চা শ্রমিক ইউনিয়নের দ্রুত নির্বাচন দাবিতে সমাবেশ ও মানববন্ধন

প্রকাশিত: ৪:৫৭ অপরাহ্ণ, আগস্ট ২, ২০২৬

চা শ্রমিক ইউনিয়নের দ্রুত নির্বাচন দাবিতে সমাবেশ ও মানববন্ধন

Manual7 Ad Code
  • নির্বাচন বিলম্বে ক্ষোভ, সময়মতো ভোটের পক্ষে সৈয়দ আমিরুজ্জামান

নিজস্ব প্রতিবেদক | শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার), ০২ আগস্ট ২০২৬ : বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের ত্রি-বার্ষিক নির্বাচনকে কেন্দ্র করে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে উত্তেজনা ও ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। নির্বাচন বানচালের উদ্দেশ্যে আদালতে দায়ের করা মামলাকে “মিথ্যা” আখ্যায়িত করে তা অবিলম্বে প্রত্যাহার, দ্রুত নির্বাচন কমিশন গঠন, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা এবং ভোটগ্রহণের দাবিতে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ করেছেন চা শ্রমিকরা।

Manual5 Ad Code

রোববার (২ আগস্ট ২০২৬) দুপুর আড়াইটার দিকে শ্রীমঙ্গল শহরের মৌলভীবাজার সড়কে বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কার্যালয় লেবার হাউসের সামনে ইউনিয়নের উদ্যোগে এ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। এতে বালিশিরা ভ্যালীসহ বিভিন্ন চা বাগানের বিপুলসংখ্যক শ্রমিক, পঞ্চায়েত কমিটির প্রতিনিধি ও ইউনিয়নের নেতারা অংশ নেন।

Manual2 Ad Code

এর আগে দুপুর ১২টায় লেবার হাউসের হলরুমে বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের বালিশিরা ভ্যালীর ৬৪টি চা বাগানের পঞ্চায়েত কমিটির জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের বালিশিরা ভ্যালীর সভাপতি বিজয় হাজরা।

সভা ও প্রতিবাদ কর্মসূচিতে বক্তব্য দেন বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের কার্যকরী সভাপতি সিউধনি কুর্মি, সহসভাপতি পংকজ কন্দ, ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক নিপেন পাল, অর্থ সম্পাদক পরেশ কালিন্দী, সাবেক উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান প্রেম সাগর হাজরাসহ অন্যান্য শ্রমিক নেতারা।

বক্তারা অভিযোগ করেন, বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের ত্রি-বার্ষিক নির্বাচনকে দীর্ঘায়িত ও বানচাল করার উদ্দেশ্যে আদালতে একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। তাদের দাবি, মামলাটি প্রত্যাহার করে দ্রুত নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা এবং ভোটগ্রহণের ব্যবস্থা করতে হবে।

তারা বলেন, দীর্ঘদিন নির্বাচন না হওয়ায় শ্রমিকদের মধ্যে অনিশ্চয়তা ও অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। একটি নির্বাচিত নেতৃত্বই শ্রমিকদের দাবি-দাওয়া কার্যকরভাবে তুলে ধরতে পারে। তাই নির্বাচনকে বাধাগ্রস্ত করার যেকোনো অপচেষ্টা থেকে সংশ্লিষ্টদের বিরত থাকার আহ্বান জানান তারা।

সমাবেশে বক্তারা সরকারের প্রতিও আহ্বান জানিয়ে বলেন, দ্রুত নির্বাচন কমিশন গঠন করে বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাচন সম্পন্ন করা হলে সংগঠনের গণতান্ত্রিক পরিবেশ পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে এবং শ্রমিকদের মধ্যে বিদ্যমান অস্থিরতার অবসান ঘটবে।

কর্মসূচি শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাংগঠনিক সম্পাদক বিজয় হাজরা। তিনি অভিযোগ করেন, একটি পক্ষ আদালতে মামলা করে নির্বাচন প্রক্রিয়া বিলম্বিত করার চেষ্টা করছে।

Manual1 Ad Code

তিনি বলেন, “মামলার নিষ্পত্তি হলে দ্রুত নির্বাচন কমিশন গঠন করে তফসিল ঘোষণা করা সম্ভব হবে। শ্রমিকরা একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন চায়।”

সময়মতো নির্বাচনের ওপর গুরুত্বারোপ

এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়ন (রেজি: নং বি-৭৭)-এর ত্রি-বার্ষিক নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে বিদ্যমান গঠনতন্ত্রের অনুচ্ছেদ ৯(জ)-এর বিধান অনুযায়ী ৯ সদস্যবিশিষ্ট নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনের কথা উল্লেখ করেন বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির মৌলভীবাজার জেলা সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষক, ইংরেজি দৈনিক দ্য ফিনান্সিয়াল পোস্ট ও সাপ্তাহিক নতুন কথা-এর বিশেষ প্রতিনিধি, আরপি নিউজের সম্পাদক এবং কলামিস্ট কমরেড সৈয়দ আমিরুজ্জামান।

Manual5 Ad Code

তিনি বলেন, “চা শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাচন সময়মতো হওয়া অত্যন্ত জরুরি। কারণ এটি শুধু সংগঠনের গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতার প্রশ্ন নয়; বরং চা শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি, সামাজিক সুরক্ষা, ভূমি অধিকার এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবনের দাবিকে সংগঠিতভাবে তুলে ধরার অন্যতম প্রধান মাধ্যম।”

তিনি আরও বলেন, “চা শিল্পে বিদ্যমান বৈষম্য দূর করা, ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা, শ্রমিকদের দাবি-দাওয়া নিয়ে কার্যকর দরকষাকষি করা, ভূমি অধিকার ও সামাজিক সুরক্ষা প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে শক্তিশালী করতে স্বাধীন ট্রেড ইউনিয়ন কার্যক্রম অপরিহার্য। এ কারণে বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাচন নির্ধারিত সময়ে অনুষ্ঠিত হওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”

তাঁর মতে, নির্বাচিত নেতৃত্ব শ্রমিকদের প্রতি জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে এবং মালিকপক্ষ ও রাষ্ট্রের সঙ্গে সংগঠনের আলোচনার সক্ষমতা বৃদ্ধি করে। “শ্রমিক নেতৃত্বে জবাবদিহিতা আনতে এবং দরকষাকষির ক্ষমতা বাড়াতে নির্বাচনের কোনো বিকল্প নেই,”—বলেন তিনি।

আইন ও গঠনতন্ত্রের প্রেক্ষাপট

সৈয়দ আমিরুজ্জামান বলেন, ২০০৬ সালের বাংলাদেশ শ্রম আইন এবং ২০১৫ সালের বাংলাদেশ শ্রম বিধিমালার আলোকে নিবন্ধিত ট্রেড ইউনিয়নের নির্বাচন গঠনতন্ত্রে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্পন্ন হওয়া প্রয়োজন। তাঁর দাবি, অতীতে বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাচন একাধিকবার বিলম্বিত হওয়ায় সংগঠনের বৈধ নেতৃত্ব এবং গণতান্ত্রিক কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছিল।

তিনি মনে করেন, নিয়মিত নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে সংগঠনের সাংগঠনিক ভিত্তি আরও শক্তিশালী হবে এবং শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনও অধিক কার্যকর হবে।

নির্বাচন ঘিরে নতুন বিতর্ক

চা শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক সময়ে সংগঠনের অভ্যন্তরে মতপার্থক্য, মামলা এবং নির্বাচন আয়োজনের প্রক্রিয়া নিয়ে নানা আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে। একদিকে শ্রমিকদের একটি অংশ দ্রুত নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবিতে মাঠে সক্রিয়, অন্যদিকে আদালতে বিচারাধীন বিষয়কে কেন্দ্র করে নির্বাচন প্রক্রিয়া বিলম্বিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, আইনগত জটিলতার দ্রুত নিষ্পত্তি এবং গঠনতন্ত্র অনুযায়ী গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আয়োজনই বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের সবচেয়ে কার্যকর পথ হতে পারে। একই সঙ্গে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সব পক্ষের মধ্যে সংলাপ, স্বচ্ছতা ও গণতান্ত্রিক চর্চা বজায় রাখার ওপরও গুরুত্বারোপ করা হচ্ছে।