হরিজন জনগোষ্ঠীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় নতুন নেতৃত্ব

প্রকাশিত: ১২:৩০ পূর্বাহ্ণ, জুন ২৭, ২০২৬

হরিজন জনগোষ্ঠীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় নতুন নেতৃত্ব

Manual2 Ad Code
  • সুরেশ বাঁশফোর সভাপতি, প্রশান্ত হাঁড়ি সাধারণ সম্পাদক; ৫১ সদস্যের কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা, ২৭ জুন ২০২৬ : বাংলাদেশের হরিজন জনগোষ্ঠীর নাগরিক, সামাজিক ও মানবিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনকে আরও শক্তিশালী করতে বাংলাদেশ হরিজন অধিকার আদায় সংগঠনের প্রথম কেন্দ্রীয় কাউন্সিলে নতুন নেতৃত্ব নির্বাচিত হয়েছে।

কাউন্সিলে সুরেশ বাঁশফোরকে সভাপতি এবং প্রশান্ত হাঁড়িকে সাধারণ সম্পাদক করে ৫১ সদস্যবিশিষ্ট কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন করা হয়েছে।

শুক্রবার (২৬ জুন ২০২৬) রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন, বাংলাদেশ (আইইবি) সেমিনার কক্ষে দিনব্যাপী আয়োজিত এই কাউন্সিলে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আগত প্রতিনিধিরা অংশ নেন। সংগঠনের নেতাকর্মীদের পাশাপাশি বিভিন্ন মানবাধিকার, সংখ্যালঘু ও সামাজিক ন্যায়বিচারভিত্তিক সংগঠনের প্রতিনিধিরাও এতে উপস্থিত ছিলেন।

কাউন্সিল শেষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে নবনির্বাচিত সভাপতি সুরেশ বাঁশফোর সংগঠনের ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা, দাবি-দাওয়া এবং আন্দোলনের রূপরেখা তুলে ধরে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের প্রায় ১৬ লাখ হরিজন জনগোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক বৈষম্য, অর্থনৈতিক বঞ্চনা, শিক্ষায় পশ্চাৎপদতা এবং রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের সংকটে ভুগছে। স্বাধীনতার পাঁচ দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও এই জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ এখনো মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপন, কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে নানা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি।

অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন জোরদারের প্রত্যয়

লিখিত বক্তব্যে সংগঠনের পক্ষ থেকে বলা হয়, হরিজন জনগোষ্ঠী বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে সমঅধিকার পাওয়ার সাংবিধানিক দাবিদার হলেও বাস্তবে তারা বহুমাত্রিক বৈষম্যের শিকার। বিশেষ করে শিক্ষা, আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা, সরকারি চাকরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে বিদ্যমান বৈষম্য দূর করতে কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।

নবনির্বাচিত সভাপতি সুরেশ বাঁশফোর বলেন, “হরিজন জনগোষ্ঠীর অধিকার প্রতিষ্ঠা কেবল একটি সম্প্রদায়ের দাবি নয়; এটি মানবাধিকার, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র গঠনের প্রশ্ন। আমরা সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সংগঠিত আন্দোলনের মাধ্যমে আমাদের ন্যায্য অধিকার আদায়ে কাজ করব।”

তিনি আরও বলেন, শিক্ষা বিস্তার, তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্ব বিকাশ, নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি এবং সামাজিক সচেতনতা তৈরির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় হরিজন জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার দাবিও জানান তিনি।

নতুন নেতৃত্বের অঙ্গীকার

নবনির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক প্রশান্ত হাঁড়ি বলেন, সংগঠনকে তৃণমূল পর্যায়ে আরও শক্তিশালী করা হবে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাসরত হরিজন জনগোষ্ঠীর বাস্তব সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সেগুলো সমাধানে সমন্বিত কর্মসূচি গ্রহণ করা হবে। তিনি বলেন, “আমাদের জনগোষ্ঠীর উন্নয়নের জন্য শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে সেই লক্ষ্য অর্জনে কাজ করব।”

সংগঠনের নবগঠিত কেন্দ্রীয় কমিটির সিনিয়র সহসভাপতি ওমর সিং হেলা, সাংগঠনিক সম্পাদক প্রান্ত বাঁশফোরসহ বিভিন্ন জেলার প্রতিনিধিরা সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন। তাঁরা নতুন নেতৃত্বের প্রতি আস্থা প্রকাশ করে সংগঠনের কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

সংহতি জানালেন বিভিন্ন সংগঠনের নেতারা

কাউন্সিলে সংহতি প্রকাশ করে বক্তব্য দেন বাংলাদেশ নারীমুক্তি কেন্দ্রের সভাপতি সীমা দত্ত এবং বাংলাদেশ মাইনরিটি রাইটস ফোরামের সাধারণ সম্পাদক উৎপল বিশ্বাস। বক্তারা বলেন, সামাজিক ন্যায়বিচার ও মানবাধিকারের প্রশ্নে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সংগ্রামের সঙ্গে বৃহত্তর গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে।

Manual1 Ad Code

তাঁরা হরিজন জনগোষ্ঠীর শিক্ষা, কর্মসংস্থান, আবাসন এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবনের অধিকার নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রের কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানান। পাশাপাশি সামাজিক কুসংস্কার, বৈষম্যমূলক আচরণ ও বর্ণভিত্তিক বিদ্বেষ দূর করতে সচেতনতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

দীর্ঘদিনের বঞ্চনার বাস্তবতা

বাংলাদেশে হরিজন জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ ঐতিহ্যগতভাবে পরিচ্ছন্নতাকর্মী, স্যানিটেশন শ্রমিক ও অন্যান্য নিম্নআয়ের পেশার সঙ্গে যুক্ত। মানবাধিকারকর্মীদের মতে, আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় সকল নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিত হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে এই জনগোষ্ঠীর অনেকেই শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আবাসন ও কর্মক্ষেত্রে বৈষম্যের মুখোমুখি হন।

Manual6 Ad Code

বিশেষজ্ঞদের মতে, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জন এবং একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনের জন্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। সেই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ হরিজন অধিকার আদায় সংগঠনের প্রথম কেন্দ্রীয় কাউন্সিলকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক মাইলফলক হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

Manual3 Ad Code

ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের ঘোষণা

কাউন্সিল শেষে নেতারা ঘোষণা দেন যে, হরিজন জনগোষ্ঠীর গণতান্ত্রিক ও মানবিক অধিকার নিশ্চিত করতে শিক্ষা বিস্তার, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি, সাংগঠনিক শক্তি সম্প্রসারণ এবং শান্তিপূর্ণ গণআন্দোলন অব্যাহত থাকবে। একই সঙ্গে তরুণ প্রজন্মকে নেতৃত্বে যুক্ত করে একটি শক্তিশালী ও প্রতিনিধিত্বশীল প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

Manual4 Ad Code

নতুন কমিটির নেতারা আশা প্রকাশ করেন, রাষ্ট্র, রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলোর সহযোগিতায় হরিজন জনগোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের বঞ্চনা দূর করে একটি বৈষম্যহীন ও মর্যাদাপূর্ণ সমাজ প্রতিষ্ঠার পথে অগ্রগতি সম্ভব হবে।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ