সিলেট ৩০শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৫ই আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ৮:১০ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২৯, ২০২৬
হৃদযন্ত্র মানুষের শরীরের এমন একটি অঙ্গ, যার এক মুহূর্তের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেলেই থেমে যেতে পারে জীবন। অথচ আধুনিক জীবনযাত্রার নানা অনিয়ম, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, ধূমপান, স্থূলতা, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, রক্তে ক্ষতিকর কোলেস্টেরলের আধিক্য এবং দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপের কারণে হৃদরোগ আজ বিশ্বব্যাপী অন্যতম বড় স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে।
প্রতি বছর ২৯ সেপ্টেম্বর বিশ্ব হার্ট দিবস পালনের উদ্দেশ্য শুধু হৃদরোগ সম্পর্কে মানুষকে এক দিনের জন্য সচেতন করা নয়। বরং হৃদ্স্বাস্থ্যকে ব্যক্তিগত, পারিবারিক এবং রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকারের অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। এবারের বিশ্ব হার্ট দিবসের প্রতিপাদ্য—‘Heart Disease Can Hide in Plain Sight: Don’t Miss a Beat’—হৃদরোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে। অনেক ক্ষেত্রেই হৃদরোগের ঝুঁকি বা প্রাথমিক লক্ষণ প্রকাশ্যে ধরা পড়ে না। ফলে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, ঝুঁকি শনাক্তকরণ এবং সময়মতো চিকিৎসা গ্রহণের গুরুত্ব অপরিসীম।
বাংলাদেশেও হৃদরোগের বোঝা ক্রমেই বাড়ছে। বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক তথ্য-উপাত্ত বলছে, দেশের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ এখন হৃদরোগ ও অন্যান্য কার্ডিওভাসকুলার রোগ। ফলে বিশ্ব হার্ট দিবস কেবল একটি স্বাস্থ্যসচেতনতা দিবস নয়; এটি বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা, জনস্বাস্থ্যনীতি এবং জীবনযাপনের ধরন নিয়ে নতুন করে ভাবারও একটি সুযোগ।
মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হৃদরোগ
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস–২০২২ অনুযায়ী, দেশে মৃত্যুর সবচেয়ে বড় কারণগুলোর একটি হৃদরোগ। মোট মৃত্যুর প্রায় ২১ শতাংশ হৃদরোগের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে ওই পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে। এর মধ্যে হার্ট অ্যাটাকের কারণে ১৭ দশমিক ৪৫ শতাংশ এবং অন্যান্য হৃদরোগের কারণে আরও ৩ দশমিক ৬৭ শতাংশ মৃত্যুর তথ্য পাওয়া যায়।
অর্থাৎ, গড়ে প্রতি পাঁচটি মৃত্যুর একটি হৃদরোগজনিত—এই চিত্রই সমস্যাটির ব্যাপকতা বোঝাতে যথেষ্ট।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যও বিশ্বব্যাপী হৃদরোগের ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে। হৃদ্যন্ত্র ও রক্তনালির রোগ বিশ্বে মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ। নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে এর অভিঘাত আরও বেশি, কারণ এসব দেশে রোগ প্রতিরোধ, প্রাথমিক শনাক্তকরণ, দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা এবং জরুরি হৃদরোগ ব্যবস্থাপনার সুযোগ অনেক ক্ষেত্রে সীমিত।
বাংলাদেশে সমস্যা আরও জটিল হয়ে উঠছে, কারণ সংক্রামক রোগের পাশাপাশি অসংক্রামক রোগের বোঝাও দ্রুত বাড়ছে। হৃদরোগ, স্ট্রোক, ডায়াবেটিস, ক্যানসারসহ অসংক্রামক রোগ এখন জাতীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ সৃষ্টি করছে।
হৃদরোগের ঝুঁকি শুধু বয়স্কদের নয়
একসময় হৃদরোগকে মূলত বয়স্কদের রোগ হিসেবে দেখা হতো। কিন্তু সেই ধারণা এখন আর যথেষ্ট নয়। তরুণদের মধ্যেও উচ্চ রক্তচাপ, স্থূলতা, ডায়াবেটিস, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা এবং ধূমপানের প্রবণতা বাড়ছে।
২০১৮ সালের বাংলাদেশ এনসিডি স্টেপস সার্ভের তথ্য অনুযায়ী, ১৮ থেকে ৩৯ বছর বয়সী জনগোষ্ঠীর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত। অর্থাৎ, তরুণ বয়সেই হৃদরোগের বীজ তৈরি হচ্ছে। এই বয়সে উচ্চ রক্তচাপ শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে পরবর্তী জীবনে হৃদরোগ, স্ট্রোক, কিডনি রোগসহ বিভিন্ন জটিলতার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
তরুণদের জীবনযাত্রার পরিবর্তন এই পরিস্থিতির অন্যতম কারণ। দীর্ঘ সময় বসে থাকা, নিয়মিত ব্যায়ামের অভাব, অতিরিক্ত লবণ ও চিনি গ্রহণ, ফাস্টফুড ও প্রক্রিয়াজাত খাবারের ওপর নির্ভরতা, কোমল পানীয় গ্রহণ, পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব এবং দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ—সবকিছু মিলিয়ে হৃদ্স্বাস্থ্যের জন্য একটি প্রতিকূল পরিবেশ তৈরি হচ্ছে।
তাই হৃদরোগ প্রতিরোধের উদ্যোগকে শুধু প্রবীণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। শিশু-কিশোর ও তরুণদের স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনে অভ্যস্ত করে তোলাই হতে পারে দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর কৌশলগুলোর একটি।
উচ্চ রক্তচাপ: নীরব বিপদের বড় কারণ
উচ্চ রক্তচাপকে প্রায়ই ‘নীরব ঘাতক’ বলা হয়। কারণ অনেক মানুষের ক্ষেত্রেই উচ্চ রক্তচাপের কোনো সুস্পষ্ট উপসর্গ থাকে না। ব্যক্তি নিজেকে সুস্থ মনে করলেও দীর্ঘদিনের অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ ধীরে ধীরে হৃদ্যন্ত্র, মস্তিষ্ক, কিডনি ও রক্তনালির ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে।
হৃদরোগ প্রতিরোধে তাই শুধু হাসপাতালভিত্তিক চিকিৎসা বাড়ালেই হবে না; মানুষের দোরগোড়ায় নিয়মিত রক্তচাপ মাপার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
বিশ্ব হার্ট দিবস উপলক্ষে ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ গবেষণা ও অ্যাডভোকেসি প্রতিষ্ঠান প্রজ্ঞা (প্রগতির জন্য জ্ঞান) আয়োজিত এক ওয়েবিনারে বিশেষজ্ঞরা তরুণদের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি মোকাবিলায় স্বাস্থ্য বাজেট বাড়ানো, রোগ শনাক্তকরণ, নিয়মিত চিকিৎসা এবং প্রয়োজনীয় ওষুধের সরবরাহ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
বিশেষজ্ঞদের বক্তব্যের মূল বার্তা স্পষ্ট—উচ্চ রক্তচাপ শনাক্ত করার পর চিকিৎসা শুরু করাই যথেষ্ট নয়। রোগী যেন নিয়মিত চিকিৎসার আওতায় থাকেন এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ গ্রহণ অব্যাহত রাখতে পারেন, সেই ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে।
হৃদরোগ প্রতিরোধে স্ট্যাটিনের ভূমিকা
হৃদরোগের চিকিৎসা শুধু হাসপাতালের বেড, রিং বা বাইপাস সার্জারির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। অনেক রোগীর ক্ষেত্রে হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফেরার পর শুরু হয় দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
স্ট্যাটিন এ ক্ষেত্রে বহুল ব্যবহৃত ওষুধগুলোর একটি। রক্তের ক্ষতিকর এলডিএল কোলেস্টেরল কমানোর পাশাপাশি হৃদ্রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ভবিষ্যতে আবার হার্ট অ্যাটাক বা অন্যান্য কার্ডিওভাসকুলার জটিলতার ঝুঁকি কমাতে চিকিৎসকের পরামর্শে স্ট্যাটিন ব্যবহার করা হয়।
কিন্তু বাংলাদেশে এ ওষুধ ব্যবহারের ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে।
‘গ্লোবাল হার্ট’ সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি গবেষণায় ২০১৮ সালের বাংলাদেশ স্টেপস জরিপের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, আগে কার্ডিওভাসকুলার রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে মাত্র ২৩ দশমিক ৫ শতাংশ স্ট্যাটিন ব্যবহার করছিলেন। অর্থাৎ গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত এই গোষ্ঠীর প্রায় ৭৭ শতাংশ স্ট্যাটিন ব্যবহার করছিলেন না।
এখানে অবশ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা দরকার। গবেষণাটিতে জাতীয় প্রতিনিধিত্বশীল জরিপের উপাত্ত থেকে হৃদ্রোগের ইতিহাস থাকা একটি ছোট উপগোষ্ঠী আলাদাভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ফলে ২৩ দশমিক ৫ শতাংশকে বাংলাদেশের সব হৃদ্রোগীর বর্তমান স্ট্যাটিন ব্যবহারের হার হিসেবে সরাসরি ব্যাখ্যা করা ঠিক হবে না। গবেষণাটির গুরুত্ব হলো—হৃদ্রোগের পর দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধমূলক চিকিৎসা গ্রহণে বড় ধরনের ঘাটতির একটি চিত্র এতে পাওয়া যায়।
গবেষণার অন্যতম গবেষক অধ্যাপক ডা. সোহেল রেজা চৌধুরীর বক্তব্য অনুযায়ী, স্ট্যাটিন শুধু রক্তে কোলেস্টেরল বেশি থাকা ব্যক্তিদের জন্য নয়। নির্দিষ্ট ঝুঁকি থাকা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও চিকিৎসকের মূল্যায়নের ভিত্তিতে এ ধরনের ওষুধ ব্যবহারের সুপারিশ থাকতে পারে।
তবে কোনো ব্যক্তির স্ট্যাটিন প্রয়োজন কি না, কোন মাত্রায় প্রয়োজন এবং কতদিন ব্যবহার করতে হবে—এসব সিদ্ধান্ত চিকিৎসকের পরামর্শ ও ব্যক্তির সামগ্রিক হৃদ্রোগের ঝুঁকি বিবেচনা করেই নিতে হবে। নিজে থেকে ওষুধ শুরু বা বন্ধ করা নিরাপদ নয়।
১০ জনে একজনের উল্লেখযোগ্য কার্ডিওভাসকুলার ঝুঁকি
২০২৬ সালের এপ্রিলে প্রকাশিত একটি গবেষণায় বাংলাদেশের ৪০ থেকে ৬৯ বছর বয়সী জনগোষ্ঠীর কার্ডিওভাসকুলার ঝুঁকি নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণাটিতে দেখা যায়, এই বয়সী মানুষের প্রায় ১০ দশমিক ৩ শতাংশ আগামী ১০ বছরে কার্ডিওভাসকুলার রোগে আক্রান্ত হওয়ার ১০ শতাংশ বা তার বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন—রক্ত পরীক্ষাভিত্তিক ঝুঁকি হিসাবের ক্ষেত্রে।
রক্ত পরীক্ষা ছাড়া বয়স, লিঙ্গ, রক্তচাপসহ অন্যান্য তথ্য ব্যবহার করে হিসাব করলে হারটি ছিল ৯ দশমিক ২ শতাংশ।
এখানে ‘কার্ডিওভাসকুলার রোগ’ বলতে শুধু হার্ট অ্যাটাক নয়; স্ট্রোকসহ হৃদ্যন্ত্র ও রক্তনালির বিভিন্ন রোগকেও বোঝানো হয়েছে।
এই পরিসংখ্যান আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়—আমরা কি রোগ হওয়ার পর চিকিৎসা করব, নাকি রোগ হওয়ার আগেই ঝুঁকি কমানোর চেষ্টা করব?
জনস্বাস্থ্যের দৃষ্টিকোণ থেকে দ্বিতীয় পথটিই অধিক গুরুত্বপূর্ণ। কারণ উচ্চ রক্তচাপ, ধূমপান, স্থূলতা, অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস, ক্ষতিকর কোলেস্টেরল এবং শারীরিক নিষ্ক্রিয়তার মতো অনেক ঝুঁকি পরিবর্তনযোগ্য।
রিং বা বাইপাসের পরও চিকিৎসা শেষ নয়
হার্ট অ্যাটাকের পর স্টেন্ট বসানো কিংবা বাইপাস সার্জারি করা হলে অনেক রোগী মনে করেন, চিকিৎসা শেষ। বাস্তবে বিষয়টি তার বিপরীত।
স্টেন্ট বা বাইপাস মূল সমস্যার একটি গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা হতে পারে, কিন্তু ভবিষ্যতে নতুন করে হৃদ্রোগ বা স্ট্রোকের ঝুঁকি পুরোপুরি শেষ হয়ে যায় না। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী দীর্ঘমেয়াদি ওষুধ, খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন, নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম, ধূমপান পরিহার এবং অন্যান্য ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এই জায়গায় রোগীর সচেতনতা বড় ভূমিকা পালন করে। হাসপাতালে চিকিৎসা পাওয়ার পাশাপাশি বাড়ি ফেরার পর চিকিৎসা অব্যাহত রাখার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।
জাতীয় হৃদ্রোগ রেজিস্ট্রি এখন সময়ের দাবি
বাংলাদেশে হৃদ্রোগের প্রকৃত চিত্র নির্ভুলভাবে বুঝতে সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি হলো সমন্বিত জাতীয় তথ্যের ঘাটতি। বর্তমানে অনেক তথ্য হাসপাতালভিত্তিক। কিন্তু দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কমিউনিটি পর্যায়ে কত মানুষ হৃদ্রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন, কতজন মারা যাচ্ছেন, কতজন দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা নিচ্ছেন—এসব বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ জাতীয় তথ্য সীমিত।
একটি জাতীয় হৃদ্রোগ রেজিস্ট্রি থাকলে রোগের প্রকোপ, বয়সভিত্তিক ঝুঁকি, চিকিৎসার ধরন, মৃত্যুহার এবং চিকিৎসার ফলাফল সম্পর্কে অনেক বেশি নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া সম্ভব।
নীতিনির্ধারকদের জন্যও এটি গুরুত্বপূর্ণ। কোথায় কত হাসপাতাল প্রয়োজন, কোথায় কার্ডিয়াক সেবা বাড়াতে হবে, কোন ওষুধের চাহিদা কত, কোন জনগোষ্ঠী বেশি ঝুঁকিতে—এসব সিদ্ধান্ত তথ্যের ভিত্তিতে নেওয়া সহজ হবে।
চিকিৎসা শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক হলে চলবে না
বাংলাদেশে হৃদরোগের চিকিৎসায় বিশেষায়িত সক্ষমতা বাড়লেও তা এখনো প্রয়োজনের তুলনায় সীমিত। রাজধানী ও বড় শহরের বাইরে জরুরি হৃদরোগ চিকিৎসা সহজলভ্য করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
হার্ট অ্যাটাকের ক্ষেত্রে সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রোগীকে দ্রুত শনাক্ত করা, প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া এবং প্রয়োজন হলে দ্রুত উচ্চতর চিকিৎসাকেন্দ্রে পাঠানোর ব্যবস্থা থাকতে হবে।
উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে অক্সিজেন, প্রয়োজনীয় জরুরি ওষুধ, প্রশিক্ষিত জনবল এবং দ্রুত রেফারেল ব্যবস্থা শক্তিশালী করা গেলে অনেক রোগীর জীবন রক্ষা করা সম্ভব হতে পারে।
কার্ডিয়াক চিকিৎসাকে শুধু বড় বেসরকারি হাসপাতালকেন্দ্রিক রাখলে দেশের বিপুল জনগোষ্ঠী প্রয়োজনীয় সেবা থেকে বঞ্চিত হবে। সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে হৃদ্রোগ প্রতিরোধ এবং জরুরি ব্যবস্থাপনা আরও শক্তিশালী করা জরুরি।
স্বাস্থ্য বাজেটে প্রতিরোধকে অগ্রাধিকার দিতে হবে
হৃদরোগের চিকিৎসা ব্যয়বহুল। একজন রোগীর স্টেন্ট, বাইপাস, দীর্ঘমেয়াদি ওষুধ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং পুনর্বাসনের খরচ একটি পরিবারের ওপর বড় আর্থিক চাপ তৈরি করতে পারে।
অন্যদিকে উচ্চ রক্তচাপ শনাক্ত করা, নিয়মিত রক্তচাপ মাপা, প্রয়োজনীয় ওষুধ নিশ্চিত করা, ধূমপানবিরোধী কর্মসূচি, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসে উৎসাহ দেওয়া এবং শারীরিক কর্মকাণ্ড বাড়াতে তুলনামূলকভাবে কম ব্যয়ে বড় জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছানো সম্ভব।
এ কারণেই স্বাস্থ্য বাজেটে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
গবেষণা ও অ্যাডভোকেসি প্রতিষ্ঠান প্রজ্ঞা (প্রগতির জন্য জ্ঞান) আয়োজিত সাম্প্রতিক ওয়েবিনারে বক্তারা স্বাস্থ্য বাজেটে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁদের আলোচনায় উঠে এসেছে—স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি সেই অর্থের একটি কার্যকর অংশ রোগ প্রতিরোধ, প্রয়োজনীয় ওষুধ, পরীক্ষা-নিরীক্ষার সরঞ্জাম এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ব্যয় করা জরুরি।
শুধু নতুন ভবন নির্মাণ করলেই স্বাস্থ্যব্যবস্থা শক্তিশালী হয় না। প্রয়োজনীয় ওষুধ, আধুনিক পরীক্ষার সরঞ্জাম, প্রশিক্ষিত জনবল এবং যন্ত্রপাতির রক্ষণাবেক্ষণও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় ওষুধের ধারাবাহিকতা জরুরি
দীর্ঘমেয়াদি রোগের ক্ষেত্রে চিকিৎসা শুরু করানো যতটা গুরুত্বপূর্ণ, চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করাও ততটাই জরুরি।
উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস বা হৃদ্রোগে আক্রান্ত একজন মানুষকে বছরের পর বছর ওষুধ গ্রহণ করতে হতে পারে। ওষুধের দাম, চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার খরচ, পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যয় এবং স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের দূরত্ব—সবকিছুই চিকিৎসা অব্যাহত রাখার ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
তাই প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে প্রয়োজনীয় ওষুধের নিয়মিত সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং রোগীদের ফলোআপ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা জরুরি।
জীবনযাপনের পরিবর্তনই প্রথম প্রতিরক্ষা
হৃদরোগ প্রতিরোধে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ প্রয়োজন, কিন্তু ব্যক্তির ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ।
স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস হৃদ্স্বাস্থ্যের জন্য অন্যতম ভিত্তি। অতিরিক্ত লবণ, চিনি এবং ক্ষতিকর চর্বি কমিয়ে শাকসবজি, ফলমূল, পূর্ণ শস্য, ডাল ও অন্যান্য পুষ্টিকর খাবারের পরিমাণ বাড়ানো প্রয়োজন।
নিয়মিত শারীরিক কর্মকাণ্ডও গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘ সময় বসে থাকার অভ্যাস কমানো এবং বয়স ও শারীরিক সক্ষমতা অনুযায়ী নিয়মিত হাঁটা বা ব্যায়ামের অভ্যাস গড়ে তোলা যেতে পারে।
ধূমপান হৃদ্স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। তাই শুধু ধূমপানকারী ব্যক্তির ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের ওপর বিষয়টি ছেড়ে না দিয়ে তামাক নিয়ন্ত্রণে কার্যকর সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ আরও শক্তিশালী করতে হবে।
পর্যাপ্ত ঘুম এবং মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণও গুরুত্বপূর্ণ। আধুনিক জীবনের প্রতিযোগিতা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে মানসিক চাপ সম্পূর্ণ এড়িয়ে চলা সম্ভব না হলেও তা মোকাবিলার স্বাস্থ্যকর উপায় গড়ে তোলা দরকার।
পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও হৃদ্স্বাস্থ্যের শিক্ষা
হৃদরোগ প্রতিরোধের শিক্ষা শুধু হাসপাতাল বা চিকিৎসকের চেম্বারে সীমাবদ্ধ থাকলে হবে না।
স্কুল-কলেজ থেকেই স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক কর্মকাণ্ড, ধূমপানের ক্ষতি এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার গুরুত্ব সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের জানানো যেতে পারে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে খেলাধুলা ও শারীরিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন।
পরিবারেও পরিবর্তন জরুরি। শিশুর খাদ্যাভ্যাস, ঘুম, শারীরিক কর্মকাণ্ড এবং স্ক্রিন ব্যবহারের ওপর অভিভাবকদের সচেতন নজর থাকতে হবে।
তরুণদের কাছে স্বাস্থ্যবার্তা পৌঁছে দিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের শক্তিকেও কাজে লাগানো যেতে পারে। তবে প্রচারণা হতে হবে সহজবোধ্য, বৈজ্ঞানিক তথ্যনির্ভর এবং ভয়ভীতি সৃষ্টি না করে আচরণগত পরিবর্তনে উৎসাহিত করার মতো।
জরুরি লক্ষণ সম্পর্কে সচেতনতা প্রয়োজন
হৃদরোগের ক্ষেত্রে সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বুকে চাপ বা ব্যথা, বুকের অস্বস্তি, শ্বাসকষ্ট, অস্বাভাবিক ঘাম, বমিভাব, মাথা ঘোরা কিংবা হঠাৎ দুর্বলতার মতো উপসর্গ দেখা দিলে বিষয়টি অবহেলা করা উচিত নয়।
বিশেষ করে হার্ট অ্যাটাকের সম্ভাব্য লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত জরুরি চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন। অনেক সময় রোগী বা পরিবারের সদস্যরা গ্যাস, বদহজম কিংবা সাধারণ দুর্বলতা ভেবে সময় নষ্ট করেন। এই বিলম্ব বিপজ্জনক হতে পারে।
তবে উপসর্গ ব্যক্তি ও পরিস্থিতিভেদে ভিন্ন হতে পারে। তাই সন্দেহজনক অবস্থায় দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।
প্রয়োজন সমন্বিত জাতীয় কর্মপরিকল্পনা
হৃদরোগের বিরুদ্ধে লড়াই কোনো একটি মন্ত্রণালয়, হাসপাতাল বা চিকিৎসকের একার পক্ষে সম্ভব নয়। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, চিকিৎসক সংগঠন, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিক সমাজকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
এই কর্মপরিকল্পনায় থাকতে পারে—
* জাতীয় পর্যায়ে হৃদ্রোগের নির্ভরযোগ্য রেজিস্ট্রি তৈরি;
* প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় নিয়মিত রক্তচাপ ও কার্ডিওভাসকুলার ঝুঁকি শনাক্তকরণ;
* উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসের নিয়মিত চিকিৎসা নিশ্চিত করা;
* প্রয়োজনীয় ওষুধের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ;
* জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে জরুরি হৃদরোগ ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা;
* ধূমপান ও তামাক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম জোরদার করা;
* স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ও শারীরিক কর্মকাণ্ডে জনসচেতনতা বাড়ানো;
* শিশু-কিশোর ও তরুণদের জন্য প্রতিরোধমূলক কর্মসূচি নেওয়া;
* গবেষণা ও জাতীয় স্বাস্থ্যতথ্য ব্যবস্থার উন্নয়ন;
* এবং হৃদরোগের চিকিৎসার পাশাপাশি পুনর্বাসন ও দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যা নিশ্চিত করা।
জনস্বাস্থ্য আন্দোলন ছাড়া টেকসই পরিবর্তন সম্ভব নয়
হৃদরোগ প্রতিরোধকে শুধু চিকিৎসা খাতের বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি একই সঙ্গে সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং উন্নয়নগত বিষয়।
একজন শ্রমজীবী মানুষ যদি নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতে না পারেন, একজন কৃষক যদি প্রয়োজনীয় ওষুধ কিনতে না পারেন, একজন তরুণ যদি স্বাস্থ্যকর খাবার ও ব্যায়ামের সুযোগ না পান কিংবা একজন রোগী যদি জেলা পর্যায়ে জরুরি হৃদরোগ চিকিৎসা না পান—তাহলে ব্যক্তিগত সচেতনতার পাশাপাশি কাঠামোগত সমস্যাও বিবেচনায় নিতে হবে।
তাই হৃদরোগ প্রতিরোধে সামাজিক আন্দোলন প্রয়োজন। মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করার পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য, সাশ্রয়ী এবং বৈষম্যহীন করার উদ্যোগ নিতে হবে।
শেষ কথা
বিশ্ব হার্ট দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়—হৃদরোগ হঠাৎ করে আসে না; অনেক ক্ষেত্রেই এর ঝুঁকি দীর্ঘদিন ধরে তৈরি হয়। উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, ধূমপান, স্থূলতা, অনিয়ন্ত্রিত কোলেস্টেরল, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা—এসব ঝুঁকিকে যত আগে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে, হৃদরোগের বোঝাও তত কমানো সম্ভব।
বাংলাদেশে হৃদরোগ এখন শুধু চিকিৎসকের চেম্বারের বিষয় নয়; এটি জাতীয় জনস্বাস্থ্যের বড় চ্যালেঞ্জ। তাই রোগী হাসপাতালে আসার পর চিকিৎসা করার পাশাপাশি রোগী যেন হাসপাতালে আসার আগেই ঝুঁকি সম্পর্কে জানতে পারেন, সেটিই হওয়া উচিত ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্যনীতির অন্যতম লক্ষ্য।
হৃদরোগ প্রতিরোধে বিনিয়োগ মানে শুধু একটি রোগ কমানো নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের কর্মক্ষমতা, পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তা, উৎপাদনশীলতা এবং দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন।
আর তাই যে বার্তাটি হোক স্পষ্ট—হৃদরোগের চিকিৎসার পাশাপাশি প্রতিরোধকে জাতীয় অগ্রাধিকার দিতে হবে। ব্যক্তির সচেতনতা, পরিবারের সহযোগিতা, সমাজের অংশগ্রহণ এবং রাষ্ট্রের কার্যকর নীতি—এই চারটি স্তম্ভ একসঙ্গে শক্তিশালী হলেই হৃদরোগের বিরুদ্ধে টেকসই লড়াই সম্ভব।
হৃদযন্ত্রের যত্ন নেওয়ার জন্য কোনো নির্দিষ্ট দিনের অপেক্ষা নয়; আজ থেকেই শুরু হোক স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের অভ্যাস। কারণ একটি সুস্থ হৃদয় শুধু একজন মানুষের জীবন নয়, একটি সুস্থ পরিবার ও কর্মক্ষম সমাজেরও ভিত্তি।
#
সৈয়দ আমিরুজ্জামান
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট;
বিশেষ প্রতিনিধি, দ্য ফিনান্সিয়াল পোস্ট (ইংরেজি দৈনিক) ও সাপ্তাহিক নতুনকথা;
সম্পাদক, আরপি নিউজ;
কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, জাতীয় কৃষক সমিতি;
‘৯০-এর মহান গণঅভ্যুত্থানের সংগঠক ও সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ ছাত্রমৈত্রী।
সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ খেতমজুর ইউনিয়ন।
সাধারণ সম্পাদক, মাগুরছড়ার গ্যাস সম্পদ ও পরিবেশ ধ্বংসের ক্ষতিপূরণ আদায় জাতীয় কমিটি।
প্রাক্তন সভাপতি, বাংলাদেশ আইন ছাত্র ফেডারেশন।
E-mail : syedzaman.62@gmail.com
WhatsApp : 01716599589
মুঠোফোন: ০১৭১৬৫৯৯৫৮৯
Bikash number : +8801716599589 (personal)

সম্পাদক : সৈয়দ আমিরুজ্জামান
ইমেইল : rpnewsbd@gmail.com
মোবাইল +8801716599589
৩১/এফ, তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০।
© RP News 24.com 2013-2020
Design and developed by ওয়েব নেষ্ট বিডি