দক্ষিণ চট্টগ্রামে বাবা হযরত শাহ মোহছেন আউলিয়া (রাঃ)-এর ওরশ

প্রকাশিত: ১০:৪৯ অপরাহ্ণ, জুন ২০, ২০২৬

দক্ষিণ চট্টগ্রামে বাবা হযরত শাহ মোহছেন আউলিয়া (রাঃ)-এর ওরশ

Manual1 Ad Code
  • লাখো ভক্তের সমাগম, ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও আধ্যাত্মিক পরিবেশে মুখর বটতলী রুস্তমহাট

নিজস্ব প্রতিবেদক | চট্টগ্রাম, ২০ জুন ২০২৬ : দক্ষিণ চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার ঐতিহাসিক বটতলী রুস্তমহাটে অবস্থিত বার আউলিয়ার অন্যতম বুজুর্গ আধ্যাত্মিক সাধক বাবা হযরত শাহ মোহছেন আউলিয়া (রহ.)-এর বার্ষিক ওরশ শরীফ শুরু হয়েছে।

Manual5 Ad Code

শনিবার (২০ জুন ২০২৬) ব্যাপক ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য, উৎসবমুখর পরিবেশ এবং লাখো ভক্ত-অনুরাগীর উপস্থিতিতে শুরু হওয়া এ ওরশ সারারাত চলবে।

ওরশকে কেন্দ্র করে কয়েকদিন ধরেই মাজার শরীফ ও আশপাশের এলাকায় উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে। দূর-দূরান্ত থেকে আগত আশেকান, মুরিদ, ভক্ত ও দর্শনার্থীদের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠেছে পুরো রুস্তমহাট বাজার, বটতলী ইউনিয়ন এবং আশপাশের জনপদ। ভোর থেকেই মাজার প্রাঙ্গণে জিয়ারতকারীদের ঢল নামে। দিন গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ভক্তদের উপস্থিতি আরও বাড়তে থাকে।

মাজার কর্তৃপক্ষ, খাদেম, মোতোয়াল্লি, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের সমন্বয়ে ওরশকে কেন্দ্র করে ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়। আগত ভক্তদের জন্য নিরাপত্তা, যানবাহন নিয়ন্ত্রণ, পানীয় জল, চিকিৎসাসেবা, তবারুক বিতরণ এবং সার্বিক ব্যবস্থাপনায় বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশ, আনসারসহ বিভিন্ন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের মোতায়েন করা হয়।

ধর্মীয় কর্মসূচিতে দিনব্যাপী আয়োজন

ওরশ উপলক্ষে আয়োজিত কর্মসূচির মধ্যে ছিল খতমে খাজেগান, পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত, জিকির-আযকার, মোরাকাবা-মুশাহিদা, মিলাদ ও কিয়াম মাহফিল, আহলে বায়েত ও সুফিবাদী দর্শন আলোচনা, অলি-আউলিয়ার সান্নিধ্যে জীবনাদর্শ ও ফয়েজ নিয়ে বয়ান, আখেরি মোনাজাত এবং তবারুক বিতরণ।

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের আলেম-ওলামা, পীর-মাশায়েখ ও আহলে বায়েতপন্থী ইসলামি চিন্তাবিদরা মাহফিলে অংশ নিয়ে মানবতার কল্যাণ, আত্মশুদ্ধি, নৈতিকতা ও ইসলামের প্রকৃত ধারা আহলে বায়েতের শান্তির মহান বাণী তুলে ধরছেন। তারা বলেন, সুফি-সাধক অলি আউলিয়ার জীবনাদর্শ সমাজে ভ্রাতৃত্ব, সহনশীলতা ও মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।

সাত শতকের আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের ধারক

Manual5 Ad Code

স্থানীয় ইতিহাস ও জনশ্রুতি অনুযায়ী, আহলে বায়েত ও বাংলার সুফি মতবাদের অন্যতম প্রবর্তক বাবা হযরত শাহ মোহছেন আউলিয়া (রহ.) প্রায় সাতশ’ বছর আগে সুদূর আরব দেশ থেকে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে সমুদ্রপথে চট্টগ্রামে আগমন করেন। তিনি পরবর্তীতে আনোয়ারা অঞ্চলে আস্তানা স্থাপন করে ইসলাম প্রচার, ধর্মীয় শিক্ষা বিস্তার এবং আধ্যাত্মিক সাধনায় আত্মনিয়োগ করেন।

প্রচলিত বর্ণনায় জানা যায়, বর্তমান চট্টগ্রাম নগরীর প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সুফি সাধক হযরত বদর আউলিয়া (রহ.) ছিলেন তাঁর মামা। দক্ষিণ চট্টগ্রামে ইসলামি শিক্ষা, আধ্যাত্মিক অনুশীলন ও মানবকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে শাহ মোহছেন আউলিয়া (রহ.)-এর অবদান আজও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়।

Manual3 Ad Code

ইতিহাস অনুযায়ী, তিনি দীর্ঘকাল ইবাদত-বন্দেগি, মোরাকাবা, মুশাহিদা ও রিয়াজতের মাধ্যমে আধ্যাত্মিক সাধনায় নিয়োজিত ছিলেন। পরবর্তীতে ৯৮৫ হিজরি, ৯৭১ বাংলা সনের ৬ আষাঢ় (১৫৬৫ খ্রিষ্টাব্দ) পর্দা গ্রহণ করেন। তাঁর স্মরণে প্রতি বছর ৬ আষাঢ় এই ওরশ শরীফ অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে।

Manual4 Ad Code

লাখো ভক্তের মিলনমেলা

প্রতিবছরের মতো এবারও দেশের বিভিন্ন জেলা ছাড়াও বিদেশ থেকে আগত ভক্তরা ওরশে অংশ নেন। মাজার প্রাঙ্গণে জিয়ারত, দোয়া, মোনাজাত এবং ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের মাধ্যমে তারা আধ্যাত্মিক শান্তি লাভের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।

ওরশকে কেন্দ্র করে আশপাশের এলাকায় বসেছে ঐতিহ্যবাহী মেলা। রাতব্যাপী ছেমা কবিগান, জারিগান, হামদ-নাত, ইসলামী আধ্যাত্মিক সংগীত এবং বিভিন্ন আধ্যাত্মিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। এতে স্থানীয় জনগণের পাশাপাশি দূর-দূরান্ত থেকে আগত দর্শনার্থীরাও অংশগ্রহণ করছেন।

প্রশাসন ও মাজার কর্তৃপক্ষের প্রস্তুতি

মাজারের মোতোয়াল্লি জানান, ওরশ শরীফকে কেন্দ্র করে সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। ভক্তদের নির্বিঘ্ন অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে নিরাপত্তা ও সার্বিক ব্যবস্থাপনায় প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।

তিনি বলেন, “দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বিপুলসংখ্যক ভক্ত সমবেত হয়েছেন। আবহাওয়া প্রতিকূল হলেও আমরা আশা করছি সবার সহযোগিতায় সুশৃঙ্খল ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ওরশের সব কর্মসূচি সম্পন্ন হবে।”

সফলতা কামনায় পীরজাদাগণের আহ্বান

বাবা হযরত শাহ মোহছেন আউলিয়া (রহ.)-এর বার্ষিক ওরশ শরীফের সফলতা কামনা করেছেন রহমানপুর দরবার শরীফের গদ্দীনশীন পীর শাহজাদা সৈয়দ গাউসুজ্জামান রুমান এবং শাহজাদা সৈয়দ রায়হান শাহ রহমানপুরী।

এক যৌথ শুভেচ্ছা বার্তায় তারা বলেন, “অলি-আউলিয়াগণ ইসলামের প্রকৃত ধারা আহলে বায়েতের শান্তি, মানবতা, সহমর্মিতা ও আধ্যাত্মিকতার শিক্ষা মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দিয়েছেন। বাবা হযরত শাহ মোহছেন আউলিয়া (রহ.)-এর জীবন ও আদর্শ নতুন প্রজন্মের জন্য অনুকরণীয়। তাঁর ওরশ শরীফ শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়; এটি মানুষের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব, সম্প্রীতি ও নৈতিক মূল্যবোধ জাগ্রত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ।”

তারা দেশ, জাতি ও মুসলিম উম্মাহর শান্তি, সমৃদ্ধি এবং কল্যাণ কামনা করে সকলের কাছে দোয়া প্রার্থনা করেন।

আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা

শতাব্দীপ্রাচীন এই ওরশ শরীফ দক্ষিণ চট্টগ্রামের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত। প্রতি বছর লাখো মানুষের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত এই আয়োজন শুধু আধ্যাত্মিক মিলনমেলাই নয়, বরং এলাকার সামাজিক সম্প্রীতি, ঐতিহ্য ও ধর্মীয় সংস্কৃতির এক অনন্য বহিঃপ্রকাশ হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ