চীনা কমিউনিস্ট পার্টির একশো পাঁচ বছর

প্রকাশিত: ১:৪৫ পূর্বাহ্ণ, জুন ২৬, ২০২৬

চীনা কমিউনিস্ট পার্টির একশো পাঁচ বছর

Manual1 Ad Code

সৈয়দ আমিরুজ্জামান |

‘একটি নির্দিষ্ট সংস্কৃতি (একটি মতাদর্শগত রূপ হিসেবে) হচ্ছে একটি নির্দিষ্ট সমাজের রাজনীতি ও অর্থনীতির প্রতিফলন, আবার সেই নির্দিষ্ট সমাজের রাজনীতি ও অর্থনীতির উপর বিরাট প্রভাব ও কার্যকারিতা বিস্তারকারী; অর্থনীতি হচ্ছে বুনিয়াদ, আর রাজনীতি হচ্ছে অর্থনীতির কেন্দ্রীভূত অভিব্যক্তি।’ -মাও সেতুং

চীনা কমিউনিস্ট পার্টির একশত পাঁচ বছর পূর্ণ হয়েছে এবার। দিবসটি উদ্‌যাপন উপলক্ষে সেজে উঠেছে সমগ্র চীন।

১৯২১-র ১ জুলাই সাংহাইয়ে পার্টির প্রথম কংগ্রেস থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কমিউনিস্ট পার্টি তৈরি হয়। বিগত একশ পাঁচ বছর চীনের ইতিহাসে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে পার্টি। পার্টি গঠনের ২৮ বছরের মাথায় বিপ্লবের মাধ্যমে গঠিত হয়েছে ‘নয়া চীন’। কমিউনিস্ট পার্টির গণ মুক্তি ফৌজ ১৯৪৯ সালে আমেরিকা সহ সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলির কৃপাধন্য শাসকদের পরাজিত করে এবং চীনে নয়াগণতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন করে। চীনে কমরেড মাও সে তুংয়ের নেতৃত্বে কমিউনিস্ট পার্টি কর্তৃক পরিচালিত বিপ্লবের প্রধান শক্তি ছিল তাঁর বিশাল কৃষক সৈনিক বাহিনী।

Manual4 Ad Code

জনগণের জীবনের বিপুল পরিবর্তন এনে দিয়েছে গণপ্রজাতন্ত্রী চীন। তার প্রতিফলন পড়ছে উৎসবের চেহারায়। দেশজুড়ে আলোকসজ্জা, পার্টির পতাকা ও প্রতীকে সাজানো ফুলের বাগান, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, প্রদর্শনীতে পার্টির সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক আরও দৃঢ় করার কথাই উচ্চারিত হচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের তরফ থেকে চীনের কমিউনিস্ট পার্টিকেই ‘প্রধান শত্রু’ হিসাবে যখন চিহ্নিত করা হচ্ছে তখন চীনের পার্টিও জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করছে নিজের ইতিহাসের খোলা পৃষ্ঠা তুলে ধরে।

২০২১ সালে শতবর্ষ উদযাপনের প্রাক্কালে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সংগঠন সংক্রান্ত দপ্তর পার্টির সাংগঠনিক চিত্রের একটি রিপোর্ট প্রকাশ করেছিল। এই রিপোর্ট অনুসারে পার্টির মোট সদস্য ৯ কোটি ৫০ লক্ষ। পার্টি তৈরির সময়ে ৫৭ জন সদস্য ছিলেন। ১৯৪৯ থেকে সদস্যসংখ্যা বেড়েছে ২০ গুণ। ২০০০-র ১ জানুয়ারি থেকে ২০২১ সালের ৫ জুন পর্যন্ত নতুন সদস্য হয়েছেন ৩২লক্ষ। ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে জুন ২৩ লক্ষ নতুন সদস্যপদ পেয়েছেন। ২০১৯ থেকে হিসাব করলে সদস্যপদ বৃদ্ধি হয়েছে ৩.৫ শতাংশ।

এই রিপোর্ট অনুসারে পার্টি সদস্যদের ৭১.২ শতাংশ পুরুষ, ২৮.৮ শতাংশ মহিলা। ৩০ বছরের নিচে পার্টিসদস্য ১ কোটি ২৫ লক্ষ। ৩১-৩৫ বয়সি ১ কোটি ১১ লক্ষ। পার্টি সদস্যদের ২৪.৯ শতাংশের বয়স ৩৫-র কম। ৩৬-৪০ বয়সি ৯৩ লক্ষ। ৪১-৪৫ বয়সি ৮৭ লক্ষ। ৪৬-৫০ বয়সি ৯৩ লক্ষ। ৫১-৫৫ বয়সী ৮৬ লক্ষ। ৫৬-৬০ বয়সী ৮৩ লক্ষ। ৬১-র বেশি ২ কোটি ৬৯ লক্ষ। শ্রমিক-কৃষক মিলিত ভাবে মোট সদস্যদের ৩৩.৯ শতাংশ। পেশাগত দিক থেকে কৃষক, প্রাণীসম্পদ পালনকারী, মৎস্যজীবী ২কোটি ৫৮ লক্ষ। টেকনিশিয়ান ৬৪ লক্ষ। বিভিন্ন এন্টারপ্রাইজ, সরকারি সংস্থা ও সামাজিক সংগঠনে কর্মরত পেশাদার ১ কোটি ৫০ লক্ষ। বিভিন্ন সংস্থার ম্যানেজার ১ কোটি। পার্টি ও সরকারের কর্মী ৭৭ লক্ষ। ছাত্র ৩০ লক্ষ, অন্যান্য পেশায় নিযুক্ত ৭২ লক্ষ। অবসরপ্রাপ্ত ১ কোটি ৯০ লক্ষ। ৫২ শতাংশ জুনিয়র কলেজ স্তর বা বেশি শিক্ষা লাভ করেছেন।

চীনের কমিউনিস্ট পার্টি গঠিত হয়েছিল ১৯২১ সালে, সাংহাইয়ে এক গোপন আস্তানায়। ১৯২৭-এ জিয়াঙশি প্রদেশের জিয়াঙশানে প্রথম গ্রামীণ বিপ্লবী ঘাঁটি তৈরি হয়। ১৯৩৪ সালে লাল ফৌজ শুরু করে লং মার্চ। ১৯৩৭ সালে জাপ সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু হয়। সাম্রাজ্যবাদ ও সামন্ততন্ত্র বিরোধী লড়াই জয়ী হয় ১৯৪৯ সালে। তৈরি হয় গণপ্রজাতন্ত্রী চীন। ১৯৫০-এ শুরু হয় মুক্ত অঞ্চলে ভূমি সংস্কারের কর্মসূচি। চীনের স্বেচ্ছাসেবকরা কোরিয়ায় মার্কিন আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অংশ নেয়। ১৯৬০-র দশকে গণকমিউন ব্যবস্থার সঙ্গেই বিজ্ঞান-প্রযুক্তির দ্রুত উন্নয়ন ঘটতে থাকে। সাফল্য সত্ত্বেও কিছু সমস্যাও তৈরি হয় এই সময়ে। ১৯৬৬ থেকে প্রায় দশ বছর সাংস্কৃতিক বিপ্লবের ফলে চীনে উথাল পাতাল ঘটে। পরবর্তীকালে চীনের পার্টি এই অভিযানকে ভ্রান্ত বলেই চিহ্নিত করেছে। ১৯৭৮ সালে একাদশ কেন্দ্রীয় কমিটির তৃতীয় অধিবেশনে সংস্কারের কাজ শুরু হয়। ১৯৮১ থেকে তা নির্দিষ্ট চেহারা পেতে শুরু করে। চীনের অর্থনীতি দ্রুত গতিতে এগিয়েছে।

একশত পাঁচ বছর পূর্তির প্রাক্কালে এই ইতিহাসের নানা পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলিকে প্রদর্শনী ও পর্যটন স্থলে রূপান্তরিত করা হয়েছে। সাংহাইয়ের পার্টি গঠনের বাড়িতে স্থায়ী মিউজিয়াম তৈরি হয়েছে। সেখানে দর্শকদের দীর্ঘ সারি শুরু হয়ে গেছে। পার্টি গঠনের সময়ে উপস্থিত নেতাদের প্রতিমূর্তি স্থাপন করা হয়েছে, তাঁদের তখনকার চেহারাতেই। ১৯৪৯ সালের পর প্রথম পার্টি কংগ্রেস ছিল অষ্টম কংগ্রেস। ১৯৫৬ সালের সেপ্টেম্বরে যেখানে সেই কংগ্রেস হয়েছিল সেখানেও এক স্থায়ী প্রদর্শনীর উদ্বোধন করা হয়েছে। ওই কংগ্রেস থেকেই সমাজতন্ত্র গঠনের মৌলিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। ‘পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ের’ রেড হাউসও উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। এক সময়ে মহান নেতা কমরেড মাও সেতুং ও অন্যান্য নেতারা এখানে থাকতেন।
বেইজিংয়ে বড় আকারে অনুষ্ঠান হয়। সেখানে চীনের পার্টির সাধারণ সম্পাদক কমরেড শি জিনপিঙ ভাষণ দেন। বেশ কয়েকটি নতুন পদক্ষেপের কথা ঘোষণা করেন তিনি।

কমরেড শি প্রায় এক ঘণ্টা ধরে ভাষণ দিয়েছেন। তার এই ভাষণে তিনি আধুনিক চীনে কমিউনিস্ট পার্টির ভূমিকার কথা তুলে ধরেছেন। বলেছেন চীনের উন্নতি এই দলটির কর্মসূচির একেবারে কেন্দ্রে এবং জনগণের কাছ থেকে এই দলটিকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা সফল হবে না।
“একমাত্র সমাজতন্ত্র চীনকে রক্ষা করতে পারবে, এবং চীনা ধাঁচের সমাজতন্ত্রই পারবে চীনের উন্নয়ন ঘটাতে,” বলেন তিনি।
তিনি বলেন, “কেউ আমাদের ভয়ভীতি দেখাতে পারবে না, নিপীড়ন করতে পারবে না এবং চীনকে পরাভূত করতে পারবে না।”
“কেউ যদি সেটা করার সাহস দেখানোর চেষ্টা করে, চীনের গ্রেট ওয়াল অব স্টিলে তার মাথা আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে রক্ত ঝরবে, যা ১৪০ কোটি মানুষ তৈরি করেছে।”
চীন বারবারই অভিযোগ করে আসছে যে যুক্তরাষ্ট্র তাদের প্রবৃদ্ধি থামিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে।
তিনি তার ভাষায় “নতুন পৃথিবী” সৃষ্টির জন্য তার জনগণের প্রশংসা করেছেন এবং বলেছেন, কমিউনিস্ট পার্টি ছাড়া এই পৃথিবী তৈরি হতো না।
অনুষ্ঠানের এক পর্যায়ে জনতার মাথার উপর দিয়ে সামরিক বিমান এমনভাবে উড়ে যায় যাতে ১০০ সংখ্যাটি ফুটে ওঠে।
সমবেত জনগণ সেসময় সমস্বরে একটি গান গেয়ে ওঠে যার মূল কথা: “কমিউনিস্ট পার্টি ছাড়া নতুন চীন হতো না।”
চীনা বিপ্লবের মহান নেতা কমরেড মাও সেতুং পরবর্তী সময়ে চীনের সবচেয়ে ক্ষমতাধর নেতা কমরেড শি। তার অধীনে কমিউনিস্ট পার্টি চীনে আরও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। কোভিড মহামারী জয় থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক মঞ্চে অবস্থান শক্ত করা পর্যন্ত সব ক্ষেত্রেই এগিয়েছে চীন।

গোপনীয়তা রক্ষা ও কড়া নিরাপত্তাজনিত কারণে ১০৫ বর্ষপূর্তি পালনের দিনটিতে ঠিক কী কী আয়োজন থাকছে সে ব্যাপারে বিস্তারিত জানানো হয়নি। তবে যুদ্ধবিমান, হেলিকপ্টার ওড়ানো হতে পারে এবং কমিউনিস্ট পার্টির প্রবীণ ও অবসরপ্রাপ্ত সদস্যরা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

দলটির দৃষ্টান্ত স্থাপন করা সদস্যদের সম্মানার্থে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রেসিডেন্ট শি বলেন, “গত ১০৫ বছরে চীনের রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন এবং মানবতার প্রসারের ইতিহাসে এক যুগান্তকরী অধ্যায় রচনা করেছে কমিউনিস্ট পার্টি।”

কমরেড শি জিনপিং কমিউনিস্ট পার্টির সক্রিয় প্রভাব বিস্তারে বড় ভূমিকা রেখেছেন। ২০১২ সালে তিনি পার্টির সাধারণ সম্পাদক হন এবং ২০১৩ সালের মার্চে তিনি চীনের প্রেসিডেন্ট হন। এরপরই দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরেন তিনি। তার সময়েই কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য বেড়েছে সবচেয়ে বেশি। বর্তমানে ৯ কোটির বেশি সদস্য রয়েছে এ দলে।

তবে পার্টি শক্তিশালী হলেও শি জিনপিং- এর আমলে চীনকে অনেক চ্যালেঞ্জেরও সম্মুখীন হতে হয়েছে। হংকং, শিনজিয়াং, তাইওয়ান ও দক্ষিণ চীন সাগর নিয়ে পশ্চিমা দেশগুলোর তীব্র সমালোচনার শিকার হয়েছে চীন। এ সমস্ত ইস্যু নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলের সঙ্গে চীনের উত্তেজনাও বেড়েছে।

আবার কোভিডের উৎপত্তি এবং প্রথমদিকে তা সামাল দেওয়া নিয়ে চীন আন্তর্জাতিক মহল থেকে চাপের মুখে ছিল। মহামারী করোনায় পুঁজিবাদী উন্নত রাষ্ট্রগুলো যখন দিশেহারা, তখন সমাজতান্ত্রিক চীন নিজের দেশকে করোনার ছোবল থেকে রক্ষা করে ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম নিয়ে ছুটে গিয়েছে দুনিয়ার দেশে দেশে। সমালোচকদের নিন্দাকে উপেক্ষা করে বিশ্ব মানবতার কল্যাণে চীন দাঁড়িয়েছে মানুষের পাশে।
তবে এতকিছুর পরও দেশে কমিউনিস্ট পার্টির জনপ্রিয়তা কমেনি। এখনও এ পার্টিকে আরও ১০০ বছর ক্ষমতায় দেখতে আগ্রহী প্রগতিশীল শক্তির সকলেই।

পরিশেষে, চীনা কমিউনিস্ট পার্টির একশত পাঁচ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে উৎসর্গ করে লেখা কবিতা—

“সিপিসির একশো পাঁচ বছর”

একশো পাঁচ বছরের পথে লাল পতাকার গান,
ইতিহাসের বুকের মাঝে জাগে নতুন প্রাণ।
সাংহাইয়ের সেই গোপন ঘর, নীরব রাতের ডাক,
স্বপ্ন হাতে ক’জন তরুণ খুলেছিল নতুন পাক।

চারিদিকে ছিল তখন শোষণ-দুঃখ-ক্ষয়,
সাম্রাজ্যবাদ, যুদ্ধ, ক্ষুধা, অন্ধকারের ভয়।
তবু মানুষের অধিকার আর মুক্তির প্রত্যয়,
একটি দলের জন্ম দিয়ে লিখল নতুন জয়।

জুলাইয়ের সেই প্রথম দিন, সংকল্প ছিল দৃঢ়,
ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ কালের বুকে স্থির হয়েছিল মূঢ়—
না, মাথা নোয়াবে না আর চীনের শ্রমিকজন,
কৃষকেরাও জাগবে একদিন মুক্তির আয়োজন।

দীর্ঘ পথে কত সংগ্রাম, কত রক্তধারা,
কতবারই ঝড়ের মুখে কেঁপেছে সংসারা।
তবু তারা থামেনি কভু, রাখেনি পিছু পা,
ভবিষ্যতের সূর্যখানি ডেকেছে নিরন্তর তা।

জিয়াঙশানের পাহাড়তলে উঠল লাল ঘাঁটি,
কৃষকেরা জড়ো হলো হাতে স্বপ্ন-মাটি।
গ্রামের পথে বিপ্লব এল নতুন ভাষা নিয়ে,
জনতারই শক্তি গড়ে ইতিহাসের প্রিয়ে।

তারপর এল লং মার্চের দুর্দম অধ্যায়,
হিমেল শৃঙ্গ, উত্তাল নদী, মৃত্যুঘেরা ছায়।
হাজার বাধা, হাজার ক্ষুধা, হাজার বিপদসীমা,
তবু এগিয়ে চলার মাঝে ছিল অমর মহিমা।

পাহাড় ডিঙায়, নদী পেরোয়, ঝড়কে করে জয়,
অগ্নিপথে মানুষ তখন খুঁজে নেয় পরিচয়।
একটি জাতির আত্মবিশ্বাস গড়ে ওঠে ধীরে,
অসংখ্য সেই পদচিহ্ন আজও আছে নীড়ে।

জাপানি আগ্রাসনের কালো দিনের মাঝে,
প্রতিরোধের আগুন জ্বলে প্রত্যন্ত জনপদে।
দেশরক্ষার সংগ্রামে যে ঐক্যের ডাক দিল,
সেই আহ্বানে কোটি মানুষ এক কাতারে মিলল।

অবশেষে ঊনপঞ্চাশ— ইতিহাসের ভোর,
বেইজিংয়ের আকাশজুড়ে নতুন দিনের ঘোর।
গণপ্রজাতন্ত্র জন্ম নিল মানুষেরই হাতে,
দীর্ঘ সংগ্রাম সফল হলো জনতার প্রভাতে।

তিয়েনআনমেন প্রাঙ্গণে সেই ঘোষণার আহ্বান,
শুনেছিল গো বিস্ময়ে ভরা অগণিত প্রাণ।
দাসত্ব পেরিয়ে উঠে এল স্বাধীন এক দেশ,
দিগন্তজোড়া আশার রঙে ভরল পরিবেশ।

Manual1 Ad Code

ভূমি সংস্কার এল পরে গ্রামীণ জনপদে,
চাষার ঘামে জন্ম নিল নতুন দিনের স্বাদে।
যে মাটি ছিল অল্প ক’জন প্রভুর অধিকারে,
সেই মাটিরই নতুন ভাষ্য ছড়িয়ে গেল দ্বারে।

কারখানাতে উঠল ধোঁয়া, জ্বলল উন্নয়ন,
শিক্ষালয়ে খুলল দুয়ার জ্ঞানের সম্ভাবন।
বিজ্ঞান আর প্রযুক্তিরও শুরু হলো যাত্রা,
দারিদ্র্যের দেয়াল ভেঙে এগোল রাষ্ট্রমাত্র।

কোরিয়ার সেই রণাঙ্গনে প্রতিরোধের ডাক,
বিশ্বমঞ্চে নতুনভাবে দৃশ্যপটে ফাঁক।
চীনের নাম উচ্চারিত হলো দৃঢ় কণ্ঠস্বরে,
স্বাধীনতার সংকল্প তখন জাগে ঘরে ঘরে।

তবু ইতিহাস একরৈখিক কখনোই নয়,
সাফল্যেরই পাশে থাকে ভুলের কঠিন ক্ষয়।
সাংস্কৃতিক বিপ্লবেরও জটিল অধ্যায়,
অনেক আলো, অনেক ছায়া, অনেক প্রশ্নচিহ্ন রয়।

নিজের ভুলের মুখোমুখি দাঁড়াবার যে শক্তি,
সেই শক্তিতেই ইতিহাসে বাড়ে নতুন ভক্তি।
আত্মসমালোচনার ভিতর শিক্ষা নেয় যে দল,
তারই মাঝে পুনর্গঠনের খুঁজে পায় সম্বল।

আটাত্তরের পরিবর্তন এক নতুন অধ্যায়,
সংস্কারের পথ ধরে দেশ এগিয়ে যেতে চায়।
খোলা জানালা, নতুন ভাবনা, উৎপাদনের ঢেউ,
গ্রাম ও নগর বদলে গেল— চিনল না আর কেউ।

শিল্পনগর উঠল গড়ে নদীর তীরে তীরে,
রেলপথ ছুটল দ্রুতগতি দূর প্রান্তের নীড়ে।
উচ্চ সেতু, মহাসড়ক, আধুনিক সব বন্দর,
উন্নয়নের নকশাপত্র পেল নতুন অন্তর।

বিজ্ঞানীদের গবেষণায় মহাকাশের পথে,
চীনের নাম জ্বলতে থাকল অগ্রগতির রথে।
উপগ্রহ আর নভোযানে দিগন্ত হলো বড়,
শ্রম ও মেধার মিলনগাথা বিশ্বজুড়ে ছড়ো।

Manual2 Ad Code

শত কোটির মানুষের এই বিশাল কর্মযজ্ঞ,
অর্থনীতির ইতিহাসে করেছে নতুন চিহ্ন।
দারিদ্র্য হ্রাসের অভিযানে যে সাফল্যের কথা,
অনেক দেশই বিস্ময়ে দেখে সেই উন্নয়নের ব্যথা।

একদিনের সেই দল আজ কোটি সদস্যধারী,
শ্রমিক, কৃষক, প্রযুক্তিবিদ, শিক্ষক, কর্মচারী।
যুবকদেরও অংশগ্রহণ বাড়ছে দিনকে দিন,
ভবিষ্যতের দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত নবীন।

Manual3 Ad Code

পল্লী থেকে মহানগর, পাহাড় থেকে সাগর,
সংগঠনের বিস্তৃতিতে গড়ে শক্তি নাগর।
শুধু সংখ্যা নয়, ইতিহাসের ধারাবাহিক স্রোত,
মানুষের সঙ্গে সম্পর্কই তাদের মূলমন্ত্র।

সাংহাইয়ের সেই জন্মঘর আজ ইতিহাস-ধন,
দর্শনার্থীর পদচারণায় মুখর প্রতিক্ষণ।
মিউজিয়ামের প্রদর্শনীতে জেগে ওঠে কাল,
প্রথম দিনের সাহসগাথা শোনায় বারবার।

পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ের স্মৃতিবহ ঘরখানি,
সংগ্রামী সব স্বপ্নবাজের বহে এখনও বাণী।
প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে যায় ইতিহাসের পাঠ,
অতীত জেনে ভবিষ্যতের খুঁজে নেয় যে ঠাঁই।

শি জিনপিংয়ের নেতৃত্বে নতুন যুগের কথা,
রাষ্ট্রগঠনের কর্মসূচিতে বাড়ে উন্নয়নের ব্যপ্তা।
দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে কঠোরতার ধ্বনি,
রাষ্ট্রপরিচালনায় আনতে চান শৃঙ্খলারই বাণী।

বিশ্বরাজনীতির উত্তাপে বাড়ছে নানা টান,
প্রতিযোগিতা, বিরোধ, সংকট, কূটনীতির গান।
হংকং, তাইওয়ান, সাগরজুড়ে বিতর্কের বিস্তার,
তবু নিজের অবস্থানে চীন রেখেছে অধিকার।

কোভিডের সেই দুঃসময়ে বিশ্ব যখন ক্লান্ত,
মানুষ তখন খুঁজছিল পথ, ছিল ভয় অশান্ত।
চিকিৎসা আর সরঞ্জাম নিয়ে বহু দূরের দেশে,
সহযোগিতার হাত বাড়ালো নিজস্ব অভিপ্রায়ে এসে।

আজও তাই একশো পাঁচের উৎসবমুখর দিন,
আলোকসজ্জায় জেগে ওঠে বিস্তৃত ভূখণ্ডচিন।
লাল পতাকার রঙে রঙে সাজে নগর-গ্রাম,
স্মরণ করে দীর্ঘ পথের সংগ্রামী অবিরাম।

এ কেবলই দলের কথা নয়, এক জাতির গান,
উত্থান-পতন, ভুল ও শিক্ষা, অগ্রযাত্রার প্রাণ।
যে ইতিহাস রক্তে লেখা, ঘামে গড়া পথ,
মানুষ তারই প্রতিধ্বনি তোলে শতসহস্র রথ।

মাও সেতুংয়ের উচ্চারণে যে কথাটি রয়—
অর্থনীতির বুনিয়াদের উপর রাজনীতি জয়।
সংস্কৃতিও প্রতিফলন সমাজবাস্তবতার,
মানুষ তাই নির্মাতা সব ইতিহাস-অধিকার।

একশো পাঁচ বছরের এই দীর্ঘ অভিযাত্রা,
ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ নদী পেরিয়ে এসেছে নবমাত্রা।
যে পথে আছে সংগ্রামেরও অগণিত দাগরেখা,
সেই পথেই উন্নয়নেরও দীপ্ত শিখা দেখা।

হয়তো সামনে আরও আসবে নতুন সব চ্যালেঞ্জ,
বদলে যাবে প্রযুক্তি, বিশ্ব, সময়েরই রেঞ্জ।
তবু ইতিহাস শেখায় শুধু শ্রমের মহিমান্বিত রূপ,
মানুষ যখন জাগে একসঙ্গে বদলে যায় সব কূপ।

তাই আজকের এই প্রভাতে উচ্চারিত হোক,
শত বছরের অধিক পথের সংগ্রামী আলোক।
সাংহাই থেকে বেইজিং অবধি প্রতিধ্বনির সুর—
মানুষ গড়ে ইতিহাস, মানুষই করে নূর।

একশো পাঁচ বছরের পথ এখনও শেষ নয়,
নতুন শতক ডাকছে আবার নতুন দিনের জয়।
অতীতের সেই অগ্নিশিখা ভবিষ্যতের দিশা,
মানুষেরই মুক্ত স্বপ্নে জাগুক বিশ্বের নিশা।

লাল পতাকা দোলে যেন সময়ের আকাশে,
সংগ্রামের গান বেজে ওঠে শ্রমজীবী নিশ্বাসে।
একশো পাঁচ বছরের এই মহাকাব্যিক ধ্বনি—
মানুষেরই শক্তি শেষ কথা, ইতিহাসের বাণী।॥
—(সিপিসির ১০৫ বছর,—সৈয়দ আমিরুজ্জামান)

#
সৈয়দ আমিরুজ্জামান
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট;
বিশেষ প্রতিনিধি, দ্য ফিনান্সিয়াল পোস্ট (ইংরেজি দৈনিক) ও সাপ্তাহিক নতুনকথা;
সম্পাদক, আরপি নিউজ;
কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, জাতীয় কৃষক সমিতি;
‘৯০-এর মহান গণঅভ্যুত্থানের সংগঠক ও সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ ছাত্রমৈত্রী।
সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ খেতমজুর ইউনিয়ন।
সাধারণ সম্পাদক, মাগুরছড়ার গ্যাস সম্পদ ও পরিবেশ ধ্বংসের ক্ষতিপূরণ আদায় জাতীয় কমিটি।
প্রাক্তন সভাপতি, বাংলাদেশ আইন ছাত্র ফেডারেশন।
E-mail : syedzaman.62@gmail.com
WhatsApp : 01716599589
মুঠোফোন: ০১৭১৬৫৯৯৫৮৯

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ