বিচারপতি সৈয়দ এ বি মাহমুদ হোসেনের ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ

প্রকাশিত: ১২:৪৪ পূর্বাহ্ণ, আগস্ট ২, ২০২৬

বিচারপতি সৈয়দ এ বি মাহমুদ হোসেনের ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ

Manual5 Ad Code
  • আইন, বিচার ও সাহিত্যাঙ্গনের উজ্জ্বল নক্ষত্রকে স্মরণ

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা, ০২ আগস্ট ২০২৬ : বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার ইতিহাসে এক অনন্য ব্যক্তিত্ব, প্রখ্যাত আইনবিদ, সাবেক প্রধান বিচারপতি, বিশিষ্ট লেখক ও অনুবাদক বিচারপতি সৈয়দ এ বি মাহমুদ হোসেনের ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ।

দিবসটি উপলক্ষে পরিবারের সদস্য, আইনজীবী সমাজ, বিচার বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারী, বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং দেশের বিশিষ্টজনেরা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন।

মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে প্রধান বিচারপতি সৈয়দ এ বি মাহমুদ হোসেন স্মৃতি সংসদের উদ্যোগে রোববার বাদ জোহর রাজধানীর হাইকোর্ট মাজার মসজিদে দোয়া ও মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে। এতে তাঁর আত্মার মাগফিরাত কামনা করে বিশেষ দোয়া করা হবে।

বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার বিকাশ, সাংবিধানিক আইন ব্যাখ্যা এবং মানবিক মূল্যবোধভিত্তিক বিচার দর্শনের ক্ষেত্রে বিচারপতি সৈয়দ এ বি মাহমুদ হোসেনের অবদান আজও গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতি এবং পরবর্তীতে দেশের প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করে তিনি বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম ও শিক্ষাজীবন

বিচারপতি সৈয়দ এ বি মাহমুদ হোসেন ১৯১৬ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের হবিগঞ্জ জেলার লস্করপুর ইউনিয়নের এক সম্ভ্রান্ত জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন তরফ রাজ্যের লস্করপুর হাবিলীর জমিদার, খ্যাতিমান কথাসাহিত্যিক ও কবি সৈয়দ আব্দুল মোতাকাব্বির আবুল হোসেন। পারিবারিকভাবে সাহিত্য, সংস্কৃতি ও জ্ঞানচর্চার পরিবেশে বেড়ে ওঠা মাহমুদ হোসেন পরবর্তীকালে বিচারক, লেখক ও অনুবাদক হিসেবে অসামান্য খ্যাতি অর্জন করেন।

শিক্ষাজীবন সমাপ্তির পর ১৯৪০ সালে তিনি ঢাকা জেলা আদালতে আইন পেশায় যোগদান করেন। কর্মজীবনের শুরুতেই তিনি কিছু সময় দারুল আলম আহসানিয়া মাদ্রাসার অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে ১৯৪২ সালে হবিগঞ্জ মহকুমা আদালতে যোগ দেন এবং ১৯৪৩ থেকে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত সহকারী সরকারি উকিল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

Manual7 Ad Code

আইনজীবী থেকে প্রধান বিচারপতি

১৯৪৮ সালে তিনি ঢাকা হাইকোর্টে আইন ব্যবসা শুরু করেন। দক্ষতা, প্রজ্ঞা ও আইনি জ্ঞানের কারণে তিনি দ্রুত আইন অঙ্গনে নিজস্ব অবস্থান তৈরি করেন। ১৯৫১ সালে পাকিস্তানের ফেডারেল কোর্টের অ্যাটর্নি হিসেবে তালিকাভুক্ত হন এবং ১৯৫৮ সালে পাকিস্তান সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র অ্যাডভোকেটের মর্যাদা লাভ করেন।

১৯৬৫ সালে তিনি হাইকোর্টের বিচার বিভাগীয় বেঞ্চে বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পান। বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি বহু গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক ও প্রশাসনিক বিষয়ে যুগান্তকারী রায় প্রদান করেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর তিনি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৭৫ সালের নভেম্বর মাসে তিনি বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন। অত্যন্ত সুনাম ও দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন শেষে ১৯৭৮ সালে তিনি অবসর গ্রহণ করেন। প্রধান বিচারপতি হিসেবে তাঁর দায়িত্ব পালনকাল দেশের বিচার বিভাগের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়।

Manual7 Ad Code

যুগান্তকারী রায় ও বিচার দর্শন

বিচারপতি সৈয়দ এ বি মাহমুদ হোসেনের দেওয়া বহু রায় পরবর্তীকালে বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থায় দিকনির্দেশনামূলক হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। বিশেষ করে মাহবুব হোসেন মামলায় তাঁর প্রদত্ত রায় আইনের শিক্ষার্থী, গবেষক এবং বিচারকদের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।

সে রায়ে তিনি বলেন, সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীরা সরাসরি প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী হিসেবে গণ্য না হলেও তাদের সঙ্গে নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের সম্পর্ককে সাধারণ প্রভু-ভৃত্যের সম্পর্ক হিসেবে দেখা যায় না। তাদের চাকরি সংবিধিবদ্ধ বিধি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে তাদের চাকরি থেকে বরখাস্ত করা যায় না। এই রায় পরবর্তীকালে কর্মসংস্থান আইন ও প্রশাসনিক আইনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়।

সাহিত্য ও অনুবাদে অবদান

আইনজ্ঞ পরিচয়ের পাশাপাশি বিচারপতি সৈয়দ এ বি মাহমুদ হোসেন ছিলেন একজন বিশিষ্ট লেখক ও অনুবাদক। ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক সাহিত্যচর্চার প্রতিও তাঁর গভীর অনুরাগ ছিল। তিনি হযরত আব্দুল কাদের জিলানী (রহ.) রচিত ফার্সি ভাষার বিখ্যাত গ্রন্থ দিওয়ান-ই-গওসিয়া ইংরেজি ও বাংলায় অনুবাদ করেন। তাঁর এই অনুবাদ কর্ম বাংলা ভাষাভাষী পাঠকদের কাছে সুফি সাহিত্য ও আধ্যাত্মিক জ্ঞানচর্চার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে।

মৃত্যু ও উত্তরাধিকার

১৯৮২ সালের ২ আগস্ট তিনি ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুর চার দশকেরও বেশি সময় পর আজও তিনি বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা, আইন অঙ্গন এবং সাহিত্য জগতে সমানভাবে স্মরণীয় ও শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে বিবেচিত।

আইনের শাসন, ন্যায়বিচার, মানবিক মূল্যবোধ এবং জ্ঞানচর্চার যে উত্তরাধিকার তিনি রেখে গেছেন, তা বাংলাদেশের বিচার বিভাগের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে রয়েছে।

বিভিন্ন মহলের শ্রদ্ধা নিবেদন

বিচারপতি সৈয়দ এ বি মাহমুদ হোসেনের ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি সৈয়দ দস্তগীর হোসেন তাঁর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন। এক বিবৃতিতে তিনি বিচারপতি মাহমুদ হোসেনকে দেশের বিচারব্যবস্থার অন্যতম আলোকবর্তিকা হিসেবে উল্লেখ করেন।

এছাড়া বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির মৌলভীবাজার জেলা সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য, ইংরেজি দৈনিক দ্য ফিনান্সিয়াল পোস্ট ও সাপ্তাহিক নতুন কথা-এর বিশেষ প্রতিনিধি, আরপি নিউজের সম্পাদক এবং বিশিষ্ট কলামিস্ট কমরেড সৈয়দ আমিরুজ্জামানও তাঁর প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন।

Manual1 Ad Code

মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আরও শ্রদ্ধা জানিয়েছেন বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির মৌলভীবাজার জেলা শাখার সম্পাদক তাপস ঘোষ; শ্রীমঙ্গল উপজেলা শাখার সভাপতি দেওয়ান মাসুকুর রহমান ও সাধারণ সম্পাদক জালাল উদ্দীন; শ্রীমঙ্গল পৌর শাখার সভাপতি শেখ জুয়েল রানা ও সাধারণ সম্পাদক রোহেল আহমদ; বাংলাদেশ যুবমৈত্রীর শ্রীমঙ্গল উপজেলা শাখার সভাপতি জামাল মুশরাফিয়া; বাংলাদেশ ছাত্রমৈত্রীর মৌলভীবাজার জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক অজিত বোনার্জি; বাংলাদেশ নারী মুক্তি সংসদের সৈয়দা তাহমিনা বেগম এবং তৃণমূল নারী উদ্যোক্তা সোসাইটি (গ্রাসরুটস)-এর মৌলভীবাজার জেলা যুগ্ম আহ্বায়ক অন্তরা ঘোষ।

অন্যদিকে, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের বেঞ্চ অফিসার সৈয়দ আক্রামুজ্জামান নাদিমও পৃথক এক বার্তায় বিচারপতি সৈয়দ এ বি মাহমুদ হোসেনের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

বিচারপতি সৈয়দ এ বি মাহমুদ হোসেনের জীবন ও কর্ম প্রমাণ করে যে ন্যায়বিচারের প্রতি অবিচল নিষ্ঠা, প্রজ্ঞা, মানবিকতা এবং জ্ঞানচর্চার সমন্বয় একজন মানুষকে ইতিহাসে অমর করে রাখতে পারে। বাংলাদেশের বিচার বিভাগের ইতিহাসে তিনি চিরকাল এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে থাকবেন।

Manual2 Ad Code

বিচারের দীপশিখা
—সৈয়দ আমিরুজ্জামান

আজ স্মৃতির প্রাঙ্গণে নত হয়েছে প্রাণ,
জ্বলে ওঠে শ্রদ্ধার দীপ, গায় ইতিহাস-গান।
ন্যায়ের দীপ্ত অঙ্গীকার, সত্যের অটল শপথ,
আপনার জীবনভরা ছিল আলোরই রথ।

বিচারের প্রতিটি পথে প্রজ্ঞার দীপ জ্বেলে,
অন্যায়ের অন্ধকারে দাঁড়িয়েছেন অবহেলে।
সংবিধানের মর্যাদা, আইনের মহিমা,
আপনারই কর্মধারা করেছে মহিমাময় সীমা।

বিচারকের আসন ছিল সেবার পবিত্র স্থান,
ক্ষমতার নয়, ন্যায়ের ছিল চিরন্তন আহ্বান।
সাহসী রায়ে প্রতিষ্ঠিত মানবাধিকারের বাণী,
আজও তারই প্রতিধ্বনি শোনে দেশের প্রাণী।

কলমেও ছিলেন আপনি জ্ঞানের অনির্বাণ আলো,
অনুবাদের সুধাধারায় ফুটিয়েছেন ভালো।
সুফি সাধনার অমৃতবাণী বাংলার হৃদয়জুড়ে,
ছড়িয়ে দিলেন প্রেমের বীজ নীরব সুরের সুরে।

জমিদার-ঘরের ঐতিহ্য, বিদ্যার স্নিগ্ধ ছায়া,
জীবনজুড়ে সত্যসাধন—ছিল আপনার মায়া।
বিচার, সাহিত্য, মানবতায় গড়েছেন এক সেতু,
যুগের পরে যুগ বলবে—আপনি অনন্য কেতু।

চুয়াল্লিশ বছরের ব্যবধান পেরিয়ে আজও তাই,
শ্রদ্ধার অর্ঘ্য নিয়ে সবাই স্মরণ করে ভাই।
আপনার সেই আদর্শ আজ পথের দিশারি,
ন্যায়ের পক্ষে অটল থাকার অমল অঙ্গীকারই।

যতদিন এই বাংলাদেশ উচ্চারণ করবে আইন,
ততদিন আপনার নাম জ্বলবে অক্ষয় ঋণ।
প্রধান বিচারপতি, প্রাজ্ঞ মনীষী, আলোকিত মহীয়ান,
বাংলার ন্যায়-ইতিহাসে আপনি চির অম্লান।

বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মরি আজ আপনার কর্মগাঁথা,
মানবতার জয়গানই হোক আমাদের প্রার্থনা।
সত্য, ন্যায় আর প্রজ্ঞার হোক অনন্ত আবাহন—
বিচারপতি সৈয়দ এ বি মাহমুদ হোসেন,
বাংলার হৃদয়ে থাকুন চিরকাল অমর, অনির্বাণ।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ