সীমানা ও পানি নিষ্কাশন নিয়ে বিরোধ, দাড়ি ছিঁড়ে ফেলার হুমকি

প্রকাশিত: ৩:২৮ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১, ২০২৬

সীমানা ও পানি নিষ্কাশন নিয়ে বিরোধ, দাড়ি ছিঁড়ে ফেলার হুমকি

Manual6 Ad Code
  • শ্রীমঙ্গলে মুসলিম পরিবারের দোকানে হামলার অভিযোগ, নারীসহ আহত ২

নিজস্ব প্রতিবেদক | মৌলভীবাজার, ০১ অক্টোবর ২০২৬ : মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে একটি মুসলিম পরিবারের দোকানে হামলা, নারীকে মারধর, শ্লীলতাহানি, টাকা ও মালামাল নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে পরিবারের প্রবীণ সদস্যকে দাড়ি ছিঁড়ে ফেলার হুমকি এবং দীর্ঘদিন ধরে বসতবাড়ি থেকে উচ্ছেদের চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।

২৬ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় উপজেলার আশীদ্রোন ইউনিয়নের হোসনাবাদ চা বাগানে এ ঘটনা ঘটে বলে শ্রীমঙ্গল থানায় দেওয়া লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ঘটনায় মর্জিনা বেগম (২৫) চারজনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা আরও চার-পাঁচজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ দিয়েছেন। তবে প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত অভিযোগটি মামলা হিসেবে রেকর্ড হয়নি। পুলিশ জানিয়েছে, অভিযোগটি তদন্ত করা হচ্ছে।

অভিযোগপত্র ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বসতঘরের চালের বৃষ্টির পানি পড়া এবং সীমানা নিয়ে দুই পরিবারের মধ্যে বিরোধের সূত্রপাত। ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, এ বিরোধকে কেন্দ্র করে তাদের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে অসদাচরণ করা হচ্ছিল এবং বসতবাড়ি থেকে উচ্ছেদের চেষ্টা করা হচ্ছিল।

মর্জিনা বেগমের অভিযোগ, একপর্যায়ে তাঁর শ্বশুর মহরম আলীকে দাড়ি ছিঁড়ে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়। ঘটনার দিন বৃষ্টির পানি চলাচল ও সীমানা নিয়ে কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে প্রতিপক্ষের লোকজন দেশীয় অস্ত্র নিয়ে তাঁদের মুদি ও দর্জির দোকানে হামলা চালায়।

লিখিত অভিযোগে মর্জিনা বেগম দাবি করেন, হামলার সময় তাঁর জামাকাপড় টেনে শ্লীলতাহানি করা হয়। তাঁকে কাস্তে দিয়ে আঘাত এবং পেটে লাথি মারা হয়। স্ত্রীকে রক্ষা করতে এগিয়ে গেলে সম্প্রতি অ্যাপেন্ডিসাইটিসের অস্ত্রোপচার করা তাঁর স্বামী সোহেল মিয়াকেও মারধর করা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, হামলাকারীরা দোকানের ক্যাশ বাক্স থেকে ৫০ হাজার টাকা এবং প্রায় ১০ হাজার টাকা মূল্যের অর্ডার করা পোশাক নিয়ে যায়। এ ছাড়া দোকানে আরও প্রায় ১০ হাজার টাকার ক্ষতি করা হয়েছে বলে দাবি করেন ভুক্তভোগীরা।

চিৎকার শুনে স্থানীয়রা এগিয়ে এলে হামলাকারীরা প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে চলে যায় বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

পরে আহত মর্জিনা বেগম ও সোহেল মিয়া শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা নেন বলে জানা গেছে। তাঁদের আঘাতের ধরন ও চিকিৎসার বিস্তারিত তথ্য চিকিৎসা নথির ভিত্তিতে স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।

অভিযুক্তদের বক্তব্য

অভিযোগে অভিযুক্ত মঞ্জু রাজবল্লব ও তাঁর স্ত্রী মহরম আলীকে দাড়ি ছিঁড়ে ফেলার হুমকি এবং দোকান থেকে টাকা ও মালামাল নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

মঞ্জু রাজবল্লব বলেন, তাঁদের মধ্যে মূল বিরোধ সীমানা ও বৃষ্টির পানি নিয়ে। তাঁর দাবি, উঁচু জায়গা থেকে নিচু জায়গায় বৃষ্টির পানি গড়িয়ে আসা স্বাভাবিক। পাশের বড় পাহাড়ি এলাকা থেকে আসা পানি বন্ধ করাও সম্ভব নয়। তবে মহরম আলীর ঘরের পানি তাঁদের জন্য সমস্যার সৃষ্টি করছে বলে দাবি করেন তিনি।

স্থানীয়ভাবে বিরোধ মীমাংসার জন্য পঞ্চায়েতের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে সবার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। পঞ্চায়েতের সদস্য খোকন মিয়া জানান, বিষয়টি স্থানীয়ভাবে সমাধানের চেষ্টা করা হবে।

বাগান কর্তৃপক্ষের বক্তব্য

হোসনাবাদ টি গার্ডেনের দায়িত্বপ্রাপ্ত ম্যানেজার আমিনুল ইসলাম বলেন, বাগানে হিন্দু, মুসলিম ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের মানুষ মিলেমিশে বসবাস করছেন এবং কর্তৃপক্ষ সবাইকে সমানভাবে দেখে।

তিনি জানান, মহরম আলী তাঁর কাছে লিখিত অভিযোগ করেছিলেন। পরে বিষয়টি স্থানীয় পঞ্চায়েতকে দেখতে দেওয়া হয়। পঞ্চায়েতের পক্ষ থেকে সমাধানের চেষ্টা করা হলেও দুই পক্ষের অনড় অবস্থানের কারণে তা সম্ভব হয়নি।

আমিনুল ইসলাম বলেন, সংশ্লিষ্ট জায়গার মালিকানা বাগান কর্তৃপক্ষের। কর্তৃপক্ষের অনুমতি ও সদিচ্ছার কারণেই পরিবারগুলো সেখানে বসবাস ও জায়গা ব্যবহার করছে। নিজেদের মধ্যে বিরোধ অব্যাহত থাকলে এর পরিণতি সংশ্লিষ্টদেরই ভোগ করতে হবে।

সাম্প্রদায়িক বিরোধ, নাকি পারিবারিক সীমানা নিয়ে দ্বন্দ্ব?

ঘটনাটি নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে সাম্প্রদায়িক বিরোধের প্রশ্নও উঠেছে। তবে স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এলাকায় হিন্দু-মুসলিমদের মধ্যে সামগ্রিকভাবে স্বাভাবিক সামাজিক সম্পর্ক রয়েছে। তাঁদের ভাষ্য, বর্তমান বিরোধটি মূলত সংশ্লিষ্ট দুই পরিবারের মধ্যে সীমানা ও পানি নিষ্কাশনকে কেন্দ্র করে।

ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে আশপাশে প্রায় ৩০টি পরিবারের বসবাসের কথা বলা হয়েছে। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বাগানের বিভিন্ন এলাকায় আরও কয়েকটি মুসলিম পরিবার রয়েছে। তবে তারা পাশাপাশি নয়, বরং পাহাড়ি ও অপেক্ষাকৃত দূরবর্তী এলাকায় বিচ্ছিন্নভাবে বসবাস করে।

মহরম আলীর পরিবারের বসতবাড়ির আশপাশে হিন্দু পরিবারের বসতি তুলনামূলকভাবে কাছাকাছি বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।

Manual4 Ad Code

এদিকে স্থানীয় এক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে মঞ্জু রাজবল্লবের বিরুদ্ধে নিয়মিত নেশা করার এবং নেশাগ্রস্ত অবস্থায় বেপরোয়া আচরণের অভিযোগ করেন। তবে ওই ব্যক্তি ঘটনার সময় ঘটনাস্থলে ছিলেন না এবং অন্যদের কাছ থেকে বিষয়টি শুনেছেন বলে জানিয়েছেন। ফলে তাঁর এ বক্তব্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

পুলিশের তদন্ত

মর্জিনা বেগমের লিখিত অভিযোগ পাওয়ার পর শ্রীমঙ্গল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) দেলোয়ার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।

এসআই দেলোয়ার বলেন, তিনি ঘটনাস্থলে গিয়ে বিষয়টি তদন্ত করেছেন। তদন্তের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Manual5 Ad Code

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, অভিযোগটি বর্তমানে তদন্তাধীন। অভিযোগের সত্যতা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা তদন্তে পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Manual3 Ad Code

ঘটনায় হামলা, শ্লীলতাহানি, টাকা ও মালামাল নিয়ে যাওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে অভিযুক্ত পক্ষ এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বিরোধটিকে সীমানা ও বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনকেন্দ্রিক বলে দাবি করছে। ফলে অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে পুলিশি তদন্ত এবং সংশ্লিষ্ট নথি-প্রমাণ গুরুত্বপূর্ণ।

Manual4 Ad Code

দীর্ঘদিনের পানি নিষ্কাশন ও সীমানা-সংক্রান্ত বিরোধের পাশাপাশি বসবাসের পরিবেশ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে, তা নিরসনে বাগান কর্তৃপক্ষ, স্থানীয় পঞ্চায়েত ও প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলে স্থানীয়রা মনে করছেন।