বাংলা সাহিত্যের মহা বটবৃক্ষ কবি শঙ্ক ঘোষ স্মরণে

প্রকাশিত: ১২:১২ পূর্বাহ্ণ, এপ্রিল ২১, ২০২৬

বাংলা সাহিত্যের মহা বটবৃক্ষ কবি শঙ্ক ঘোষ স্মরণে

Manual6 Ad Code

বিশেষ প্রতিনিধি | পশ্চিম বঙ্গ (ভারত), ২১ এপ্রিল ২০২৬ : বাংলা সাহিত্যের মহা বটবৃক্ষ কবি শঙ্ক ঘোষের পঞ্চম মৃত্যুবার্ষিকী আজ।

তিনি ভারতের একজন শক্তিমান বাঙালি কবি ও সাহিত্য-সমালোচক এবং বিশিষ্ট রবীন্দ্র বিশেষজ্ঞ। তিনি ছিলেন কাব্য সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ ও জীবনানন্দ দাশের উত্তরসূরী।

তার প্রকৃত নাম চিত্তপ্রিয় ঘোষ। শঙ্খ ঘোষ সারা জীবন শিক্ষকতা করেছেন। তিনি বঙ্গবাসী কলেজ, জঙ্গীপুর কলেজ, যাদবপুর, ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ অ্যাডভান্সড স্টাডিজ (শিমলা), দিল্লি ও বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা সাহিত্যে অধ্যাপনা করেছেন।

Manual7 Ad Code

বাবরের প্রার্থনা কাব্যগ্রন্থটির জন্য তিনি ভারতের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সাহিত্য পুরস্কার সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার লাভ করেন। তার গদ্যগ্রন্থ “বটপাকুড়ের ফেনা” ২০১৬ সালে ভারতের সর্বোচ্চ সাহিত্য সম্মান জ্ঞানপীঠ পুরস্কার লাভ করে। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলির মধ্যে অন্যতম হল মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে, উর্বশীর হাসি, ওকাম্পোর রবীন্দ্রনাথ ইত্যাদি।

তিনি শঙ্খ ঘোষ নামে অধিক পরিচিত হলেও তাঁকে অন্য নামও গ্রহণ করতে দেখা যায়। দশম-একাদশ শতকের সংস্কৃত আলংকারিক কুন্তক-এর নাম তিনি গ্রহণ করেছেন নিজের আরেকটি ছদ্মনাম হিসেবে। আবার শুভময় নামটিও তাকে ব্যবহার করতে দেখা যায়।

কবি শঙ্ক ঘোষ ২০২১ সালের ১০ এপ্রিল কোভিড-১৯ রোগে আক্রান্ত হন বলে পরীক্ষায় ধরা পড়ে। এরপরে তিনি বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হন এবং ২০২১ সালের ২১ এপ্রিল কলকাতায় তাঁর নিজ বাড়িতে সকাল সাড়ে ১১টায় মারা যান।

জীবনের শুরুতে:

Manual8 Ad Code

শঙ্খ ঘোষের আসল নাম চিত্তপ্রিয় ঘোষ। তার পিতা মণীন্দ্রকুমার ঘোষ এবং মাতা অমলা ঘোষ। তিনি বর্তমান বাংলাদেশের চাঁদপুর জেলায় ১৯৩২ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন। বংশানুক্রমিকভাবে পৈত্রিক বাড়ি বাংলাদেশের বরিশাল জেলার বানারিপাড়া গ্রামে শঙ্খ ঘোষ বড় হয়েছেন। পাবনায় পিতার কর্মস্থল হওয়ায় তিনি বেশ কয়েক বছর পাবনায় অবস্থান করেন এবং সেখানকার চন্দ্রপ্রভা বিদ্যাপীঠ থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন। ১৯৫১ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বাংলায় কলা বিভাগে স্নাতক এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন।

কর্ম

তিনি বঙ্গবাসী কলেজ, সিটি কলেজ, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় সহ বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করেন। তিনি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৯২ সালে অবসর নেন। ১৯৬০ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আইওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে রাইটার্স ওয়ার্কশপে অংশগ্রহণ করেন। তিনি দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়, শিমলাতে ইন্ডিয়ান ইন্সটিটিউট অফ আডভান্স স্টাডিজ এবং বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়েও শিক্ষকতা করেন।

তার সাহিত্য সাধনা এবং জীবনযাপনের মধ্যে বারবার প্রকাশ পেয়েছে তার রাজনৈতিক সত্তা। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের ‘নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল’-এর বিরুদ্ধে বারবার তাঁকে কলম ধরতে দেখা গেছে। প্রতিবাদ জানিয়েছেন নিজের মতো করে। ‘মাটি’ নামের একটি কবিতায় নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন তিনি।

সাহিত্য চর্চা

বাংলা কবিতার জগতে শঙ্খ ঘোষ অপরিসীম অবদান রেখেছেন। ‘দিনগুলি রাতগুলি’, ‘বাবরের প্রার্থনা’, ‘মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে’, ‘গান্ধর্ব কবিতাগুচ্ছ’ তার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ।

কবি শঙ্খ ঘোষ কবিতার পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক গদ্য রচনা করেছেন। তিনি কবিতা ও গদ্য মিলিয়ে কাজ করেছেন। তিনি এক বিশিষ্ট রবীন্দ্র বিশেষজ্ঞ।

ওকাম্পোর রবীন্দ্রনাথ’, ‘এ আমির আবরণ’, ‘কালের মাত্রা ও রবীন্দ্র নাটক’ ,’ছন্দের বারান্দা’ আর ‘দামিনির গান’ তার উল্লেখযোগ্য রবীন্দ্রবিষয়ক গ্রন্থ। ‘শব্দ আর সত্য’, ‘উর্বশীর হাসি’, ‘এখন সব অলীক’ তার অন্য উল্লেখযোগ্য গদ্যগ্রন্থ। তার লেখা বছরের পর বছর দুই বাংলায় চর্চিত, জনপ্রিয় কবিতায় তিনি লিখেছেন ‘নিহিত পাতালছায়া’, ‘আদিম লতাগুল্মময়’, ‘পাঁজরে দাঁড়ের শব্দ’, ‘গান্ধর্ব কবিতাগুচ্ছ’-র মতো বই। তার পাশাপাশিই তিনি লিখেছেন ‘লাইনেই ছিলাম বাবা’ নামক কাব্যগ্রন্থ যা বিস্ফোরক রাজনৈতিক কবিতা দিয়ে ভরা। শঙ্খ ঘোষের যে কবিমানস, তার গতি দ্বিমুখী। এক দিকে সেই মন সর্বদা সজাগ সমসময়ের সমস্ত সামাজিক রাজনৈতিক ঘটনার ঘাত প্রতিঘাত বিষয়ে। সমাজের যে কোনও অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে শঙ্খ ঘোষের অতিসংবেদনশীল কবিমন গর্জন করে ওঠে। তার প্রকাশ আমরা দেখি কখনও কখনও তীব্র শ্লেষে, ব্যঙ্গাত্মক ভাষায় লেখা কবিতার মধ্যে। নিচুতলার মানুষ, দরিদ্রসাধারণ তাদের প্রাত্যহিক যন্ত্রণার সঙ্গী হিসেবে পেতে পারে শঙ্খ ঘোষের কবিতাকে। সমাজের প্রতিটি অসাম্য, ন্যায়বিচারের প্রতিটি অভাব শঙ্খ ঘোষ চিহ্নিত করে দেন তার অমোঘ কবিতা দিয়ে।

এখনই বলছিলাম যে, শঙ্খ ঘোষের কবিতার গতিধারা চালিত হয় দু’টি ভিন্ন মুখে। একটি হল, যেখানে সমাজের নিচুতলার মানুষদের ওপর যে শোষণপীড়ন বঞ্চনা অবিরাম ঘটে চলেছে, সে বিষয়ে কবির প্রতিবাদ ধ্বনিত হয়। অন্য গতিধারাটি কাজ করে সম্পূর্ণ পৃথক একটি দিকে। সেই দিকটি হল কবির নিজের অবচেতনের মধ্যে কেবলই নেমে চলে তার কবিতা। মনের কোনও গভীর অতলান্তের দিকে তার যাত্রা। যেমন এই দৃষ্টান্তটি নেওয়া যাক:
”তোমার শুধু জাগরণ শুধু উত্থাপন কেবল উদ্ভিদ
তোমার শুধু পান্না আর শুধু বিচ্ছুরণ কেবল শক্তি।
তোমার কোনো মিথ্যা নেই তোমার কোনো সত্য নেই
কেবল দংশন
তোমার কোনো ভিত্তি নেই তোমার কোনো শীর্ষ নেই
কেবল তক্ষক…
এখানে, তোমার কোনো ভিত্তি নেই, তোমার কোনো শীর্ষ নেই/ কেবল তক্ষক— এই লাইনটি কিন্তু বাচ্যার্থ পেরিয়ে চলে যায়। এ কবিতার শিরোনাম ‘তক্ষক’। কিন্তু, ‘তক্ষক’ শব্দটি যেখানে যে ভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে সেখানে আমরা বাচ্যার্থ আশ্রয় করলে কী মানে পাব তার? এই ভাবেই অন্তহীন রহস্যকেও নিজের শরীরে ধারণ করে থাকে শঙ্খ ঘোষের কবিতা। এ রকম আরও দৃষ্টান্ত দেওয়া যায়। যেমন ধরা যাক ‘জল’ কবিতাটি:
”জল কি তোমার কোনও ব্যথা বোঝে? তবে কেন, তবে কেন
জলে কেন যাবে তুমি নিবিড়ের সজলতা ছেড়ে?
জল কি তোমার বুকে ব্যথা দেয়? তবে কেন তবে কেন
কেন ছেড়ে যেতে চাও দিনের রাতের জলভার?
এই কবিতাটিতে ‘জল’ শব্দটি কয়েক বার প্রয়োগ করা হয়েছে। কিন্তু, স্পষ্ট প্রত্যক্ষ বাচ্যার্থ দিয়ে ‘জল’ কথাটিকে আমরা ধরাছোঁয়ার মধ্যে পাচ্ছি না। একটি শব্দের চার পাশে যেটুকু অর্থের বৃত্ত থাকে, সেই বৃত্তটিকে পার হয়ে নতুন এক রহস্যময়তায় শব্দটিকে উত্তীর্ণ করে দেওয়া হল। ‘জল’ এই সামান্য ও অতিচেনা শব্দও নতুন অর্থস্তর যোগ করল নিজের সঙ্গে। সহজ কথাকে এত অসামান্যতায় উড়িয়ে দেওয়া হল যে পাঠকের বিস্ময়ে বিমুগ্ধ হওয়া ছাড়া উপায় রইল না।
আবার কখনও তিনি লেখেন:
”পাঁজরে দাঁড়ের শব্দ, রক্তে জল ছলছল করে
নৌকোর গলুই ভেঙে উঠে আসে কৃষ্ণা প্রতিপদ
জলজ গুল্মের ভারে ভরে আছে সমস্ত শরীর
আমার অতীত নেই, ভবিষ্যৎও নেই কোনোখানে।
‘পাঁজরে দাঁড়ের শব্দ’ নামক তার এই হাতে-হাতে-ঘোরা কাব্যগ্রন্থ সম্পূর্ণ হয় যে কবিতায় পৌঁছে, তা হল এই রকম:
”ঘিরে ধরে পাকে পাকে, মুহূর্তে মুহূর্ত ছেড়ে যাই
জলপাতালের চিহ্ন চরের উপরে মুখে ভাসে
তাঁবু হয়ে নেমে আসে সূর্যপ্রতিভার রেখাগুলি
স্তব্ধ প্রসারিত-মূল এ আমার আলস্যপুরাণ।
শঙ্খ ঘোষের এই দু’টি কবিতার মধ্যবর্তী অংশে ধরা থাকে শ্লোকের মতো চার পঙ্‌ক্তি সংবলিত আরও একগুচ্ছ কবিতা।
শব্দ আর সত্যতে তিনি লিখেছেন “শব্দবাহুল্যের বাইরে দাঁড়িয়ে, ভুল আস্ফালনের বাইরে দাঁড়িয়ে সত্যিই যদি নিজেকে, নিজের ভিতর এবং বাহিরকে, আগ্নেয় জীবনযাপনের বিভীষিকার সামনে খুলে দিতে পারেন কবি, সেই হবে আজ তার অস্তিত্বের পরম যোগ্যতা, তার কবিতা।”ওই বিশেষ কথাগুলি শঙ্খ ঘোষ লিখেছিলেন ‘ক্ষুধার্ত’ সম্প্রদায়ভুক্ত কবিদের বিষয়ে আলোচনা করতে গিয়ে। ওই একই গ্রন্থে আরও একটি প্রবন্ধ আছে, যার নাম ‘রুচির সমগ্রতা’। সেখানে এক জায়গায় আছে এই কথা: “এরকম অভিজ্ঞতাও আমাদের বিস্তর ঘটেছে যে বিষ্ণু দে-র ভক্ত সইতে পারেন না জীবনানন্দের রচনা, অথবা জীবনানন্দের অনুরাগী অগ্রাহ্য করেন সুধীন্দ্রনাথকে…।” এর পরেই পাওয়া এই সব লাইন: “এক-হিসেবে, হয়তো এ-রকমই হবার কথা। রুচির এক-একটা বিশেষ আদল গড়ে ওঠে পাঠকের মনে, হয়তো কোনো সামার্থ্যবান কবিই তৈরি করে দেন সেই আদলটি, আর তার বাইরে ভিন্ন রুচির কবিতাকে নিজের মধ্যে নিতে পারা যেন অসম্ভব মনে হয় তখন। এক কবিকে মনে হতে থাকে আরেকজনের বিপরীত কিংবা বিরোধী, একজনের প্রতি আনুগত্যের সততায় অন্যজনকে লক্ষ করা তখন শক্ত হয়ে ওঠে।”এই ‘রুচির সমগ্রতা’ রচনাটি ধরে এগিয়ে চলতে চলতে জানা হয় লেখকের একটি বিশেষ উপলব্ধি “জীবনের কাছে অথবা কবিতার কাছে আমাদের অতিনির্মিত সচেতন দাবির ধরনটা খুব উচ্চারিত। আমরা চাই হৃদয় অথবা মেধা, জাদু অথবা যুক্তি, রহস্য অথবা স্বচ্ছতা, ব্যক্তি অথবা সমাজ, শমতা কিংবা ক্ষোভ, নম্যতা বা বিদ্রোহ, আসক্তি বা বিদ্রূপ। আমরা নির্বাচন করে নিই এর মধ্যে যে-কোনো এক দিক, মনে করতে থাকি সেইটেকেই জীবনের সম্পূর্ণতা…।”
এর ঠিক পরেই এ লেখায় এসে পড়ল নম্র ও মৃদু স্বরে বলা কঠোর একটি বাক্য। বাক্যটি এই রকম: “কিন্তু এতে কি ফাঁকি নেই মস্ত? মানুষের সহস্রধারা মনকে কি অত সহজেই বন্দী করা চলে নির্ধারিত এক কাঠামোর মধ্যে?” এক দিকে সমাজের প্রতিটি দায়ভার নিজের কাঁধে তুলে নেওয়ার সামর্থ্য, অন্য দিকে নিজের গভীরতম অবচেতনের দিকে যাত্রা করার মতো এক অতিনিবিষ্ট অভিনিবেশসম্পন্ন মন— এই দুই ধরন পাওয়া যায় শঙ্খ ঘোষের কবিতায়।

গ্রন্থ

কাব্যগ্রন্থ

দিনগুলি রাতগুলি (১৯৫৬), এখন সময় নয় (১৯৬৭), নিহিত পাতালছায়া (১৯৬৭), শঙ্খ ঘোষের শ্রেষ্ঠ কবিতা (১৯৭০), আদিম লতাগুল্মময় (১৯৭২), মূর্খ বড় সামাজিক নয় (১৯৭৪), বাবরের প্রার্থনা (১৯৭৬)
মিনিবুক (১৯৭৮), তুমি তেমন গৌরী নও (১৯৭৮), পাঁজরে দাঁড়ের শব্দ (১৯৮০), কবিতাসংগ্রহ -১ (১৯৮০), প্রহরজোড়া ত্রিতাল (১৯৮২), মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে (১৯৮৪), বন্ধুরা মাতি তরজায় (১৯৮৪), ধুম লেগেছে হৃদকমলে (১৯৮৪), কবিতাসংগ্রহ – ২ (১৯৯১), লাইনেই ছিলাম বাবা (১৯৯৩), গান্ধর্ব কবিতাগুচ্ছ (১৯৯৪), শঙ্খ ঘোষের নির্বাচিত প্রেমের কবিতা (১৯৯৪), মিনি কবিতার বই (১৯৯৪), শবের উপরে শামিয়ানা (১৯৯৬), ছন্দের ভিতরে এত অন্ধকার (১৯৯৯), জলই পাষাণ হয়ে আছে (২০০৪), সমস্ত ক্ষতের মুখে পলি (২০০৭), মাটিখোঁড়া পুরোনো করোটি (২০০৯), গোটাদেশজোড়া জউঘর (২০১০), হাসিখুশি মুখে সর্বনাশ (২০১১), প্রতি প্রশ্নে জেগে ওঠে ভিটে (২০১২), প্রিয় ২৫ : কবিতা সংকলন (২০১২), বহুস্বর স্তব্ধ পড়ে আছে (২০১৪), প্রেমের কবিতা (২০১৪), শঙ্খ ঘোষের কবিতাসংগ্রহ (২০১৫), শুনি নীরব চিৎকার (২০১৫), এও এক ব্যথা উপশম (২০১৭), সীমান্তবিহীন দেশে (২০২০)।

গদ্যগ্রন্থ

কালের মাত্রা ও রবীন্দ্রনাটক (১৯৬৯), নিঃশব্দের তর্জনী (১৯৭১), ছন্দের বারান্দা (১৯৭২), এ আমির আবরণ (১৯৮০), উর্বশীর হাসি (১৯৮১), শব্দ আর সত্য (১৯৮২), নির্মাণ আর সৃষ্টি (১৯৮২), কল্পনার হিস্টোরিয়া (১৯৮৪), জার্নাল (১৯৮৫), ঘুমিয়ে পড়া এলবাম (১৯৮৬), কবিতার মুহূর্ত (১৯৮৭), কবিতালেখা কবিতাপড়া (১৯৮৮), ঐতিহ্যের বিস্তার (১৯৮৯), ছন্দময় জীবন (১৯৯৩), কবির অভিপ্রায় (১৯৯৪), এখন সব অলীক ক ১৯৯৪), বইয়ের ঘর (১৯৯৬), সময়ের জলছবি (১৯৯৮), কবির বর্ম (১৯৯৮), ইশারা অবিরত (১৯৯৯), এই শহর রাখাল (২০০০), ইচ্ছামতির মশা : ভ্রমণ (২০০২), দামিনির গান (২০০২), গদ্যসংগ্রহ ১-৬ (২০০২), অবিশ্বাসের বাস্তব (২০০৩), গদ্যসংগ্রহ – ৭ (২০০৩), সামান্য অসামান্য (২০০৬), প্রেম পদাবলী (২০০৬), ছেঁড়া ক্যামবিসের ব্যাগ (২০০৭), সময়পটে শঙ্খ ঘোষ : কবিতা সংকলন (২০০৮), ভিন্ন রুচির অধিকার (২০০৯), আরোপ আর উদ্ভাবন (২০১১), বট পাকুড়ের ফেনা (২০১১), গদ্যসংগ্রহ – ৮ (২০১৩), দেখার দৃষ্টি (২০১৪), আয়ওয়ার ডায়েরি (২০১৪), নির্বাচিত প্রবন্ধ : রবীন্দ্রনাথ (২০১৪), নির্বাচিত প্রবন্ধ : নানা প্রসঙ্গ (২০১৪), নির্বাচিত গদ্যলেখা (২০১৫), গদ্যসংগ্রহ – ৯ (২০১৫), হে মহাজীবন : রবীন্দ্র প্রসঙ্গ (২০১৬), বেড়াতে যাবার সিঁড়ি (২০১৬), অল্প স্বল্প কথা (২০১৬), নিরহং শিল্পী (২০১৭), গদ্যসংগ্রহ-১০ (২০১৮), লেখা যখন হয় না (২০১৯), পরম বন্ধু প্রদ্যুমন (২০১৯), সন্ধ্যানদীর জলে : বাংলাদেশ সংকলন (২০১৯), ছেড়ে রেখেই ধরে রাখা (২০২১)।

শিশু-কিশোর সাহিত্য

বিদ্যাসাগর (১৯৫৬), সকালবেলার আলো (১৯৭২), শব্দ নিয়ে খেলা : বানান বিষয়ক বই {কুন্তক ছদ্মনামে লেখা } (১৯৮০), রাগ করো না রাগুনী (১৯৮৩), সব কিছুতেই খেলনা হয় (১৯৮৭), সুপারিবনের সারি (১৯৯০), আমন ধানের ছড়া (১৯৯১), কথা নিয়ে খেলা (১৯৯৩), সেরা ছড়া (১৯৯৪), আমন যাবে লাট্টু পাহাড় (১৯৯৬), ছোট্ট একটা স্কুল (১৯৯৮), বড় হওয়া খুব ভুল (২০০২), ওরে ও বায়নাবতী (২০০৩), বল তো দেখি কেমন হত (২০০৫), অল্পবয়স কল্পবয়স (২০০৭), আমায় তুমি লক্ষ্মী বল (২০০৭), শহরপথের ধুলো (২০১০), সুর সোহাগী (২০১০), ছড়া সংগ্রহ (২০১০), ছোটদের ছড়া কবিতা (২০১১), ইচ্ছে প্রদীপ (২০১৪), ছোটদের গদ্য (২০১৭), আজকে আমার পরীক্ষা নেই (২০১৮)।

বক্তৃতা ও সাক্ষাৎকার ভিত্তিক সংকলন

অন্ধের স্পর্শের মতো (২০০৭), এক বক্তার বৈঠক: শম্ভু মিত্র (২০০৮), কথার পিঠে কথা (২০১১), জানার বোধ (২০১৩), হওয়ার দুঃখ (২০১৪)।

অগ্রন্থিত রচনা সংকলন

মুখজোড়া লাবণ্য (২০০৯), অগ্রন্থিত শঙ্খ ঘোষ (২০১৭)।

পুরস্কার

১৯৭৭ – “মূর্খ বড়, সামাজিক নয়” নরসিংহ দাস পুরস্কার।
১৯৭৭ – “বাবরের প্রার্থনা” র জন্য সাহিত্য একাদেমি পুরস্কার।
১৯৮৯ – “ধুম লেগেছে হৃদকমলে” রবীন্দ্র পুরস্কার।
১৯৯৮ – সরস্বতী সম্মান “গন্ধর্ব কবিতাগুচ্ছ”র জন্য।
১৯৯৯ – “রক্তকল্যাণ” অনুবাদের জন্য সাহিত্য একাদেমি পুরস্কার।
১৯৯৯ – বিশ্বভারতীর দ্বারা দেশিকোত্তম পুরস্কার।
২০১০ – বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডি. লিট উপাধি।
২০১১ – ভারত সরকারের পদ্মভূষণ পুরস্কার।
২০১৫ – শিবপুর ইন্ডিয়ান ইনস্টটিউট অফ ইঞ্জিনিয়ারিং সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি থেকে ডি. লিট।
২০১৬ – জ্ঞানপীঠ পুরস্কার।
২০২০ – উত্তর ভারতের “অমর উজালা ফাউন্ডেশন”-এর সর্ব্বোচ্চ পুরস্কার “আকাশদীপ”

মৃত্যু

Manual4 Ad Code

শঙ্খ ঘোষ ২০২১ খ্রিস্টাব্দের ১২ এপ্রিল থেকে সর্দি-কাশিতে ভুগছিলেন। দুইদিন পর অর্থাৎ ১৪ এপ্রিলে তার করোনা পরীক্ষার রিপোর্ট পজিটিভ আসে। কোভিডের বাড়বাড়ন্তের কারণে কবি হাসপাতালে যেতে অনিচ্ছুক ছিলেন, তাই সেই থেকে তিনি ঘরোয়া নিভৃতবাসে তথা আইসোলেশনেই ছিলেন এবং সেখানেই তার চিকিৎসা চলছিল। তবে শেষমেষ কোভিডের সঙ্গে যুদ্ধ করতে না পেরে ২১ এপ্রিল সকাল সাড়ে ১১টায় নিজ বাসভবনে তিনি প্রয়াত হন।

কবির মৃত্যুতে জয় গোস্বামী বলেন, “এক মহা বটবৃক্ষের পতন হল। তিনি ছিলেন জাতির বিবেক”। সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় বলেন, “শঙ্খ ঘোষের মৃত্যুতে যেন মনে হচ্ছে, মাথার ওপর ছাদ সরে গেল।” তিনি এও বললেন, “আজ মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল”। নিমতলা মহাশশ্মানে কোভিড বিধি মেনে তার শেষ কৃত্য সম্পন্ন হয়।

শঙ্খ ঘোষের মৃত্যুর আট দিনের মধ্যে তার স্ত্রী প্রতিমা ঘোষও ২০২১ সালের ২৯ এপ্রিল ভোর পাঁচটায় করোনার কারণে প্রয়াত হন। কবির অনুজ ছিলেন প্রাবন্ধিক ও রবীন্দ্র গবেষক নিত্যপ্রিয় ঘোষ (১৯৩৪-২০২২)।

সাহিত্যের মহাবট শঙ্খ ঘোষ
—সৈয়দ আমিরুজ্জামান

আজও ভোরের কুয়াশাতে নীরব শোকের ঢেউ,
শব্দহারা আকাশ জুড়ে কার যেন হাহাকার বয়ে।
কলকাতার জানালাতে ধূসর আলো ঝরে,
বটবৃক্ষ এক ভেঙে পড়ে স্মৃতির গভীর ঘরে।

তিনি ছিলেন উচ্চারণে নির্মম সত্যের দীপ,
মুখোশ ভাঙার দৃপ্ত শপথ, অন্তর্লীনের নীপ।
বিজ্ঞাপনের আবরণে ঢাকা সমাজমুখ,
তার কলমে ছিন্ন হয়ে উঠত নগ্ন দুখ।

শঙ্খ ঘোষ— নামটি যেন শব্দেরই ধ্বনি,
বেদনাতে দীপ্ত হয়ে ওঠা মানবতার বাণী।
যেখানে ভাষা ক্লান্ত হয়ে থেমে যায় অবশেষে,
সেখানে তার কবিতা যায় আগুন হাতে ভেসে।

চাঁদপুরের মাটির গন্ধে শৈশবের যে রঙ,
বরিশালের পল্লীস্মৃতি জড়িয়ে থাকে সংগ।
পাবনার সেই দিনগুলি, চন্দ্রপ্রভা আলো,
শিক্ষার পথ ধরে তিনি গড়েছেন কালো-ভালো।

প্রেসিডেন্সির শ্রেণিকক্ষে জেগে ওঠে মন,
কলকাতার জ্ঞানের স্রোতে শাণিত হয় জীবন।
শব্দকে তিনি শিখেছিলেন শুধু উচ্চারণ নয়,
শব্দ মানে সময়-সাক্ষী, প্রতিরোধের বয়।

শিক্ষকতার নীরব পথে গড়েছেন প্রজন্ম,
যাদবপুরের আঙিনাতে রেখেছেন অন্বয়।
শিমলার সেই চিন্তামগ্ন প্রজ্ঞার উচ্চ শিখর,
দিল্লির পথে বিশ্বভারতী— জ্ঞানের অবিচল অধিকার।

তিনি শুধু কবি নন, ছিলেন বিবেক-শিখা,
অন্যায় দেখলে কলম তার গর্জে উঠত দীক্ষা।
নাগরিকত্বের অন্ধকারে প্রশ্ন ছুড়েছেন বারবার,
‘মাটি’ কবিতায় উঠে এসেছে প্রতিবাদের আগুনধার।

“মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে”— শুধু পঙ্‌ক্তি নয়,
সময়ের মুখোশ ছিঁড়ে দেওয়া এক কঠিন প্রত্যয়।
“বাবরের প্রার্থনা”য় শোনা যায় ইতিহাসের কান্না,
ক্ষমতার চূড়ায় দাঁড়িয়েও মানুষেরই জানা।

তার কবিতার দ্বিমুখী পথ— একদিকে জ্বালা,
সমাজজুড়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে তীব্র জ্বালা।
অন্যদিকে নিঃশব্দ ডুব, অবচেতনের স্রোত,
রহস্যময় গভীরতায় অনন্তেরই নোট।

“তক্ষক” শব্দে ধরা পড়ে অদ্ভুত এক ছায়া,
ভিত্তিহীন শূন্যতাতে জীবনেরই মায়া।
“জল” হয়ে যায় ব্যথার ভাষা, অচেনা এক স্তর,
সহজ শব্দে লুকিয়ে থাকে অসীমতার ঘর।

“পাঁজরে দাঁড়ের শব্দ” বাজে ইতিহাসের তানে,
রক্তে মেশা জলের ঢেউ দোলে মানব প্রাণে।
অতীতহীন ভবিষ্যৎহীন যে নির্জন উচ্চারণ,
সেইখানেই খুঁজে পাই আমরা তার অন্তর্গত মন।

গদ্যের ভেতর যুক্তির শিখা, প্রবন্ধে বিশ্লেষণ,
রবীন্দ্রনাথের আলোয় লেখা গভীর অন্বেষণ।
“শব্দ আর সত্য” শেখায় কেমন দাঁড়াতে হয় একা,
মিথ্যার ভিড়ে সত্যের পথে কত কঠিন দেখা।

তিনি জানতেন— রুচির দেয়াল মানুষ গড়ে নিজেই,
একজনের আলো অন্যজনের চোখে অন্ধকার রচেই।
তাই তিনি ডাক দিয়েছিলেন সমগ্রতার পথে,
হৃদয়-মেধা, যুক্তি-জাদু মিলুক জীবনের সাথে।

Manual7 Ad Code

শঙ্খ ঘোষ মানে প্রতিবাদ, তবু নির্মল সুর,
অগ্নির ভেতর শীতল নদী, দৃঢ় অথচ দূর।
তার শব্দে দরিদ্র মানুষ পায় নীরব ভাষা,
অবহেলিত জীবনেরও ওঠে স্পষ্ট আশা।

কোভিডের সেই নিঃসঙ্গতা, ঘরবন্দী দিন,
শব্দহীন সেই লড়াইয়ে ক্ষয় হয়ে গেল ঋণ।
একুশে এপ্রিল সকালবেলায় স্তব্ধ হল ধ্বনি,
বাংলা ভাষা হারাল যেন নিজেরই এক ধনী।

নিমতলার আগুনে জ্বলে উঠল শেষ অধ্যায়,
তবু তারই কবিতা জেগে থাকে অনন্ত প্রভায়।
স্ত্রীরও প্রস্থান শোকের স্রোত আরও ঘন করে,
ব্যথার ঢেউয়ে ডুবে থাকে বাংলা ঘরের পরে।

জয় গোস্বামী বলেছিলেন— পতন এক মহীরুহ,
শীর্ষেন্দুর কণ্ঠে শোনা— শূন্য হলো দিগন্তমুখ।
ছাদের মতো সরে গেল যে আশ্রয়ের ছায়া,
সেই শূন্যতা আজও বুকে অমোচনীয় মায়া।

তবু তিনি শেষ নন, শব্দে রয়েছেন বেঁচে,
প্রতিটি প্রশ্নের ভেতর তার উচ্চারণ যে বেঁচে।
যতদিন অন্যায় হবে, ততদিন তার গান,
মানুষকে জাগিয়ে রাখবে প্রতিবাদের টান।

আজ তার পঞ্চম প্রয়াণদিনে স্মৃতির প্রদীপ জ্বলে,
কবিতারা ফিরে আসে নিঃশব্দ অশ্রুজলে।
বটবৃক্ষের ছায়া আজও মাটির গভীরে রয়,
শঙ্খ ঘোষের কণ্ঠস্বর চিরকাল অক্ষয়।

তিনি ছিলেন— আছেন— থাকবেন শব্দের অন্তরে,
প্রতিটি সত্য উচ্চারণে, প্রতিটি প্রতিবাদ ঘরে।
বাংলা ভাষার প্রাণে লেখা এক অমোঘ ইতিহাস—
শঙ্খ ঘোষ মানে মানুষের অবিনশ্বর শ্বাস।