সিলেট ২৮শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৩ই আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ৬:১১ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২৮, ২০২৬
“একটা সময়ের পর পেছন ফিরে দেখবেন, আপনার ক্ষতি করা মানুষগুলো কেউই সুখে নেই। এটা অভিশাপ নয়, নিয়তির বিচার।”
জীবনের পথে চলতে গেলে মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক তৈরি হয়। কেউ হয়ে ওঠে আপনজন, কেউ বন্ধু, কেউ সহযাত্রী। আবার কখনো সেই কাছের মানুষই হয়ে ওঠে কষ্টের কারণ। বিশ্বাস ভাঙে, স্বপ্ন ভেঙে যায়, সম্পর্কের জায়গায় জন্ম নেয় অভিমান। কেউ সচেতনভাবে ক্ষতি করে, কেউ স্বার্থের কারণে অন্যের অধিকার কেড়ে নেয়, আবার কেউ নিজের অজ্ঞতা কিংবা ভুল সিদ্ধান্তের মাধ্যমে অন্যের জীবনে গভীর ক্ষত তৈরি করে।
কিন্তু জীবনের সবচেয়ে আশ্চর্য বিষয় হলো—সময় অনেক কিছুর উত্তর দিয়ে দেয়।
কোনো মানুষ যখন অন্যের ক্ষতি করে, তখন হয়তো সে মুহূর্তে নিজেকে বিজয়ী মনে করে। অন্যের চোখের জলকে দুর্বলতা ভাবে, অন্যের নীরবতাকে পরাজয় মনে করে। অথচ সময়ের পরিক্রমায় সে বুঝতে পারে, অন্যকে আঘাত করে পাওয়া সাফল্য সবসময় শান্তি এনে দেয় না।
‘নিয়তির বিচার’ কথাটিকে তাই কেবল কোনো অলৌকিক শাস্তির ধারণা হিসেবে দেখলে বিষয়টি অসম্পূর্ণ থেকে যায়। এর মধ্যে জীবনের একটি গভীর বাস্তবতাও আছে। মানুষের কাজের ফল কোনো না কোনোভাবে তার জীবনেই ফিরে আসে—কখনো সামাজিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে, কখনো সম্পর্ক হারানোর মধ্য দিয়ে, কখনো নিজের তৈরি পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে।
যে মানুষ প্রতিনিয়ত অন্যকে অবিশ্বাস করতে শেখায়, একদিন হয়তো তাকেও কেউ বিশ্বাস করবে না। যে মানুষ সম্পর্ককে কেবল স্বার্থের চোখে দেখে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার চারপাশের সম্পর্কগুলোও স্বার্থনির্ভর হয়ে উঠতে পারে। যে ব্যক্তি অন্যের সম্মান নষ্ট করতে আনন্দ পায়, একসময় তার নিজের আচরণই তার পরিচয়ের অংশ হয়ে দাঁড়ায়।
এটাই হয়তো জীবনের এক ধরনের নীরব বিচার।
তবে এই বিচারকে প্রতিশোধের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা উচিত নয়। কেউ আমাদের ক্ষতি করেছে বলে তার অমঙ্গল কামনা করা, তার পতনের অপেক্ষায় থাকা কিংবা মনে মনে তাকে অভিশাপ দেওয়া আমাদের নিজেদেরই মানসিক শান্তি নষ্ট করে। বরং জীবনের সবচেয়ে বড় উত্তর হতে পারে—ক্ষতকে শক্তিতে পরিণত করা এবং অন্যায় আচরণের পরও নিজের মানবিকতাকে ধরে রাখা।
কারণ প্রতিশোধ মানুষকে অতীতের সঙ্গে বেঁধে রাখে, আর ক্ষমা ও আত্মমর্যাদা তাকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেয়।
জীবনে এমন মানুষ আসবেই, যারা আমাদের মূল্য বুঝবে না। কেউ আমাদের সরলতাকে দুর্বলতা ভাববে, কেউ বিশ্বাসের সুযোগ নেবে, কেউ আমাদের ভালো থাকার অধিকারটুকুও অস্বীকার করতে চাইবে। কিন্তু তাদের আচরণ আমাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে কি না, সেই সিদ্ধান্ত আমাদেরই।
সময় পেরিয়ে একদিন যখন পেছনে তাকানো হয়, তখন অনেক পুরোনো কষ্টের অর্থ বদলে যায়। যে মানুষটিকে হারানো একসময় পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ক্ষতি মনে হয়েছিল, হয়তো পরে বোঝা যায়—সেই বিচ্ছেদই নতুন জীবনের দরজা খুলেছিল। যে প্রত্যাখ্যান একসময় অপমান মনে হয়েছিল, সেটিই হয়তো নিজের মূল্য বুঝতে শিখিয়েছে। আর যে আঘাত একসময় জীবন থামিয়ে দিয়েছিল, সেটিই হয়তো মানুষকে আরও পরিণত করেছে।
জীবন সবসময় অন্যায়কারীর বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো রায় ঘোষণা করে না। অনেক সময় আমরা দেখি না, অন্য একজনের জীবনে কী ঘটছে। বাইরে থেকে কাউকে সুখী কিংবা অসুখী মনে হওয়াও সবসময় সত্যের প্রতিচ্ছবি নয়। তাই “সে সুখে নেই”—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর চেয়ে বরং নিজের জীবনের দিকে তাকানোই বেশি জরুরি।
আমাদের প্রত্যেকের জীবনেই কিছু হিসাব অসম্পূর্ণ থেকে যায়। কিছু প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় না। কিছু মানুষের কাছে ক্ষমা চাওয়া হয় না, কিছু মানুষের কাছ থেকে ক্ষমাও পাওয়া যায় না। কিন্তু সব হিসাবের উত্তর নিজের হাতে নিতে হয় না। কিছু বিষয় সময়ের ওপর ছেড়ে দেওয়াও এক ধরনের প্রজ্ঞা।
কারণ প্রকৃত শান্তি তখনই আসে, যখন আমরা বুঝতে পারি—আমাদের কাজ আমাদের নিয়ন্ত্রণে, অন্যের কাজ নয়।
কেউ আমাদের ক্ষতি করেছে—এটি তার সিদ্ধান্ত। সেই ক্ষতির পর আমরা কীভাবে নিজেদের গড়ে তুলব—সেটি আমাদের সিদ্ধান্ত।
তাই জীবনের কঠিন সময়ে প্রতিশোধের কথা না ভেবে নিজেকে প্রশ্ন করা যেতে পারে—আমি কি এই অভিজ্ঞতা থেকে আরও শক্ত, আরও সচেতন এবং আরও মানবিক হয়ে উঠতে পারি?
হয়তো সেখানেই রয়েছে প্রকৃত ‘নিয়তির বিচার’।
অন্যের পতন দেখার অপেক্ষায় না থেকে নিজের উত্থানের দিকে এগিয়ে যাওয়া। অন্যের অমঙ্গল কামনা না করে নিজের জীবনে আলো তৈরি করা। যারা কষ্ট দিয়েছে, তাদের স্মৃতিকে বোঝা না বানিয়ে জীবনের শিক্ষায় পরিণত করা।
শেষ পর্যন্ত মানুষ তার কাজের মধ্যেই বেঁচে থাকে। ভালোবাসা, বিশ্বাস, সততা ও মানবিকতার যে বীজ আমরা অন্যের জীবনে বপন করি, তার ফল কোনো না কোনোভাবে আমাদের জীবনকেও সমৃদ্ধ করে। আর অন্যায়, প্রতারণা ও নিষ্ঠুরতার বীজও সম্পর্ক ও সমাজের ভেতরে তার নিজস্ব প্রতিক্রিয়া তৈরি করে।
তাই ‘নিয়তির বিচার’ হয়তো কোনো রহস্যময় প্রতিশোধের নাম নয়। বরং এটি জীবনের সেই নীরব সত্য—মানুষের আচরণ তার চারপাশের পৃথিবীকে যেমন করে তোলে, শেষ পর্যন্ত সেই পৃথিবীর মধ্যেই তাকেও বসবাস করতে হয়।
আর সেই কারণেই, জীবনের সবচেয়ে শক্তিশালী উত্তর কখনো অভিশাপ নয়—
নিজেকে ভালো রাখা, নিজের পথে এগিয়ে যাওয়া এবং নিজের মানবিকতাকে অটুট রাখা।
#
মুক্তা সরকার
Artist, Singer

সম্পাদক : সৈয়দ আমিরুজ্জামান
ইমেইল : rpnewsbd@gmail.com
মোবাইল +8801716599589
৩১/এফ, তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০।
© RP News 24.com 2013-2020
Design and developed by ওয়েব নেষ্ট বিডি