সিলেট ২২শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৮ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ৪:৩০ অপরাহ্ণ, জুন ২১, ২০২৬
বিশ্ব স্থানীয়করণ দিবস-২০২৬ উপলক্ষে আলোচনা সভায় বক্তারা
নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা, ২১ জুন ২০২৬ : জলবায়ু পরিবর্তন, জীববৈচিত্র্যের ক্ষয়, বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতা এবং স্থানীয় সংস্কৃতির ক্রমাবনতি—এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় স্থানীয় অর্থনীতি, দেশীয় জ্ঞান, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে পুনরুজ্জীবিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন পরিবেশবিদ, উন্নয়নকর্মী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। তাদের মতে, টেকসই উন্নয়ন, জলবায়ু ন্যায়বিচার এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে স্থানীয়করণভিত্তিক উন্নয়ন মডেল সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দাবি।
বিশ্ব স্থানীয়করণ দিবস-২০২৬ উপলক্ষে রোববার (২১ জুন) ইনস্টিটিউট অব ওয়েলবীইং বাংলাদেশ এবং ওয়ার্ক ফর এ বেটার বাংলাদেশ (ডাব্লিউবিবি) ট্রাস্টের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত আলোচনা সভা, প্রদর্শনী, ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলা ও কুইজ প্রতিযোগিতায় বক্তারা এসব কথা বলেন।
“জলবায়ু ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় স্থানীয় অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও জ্ঞানের প্রসার” প্রতিপাদ্যে রাজধানীর ডাব্লিউবিবি ট্রাস্ট কার্যালয়ে আয়োজিত অনুষ্ঠানে পরিবেশবাদী সংগঠনের প্রতিনিধি, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, আইনজীবী, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার কর্মকর্তা, শিক্ষক, গণমাধ্যমকর্মী, শিক্ষার্থী এবং তরুণ স্বেচ্ছাসেবীরা অংশ নেন।
স্থানীয়করণ হতে পারে জলবায়ু সংকট মোকাবিলার কার্যকর পথ
আলোচনা সভায় বক্তারা বলেন, বর্তমান বিশ্বে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বড় অংশই বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। এর ফলে একদিকে যেমন দীর্ঘ দূরত্বে পণ্য পরিবহনের কারণে কার্বন নিঃসরণ বাড়ছে, অন্যদিকে স্থানীয় উৎপাদক, কৃষক ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছেন। একই সঙ্গে বহুজাতিক ভোগবাদী সংস্কৃতির বিস্তারের কারণে স্থানীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যও ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে।
বক্তাদের মতে, স্থানীয় উৎপাদন ও ভোগব্যবস্থা শক্তিশালী হলে পরিবহনজনিত দূষণ কমবে, কর্মসংস্থান বাড়বে এবং খাদ্য ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সহজ হবে। পাশাপাশি স্থানীয় সংস্কৃতি, ভাষা ও ঐতিহ্যের সংরক্ষণও সম্ভব হবে।
‘নিজস্ব শেকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হচ্ছে নতুন প্রজন্ম’
ডাব্লিউবিবি ট্রাস্টের নির্বাহী পরিচালক সাইফুদ্দিন আহমেদ বলেন, বাংলাদেশের রয়েছে হাজার বছরের সমৃদ্ধ সংস্কৃতি, কৃষিভিত্তিক জীবনধারা এবং স্থানীয় জ্ঞানের বিশাল ভাণ্ডার। কিন্তু বিশ্বায়নের প্রভাবে নতুন প্রজন্ম ধীরে ধীরে নিজেদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে।
তিনি বলেন, “দেশীয় সংস্কৃতি, কৃষি ও স্থানীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে না পারলে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। স্থানীয়করণভিত্তিক উন্নয়ন মডেল পরিবেশ ও জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। স্থানীয় পর্যায়ে উৎপাদন ও ভোগব্যবস্থা জোরদার করা গেলে একদিকে পরিবেশ সুরক্ষিত হবে, অন্যদিকে মানুষের জীবনমানও উন্নত হবে।”
তিনি আরও বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব সবচেয়ে বেশি ভোগ করছে উন্নয়নশীল দেশগুলো। এ পরিস্থিতিতে স্থানীয় সম্পদ, স্থানীয় জ্ঞান এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অভিজ্ঞতাকে উন্নয়ন পরিকল্পনার কেন্দ্রে নিয়ে আসতে হবে।
স্থানীয় কৃষি ও বাজারকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান
আলোচনায় অংশগ্রহণকারী পরিবেশ ও উন্নয়ন বিশেষজ্ঞরা বলেন, কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থার স্থানীয়করণ দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। স্থানীয় জাতের ফসল, দেশীয় বীজ এবং পরিবেশবান্ধব কৃষি পদ্ধতির প্রসার ঘটাতে পারলে কৃষকদের উৎপাদন খরচ কমবে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা সহজ হবে।
তারা বলেন, স্থানীয় বাজার ও দেশীয় পণ্যের ব্যবহার বৃদ্ধি পেলে কৃষক, কারিগর ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা সরাসরি উপকৃত হবেন। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্য ওঠানামা কিংবা বৈশ্বিক সরবরাহ সংকটের নেতিবাচক প্রভাবও অনেকাংশে কমে আসবে।
বক্তাদের মতে, স্থানীয় উৎপাদনকে উৎসাহিত করতে সরকারি প্রণোদনা, বাজার ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং কৃষিপণ্য সংরক্ষণ ও বিপণনের জন্য আধুনিক অবকাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন।
পরিবেশ সংরক্ষণে স্থানীয় সম্প্রদায়ের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ
আলোচনা সভায় পরিবেশ সংরক্ষণে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করা হয়। বক্তারা বলেন, দেশের মাঠ, পার্ক, জলাধার, বনাঞ্চল ও উন্মুক্ত স্থানগুলো সংরক্ষণে স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করতে হবে। কারণ এসব প্রাকৃতিক সম্পদ শুধু জীববৈচিত্র্য রক্ষা করে না, বরং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
তারা আরও বলেন, শহর ও গ্রাম উভয় এলাকাতেই সবুজ এলাকা বৃদ্ধি, স্থানীয় প্রজাতির বৃক্ষরোপণ এবং জলাধার সংরক্ষণকে উন্নয়ন পরিকল্পনার অংশ করতে হবে। উন্নয়ন কার্যক্রম গ্রহণের সময় পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়নকে বাধ্যতামূলকভাবে গুরুত্ব দিতে হবে।
দেশীয় জ্ঞান ও ঐতিহ্যের প্রদর্শনী
অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল দেশীয় ঐতিহ্য ও জীববৈচিত্র্যভিত্তিক প্রদর্শনী। এতে বিভিন্ন অঞ্চলের দেশীয় ফলমূল, শাকসবজি, ঔষধি উদ্ভিদ, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ব্যবহৃত তৈজসপত্র, পোশাক এবং গ্রামীণ জীবনধারার নানা উপকরণ প্রদর্শন করা হয়।
এ ছাড়া বাংলাদেশের দেশীয় পাখির সচিত্র পোস্টার দর্শনার্থীদের বিশেষভাবে আকৃষ্ট করে। আয়োজকদের মতে, এ ধরনের প্রদর্শনী তরুণ প্রজন্মকে দেশের জীববৈচিত্র্য ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সম্পর্কে সচেতন করে তুলতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।

বিশ্ব স্থানীয়করণ দিবস উপলক্ষে দেশীয় জ্ঞান ও ঐতিহ্য প্রদর্শনী।
ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলায় তরুণদের অংশগ্রহণ
অনুষ্ঠানে বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলার আয়োজন করা হয়, যা অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহের সৃষ্টি করে। আয়োজকরা জানান, প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক জীবনে গ্রামীণ খেলাধুলা ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে। তাই নতুন প্রজন্মকে নিজেদের সাংস্কৃতিক শেকড়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে এসব আয়োজন গুরুত্বপূর্ণ।
শিক্ষার্থীদের জন্য আয়োজিত কুইজ প্রতিযোগিতায় স্থানীয় সংস্কৃতি, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য বিষয়ে প্রশ্নোত্তর পর্ব অনুষ্ঠিত হয়। বিজয়ীদের মাঝে পুরস্কার বিতরণ করা হয়।

উন্নয়ন পরিকল্পনায় পরিবেশ ও সংস্কৃতির সমন্বয়ের আহ্বান
বক্তারা বলেন, দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনায় শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে নয়, পরিবেশ সংরক্ষণ ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য রক্ষাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। কৃষিজমি রক্ষা, দেশীয় পণ্যের ব্যবহার বৃদ্ধি, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সহায়তা এবং স্থানীয় সংস্কৃতিচর্চার প্রসার ঘটাতে কার্যকর নীতি গ্রহণের আহ্বান জানান তারা।
তাদের মতে, স্থানীয়করণ কোনো বিচ্ছিন্ন অর্থনৈতিক ধারণা নয়; বরং এটি পরিবেশগত স্থায়িত্ব, সামাজিক ন্যায়বিচার, সাংস্কৃতিক পরিচয় এবং অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার একটি সমন্বিত দর্শন। স্থানীয় পর্যায়ের সম্পদ ও সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা গেলে জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলাও সহজ হবে।
সম্মিলিত উদ্যোগের প্রত্যয়
অনুষ্ঠান শেষে অংশগ্রহণকারীরা স্থানীয় সংস্কৃতি, পরিবেশ ও অর্থনীতি রক্ষায় সম্মিলিতভাবে কাজ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। তারা বলেন, স্থানীয়করণকে কেন্দ্র করে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, গবেষণা, নীতি-সংলাপ এবং তরুণদের সম্পৃক্ততার মাধ্যমে একটি পরিবেশবান্ধব ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নধারা গড়ে তোলা সম্ভব।
বিশ্ব স্থানীয়করণ দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এ অনুষ্ঠান থেকে স্থানীয় অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও দেশীয় জ্ঞানকে জাতীয় উন্নয়ন কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনার আহ্বান জানানো হয়। বক্তাদের মতে, স্থানীয় সম্পদ ও সক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা উন্নয়ন মডেলই ভবিষ্যতের জলবায়ু-সহনশীল এবং টেকসই বাংলাদেশ নির্মাণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

সম্পাদক : সৈয়দ আমিরুজ্জামান
ইমেইল : rpnewsbd@gmail.com
মোবাইল +8801716599589
৩১/এফ, তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০।
© RP News 24.com 2013-2020
Design and developed by ওয়েব নেষ্ট বিডি