মহাসমাবেশে বোমা হামলার ২৫ বছর: হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি সিপিবি’র

প্রকাশিত: ১২:২৫ পূর্বাহ্ণ, জানুয়ারি ১৯, ২০২৬

মহাসমাবেশে বোমা হামলার ২৫ বছর: হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি সিপিবি’র

Manual4 Ad Code

বিশেষ প্রতিনিধি | ঢাকা | ১৯ জানুয়ারি ২০২৬ : রাজধানীর পল্টন ময়দানে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) আয়োজিত মহাসমাবেশে সংঘটিত ভয়াবহ বোমা হামলার ২৫ বছর পূর্ণ হয়েছে আজ। ২০০১ সালের ২০ জানুয়ারির সেই নৃশংস হামলায় নিহত চার শহীদের হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার এবং ঘটনার নেপথ্যের হোতাদের চিহ্নিত করে বিচারের আওতায় আনার জোর দাবি জানিয়েছে সিপিবি।

সোমবার (১৯ জানুয়ারি ২০২৬) গণমাধ্যমে প্রেরিত এক যৌথ বিবৃতিতে সিপিবি’র সভাপতি কমরেড কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দন ও সাধারণ সম্পাদক কমরেড আব্দুল্লাহ ক্বাফী রতন বলেন, দীর্ঘ ২৫ বছর পেরিয়ে গেলেও এই বর্বর বোমা হামলার পূর্ণাঙ্গ বিচার হয়নি। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি জড়িতদের পাশাপাশি এর পরিকল্পনাকারী ও মদদদাতাদের আজও চিহ্নিত করা যায়নি, যা রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতারই বহিঃপ্রকাশ।

বিবৃতিতে নেতৃবৃন্দ বলেন, রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিন্নতার কারণে একটি শান্তিপূর্ণ গণসমাবেশে বোমা হামলা চালিয়ে শ্রমিক-কৃষক-মেহনতি মানুষের নেতৃত্বকে হত্যার ঘটনা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক কলঙ্কজনক অধ্যায়। তারা বলেন, হত্যা, হামলা, মামলা ও নির্যাতনের মাধ্যমে কমিউনিস্ট আন্দোলনকে দমন করা যায়নি, ভবিষ্যতেও যাবে না।
সিপিবি নেতারা আরও বলেন, শহীদদের রক্তে রঞ্জিত পতাকাই কমিউনিস্ট পার্টির পথচলার প্রেরণা। শহীদদের স্বপ্নের শোষণমুক্ত সমাজ ও সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়েই তাঁদের প্রতি প্রকৃত সম্মান জানানো সম্ভব।

উল্লেখ্য, ২০০১ সালের ২০ জানুয়ারি পুরানা পল্টনের পল্টন ময়দানে সিপিবির মহাসমাবেশ চলাকালে একাধিক শক্তিশালী বোমার বিস্ফোরণ ঘটে। এতে ঘটনাস্থলেই শহীদ হন খুলনা জেলার বটিয়াঘাটা উপজেলার সিপিবি নেতা কমরেড হিমাংশু মণ্ডল, খুলনা জেলার রূপসা উপজেলার সিপিবি নেতা ও দাদা ম্যাচ ফ্যাক্টরির শ্রমিক নেতা কমরেড আব্দুল মজিদ, ঢাকার ডেমরা থানার লতিফ বাওয়ানি জুটমিলের শ্রমিক নেতা কমরেড আবুল হাসেম এবং মাদারীপুরের কমরেড মোক্তার হোসেন। এছাড়া আহত অবস্থায় ঢাকা বক্ষব্যাধি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় একই বছরের ২ ফেব্রুয়ারি মৃত্যুবরণ করেন খুলনা বিএল কলেজের ছাত্র ইউনিয়ন নেতা কমরেড বিপ্রদাস রায়। এ হামলায় আরও শতাধিক নেতা-কর্মী আহত হন।

এদিকে বোমা হামলার ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে দিনব্যাপী কর্মসূচি ঘোষণা করেছে সিপিবি। কর্মসূচির অংশ হিসেবে মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) সকাল ৮টা ৩০ মিনিট থেকে সকাল ১০টা পর্যন্ত পুরানা পল্টনে সিপিবির কেন্দ্রীয় কার্যালয় মুক্তি ভবনের সামনে শহীদদের স্মরণে নির্মিত অস্থায়ী বেদীতে পুষ্পমাল্য অর্পণের মাধ্যমে শ্রদ্ধা জানানো হবে।

এই কর্মসূচিতে সিপিবিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, ছাত্র, যুব ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা অংশ নেবেন বলে দলটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

সিপিবি নেতারা আশা প্রকাশ করেন, শহীদদের আত্মত্যাগের স্মরণে আয়োজিত এসব কর্মসূচির মধ্য দিয়ে হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রশ্নটি নতুন করে জনমনে আলোচিত হবে এবং রাষ্ট্র যথাযথ দায়িত্ব পালন করতে বাধ্য হবে।
#

রক্তমাখা পল্টন

— সৈয়দ আমিরুজ্জামান |

পল্টনের আকাশ সেদিন ছিল
লাল পতাকার ছায়া,
শ্রমিক-কৃষকের স্বপ্নভরা
উত্তাল মানুষের মায়া।

ঢেউ খেলানো জনসমুদ্রে
ধ্বনিত শ্লোগান-ডাক,
শোষণমুক্ত ভোরের আশায়
উঁচু হয়েছিল ফাক।

হঠাৎ করে বজ্রনিনাদ
মাটির বুকে ফাটল,
মানুষ নয়—রাষ্ট্র যেন
নিজের সন্তান কাটল।

শান্ত সমাবেশ, খোলা মাঠ,
কোনো অস্ত্র ছিল না,
ছিল কেবল বুকের ভেতর
অধিকার পাওয়ার বাণীখানা।

একটি নয়—একাধিক বিস্ফোরণ,
আগুন, ধোঁয়া, আর্তনাদ,
রক্তে ভিজে গেল মাটি,
কেঁপে উঠল এই স্বদেশভাগ।

হিমাংশু পড়ে গেলেন আগে,
বটিয়াঘাটার সন্তান,
মাটি আর মানুষের টানে
যিনি ছিলেন আজীবন বন্ধন।

মজিদ গেলেন, শ্রমের হাত
থামিয়ে দিয়ে চিরতরে,
দাদা ম্যাচের আগুনটুকু
রয়ে গেল ইতিহাসে জ্বরে।

আবুল হাসেম, জুটের ঘামে
গড়া এক দৃঢ় শরীর,
বুকের ভেতর লাল সূর্যটি
নিভে গেল নিঃশব্দে ধীর।

মাদারীপুরের মোক্তার ভাই,
গ্রামের খেটে-খাওয়া কণ্ঠ,
নেতৃত্ব মানে যে দায়িত্ব
তা শিখিয়ে গেল রক্তপথ।

আরও পরে, হাসপাতালের
সাদা দেয়াল কাঁপিয়ে দিয়ে,
বিপ্রদাস—তরুণ ছাত্রটি
চলে গেল স্বপ্ন লিখে।

পাঁচটি নাম, পাঁচটি জীবন,
শতাধিক ক্ষতবিক্ষত দেহ,
রাষ্ট্র লিখল নীরবতা
আর ইতিহাসে জ্বলল ক্ষোভ-স্নেহ।

পঁচিশটি বছর পার হলো,
বিচার আজও অধরা,
হোতা, পরিকল্পনাকারী
থাকল অন্ধকারে লুকানো ধরা।

রাষ্ট্র বলল—তদন্ত চলছে,
ফাইল ঘুমাল আলমারিতে,
রক্ত শুকাল, প্রশ্ন জাগল
শুধু শহীদের পরিবারের স্মৃতিতে।

কিন্তু ইতিহাস ভুলে না কিছু,
রক্তের থাকে দীর্ঘ স্মৃতি,
পতাকার লাল রঙ জানে
কারা লিখেছিল এই ক্ষতি।

Manual3 Ad Code

হত্যা দিয়ে থামানো যায় না
মেহনতি মানুষের গান,
কারণ প্রতিটি শহীদের রক্ত
হয়ে ওঠে নতুন বিদ্রোহী প্রাণ।

কমিউনিস্ট মানে ভয় নয়,
কমিউনিস্ট মানে প্রতিজ্ঞা,
শোষণহীন সমাজ গড়ার
অবিচল লাল নিশানা।

আজও পল্টনের সেই মাঠে
শোনা যায় পদধ্বনি,
শহীদেরা হাঁটে মিছিলে
হাতে হাতে লাল জ্যোতি।

ফুলে ফুলে অস্থায়ী বেদী,
অস্থায়ী নয় স্মরণ,
কারণ এই রক্তের ঋণ
মেটাতে লাগে প্রজন্ম-প্রজন্ম।

Manual6 Ad Code

বিচার চাই—শুধু রায় নয়,
চাই সত্যের উন্মোচন,
কারা ভয় পায় মানুষের শক্তি,
কারা করে রাষ্ট্রকে পণ।

Manual3 Ad Code

পঁচিশ বছর নয়, আরও হোক,
লড়াই থামবে না তবু,
শহীদের স্বপ্ন বাস্তবায়ন
এই প্রতিজ্ঞাই আজ প্রভু।

Manual2 Ad Code

লাল পতাকা উড়ুক আবার
রক্তের দায় শোধ করতে,
পল্টন হোক মুক্ত মানুষের
নতুন ইতিহাস লিখতে।

শহীদরা মরেননি কখনো,
তাঁরা আছেন সংগ্রামে,
প্রতিটি শ্লোগান, প্রতিটি পদে
প্রতিটি অক্ষরে, প্রতিটি নামে।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ