বরেণ্য শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার আর নেই

প্রকাশিত: ১০:৪০ পূর্বাহ্ণ, জুন ২৯, ২০২৬

বরেণ্য শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার আর নেই

Manual8 Ad Code
  • শিল্প, পাপেট ও শিশু সংস্কৃতির এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের বিদায়

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা, ২৯ জুন ২০২৬ : দেশের শিল্প, সংস্কৃতি ও শিশু-কিশোর সৃজনশীলতার জগতে এক অপূরণীয় শূন্যতা সৃষ্টি করে না-ফেরার দেশে চলে গেলেন বরেণ্য শিল্পী, চিত্রকর, পাপেটশিল্পের পথিকৃৎ এবং সাংস্কৃতিক সংগঠক মুস্তাফা মনোয়ার।

সোমবার (২৯ জুন ২০২৬) সকালে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯০ বছর।

স্কয়ার হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, দীর্ঘদিন ধরে তিনি নিউমোনিয়া ও প্রোস্টেট ক্যানসারে ভুগছিলেন। চলতি মাসের ১৪ জুন শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় সোমবার সকাল সাড়ে ৮টায় তাঁর মৃত্যু হয়।

মুস্তাফা মনোয়ারের মৃত্যুতে দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গন, শিল্পী সমাজ, শিক্ষাবিদ, রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনগুলোর মধ্যে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। তাঁকে বাংলাদেশের পাপেট আন্দোলনের জনক এবং শিশু সংস্কৃতি বিকাশের অন্যতম প্রধান কারিগর হিসেবে স্মরণ করা হচ্ছে।

শেষ বিদায়ের আয়োজন

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, সোমবার রাতে শিল্পীর মরদেহ স্কয়ার হাসপাতালের হিমঘরে সংরক্ষণ করা হবে। আগামীকাল মঙ্গলবার (৩০ জুন) সকাল ৯টায় বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) প্রাঙ্গণে তাঁর প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হবে।

এরপর বেলা ১১টায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য তাঁর মরদেহ রাখা হবে। বাদ জোহর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। পরে চারুকলা অনুষদে নেওয়া হবে তাঁর মরদেহ, যেখানে শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও শিল্পী সমাজ তাঁকে শেষ শ্রদ্ধা জানাবেন।

সবশেষে বনানী কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হবে।

ধানমন্ডির বাসভবনে শোকের ছায়া

মুস্তাফা মনোয়ারের মৃত্যুসংবাদ ছড়িয়ে পড়ার পর রাজধানীর ধানমন্ডির ১ নম্বর সড়কে অবস্থিত তাঁর বাসভবনে ভিড় জমান পরিবারের সদস্য, আত্মীয়স্বজন, সহকর্মী, শিল্পী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও শুভানুধ্যায়ীরা।

সকাল সাড়ে ১০টার দিকে তাঁর মরদেহবাহী ফ্রিজিং ভ্যান বাসভবনে পৌঁছালে সেখানে এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়।

শ্রদ্ধা জানাতে উপস্থিত ছিলেন শিল্পী ইমেরিটাস অধ্যাপক রফিকুন নবী, গ্যালারি চিত্রকের নির্বাহী পরিচালক মনিরুজ্জামান, বাংলাদেশ টেলিভিশনের মহাপরিচালক মো. মাহবুবুল আলম, অভিনেতা তারিক আনাম খান, বিশিষ্ট পাপেটশিল্পী জিল্লুর রহমান, তামান্না তিথি, সোহেল আহমেদ, খালিদ আহমেদ, মো. নোমান, অনুকূল দাসসহ সংস্কৃতি অঙ্গনের বহু বিশিষ্টজন।

রাষ্ট্র ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের শোক

মুস্তাফা মনোয়ারের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়, বাংলা একাডেমি, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলনসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠন।

শোকবার্তায় তাঁরা বলেন, মুস্তাফা মনোয়ার শুধু একজন শিল্পী ছিলেন না; তিনি ছিলেন বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক জাগরণ, শিশু-কিশোর বিকাশ এবং সৃজনশীল শিক্ষার এক উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা। তাঁর মৃত্যু দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি।

Manual2 Ad Code

ওয়ার্কার্স পার্টির শোক

বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি কমরেড মাহমুদুল হাসান মানিক এবং ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক কমরেড নূর আহমেদ বকুল পৃথক শোকবার্তায় গভীর শোক প্রকাশ করেন।

নেতৃবৃন্দ বলেন, মুস্তাফা মনোয়ার ছিলেন প্রগতিশীল সংস্কৃতি চর্চার এক নিবেদিত প্রাণ ব্যক্তিত্ব। শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও শিশু বিকাশে তাঁর অবদান জাতি চিরদিন শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে।

তাঁরা শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান এবং তাঁর আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন।

কমরেড সৈয়দ আমিরুজ্জামানের শোক

বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির মৌলভীবাজার জেলা সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য, আরপি নিউজের সম্পাদক ও বিশিষ্ট কলামিস্ট কমরেড সৈয়দ আমিরুজ্জামান এক শোকবার্তায় বলেন, “মুস্তাফা মনোয়ার ছিলেন বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতির এক জীবন্ত প্রতিষ্ঠান। তিনি শিল্পকে মানুষের কাছে নিয়ে গেছেন, শিশুদের কল্পনার জগৎকে সমৃদ্ধ করেছেন এবং পাপেটশিল্পকে জাতীয় পর্যায়ে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তাঁর মৃত্যুতে দেশ একজন অসাধারণ শিল্পী, শিক্ষক, সংগঠক ও সাংস্কৃতিক দূরদর্শীকে হারালো।”

তিনি আরও বলেন, “ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সাংস্কৃতিক পুনর্গঠন পর্যন্ত প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ে মুস্তাফা মনোয়ারের সক্রিয় উপস্থিতি ছিল। তাঁর সৃষ্টিকর্ম আগামী প্রজন্মকে দেশপ্রেম, মানবিকতা ও সৃজনশীলতার শিক্ষা দিয়ে যাবে।”

শৈশব থেকেই শিল্পচর্চার প্রতি আকর্ষণ

১৯৩৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর কবি গোলাম মোস্তফার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন মুস্তাফা মনোয়ার। শৈশব থেকেই তাঁর ঝোঁক ছিল ছবি আঁকা ও সংগীতের প্রতি।

বিদ্যালয়ে পড়ার সময় তিনি রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন। নবম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত অবস্থায় ভাষা আন্দোলনের কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়ার কারণে তাঁকে কারাবরণও করতে হয়।

ছাত্রজীবন থেকেই তাঁর শিল্পীসত্তা বিকশিত হতে থাকে এবং পরবর্তীকালে তিনি বাংলাদেশের অন্যতম প্রভাবশালী শিল্প ব্যক্তিত্বে পরিণত হন।

Manual4 Ad Code

শহীদ মিনারের লাল সূর্যের অন্যতম স্থপতি

Manual6 Ad Code

বাংলাদেশের জাতীয় চেতনার অন্যতম প্রতীক কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পেছনের লাল সূর্যের নকশা ও স্থাপত্য ভাবনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল মুস্তাফা মনোয়ারের।

ভাষা আন্দোলনের চেতনাকে শিল্পের মাধ্যমে ধারণ করার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয়।

‘পারুল’ থেকে ‘মীনা’: শিশুদের প্রিয় স্রষ্টা

মুস্তাফা মনোয়ার সৃষ্ট জনপ্রিয় চরিত্র ‘পারুল’ একসময় শিশু-কিশোরদের কাছে অত্যন্ত পরিচিত ও প্রিয় হয়ে ওঠে।

পরবর্তীকালে দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে জনপ্রিয় শিশুতোষ চরিত্র ‘মীনা’-র সঙ্গেও তিনি ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন। শিশুদের অধিকার, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সচেতনতা তৈরিতে এই চরিত্রগুলোর মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করা হয়।

‘নতুন কুঁড়ি’: প্রতিভা বিকাশের এক অনন্য মঞ্চ

বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রচারিত শিশু-কিশোরদের প্রতিভা বিকাশমূলক অনুষ্ঠান ‘নতুন কুঁড়ি’-র অন্যতম রূপকার ছিলেন মুস্তাফা মনোয়ার।

এই অনুষ্ঠান থেকে দেশের অসংখ্য শিল্পী, সংগীতশিল্পী, আবৃত্তিকার ও সাংস্কৃতিক কর্মীর উত্থান ঘটেছে। এখনও এটি বাংলাদেশের টেলিভিশন ইতিহাসের অন্যতম জনপ্রিয় ও প্রভাবশালী অনুষ্ঠান হিসেবে বিবেচিত হয়।

তাঁর নির্মিত আরেক জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘মনের কথা’ দর্শকদের ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করেছিল।

মুক্তিযুদ্ধ ও পাপেট আন্দোলনের পথিকৃৎ

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতের শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেওয়া শিশুদের আতঙ্কগ্রস্ত ও বিষণ্ন মুখ মুস্তাফা মনোয়ারকে গভীরভাবে ব্যথিত করেছিল।

শিশুদের কিছুটা আনন্দ দেওয়ার উদ্দেশ্যে তিনি সেখানে জীবনের প্রথম পাপেট শোর আয়োজন করেন। সেই উদ্যোগই পরবর্তীকালে বাংলাদেশের পাপেট আন্দোলনের ভিত্তি হয়ে ওঠে।

Manual2 Ad Code

স্বাধীনতার পর তিনি পাপেটকে শুধু বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে নয়, শিক্ষা, সামাজিক সচেতনতা ও সৃজনশীল বিকাশের কার্যকর মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। এ কারণেই তিনি দেশজুড়ে পরিচিতি পান ‘বাংলাদেশের পাপেটম্যান’ হিসেবে।

দীর্ঘ কর্মজীবনের উজ্জ্বল অধ্যায়

মুস্তাফা মনোয়ারের পেশাজীবনের শুরু পূর্ব পাকিস্তান চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ের প্রভাষক হিসেবে। পরবর্তীতে তিনি বাংলাদেশ শিশু একাডেমি, বাংলাদেশ টেলিভিশন, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন সংস্থা (বিএফডিসি), বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে উচ্চপদে দায়িত্ব পালন করেন।

শিক্ষক, প্রশাসক, শিল্পী, সংগঠক এবং সাংস্কৃতিক দূত—প্রতিটি ভূমিকায় তিনি সাফল্যের স্বাক্ষর রেখেছেন।

একুশে পদকসহ বহু সম্মাননা

বাংলাদেশের শিল্পকলায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০৪ সালে তাঁকে দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা একুশে পদক প্রদান করা হয়।

এ ছাড়া দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে তিনি অসংখ্য পুরস্কার, সম্মাননা ও স্বীকৃতি লাভ করেন।

এক অনন্য উত্তরাধিকার

মুস্তাফা মনোয়ার ছিলেন এমন এক শিল্পী, যিনি ক্যানভাসের সীমা ছাড়িয়ে শিশুদের স্বপ্ন, জাতির ইতিহাস, সাংস্কৃতিক চেতনা এবং মানবিক মূল্যবোধকে শিল্পের মাধ্যমে মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। তাঁর সৃষ্ট চরিত্র, অনুষ্ঠান, পাপেট আন্দোলন এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতির ইতিহাসে স্থায়ীভাবে স্থান করে নিয়েছে।

তাঁর প্রয়াণে একটি অধ্যায়ের অবসান ঘটলেও তাঁর কর্ম, দর্শন ও সৃষ্টিশীল উত্তরাধিকার প্রজন্মের পর প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করবে। বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে মুস্তাফা মনোয়ারের নাম চিরকাল শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হবে।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ