সিলেট ৩রা অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৮ই আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ৭:৪০ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২, ২০২৬
মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পেতে অপেক্ষা করতে হয়েছে ৪৫ বছর
নিজস্ব প্রতিবেদক | সাদুল্লাপুর (গাইবান্ধা), ০২ অক্টোবর ২০২৬ : মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের সহযোগীদের নির্যাতনের শিকার গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর উপজেলার বীরাঙ্গনা ও বীর মুক্তিযোদ্ধা রাজকুমারী রবিদাস ফুলমতি আর নেই।
বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) সন্ধ্যায় ৮৪ বছর বয়সে উপজেলার উত্তরপাড়া এলাকার নিজ বাড়িতে তিনি মারা যান।
শুক্রবার বেলা ৩টায় উত্তরপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে ফুলমতিকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেওয়া হয়। পরে ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী তার শেষকৃত্য সম্পন্ন করা হয়। এ সময় গাইবান্ধা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ আশরাফুল হক, সাদুল্লাপুর থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) হাসানুল কবিরসহ স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন।
ফুলমতি উপজেলার উত্তরপাড়া এলাকার প্রয়াত কুশিরাম রবিদাস ফসিয়ারের স্ত্রী। ১৯৮৮ সালে স্বামীর মৃত্যুর পর চার ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে চরম দারিদ্র্যের মধ্যে জীবন কাটিয়েছেন তিনি। বার্ধক্য ও নানা শারীরিক জটিলতায় জীবনের শেষ সময়ে দীর্ঘদিন শয্যাশায়ী ছিলেন এই বীরাঙ্গনা।
তার ছেলে মনিরাজ কুমার জানান, প্রায় দুই বছর আগে ব্রেইন স্ট্রোকে ফুলমতির ডান হাত ও পা অবশ হয়ে যায়। এরপর থেকে তিনি শয্যাশায়ী ছিলেন।
নির্যাতনের শিকার মুক্তিযুদ্ধের সময়
লেখক ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষক জহুরুল কাইয়ুমের বর্ণনা অনুযায়ী, ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের সহযোগীরা ফুলমতিদের বাড়িতে প্রবেশ করে তাকে নির্যাতন করে। এ সময় তার স্বামীর বুকে রাইফেল ঠেকিয়ে তার সামনেই ফুলমতির ওপর নির্যাতন চালানো হয়।
মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহ সেই অভিজ্ঞতা নিয়ে দীর্ঘদিন নীরবে জীবন কাটিয়েছেন ফুলমতি। স্বাধীনতার পরও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পেতে তাকে দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হয়েছে।
৪৫ বছর পর রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি
দীর্ঘ ৪৫ বছর অপেক্ষার পর ২০১৬ সালের মার্চে বীরাঙ্গনা হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পান রাজকুমারী রবিদাস ফুলমতি। পরে সরকারিভাবে বীরনিবাস প্রকল্পের আওতায় তাকে একটি ঘর দেওয়া হয়।
সাদুল্লাপুর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের সাবেক ডেপুটি কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রশিদ আজমী বলেন, “স্বীকৃতি পেতে ফুলমতিকে ৪৫ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে। পরে সরকারিভাবে বীরনিবাস প্রকল্পের আওতায় তাকে একটি ঘর দেওয়া হয়।”
স্মৃতি সংরক্ষণের দাবি
ফুলমতির মৃত্যুতে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা, রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ শোক জানিয়েছেন।
সাদুল্লাপুর গার্লস ডিগ্রি কলেজের সহকারী অধ্যাপক ও লেখক হোসনে আরা মুন্সি বলেন, “ফুলমতি শুধু একজন নারী ছিলেন না, তিনি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের জীবন্ত ইতিহাস। তার জীবন ও সংগ্রামের কথা নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে এবং স্মৃতি ধরে রাখতে সমাধিস্থলে স্মৃতিফলক বা স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা প্রয়োজন।”
ওয়ার্কার্স পার্টির শোক
বীরাঙ্গনা ও বীর মুক্তিযোদ্ধা রাজকুমারী রবিদাস ফুলমতির মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি কমরেড মাহমুদুল হাসান মানিক ও ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক কমরেড নূর আহমেদ বকুল।
এক শোকবার্তায় তারা ফুলমতির মুক্তিযুদ্ধকালীন নির্যাতন ও পরবর্তী জীবনের সংগ্রামের কথা স্মরণ করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জানান।
এদিকে ফুলমতির মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির মৌলভীবাজার জেলা সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য, আরপি নিউজের সম্পাদক ও কলামিস্ট কমরেড সৈয়দ আমিরুজ্জামান। তিনি শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় নির্যাতনের শিকার নারীদের মধ্যে ফুলমতির জীবন ছিল দীর্ঘ সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি। রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পেলেও তার জীবনের দীর্ঘ বঞ্চনা ও সংগ্রামের ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা জরুরি। তার স্মৃতি সংরক্ষণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ারও আহ্বান জানান তিনি।

সম্পাদক : সৈয়দ আমিরুজ্জামান
ইমেইল : rpnewsbd@gmail.com
মোবাইল +8801716599589
৩১/এফ, তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০।
© RP News 24.com 2013-2020
Design and developed by ওয়েব নেষ্ট বিডি