তেল সংকটে ডে-লাইট সেভিং টাইম কেন নয়?

প্রকাশিত: ১২:৪৫ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ২১, ২০২৬

তেল সংকটে ডে-লাইট সেভিং টাইম কেন নয়?

Manual2 Ad Code

ইয়াসমিন আরা |

অস্থির বিশ্ববাজার পালটে যাচ্ছে অর্থনীতির অঙ্ক। সকল খাতে এর প্রভাব পড়ছে ব্যাপকভাবে। ইরান যুদ্ধের প্রভাব এখন বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তেই পড়ছে। বাংলাদেশে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভোক্তাদের ওপরই পড়ে। ইতিমধ্যেই পরিবহন ভাড়া এবং এলপিজির মূল্য বেড়েছে। এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে নিত্য পণ্যের বাজারেও। এই মূল্যবৃদ্ধির কারণে পরিবহন, সব ধরনের খাদ্যদ্রব্য ও ব্যবহার্য পণ্য, ওষুধ, নির্মাণশিল্প, পোশাকসহ অন্যান্য রপ্তানিমুখী শিল্প—সব খাতের ভোক্তা ও ব্যবহারকারী সম্পর্কিত। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির নেতিবাচক প্রভাব পড়বে অর্থনীতির সব খাতে।

Manual2 Ad Code

২১ এপ্রিল মঙ্গলবার অয়েল প্রাইস ডট কমের তথ্যানুযায়ী অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের (Brent Crude) দাম ৯৫ দশমিক ৬৬ ডলার। যুদ্ধবিরতির আগে এর দাম ১১০ ডলার ছাড়িয়ে যায়। যুদ্ধের কারণে তেল সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে, ফলে উৎপাদনও কমে গেছে। যে পরিমাণ তেল কম উৎপাদিত হয়েছে, তার আর্থিক মূল্য বিপুল। রয়টার্সের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এই সময় যে পরিমাণ অপরিশোধিত তেল কম উৎপাদিত হয়েছে, তার মূল্য ৫ হাজার কোটি ডলার। স্বাভাবিকভাবেই আশঙ্কা করা হচ্ছে, এর প্রভাব আগামী কয়েক মাস বা এমনকি কয়েক বছর পর্যন্ত অনুভূত হবে। এদিকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) সতর্ক করে বলেছে ইরান যুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতিকে মন্দার দিকে ঠেলে দিতে পারে। সংস্থাটির তথ্যানুযায়ী, যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী রূপ নিলে বিশ্ব অর্থনীতি ১৯৮০ সালের পর পঞ্চম বারের মতো ভয়াবহ মন্দার মুখে পড়বে।

করোনা মহামারির ধাক্কা, ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব, অভ্যন্তরীণ বাজারের অস্থিরতা সব মিলিয়ে দেশের সাধারণ মানুষ জর্জরিত। এই প্রেক্ষাপটে ইরান যুদ্ধ পরিস্থিতি এই অবস্থাকে বিশ্ব সংকট তৈরী হয়েছে । মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত উত্তাপ ছড়িয়েছে বাংলাদেশের বাজারে, বিশেষ করে জ্বালানি খাতে। ইতিমধ্যে দেশের বাজারেও জ্বালানির মূল্য বাড়ানো হয়েছে।

Manual7 Ad Code

তেলের মূল্য বৃদ্ধির চিত্র (১৯ এপ্রিল ২০২৬ থেকে কার্যকর):

ডিজেল: প্রতি লিটার ১০০ টাকা থেকে বেড়ে ১১৫ টাকা (১৫ টাকা বৃদ্ধি),

অকটেন: প্রতি লিটার ১২০ টাকা থেকে বেড়ে ১৪০ টাকা (২০ টাকা বৃদ্ধি),

Manual6 Ad Code

পেট্রোল: প্রতি লিটার ১১৬ টাকা থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা (১৯ টাকা বৃদ্ধি),

কেরোসিন: প্রতি লিটার ১১২ টাকা থেকে বেড়ে ১৩০ টাকা (১৮ টাকা বৃদ্ধি।

গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম)-এর এক গবেষণায় বলা হয়েছে, অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ৪০ শতাংশ এবং এলএনজির দাম ৫০ শতাংশ বাড়লে দেশের প্রকৃত জিডিপি প্রায় ১ দশমিক ২ শতাংশ কমে যেতে পারে। একই সঙ্গে রপ্তানি প্রায় ২ শতাংশ এবং আমদানি ১ দশমিক ৫ শতাংশ হ্রাস পেতে পারে। প্রতিষ্ঠানটির বিশ্লেষণে আরও উঠে এসেছে, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির ফলে মূল্যস্ফীতির চাপ তীব্র হবে। এতে ভোক্তা পর্যায়ে দাম প্রায় ৪ শতাংশ বাড়তে পারে এবং প্রকৃত মজুরি প্রায় ১ শতাংশ কমে গিয়ে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ার ইঙ্গিত দেবে। ইতিমধ্যে বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার পূর্বাভাস দিয়েছে।

সেবা বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন, জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ার ফলে সাধারণ মানুষ যারা দারিদ্রসীমার কাছাকাছি রয়েছে, তাদের বিশেষ সুরক্ষার বিষয়টিতে গুরুত্বআরোপ করছে। সেইসাথে, বর্তমান পরিস্থিতিতে ব্যয় সাশ্রয়ী হতে হব। ব্যয়সাশ্রয়ী হওয়া এখন বিকল্প নয়, বাধ্যবাধকতা। ডে লাইট সেভিং টাইম (DST) হলো গ্রীষ্মকালে দিনের আলোর সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে ঘড়ির কাঁটা ১ ঘণ্টা এগিয়ে দেওয়ার একটি পদ্ধতি অনুসরণ করার এখনই উপযুক্ত সময়। এতে সন্ধ্যায় এক ঘণ্টা বেশি আলো পাওয়া যায়, যা বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ে সাহায্য করে। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU) দেশ ও যুক্তরাজ্য, সহ পৃথিবীর ৭০টি দেশ এই পদ্ধতি অনুসরণ করছে।

তেলের দাম বাড়ার কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচও বেড়ে যায় (যেহেতু ডিজেলভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু রাখা ব্যয়বহুল), তাই ডে-লাইট বা দিনের আলোর সর্বোত্তম ব্যবহার এখন অত্যন্ত জরুরি। দিনের বেলা কৃত্রিম আলো (লাইট, ফ্যান) কমিয়ে প্রাকৃতিক আলো ব্যবহার করলে বিদ্যুৎ বিল এবং রাষ্ট্রীয় লোডশেডিংয়ের চাপ কমবে। শিল্প কারখানায় দিনের আলো ব্যবহারের ব্যবস্থা থাকলে উৎপাদন খরচ কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে।

এই পরিস্থিতিতে জ্বালানি সাশ্রয় এবং দিনের আলোর কার্যকর ব্যবহারই পারে তেলের মূল্য বৃদ্ধির প্রভাব কিছুটা কমাতে। ডে লাইট সেভিং টাইম (DST) প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি সেবা বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন বিশেষভাবে বিবেচনা করার জন্য সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে।
#

ইয়াসমিন আরা
নির্বাহী পরিচালক
সেবা বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন।

Manual8 Ad Code

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ