কমরেড লেনিনের দুনিয়া কাঁপানো বিখ্যাত ভাষণ, যা ‘এপ্রিল থিসিস’ নামে খ্যাত

প্রকাশিত: ১২:৪৫ পূর্বাহ্ণ, এপ্রিল ১৭, ২০২২

কমরেড লেনিনের দুনিয়া কাঁপানো বিখ্যাত ভাষণ, যা ‘এপ্রিল থিসিস’ নামে খ্যাত

Manual6 Ad Code

সৈয়দ অামিরুজ্জামান |

এপ্রিল থিসিস ছিল বলশেভিক নেতা কমরেড ভ্লাদিমির লেনিন প্রদত্ত দিকনির্দেশক দুনিয়া কাঁপানো বিখ্যাত ভাষণ।
১৯১৭ সালের ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের বিজয়ের পর এক বিশেষ পরিস্থিতিতে সুইজারল্যান্ডে দীর্ঘ নির্বাসিত জীবনের পর এপ্রিলের ৩ তারিখ রাত্রে লেনিন রাশিয়ায় ফিরে আসেন। পেত্রোগ্রাদে পৌঁছে তিনি তাৎক্ষনিকভাবেই অপেক্ষমাণ শ্রমিক ও সৈনিক জনতার সামনে এক ছোট্ট কিন্তু বিখ্যাত ভাষণ দেন, যাতে তিনি সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবে বিজয় অর্জনের আহ্বান জানান। এটাই এপ্রিল থিসিস নামে পরিচিত। পরদিন ৪ঠা এপ্রিল প্রথমে বলশেভিকদের এক বৈঠকে এবং পরে বলশেভিক ও মেনশেভিকদের এক যৌথ সভায় যুদ্ধ ও বিপ্লব সম্পর্কে তিনি এক রিপোর্ট প্রদান করেন যা তার বক্তৃতাকে পূর্ণাঙ্গ রূপ দেয়।[১]

Manual4 Ad Code

থিসিসসমূহ :

Manual6 Ad Code

এপ্রিল থিসিস বলশেভিক পত্রিকা প্রাভদায় প্রকাশিত হয়েছিল এবং শ্রমিক ও সৈনিক প্রতিনিধিদের সোভিয়েতগুলির সর্ব-রাশিয়া সম্মেলনের দুটি সভায় লেনিন ১৭ এপ্রিল ১৯১৭ তারিখে (৪ এপ্রিল রাশিয়ান পুরনো দিনপঞ্জি অনুসারে) থিসিসগুলি পড়েন।

থিসিসসমূহে লেনিনঃ[২]

সাময়িক সরকারকে বুর্জোয়া হিসেবে অভিযুক্ত করেন এবং সামান্যতম সমর্থন না করার নীতি প্রণয়ন করেন। তিনি বলেন সরকারকে সামান্যতম ছাড় দেওয়া চলবে না। বরং সাময়িক সরকারের পরদেশ দখল সংক্রান্ত প্রতিশ্রুতি ডাহা মিথ্যা তা স্পষ্ট করে দিতে হবে। তিনি প্রথম বিশ্বযুদ্ধকে পররাজ্যগ্রাসী সাম্রাজ্যবাদ হিসেবে অভিযুক্ত করেন।
রাশিয়ার পরিস্থিতির বিশেষত্বে বলেন যে, প্রলেতারিয়েতের শ্রেণীচেতনা ও সংগঠন যথেষ্ট শক্তিশালী না থাকার কারণে বিপ্লবের প্রথম পর্বে ক্ষমতা তুলে দেওয়া হয়েছে বুর্জোয়াদের হাতে, এবং সেই পর্যায় অতিক্রম করে দেশ এখন এগিয়ে যাচ্ছে বিপ্লবের দ্বিতীয় পর্বে যেখানে ক্ষমতা অবশ্যই প্রলেতারিয়েত এবং কৃষকদের সবচেয়ে গরিব অংশগুলোর হাতে হস্তান্তরিত হবে।
পরিচিত করেন যে “শ্রমিক প্রতিনিধি সোভিয়েতগুলির বেশির ভাগের মধ্যে বলশেভিকরা সংখ্যালঘু, এখন অবধি ক্ষুদ্র সংখ্যালঘু, আর আমাদের বিরুদ্ধে রয়েছে একটা জোট যেটার মধ্যে আছে সমস্ত পেটি-বুর্জোয়া সুবিধাবাদীরা, জনপ্রিয় সমাজতন্ত্রী এবং সোশ্যালিস্ট-রেভলিউশনারি থেকে শুরু করে অরগানাইজিং কমিটি (চখেইজে, সেরেতেলি আরও সব), স্তেকলোভ, আরও অনেকে, যারা বুর্জোয়াদের প্রভাবের কাছে বশ্যতাস্বীকার করেছে এবং এই প্রভাবকে প্রলেতারিয়েতের মধ্যে বিস্তৃত করেছে।”
পার্লামেন্টারি প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে ডাক দেন এবং শ্রমিক প্রতিনিধি সোভিয়েতগুলি থেকে পার্লামেন্টারি প্রজাতন্ত্রে ফিরে যাওয়া হবে একটা পশ্চাৎমুখ্য পদক্ষেপ তা বলেন। তারা চান সারা দেশে তৃণমুল থেকে উপর পর্যন্ত শ্রমিক, ক্ষেতমজুর আর কৃষক প্রতিনিধি সোভিয়েতগুলির প্রজাতন্ত্র।
পুলিশ, সেনাবাহিনী এবং আমলাতন্ত্রের বিলোপসাধনে ডাক দেন। তিনি বলেন, সকল কর্মকর্তাকে নির্বাচিত হতে হবে, “তারা সবাই হবেন যেকোন সময় অপসারণযোগ্য, তাদের কারও বেতন একজন দক্ষ শ্রমিকের গড় মজুরি অতিক্রম করতে পারবে না।”
ডাক দেন এই বলে যে, “ভূমিবিষয়ক কর্মসূচীতে গুরুত্বের ভরকেন্দ্রটা ক্ষেতমজুর প্রতিনিধি সোভিয়েতের হাতে তুলে দিতে হবে। জমিদারদের সকল ভূসম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা” হবে। এছাড়াও ডাক দেন, “দেশের সমস্ত ভূমির রাষ্ট্রীয়করণ সম্পন্ন করতে হবে, ভূমির বিলিব্যবস্থা স্থানীয় ক্ষেতমজুর এবং কৃষক সোভিয়েতগুলির হাতে হস্তান্তর করতে হবে। পৃথক পৃথক গরিব কৃষক প্রতিনিধিদের সোভিয়েত গুলির নিয়ন্ত্রণাধীনে এবং সরকারী খরচে প্রত্যেকটা বৃহৎ ভূসম্পত্তিতে একটা আদর্শ খামার স্থাপন করতে হবে (স্থানীয় আর অন্যান্য অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে এবং স্থানীয় সংস্থাগুলির সিদ্ধান্ত অনুসারে খামারের আকার ১০০ থেকে ৩০০ দেসিয়াতিনা হতে পারে।”
একটি জাতীয় ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা হবে।
একটা বিপ্লবী আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠা করা হবে যা পরে Comintern বা তৃতীয় আন্তর্জাতিক হিসেবে ১৯১৯ সালে গঠিত হয়।

Manual7 Ad Code

বুর্জোয়াদের সমালোচনা

এপ্রিল থিসিস প্রকাশিত হলে তা বিপ্লবী প্রলেতারিয়েতের শত্রুপক্ষকে খেপিয়ে তুলল। বুর্জোয়া পত্রপত্রিকায় লেনিনের বিরুদ্ধে জঘন্যতম কুৎসা প্রচার করতে লাগলো। লেনিন জার্মানির ভেতর দিয়ে রুশদেশে ফিরে এসেছেন, এই ঘটনাকে ব্যবহার করে বলা হতে লাগল যে জার্মান সাম্রাজ্যবাদকে সাহায্য করবার জন্যই এই এপ্রিল থিসিস। এই তুমুল কুৎসা রটনা সত্ত্বেও ১৪ এপ্রিল তারিখে যখন বলশেভিকদের পেত্রোগ্রাদ নগর সম্মেলন অনুষ্ঠিত হলো তখন অধিকাংশ প্রতিনিধিই এপ্রিল থিসিসকে সমর্থন করলেন।রুশ দেশে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের প্রস্তুতি গড়ে তোলবার জন্যে ডাক দেয়া হলো বলশেভিকদের।[৩]

তথ্যসূত্র :

১.ভি. আই. লেনিন; সর্বহারা বিপ্লব ও দলদ্রোহী কাউৎস্কী; সেরাজুল আনোয়ার অনূদিত, গণপ্রকাশন, ঢাকা; ডিসেম্বর, ১৯৯০; পৃষ্ঠা-১২৭-১২৮।
২. First World War.com – Primary Documents – Lenin’s April Theses, April 1917
৩. দাশগুপ্ত, অমল (২০১৩)। “অক্টোবর সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবে”। কমরেড লেনিন (এনবিএ-র প্রথম সংস্করণ সংস্করণ)। কলকাতা: এনবিএ। পৃষ্ঠা ২৬৭।

সৈয়দ আমিরুজ্জামান
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট;
বিশেষ প্রতিনিধি, সাপ্তাহিক নতুনকথা;
সম্পাদক, আরপি নিউজ;
সম্পাদকমন্ডলীর সদস্য, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি, মৌলভীবাজার জেলা;
‘৯০-এর মহান গণঅভ্যুত্থানের সংগঠক ও সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ ছাত্রমৈত্রী।
সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ খেতমজুর ইউনিয়ন।
সাধারণ সম্পাদক, মাগুরছড়ার গ্যাস সম্পদ ও পরিবেশ ধ্বংসের ক্ষতিপূরণ আদায় জাতীয় কমিটি।
প্রাক্তন সভাপতি, বাংলাদেশ আইন ছাত্র ফেডারেশন।
E-mail : rpnewsbd@gmail.com
মুঠোফোন: ০১৭১৬৫৯৯৫৮৯।

Manual3 Ad Code