সিলেট ৪ঠা আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২০শে শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ১:৩৬ পূর্বাহ্ণ, আগস্ট ৩, ২০২৬
নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা, ০৪ আগস্ট ২০২৬ : প্রথিতযশা সাংবাদিক, কলামিস্ট, বাম প্রগতিশীল রাজনীতিবিদ, লেখক এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা কমরেড নির্মল সেনের ৯৬তম জন্মবার্ষিকী আজ।
দিবসটি উপলক্ষে বিভিন্ন সংগঠন পৃথক পৃথক কর্মসূচির পাশাপাশি তাঁর জীবন, কর্ম, আদর্শ এবং বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল রাজনীতিতে তাঁর অবদানের কথা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে।
১৯৩০ সালের ৩ আগস্ট গোপালগঞ্জ জেলার কোটালীপাড়া উপজেলার দীঘিরপাড়া গ্রামে নির্মল সেন জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা সুরেন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত ছিলেন কোটালীপাড়া ইউনিয়ন ইনস্টিটিউশনের গণিতের শিক্ষক এবং মাতা লাবণ্য প্রভা সেনগুপ্ত। পাঁচ ভাই ও তিন বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন পঞ্চম।
দেশভাগের পর তাঁর পরিবারের অধিকাংশ সদস্য ভারতে চলে গেলেও জন্মভূমির প্রতি গভীর ভালোবাসা থেকে নির্মল সেন পূর্ব বাংলাতেই থেকে যান। শৈশব ও কৈশোরের একটি বড় অংশ কেটেছে ঝালকাঠি জেলায় তাঁর পিসির বাড়িতে। তিনি ঝালকাঠির কলসকাঠি বিএম একাডেমি থেকে ১৯৪৪ সালে ম্যাট্রিকুলেশন, বরিশাল বিএম কলেজ থেকে আইএসসি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ততা
স্কুলজীবনেই ব্রিটিশবিরোধী ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনের মাধ্যমে নির্মল সেনের রাজনৈতিক জীবনের সূচনা হয়। কলেজজীবনে তিনি অনুশীলন সমিতির সক্রিয় সদস্য ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি রেভল্যুশনারি সোশ্যালিস্ট পার্টি (আরএসপি)-তে যোগ দেন এবং দীর্ঘদিন শ্রমিক কৃষক সমাজবাদী দলের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। গণতন্ত্র, অসাম্প্রদায়িকতা, শ্রমজীবী মানুষের অধিকার এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্নে তিনি সারাজীবন আপসহীন অবস্থান বজায় রাখেন।
রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে তাঁকে বিভিন্ন সময় কারাবরণ করতে হয়েছে। পাকিস্তান আমল থেকে শুরু করে স্বাধীন বাংলাদেশেও গণতান্ত্রিক আন্দোলনে তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ তাঁকে দেশের বাম রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বে পরিণত করে।
সাংবাদিকতায় উজ্জ্বল অধ্যায়
১৯৫৯ সালে দৈনিক ইত্তেফাক-এ যোগদানের মাধ্যমে নির্মল সেনের সাংবাদিকতা জীবনের সূচনা হয়। পরবর্তীকালে তিনি দৈনিক আজাদ, দৈনিক পাকিস্তান এবং দৈনিক বাংলা-সহ দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সংবাদপত্রে সাংবাদিকতা করেন।
তিনি ‘অনিকিত’ ছদ্মনামে রাজনৈতিক বিশ্লেষণধর্মী কলাম লিখে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন। তাঁর লেখায় সমকালীন রাজনীতি, রাষ্ট্র, সমাজ, গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক বিষয়াবলির বিশ্লেষণ বিশেষভাবে স্থান পেয়েছে।
বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) সভাপতির দায়িত্ব পালন ছাড়াও তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে অতিথি শিক্ষক হিসেবে পাঠদান করেন।
লেখক হিসেবে অবদান
সাংবাদিকতা ও রাজনীতির পাশাপাশি নির্মল সেন একজন শক্তিশালী লেখক হিসেবেও সুপরিচিত ছিলেন। তাঁর রচিত উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে— পূর্ব পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ, মানুষ সমাজ রাষ্ট্র, বার্লিন থেকে মস্কো, মা জন্মভূমি, স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি চাই, আমার জীবনে একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ এবং আমার জবানবন্দি।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ, সমাজতন্ত্র, রাষ্ট্রচিন্তা এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতি নিয়ে তাঁর লেখাগুলো এখনও গবেষক, শিক্ষার্থী ও রাজনৈতিক কর্মীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যসূত্র হিসেবে বিবেচিত হয়।
মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে নির্মল সেন সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও মানবমুক্তির আদর্শকে তিনি আজীবন ধারণ করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন এবং অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গঠনের প্রশ্নে তিনি ছিলেন সোচ্চার কণ্ঠস্বর।
মৃত্যু
দীর্ঘ কর্মময় জীবনের অবসান ঘটে ২০১৩ সালের ৮ জানুয়ারি। রাজধানীর ল্যাবএইড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি ৮৩ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর মৃত্যুতে দেশের রাজনৈতিক, সাংবাদিকতা ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে গভীর শোকের ছায়া নেমে আসে।
ওয়ার্কার্স পার্টির শ্রদ্ধা
কমরেড নির্মল সেনের ৯৬তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে এক বিবৃতিতে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি কমরেড মাহমুদুল হাসান মানিক এবং ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক কমরেড নূর আহমেদ বকুল তাঁর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
নেতৃদ্বয় বলেন, নির্মল সেন ছিলেন দেশের প্রগতিশীল রাজনৈতিক আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, গণতন্ত্র, অসাম্প্রদায়িকতা এবং সাংবাদিকতার নৈতিকতার এক উজ্জ্বল প্রতীক। তাঁর আদর্শ ও সংগ্রাম ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করবে।
সৈয়দ আমিরুজ্জামানের শ্রদ্ধা
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক, নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের সংগঠক, বাংলাদেশ ছাত্রমৈত্রীর সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, জাতীয় কৃষক সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির মৌলভীবাজার জেলা সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য, ইংরেজি দৈনিক দ্য ফিনান্সিয়াল পোস্ট ও সাপ্তাহিক নতুন কথা-এর বিশেষ প্রতিনিধি, আরপি নিউজের সম্পাদক এবং কলামিস্ট কমরেড সৈয়দ আমিরুজ্জামান এক বিবৃতিতে কমরেড নির্মল সেনের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
তিনি বলেন, “কমরেড নির্মল সেন ছিলেন সততা, আদর্শ, যুক্তিবাদ এবং মানবিক মূল্যবোধের এক অনন্য প্রতীক। রাজনীতি, সাংবাদিকতা ও লেখালেখি—প্রতিটি ক্ষেত্রে তিনি নীতি ও আদর্শের প্রশ্নে আপসহীন ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে তাঁর অবদান বাংলাদেশের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। নতুন প্রজন্মের উচিত তাঁর জীবন ও কর্ম থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা এবং মানবিক, গণতান্ত্রিক ও বৈষম্যহীন সমাজ বিনির্মাণে তাঁর আদর্শকে ধারণ করা।”
বিভিন্ন নেতৃবৃন্দের শ্রদ্ধা
জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আরও শ্রদ্ধা নিবেদন করেন বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির মৌলভীবাজার জেলা শাখার সম্পাদক তাপস ঘোষ; শ্রীমঙ্গল উপজেলা শাখার সভাপতি দেওয়ান মাসুকুর রহমান ও সাধারণ সম্পাদক জালাল উদ্দীন; শ্রীমঙ্গল পৌর শাখার সভাপতি শেখ জুয়েল রানা ও সাধারণ সম্পাদক রোহেল আহমদ; বাংলাদেশ যুবমৈত্রীর শ্রীমঙ্গল উপজেলা শাখার সভাপতি জামাল মুশরাফিয়া; বাংলাদেশ ছাত্রমৈত্রীর মৌলভীবাজার জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক অজিত বোনার্জি; বাংলাদেশ নারী মুক্তি সংসদের সৈয়দা তাহমিনা বেগম এবং তৃণমূল নারী উদ্যোক্তা সোসাইটি (গ্রাসরুটস)-এর মৌলভীবাজার জেলা যুগ্ম আহ্বায়ক অন্তরা ঘোষ।
তাঁরা পৃথক বক্তব্যে বলেন, কমরেড নির্মল সেনের রাজনৈতিক আদর্শ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, অসাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি এবং নৈতিক সাংবাদিকতা বাংলাদেশের প্রগতিশীল আন্দোলনের জন্য আজও প্রেরণার উৎস। তাঁর আদর্শকে ধারণ করেই গণতান্ত্রিক, বৈষম্যহীন ও মানবিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম এগিয়ে নিতে হবে।

সম্পাদক : সৈয়দ আমিরুজ্জামান
ইমেইল : rpnewsbd@gmail.com
মোবাইল +8801716599589
৩১/এফ, তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০।
© RP News 24.com 2013-2020
Design and developed by ওয়েব নেষ্ট বিডি