গোটা একটা প্রজন্ম বই থেকে ক্রমেই দূরে সরে যাচ্ছে

প্রকাশিত: ৫:৪৬ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২৫, ২০২৬

গোটা একটা প্রজন্ম বই থেকে ক্রমেই দূরে সরে যাচ্ছে

Manual2 Ad Code

ঐশ্বর্য রায় |

গোটা একটা প্রজন্ম বই থেকে ক্রমেই দূরে সরে যাচ্ছে। তাদের আড্ডায় নেই কবিতা, নেই গল্প, নেই উপন্যাসের চরিত্র নিয়ে তর্ক; নেই সেই নির্ভেজাল সাহিত্যচর্চা, যার ভেতর দিয়ে মানুষ একটু একটু করে মানুষ হয়ে ওঠে। পাঠ্যপুস্তকের বাইরে বই পড়া যেন আজ অনেকের কাছেই অপ্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছে।

অথচ বই কেবল কিছু অক্ষরের সমষ্টি নয়—বই মানুষের ভেতরে আরেকটি পৃথিবী তৈরি করে।

শরৎচন্দ্রের শ্রীকান্ত পড়ে আমরা শুধু একজন ভবঘুরের গল্প পড়ি না; তার চোখ দিয়ে পৃথিবীকে নতুন করে দেখতে শিখি। দেবদাসের পতনের ভেতর দিয়ে মানুষের দুর্বলতা বুঝি, সব্যসাচীর মধ্যে দেখি অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর এক দুর্দমনীয় আকাঙ্ক্ষা। রবীন্দ্রনাথের কাবুলিওয়ালা আমাদের শেখায়—দেশ, ভাষা, ধর্মের বহু ঊর্ধ্বে একজন পিতার হৃদয় আরেকজন পিতার হৃদয়কে চিনতে পারে। পোস্টমাস্টার-এর রতনের নিঃসঙ্গতা আমাদের নিজের অজান্তেই বুকের ভেতর কোথাও ব্যথা জাগায়।

বিভূতিভূষণের অপু-দুর্গার সঙ্গে পথ চলতে গিয়ে আমরা বুঝি, দারিদ্র্যের মধ্যেও শৈশব কত অপার সুন্দর হতে পারে। পথের ধারে কাশফুল, বৃষ্টিভেজা দুপুর, দূরের রেলগাড়ির শব্দ—এসব তখন আর নিছক দৃশ্য থাকে না; আমাদের নিজেদের স্মৃতির অংশ হয়ে যায়।

Manual7 Ad Code

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কুবের কিংবা কপিলার জীবন আমাদের সমাজের আরেক অন্ধকার মুখোমুখি দাঁড় করায়। তারাশঙ্করের শ্রীকান্ত? না—তারাশঙ্করের হাঁসুলি বাঁকের মানুষগুলো আমাদের নিয়ে যায় এমন এক জীবনের কাছে, যে জীবন শহুরে আরামের আড়ালে আমরা প্রায় ভুলেই গেছি।

Manual1 Ad Code

আর রবীন্দ্রনাথের ‘ঘরে বাইরে’-র নিখিলেশ কিংবা সন্দীপকে পড়তে গিয়ে আমরা শুধু চরিত্র দেখি না; মানুষের আদর্শ, আবেগ, মোহ, রাজনীতি ও আত্মপ্রবঞ্চনার জটিলতাও বুঝতে শিখি।

এই চরিত্রগুলো আমাদের পাঠ্যসূচির কয়েকটি নামমাত্র নয়। তারা আমাদের নীরব শিক্ষক। তারা আমাদের শেখায়—অন্যের চোখ দিয়ে পৃথিবীকে দেখতে হয়; অন্যের কষ্টকে নিজের কষ্টের মতো অনুভব করতে হয়; মানুষের ভুলকে বুঝতে হয়; সৌন্দর্যের সামনে থমকে দাঁড়াতে হয়।

যে প্রজন্ম রতনের অপেক্ষা বোঝে না, অপুর বিস্ময় বোঝে না, কাবুলিওয়ালার পিতৃত্ব অনুভব করে না, নিখিলেশের মানবিকতা নিয়ে ভাবে না—সে পৃথিবীকে কীভাবে দেখবে?

আজ আমরা অবাক হয়ে দেখি, কথাবার্তায় রুক্ষতা বাড়ছে, সহনশীলতা কমছে, ভিন্নমত শুনলেই ক্রোধ, সামান্য মতপার্থক্যেই অপমান। মানুষের কষ্টের জায়গায় হাসি, যুক্তির জায়গায় চিৎকার, সৌন্দর্যের জায়গায় কেবল প্রদর্শন।

এগুলো কি বিচ্ছিন্ন ঘটনা?

হয়তো নয়।

কারণ সাহিত্য আমাদের ভেতরের মানুষটিকে ধীরে ধীরে নির্মাণ করে। একটি ভালো বই পড়ার পর আমরা আগের মানুষটি থাকি না। কখনো একটু বেশি কোমল হই, কখনো একটু বেশি প্রশ্ন করতে শিখি, কখনো অপরিচিত একজন মানুষের দুঃখও নিজের বলে মনে হয়।

তাই সাহিত্য থেকে দূরে সরে যাওয়া শুধু বই না পড়ার অভ্যাস নয়—এটি মানুষের অনুভব করার ক্ষমতা সংকুচিত হওয়ারও লক্ষণ হতে পারে।

Manual2 Ad Code

আর সবচেয়ে বিস্ময়কর—এই সময়ে যখন তরুণদের হাতে বইয়ের বদলে অগণিত ক্ষণস্থায়ী বিনোদন, যখন দীর্ঘ পাঠের ধৈর্য ক্রমশ কমছে, যখন সাহিত্যচর্চা আড্ডা থেকে হারিয়ে যাচ্ছে—তখনও আমাদের লেখকসমাজের একাংশ নিশ্চিন্ত কণ্ঠে বলে, ‘কোনো ক্রাইসিস নেই।’

আশ্চর্য!

তাহলে সংকট আর কাকে বলে?

যেদিন একটি প্রজন্ম বইয়ের সঙ্গে বন্ধুত্ব হারায়, সেদিন শুধু পাঠক কমে না—একটি সমাজ তার কল্পনার একটি জানালা বন্ধ করে দেয়।

যেদিন একটি প্রজন্ম বইয়ের বদলে শুধু শব্দের ভিড়ে বড় হয়, কবিতার বদলে কেবল উত্তেজনা খোঁজে, আর চিন্তার বদলে কেবল প্রতিক্রিয়া জানায়—সেদিন সংকটটা শুধু সাহিত্যের থাকে না; সংকটটা সমাজের মননে গিয়ে পৌঁছায়।

Manual5 Ad Code

সাহিত্যহীনতা কখনো হঠাৎ করে কোনো সমাজকে ধ্বংস করে না। ধীরে ধীরে মানুষের ভেতর থেকে কোমলতা, কল্পনা ও বিবেচনাবোধ সরিয়ে নেয়। তারপর একদিন আমরা বিস্মিত হয়ে দেখি—মানুষ আছে, কিন্তু মনুষ্যত্ব ক্রমেই অচেনা হয়ে যাচ্ছে।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ