বছরে ৯ হাজার নারী জরায়ুমুখের ক্যান্সারে আক্রান্ত, অর্ধেকের মৃত্যু

প্রকাশিত: ১০:০০ অপরাহ্ণ, জুন ২৯, ২০২৬

বছরে ৯ হাজার নারী জরায়ুমুখের ক্যান্সারে আক্রান্ত, অর্ধেকের মৃত্যু

Manual5 Ad Code
  • এইচপিভি প্রতিরোধে টিকাদান, স্ক্রিনিং ও সচেতনতা বাড়ানোর তাগিদ বিশেষজ্ঞদের

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা, ২৯ জুন ২০২৬ : বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ৯ হাজার নারী জরায়ুমুখের ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছেন এবং সময়মতো রোগ শনাক্ত ও চিকিৎসা না পাওয়ার কারণে আক্রান্তদের প্রায় অর্ধেকের মৃত্যু হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জরায়ুমুখের ক্যান্সার এমন একটি রোগ যা যথাসময়ে এইচপিভি (হিউম্যান প্যাপিলোমাভাইরাস) টিকাদান, নিয়মিত স্ক্রিনিং এবং কার্যকর চিকিৎসার মাধ্যমে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রতিরোধ করা সম্ভব। তবে সচেতনতার ঘাটতি, স্ক্রিনিং সুবিধার সীমাবদ্ধতা এবং চিকিৎসাসেবার অসম প্রাপ্যতা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে দেশে এইচপিভি প্রতিরোধ কর্মসূচি আরও সম্প্রসারণ, ছেলে ও মেয়ে উভয়কে টিকার আওতায় আনা, ডিএনএভিত্তিক আধুনিক পরীক্ষার প্রসার এবং গবেষণাভিত্তিক নীতি বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

সোমবার (২৯ জুন ২০২৬) রাজধানীর শাহবাগে বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালে আয়োজিত ইন্টারন্যাশনাল প্যাপিলোমাভাইরাস সোসাইটি (আইপিভিএস) বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তারা এসব মতামত তুলে ধরেন।

বিশ্বজুড়ে অন্যতম সাধারণ যৌনবাহিত সংক্রমণ

অনুষ্ঠানে আইপিভিএস বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের লিড অধ্যাপক ডা. আশরাফুন্নেছা বলেন, এইচপিভি বিশ্বের সবচেয়ে সাধারণ যৌনবাহিত সংক্রমণগুলোর একটি। ভাইরাসটির ২০০টিরও বেশি ধরন রয়েছে, যার মধ্যে অন্তত ১৪টি উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ এবং ক্যান্সার সৃষ্টিকারী।

তিনি জানান, এইচপিভি-১৬ এবং এইচপিভি-১৮ টাইপ জরায়ুমুখের ক্যান্সারের প্রায় ৭১ শতাংশ ঘটনার জন্য দায়ী। এছাড়া এই ভাইরাস পায়ুপথ, মুখগহ্বর, যোনিপথ ও পুরুষাঙ্গের ক্যান্সারের সঙ্গেও সম্পর্কিত।

ডা. আশরাফুন্নেছা বলেন, “জরায়ুমুখের ক্যান্সার নারীদের জন্য একটি নীরব ঘাতক। প্রাথমিক পর্যায়ে রোগটির তেমন কোনো উপসর্গ না থাকায় অধিকাংশ রোগী দেরিতে চিকিৎসকের কাছে আসেন। ফলে চিকিৎসা জটিল হয়ে পড়ে এবং মৃত্যুঝুঁকি বেড়ে যায়।”

দেশে এইচপিভি সংক্রমণের চিত্র

বাংলাদেশে সাধারণ নারীদের মধ্যে উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ এইচপিভি সংক্রমণের হার ৪ দশমিক ২ শতাংশ বলে জানান তিনি। তবে অঞ্চলভেদে এই হার ভিন্ন।

তার তথ্য অনুযায়ী, উপকূলীয় এলাকায় উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ এইচপিভির প্রাদুর্ভাব ২ দশমিক ৫৬ শতাংশ এবং হাসপাতালভিত্তিক গবেষণায় শহর ও গ্রামের নারীদের মধ্যে প্রায় ৩ দশমিক ৬ শতাংশ সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব পরিসংখ্যান তুলনামূলকভাবে কম মনে হলেও দেশের বিপুল জনসংখ্যার প্রেক্ষাপটে এটি একটি বড় জনস্বাস্থ্য ঝুঁকির ইঙ্গিত বহন করে।

সরকারের টিকাদান কর্মসূচির অগ্রগতি

জরায়ুমুখের ক্যান্সার প্রতিরোধে সরকারের বর্তমান উদ্যোগের প্রশংসা করে ডা. আশরাফুন্নেছা বলেন, বর্তমানে স্কুলের পঞ্চম থেকে নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী এবং কমিউনিটির ১০ থেকে ১৪ বছর বয়সী মেয়েদের এক ডোজ এইচপিভি টিকা প্রদান করা হচ্ছে।

Manual8 Ad Code

তিনি জানান, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত লক্ষ্যমাত্রাভুক্ত কিশোরীদের ৮৮ দশমিক ৭ শতাংশকে এই কর্মসূচির আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সাফল্য ধরে রাখতে হলে টিকাদান কর্মসূচিকে আরও বিস্তৃত করতে হবে এবং বিদ্যালয়ের বাইরে থাকা কিশোরীদেরও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

Manual1 Ad Code

স্ক্রিনিং ব্যবস্থার সম্প্রসারণ প্রয়োজন

বর্তমানে দেশে ৬০১টি ভিআইএ (Visual Inspection with Acetic Acid) কেন্দ্র এবং ৫২টি কল্পোস্কোপি ক্লিনিকের মাধ্যমে জরায়ুমুখের ক্যান্সার শনাক্তকরণ সেবা দেওয়া হচ্ছে।

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, স্ক্রিনিং সুবিধা থাকলেও অনেক নারী এ সম্পর্কে জানেন না অথবা নিয়মিত পরীক্ষা করাতে আগ্রহী নন। ফলে বিপুলসংখ্যক রোগী রোগের অগ্রসর পর্যায়ে শনাক্ত হচ্ছেন।

আইপিভিএস বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের লিড অধ্যাপক ডা. কামরুন নাহার বলেন, “এইচপিভি-সম্পর্কিত রোগমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলাই আমাদের লক্ষ্য। এ জন্য টিকাদান, স্ক্রিনিং, গবেষণা, তথ্য-প্রমাণভিত্তিক নীতি প্রণয়ন এবং সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।”

ছেলে-মেয়ে উভয়ের টিকাদানের দাবি

বাংলাদেশ গাইনিকোলজিক্যাল অনকোলজি সোসাইটির (জিওএসবি) সভাপতি অধ্যাপক সাবেরা খাতুন বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে শুধুমাত্র মেয়েদের নয়, ১১ থেকে ২১ বছর বয়সী ছেলে ও মেয়ে উভয়কেই এইচপিভি টিকার আওতায় আনার সময় এসেছে।

তিনি বলেন, “এইচপিভি শুধু নারীদের রোগ নয়। পুরুষদের মধ্যেও ভাইরাসটি সংক্রমিত হতে পারে এবং তারা সংক্রমণ বিস্তারে ভূমিকা রাখতে পারে। তাই জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার স্বার্থে ছেলে ও মেয়েদের একসঙ্গে টিকাদান কার্যক্রম পরিচালনা করা প্রয়োজন।”

একই সঙ্গে তিনি ডিএনএভিত্তিক এইচপিভি পরীক্ষা এবং সেলফ-টেস্টিং পদ্ধতি চালুর আহ্বান জানান। তার মতে, এসব আধুনিক পদ্ধতি চালু হলে প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্তকরণ আরও সহজ হবে।

Manual8 Ad Code

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ৯০-৭০-৯০ লক্ষ্য

আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী ড. ফেরদৌসী কাদরী বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) জরায়ুমুখের ক্যান্সার নির্মূলে ৯০-৭০-৯০ কৌশল গ্রহণ করেছে।

এই কৌশল অনুযায়ী—

৯০ শতাংশ কিশোরীকে এইচপিভি টিকার আওতায় আনতে হবে,

৭০ শতাংশ নারীকে নিয়মিত স্ক্রিনিংয়ের আওতায় আনতে হবে,

এবং শনাক্ত হওয়া ৯০ শতাংশ রোগীর যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে।

ড. কাদরী বলেন, “এই লক্ষ্য অর্জন করা গেলে আগামী কয়েক দশকের মধ্যে জরায়ুমুখের ক্যান্সারের বোঝা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।”

আইইডিসিআরের সক্রিয় ভূমিকা

রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ডা. কাজী আহম্মেদ জাকী বলেন, ৯০-৭০-৯০ কৌশল বাস্তবায়নে আইইডিসিআর সক্রিয়ভাবে কাজ করছে।

তিনি বলেন, “নীতিগতভাবে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এখন প্রয়োজন বিভিন্ন পর্যায়ের প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যকর্মী এবং স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ।”

বাস্তবায়নই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ

বিএমইউর সাবেক উপাচার্য ও বিশিষ্ট ভাইরোলজিস্ট অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম মনে করেন, পরিকল্পনার অভাব নয়, বরং বাস্তবায়নের দুর্বলতাই বড় সমস্যা।

তিনি বলেন, “দেশে স্বাস্থ্যসেবার অবকাঠামো উন্নত হয়েছে, কিন্তু সেবার মান এখনো কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। তাই মাঠপর্যায়ে কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।”

তার মতে, ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে স্ক্রিনিং সুবিধা আরও সহজলভ্য করা এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধি জরুরি।

উদ্বেগ বাড়াচ্ছে কম বয়সী আক্রান্ত

অনুষ্ঠানে বিএমইউর প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. মো. আবুল কালাম আজাদ জানান, গত দুই বছরে দেশে প্রায় ৪ হাজার এইচপিভি আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়েছেন।

তিনি বলেন, “আক্রান্তদের মধ্যে অনেকের বয়স কম এবং অনেকে অবিবাহিত। বিষয়টি জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগজনক এবং প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম আরও জোরদারের প্রয়োজনীয়তার ইঙ্গিত দেয়।”

Manual2 Ad Code

সচেতনতা ছাড়া সফলতা সম্ভব নয়

বিশেষজ্ঞদের মতে, জরায়ুমুখের ক্যান্সার প্রতিরোধে টিকাদান ও স্ক্রিনিংয়ের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখনো অনেক নারী নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করান না এবং রোগের প্রাথমিক লক্ষণ সম্পর্কে অবগত নন।

তাদের মতে, গণমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় ও সামাজিক সংগঠন এবং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে সম্পৃক্ত করে ব্যাপক জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।

সামনে করণীয়

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জরায়ুমুখের ক্যান্সার নির্মূলের লড়াইয়ে বাংলাদেশ ইতোমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জন করেছে। তবে টিকাদানের পরিধি বাড়ানো, ছেলে-মেয়েদের সমানভাবে অন্তর্ভুক্ত করা, আধুনিক পরীক্ষার ব্যবস্থা চালু করা, গবেষণা জোরদার করা এবং সর্বোপরি মাঠপর্যায়ে কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত না হলে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে।

তাদের মতে, সময়মতো টিকা, নিয়মিত স্ক্রিনিং এবং দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে প্রতি বছর হাজারো নারীর জীবন রক্ষা করা সম্ভব হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে জরায়ুমুখের ক্যান্সারকে জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে উল্লেখযোগ্যভাবে নিয়ন্ত্রণে আনা যাবে।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ