উগ্রতাবাদ থেকে বের হয়ে আসুন, মানুষ হোন!

প্রকাশিত: ৩:৪১ অপরাহ্ণ, আগস্ট ৩, ২০২৬

উগ্রতাবাদ থেকে বের হয়ে আসুন, মানুষ হোন!

Manual4 Ad Code

আসাদুজ্জামান আসাদ |

ইতিহাস সাক্ষী দেয়, “যিশু খ্রিস্টের জন্মের ১৫০০ থেকে ২৫০০ বছর পূর্বে’ ইন্ডাস ভ্যালি সভ্যতা গড়ে উঠেছিলো। এটাকেই বলা হয় হরপ্পা সভ্যতা। এই সভ্যতা ছিল পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন সভ্যতা। যার সাথে প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতা ও মেসোপটেমিয়া সভ্যতার তুলনা করা হয়। সিন্ধু নদীর অববাহিকা থেকে শুরু করে পাকিস্তান, উত্তর পশ্চিম ভারত ও উত্তর পূর্ব আফগানিস্তান পর্যন্ত এই সভ্যতা বিস্তৃত ছিলো।”

Manual4 Ad Code

যিশু খ্রিস্টের জন্মের ১৫০০ বছর পূর্বে ইন্দো – আর্যরা ভারতীয় উপমহাদেশে এসে সিন্ধু নদীর তীরে বসতি স্থাপন করে। তাদের ভাষা, সংস্কৃতি ও ইতিহাস হরপ্পা সভ্যতার সাথে মিলে একটি ধর্ম হিসেবে পরিচিতি লাভ করে, যা হিন্দু ধর্ম নামে পরিচিত হয়।

ইন্দো – আর্যরা রাশিয়া ও কাজাখাস্তানের মধ্য এশীয় স্তেপ অঞ্চল থেকে মতান্তরে যিশু খ্রিস্টের জন্মের প্রায় দুই হাজার বছর পূর্বে ভারতবর্ষে আগমন করে।

হিন্দুদের সবচেয়ে প্রাচীন ধর্মগ্রন্থ বেদ রচিত হয় যিশু খ্রিস্টের জন্মের প্রায় ১২০০ বছর আগে। আজ থেকে প্রায় দুই হাজার বছর আগে যদি ইসরায়েলের জেরুজালেমের নাজারত শহরে যিশু খ্রিস্টের জন্ম হয়, তবে খ্রিষ্টান ধর্ম ইসলাম ধর্ম থেকে কম করে হলেও পাঁচশো বছর আগে এসেছে। অপরদিকে সেই হিসেবে হিন্দুদের ধর্মগ্রন্থ বেদ প্রায় সাড়ে তিন হাজার বছরের পুরোনো। অর্থাৎ পৃথিবীতে ইসলাম ধর্ম আগমনের অন্তত দুই হাজার বছর আগে হিন্দু ধর্মের সৃষ্টি হয়েছে।

হিন্দু সম্প্রদায়ের ধর্মগ্রন্থে কোথাও মুসলমানদের হত্যার কথা বলা হয়নি। ইসলাম বলে কোন ধর্ম পৃথিবীতে আছে তাই হিন্দুরা জানতো না। ইসলাম ধর্মের পৃথিবীতে আগমন হয়েছে হিন্দু ধর্মের প্রায় দুই হাজার বছর পর। ইসলাম ধর্মের বর্তমান বয়স প্রায় ১৫০০ বছর। এজন্য ইসলাম ধর্মে মূর্তি পুজারীদের হত্যার কথা, ভারত দখলের ‘গাজওয়াতুল হিন্দ’-এর কথা উল্লেখ থাকলেও পৃথিবীর আর কোন ধর্মে এমন আগ্রাসী বক্তব্য নেই। কারণ ইহুদি, খ্রিস্টান ও বৌদ্ধ ধর্ম সব ইসলাম ধর্মের আগে এসেছে। আজ থেকে কম করে হলেও আড়াই হাজার বছর পূর্বে উত্তর পূর্ব ভারত ও নেপাল সংলগ্ন এলাকায় বৌদ্ধ ধর্মের আবির্ভাব ঘটে। এজন্য পৃথিবীর আর কোন ধর্মেই আপনি অন্য ধর্মের বিরুদ্ধে হিংসা, কুৎসা ও হত্যার ঘটনা পাবেন না। এটাই সত্য। এসব বিষয়ে অন্য একদিন বিস্তারিত লিখবো।

Manual2 Ad Code

একটা সময় হিন্দু ধর্ম বলে পৃথিবীতে কোন ধর্ম ছিলো না। হিন্দু ধর্মের উৎপত্তি হয়েছে সনাতন ধর্ম থেকে। হিন্দু শব্দটি এসেছে পারস্য থেকে। পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন ধর্ম হচ্ছে সনাতন ধর্ম। আর্য জাতিরা ইউরোপ হয়ে ইরানের মধ্যে দিয়ে ভারতে প্রবেশ করে বেদ চর্চা শুরু করে। সেই থেকে ভারতে হিন্দু ধর্মের উৎপত্তি। হিন্দু ধর্ম বা সনাতন ধর্মকে পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন ধর্ম বলা হয় এটাই সত্য। ম্যাক্সিকোতে মাটির নিচে একটা শহর পাওয়া গেছে যেখানে মানুষের মূর্তিপূজা করার নিদর্শন মিলেছে। ইহুদীদের কেনানেও মূর্তিপূজা ছিলো। এমনকি নবী মোহাম্মদ যে কুরাইশ গোত্র থেকে এসেছেন এবং যে মক্কা নগরীতে জন্মগ্রহণ করেছেন সেখানেও মানুষ এখনও মূর্তিপূজা করে, তখনও মূর্তিপূজা ছিলো।

সপ্তম শতাব্দীতে ভারতীয় উপমহাদেশে ব্যাবসার জন্য আরবের বণিকরা এসে বসতি স্থাপন করে। অষ্টম শতাব্দী পর্যন্ত পাকিস্তানে কোন মুসলমান ছিলো না। পাকিস্তানের মানুষ ছিল হিন্দু, বৌদ্ধ, জরাথ্রুষ্ট, জৈন ধর্মের অনুসারী। এখনও আফগানিস্তানের পাহাড়ে হিন্দু ধর্মের বিভিন্ন নিদর্শন পাওয়া যায়। বাংলাদেশ ও পাকিস্তান এসব ভূখন্ড ছিল হিন্দুদের ভূখন্ড। এখনও বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলার নামের ইতিহাস খুঁজলে এসব সত্যতা আপনি পেয়ে যাবেন। ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলমানরা অনেকটা রোহিঙার মতো এসেছিল, যেমন করে তাঁরা ৬২৮ সালে চীনে গিয়ে চীনের তাঙ বংশের প্রথম সম্রাট তাই -ৎসুঙ এর নিকট মসজিদ প্রার্থনা করে। তিনি চীনের ক্যান্টনে মুসলমানদের মসজিদ করে দেন। ঠিক এর পরের বছর ৬২৯ সালে মুসলমানরা ভারতে এলে ভারতীয়রা চেরামন জুমা মসজিদ স্থাপনে মুসলমানদের সহযোগিতা করে। সুফী মুসলমানরা ভারতে শান্তির ধর্ম ইসলাম প্রচার করেছেন। হিন্দু ধর্মের মানুষ তাদের সহযৌগিতা করেছে। হিন্দুরা বৌদ্ধ ধর্মের মানুষকেও তাদের ধর্ম প্রচারে সহযোগিতা করেছে। এমনকি খ্রিষ্টান ও ইহুদীরাও নির্বিঘ্নে ভারতীয় উপমহাদেশে তাদের ধর্ম পালন করেছে কোন সমস্যা হয়নি।

৬ষ্ঠ শতাব্দীতে পূর্তগিজ ও স্পেনের বণিকরা ভারতে এসেছিলো মশলার লোভে। একই মশলা বাণিজ্য আরবের বণিকরা ভারতীয় উপমহাদেশে আসা শুরু করে। পূর্তগীজ ও স্পেনীয়রা চলে গেলে আরবের বণিকরা হিন্দু নারীদের বিয়ে করে ভারতে বসবাস শুরু করে। সপ্তম শতাব্দীতে মুসলমানদের যখন সারা বিশ্বে জয় জয়কার চলছে তখন রাজ্য ও ভূখন্ড দখলের লোভ সামলাতে না পেরে ৭১২ খ্রিষ্টাব্দে উমাইয়া সেনাপতি মুহাম্মদ বিন কাসিম হাজার হাজার হিন্দুকে হত্যা করে সিন্ধু বিজয় করেন। এরপর দ্বাদশ শতাব্দীতে লক্ষ হিন্দু হত্যার মধ্য দিয়ে ঘোরিরা ভারতের দিল্লির মসনদ দখল করেন। ১২০৪ সালে ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজির নেতৃত্বে বখতিয়ারের ঘোড়া বাংলাদেশ দখল করে। ১৫২৬ সালে উজবেকিস্তান থেকে এসে মোঘল সম্রাট বাবর হিন্দুদের হত্যা করে মোঘল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর মোঘল সম্রাট আওরঙ্গজেব লক্ষ লক্ষ হিন্দুদের হত্যা করেন। এই মোঘল সম্রাটদের কেউ কি ভারতীয়? ইখতিয়ার উদ্দিন বখতিয়ার অথবা মুহাম্মদ বিন কাসিম এরা কি কেউ ভারতে জন্মেছিলেন? তবে ধর্মের নামে হিন্দু ও মুসলমান হত্যা ও রাজ্য দখল কেন? এর নাম কি ধর্ম প্রতিষ্ঠা?

Manual1 Ad Code

ইন্দো – আর্যরা ইউরোপ ও ইরান হয়ে ভারতে এসে হিন্দু ধর্ম প্রচার করেছেন কিন্তু কোন মানুষ হত্যা করেননি।তবে সপ্তম শতাব্দী থেকে আজ পর্যন্ত ভারতীয় উপমহাদেশে হিন্দু ও মুসলমান হত্যা কেন? এর জন্য দায়ী হচ্ছে একদল সাম্রাজ্য লোভী উগ্রবাদী মুসলমান।যারা নিরীহ মানুষদের হত্যা করে ধর্ম প্রতিষ্ঠার নামে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে দখল করে হিন্দু ও মুসলমান সাম্প্রদায়িকতা সৃষ্টি করেছিল। চীনের বৌদ্ধরা ভারতের হিন্দু জনগোষ্ঠীর মত এত সহজ সরল ছিলেন না। তাই একই সময়ে চীন ও ভারতে এসে মুসলমানরা ভারতে উগ্রতাবাদ প্রতিষ্ঠিত করতে পারলেও চীনা রাজাদের সতর্কতার কারণে চীনে তা সম্ভব হয়নি।

Manual7 Ad Code

দ্বাদশ শতাব্দী থেকে আরবের বিভিন্ন রাজ্যে থেকে মুসলিম শাসকরা ভারত দখল করে প্রায় আটশো বছর ধরে ভারতে হিন্দু গণহত্যা চালায়। এইভাবেই তারা বাইরের দেশ থেকে এসে ভারতে তাদের সাম্রাজ্যবাদ প্রসার করে। এরপর ১৭৫৭ সালে ব্রিটেন থেকে ব্রিটিশের সৈন্যদল এসে মোঘল মুসলমানদের পরাজিত করে ভারত দখল করে প্রায় দুইশো বছর শাসন করে। মুসলমান ও হিন্দুদের এই সাম্প্রদায়িক ‌সংঘাতকে ব্রিটিশরা খুব ভালোভাবে কাজে লাগায়। ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলমানরা যুদ্ধবাজ হলেও শিক্ষা দীক্ষায় হিন্দুদের চেয়ে অনেক পিছিয়ে ছিলো। ব্রিটিশরাই সর্বপ্রথম পৃথিবীতে মুসলমানদের জন্য মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করে। ব্রিটিশ ওয়ারেন হেস্টিংস আলিয়া মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। অপরদিকে ব্রিটিশরা প্রতিষ্ঠিত করতে ভারতীয় উপমহাদেশে দেওবন্দ তথা কাওমী মাদ্রাসা। একটি ভূখণ্ডকে তিন থেকে চারমূখী শিক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করে ধ্বংস করে দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল ব্রিটিশদের। এই ব্রিটিশরা সৌদির মাওলানা ওহাবকে দিয়ে ওহাবিজম প্রতিষ্ঠা করে তিতুমীর ও সৈয়দ আহমেদ বেরলভীদের দিয়ে সাম্প্রদায়িক সংঘাতকে স্থায়ী রূপ দেয়। যার ফলে ব্রিটেন থেকে জিন্নাহকে উড়িয়ে এনে ভারতবর্ষকে দুইভাগে বিভক্ত করার আগে মাওলানা মওদুদীকে দিয়ে ব্রিটিশরা “জামায়াতে ইসলামী” নামক উগ্রবাদী ও জঙ্গীবাদী সংগঠন সৃষ্টি করে ভারতীয় উপমহাদেশের শান্তি চিরতরে বিনষ্ঠের পরিকল্পনা করে। এতে ব্রিটিশরা পুরোপুরি সফল হয়।

ধর্মীয় উস্কানি ও জঙ্গীবাদ সৃষ্টি করে পাকিস্তানের জামায়াতে ইসলাম ১৯৫৫ সালে গোলাম আযমকে দিয়ে বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠা করে ভারত বিরোধী প্রচারণা অব্যাহত রাখে। এই জামায়াতে ইসলামীর মত উগ্রবাদী মুসলমানদের দিয়ে ১৯৪৬ সালে নোয়াখালী হিন্দু গণহত্যা চালানো হয়। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতে ইসলাম রাজাকার নাম ধারণ করে ত্রিশ লক্ষ হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ও আদিবাসীদের হত্যা করে। পৃথিবীর বুকে এই উগ্রবাদী মুসলমানরাই একদিন ইসলাম ধ্বংসের সবচেয়ে বড় কারণ হবে। ক্ষমতা ও রাজ্য দখলের লোভে এরা অন্ধ। দেশে দেশে এরা বোমাবাজি ও মানুষ হত্যা করছে। এমনকি নিজ সম্প্রদায়ের শান্তিপ্রিয় মুসলমানরা পর্যন্ত এই উগ্রবাদী মুসলমানদের কাছে নিরাপদ নন। আফগানিস্তান, পাকিস্তান, সিরিয়া, লেবানন, ইরাক, ইরান, লিবিয়া ও বাংলাদেশে এক মুসলমান আরেক মুসলমানকে হত্যা করছে। মুসলমানদের সাম্রাজ্য দখলের বলি হয়েছে ভারতের লক্ষ লক্ষ হিন্দু। তাদের সরলতাই হয়েছিল তাদের জন্য সবচেয়ে বড় অভিশাপ। তাছাড়া হিন্দুরা বিভিন্ন জাতি গোষ্ঠিতে বিভক্ত ছিলো যার সুযোগটাই নিয়েছিল মুসলমান ও ব্রিটিশরা। মানব ইতিহাসের অন্যতম বড় কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ কৌরব ও পাণ্ডবদের সিংহাসন দখলের লড়াই এই ভারতীয় উপমহাদেশে হয়েছে। বর্তমানে ভারতীয় উপমহাদেশে যে হিন্দু ও মুসলমান সংঘাত দেখছেন এর মূলেও রয়েছে ক্ষমতা ও সিংহাসন দখলের লড়াই। মানুষ হত্যা কোন ধর্ম হতে পারে না। এর চেয়ে নিকৃষ্ট ধর্ম পৃথিবীতে আর কিছুই হয় না।

ধর্মান্ধ ও উগ্রতাবাদ থেকে বের হয়ে মানুষ হোন। সকল কন্ঠে একসুরে বলুন, “সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই।”