিরোধ, শনাক্তকরণ ও দীর্ঘমেয়াদি নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ এখনো পর্যাপ্ত নয়। বিশেষ করে তরুণ বয়সে উচ্চ রক্তচাপ শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণ করা গেলে পরবর্তী জীবনে হৃদরোগের ঝুঁকি কমানো সম্ভব।

ওয়েবিনারে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে প্রতিবছর হৃদরোগের কারণে প্রায় ৬৫ লাখ মানুষ অকালমৃত্যুবরণ করেন। বাংলাদেশেও হৃদরোগজনিত মৃত্যুর হার উদ্বেগজনক। দেশে মোট মৃত্যুর প্রায় ৩৪ শতাংশ হৃদরোগের কারণে ঘটে। ২০২৪ সালে দেশে হৃদরোগজনিত অসুস্থতায় প্রায় ২ লাখ ৮৩ হাজার ৮০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে ওয়েবিনারে জানানো হয়। এর মধ্যে ৫২ শতাংশ মৃত্যুর জন্য উচ্চ রক্তচাপকে দায়ী করা হয়।

তরুণদের মধ্যেও উচ্চ রক্তচাপের উপস্থিতি উদ্বেগ তৈরি করছে। ‘বাংলাদেশ এনসিডি স্টেপস সার্ভে, ২০১৮’-এর তথ্য তুলে ধরে বক্তারা জানান, দেশে ১৮ থেকে ৩৯ বছর বয়সী জনগোষ্ঠীর প্রায় ১২ শতাংশ উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত। ফলে উচ্চ রক্তচাপকে শুধু বয়স্কদের সমস্যা হিসেবে বিবেচনা না করে তরুণ জনগোষ্ঠীর মধ্যেও এর প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে কার্যকর কর্মসূচি গ্রহণের প্রয়োজন রয়েছে।

স্বাস্থ্য বাজেটে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে বরাদ্দ বাড়ানোর দাবি

ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের ইপিডেমিওলজি অ্যান্ড রিসার্চ বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. সোহেল রেজা চৌধুরী বলেন, চলতি বাজেটে স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ ৫ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে ৭ দশমিক ৪ শতাংশে উন্নীত করা হয়েছে, যা প্রশংসনীয়। এই বর্ধিত বরাদ্দের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ উচ্চ রক্তচাপের ওষুধে ব্যয় করা হলে দেশে উচ্চ রক্তচাপজনিত হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে তা কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

Manual7 Ad Code

তিনি বলেন, উচ্চ রক্তচাপ এমন একটি স্বাস্থ্যঝুঁকি, যা দীর্ঘদিন নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকলে হৃদরোগসহ বিভিন্ন জটিলতার সৃষ্টি করতে পারে। তাই শুধু রোগ শনাক্ত করাই যথেষ্ট নয়, শনাক্ত রোগীদের নিয়মিত চিকিৎসার আওতায় এনে প্রয়োজনীয় ওষুধ সহজলভ্য করা এবং চিকিৎসা অব্যাহত রাখার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।

বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিকস বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. মারুফ হক খান বলেন, উচ্চ রক্তচাপজনিত হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ও জীবনাচরণ সম্পর্কে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে। তরুণদের দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক পরিশ্রম, স্থূলতা এবং অন্যান্য জীবনাচরণগত ঝুঁকির বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিয়ে প্রতিরোধমূলক উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণার তাগিদ

তরুণদের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপজনিত হৃদরোগের ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতা তৈরিতে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রচারণা চালানোর ওপর গুরুত্ব দেন দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের ডেপুটি এডিটর সাজ্জাদুর রহমান।

Manual6 Ad Code

তিনি বলেন, তরুণদের কাছে স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য পৌঁছে দিতে প্রচলিত গণমাধ্যমের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে হবে। উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি, নিয়মিত রক্তচাপ মাপা, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ও শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকার বিষয়ে সহজবোধ্য ও তথ্যভিত্তিক প্রচারণা প্রয়োজন।

গ্লোবাল হেলথ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবেটরের বাংলাদেশ কান্ট্রি লিড মুহাম্মদ রূহুল কুদ্দুস বলেন, দেশে মোট মৃত্যুর ৭১ শতাংশ অসংক্রামক রোগের কারণে ঘটে। অথচ স্বাস্থ্য বাজেটের মাত্র ৪ দশমিক ২ শতাংশ এ খাতে বরাদ্দ রয়েছে। উচ্চ রক্তচাপসহ অন্যান্য অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে বরাদ্দ আরও বাড়ানো প্রয়োজন।

তাঁর মতে, অসংক্রামক রোগের ক্রমবর্ধমান বোঝা বিবেচনায় নিয়ে স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বরাদ্দের ক্ষেত্রে প্রতিরোধ ও প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ নিয়ন্ত্রণকে আরও গুরুত্ব দিতে হবে।

অবকাঠামোর পাশাপাশি ওষুধ ও সরঞ্জামে গুরুত্ব

ওয়েবিনারে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে স্বাস্থ্য খাতের বাজেট ব্যবস্থাপনা নিয়ে বক্তব্য দেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক, ‘৯০-এর গণঅভ্যুত্থানের সংগঠক, বাংলাদেশ ছাত্রমৈত্রীর সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, জাতীয় কৃষক সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির মৌলভীবাজার জেলা সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য, ইংরেজি দৈনিক দ্য ফিনান্সিয়াল পোস্ট ও সাপ্তাহিক নতুন কথার বিশেষ প্রতিনিধি, আরপি নিউজের সম্পাদক ও কলামিস্ট কমরেড সৈয়দ আমিরুজ্জামান।

তিনি বলেন, চলতি বাজেটে স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ ৫ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে ৭ দশমিক ৪ শতাংশে উন্নীত হলেও এর বড় একটি অংশ অবকাঠামো নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণে ব্যয় হয়। টেস্ট ইকুইপমেন্ট, চাহিদা অনুযায়ী ওষুধ সরবরাহ এবং চিকিৎসা সরঞ্জামের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বরাদ্দ পর্যাপ্ত হারে বাড়ছে না।

সৈয়দ আমিরুজ্জামান বলেন, স্বাস্থ্য খাতে সরাসরি মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় বিষয়গুলোকে আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। স্বাস্থ্য অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি রোগ নির্ণয়ের সরঞ্জাম, ওষুধ এবং সেগুলোর রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়েও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। স্বাস্থ্য খাতের খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

ওয়েবিনারের আলোচ্য বিষয়কে গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে তিনি আয়োজকদের ধন্যবাদ জানান।

তরুণদের ঝুঁকি বাড়ছে, প্রয়োজন আগাম প্রতিরোধ

বিশেষজ্ঞরা বলেন, উচ্চ রক্তচাপকে অনেক সময় উপসর্গহীন রোগ হিসেবে দেখা হয়। ফলে তরুণ বয়সে অনেকেই নিজেদের উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি সম্পর্কে অবগত থাকেন না। নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা না করা এবং উচ্চ রক্তচাপ শনাক্ত হওয়ার পরও নিয়মিত চিকিৎসা না নেওয়ার কারণে দীর্ঘমেয়াদে হৃদরোগসহ বিভিন্ন জটিলতার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

Manual5 Ad Code

তাঁদের মতে, তরুণদের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপ প্রতিরোধে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম, ওজন নিয়ন্ত্রণ এবং ক্ষতিকর জীবনাচরণ পরিহারের পাশাপাশি নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপ শনাক্তকরণ ও ব্যবস্থাপনাকে আরও কার্যকরভাবে যুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেন তাঁরা।

বিশ্ব হার্ট দিবস কাল

আগামীকাল ২৯ সেপ্টেম্বর বিশ্ব হার্ট দিবস পালিত হবে। এ বছরের প্রতিপাদ্য ‘Heart Disease Can Hide in Plain Sight: Don’t Miss a Beat’।

বিশ্ব হার্ট দিবস উপলক্ষে আয়োজিত ওয়েবিনারে হৃদরোগ প্রতিরোধে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ এবং স্বাস্থ্য খাতে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। বক্তারা বলেন, হৃদরোগ প্রতিরোধে চিকিৎসার পাশাপাশি জনস্বাস্থ্যভিত্তিক প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন।

ওয়েবিনারে আলোচক হিসেবে আরও উপস্থিত ছিলেন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন এবং ভাইটাল স্ট্র্যাটেজিসের কনসালট্যান্ট আমিনুল ইসলাম সুজন।

প্রজ্ঞার নির্বাহী পরিচালক এবিএম জুবায়েরের সভাপতিত্বে ওয়েবিনারটি সঞ্চালনা করেন প্রজ্ঞার প্রোগ্রাম অফিসার সামিহা বিনতে কামাল।

ওয়েবিনারে বাংলাদেশ মেডিকেল স্টুডেন্টস’ সোসাইটি, প্ল্যাটফরম ডক্টরস ফাউন্ডেশনসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন।

Manual4 Ad Code

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ