সিলেট ২০শে জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৬ই মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ১২:৫৭ পূর্বাহ্ণ, জানুয়ারি ১৯, ২০২৬
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক অনুসন্ধিৎসু | ঢাকা, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬ : আগামীকাল ২০ জানুয়ারি শহীদ আসাদ দিবস।
“আজ থেকে ৫৭ বছর আগে ১৯৬৯ সালের ২০ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আসাদুজ্জামান আসাদ আইয়ুব সরকারের পুলিশের গুলিতে শহীদ হন। এ ঘটনা জনমনে দাবানলের সৃষ্টি করেছিল। যার পরিণতিতে ঊনসত্তরে ঘটে গেল ঐতিহাসিক মহান গণ-অভ্যুত্থান, আইয়ুব খানের পতন, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার ও বঙ্গবন্ধুসহ অন্য আসামিদের নিঃশর্ত মুক্তিলাভ। এই অভ্যুত্থান শ্রমিক ও কৃষকের মধ্যেও বিপুলভাবে জাগরণ সৃষ্টি করেছিল। ’৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থানের ধারাবাহিকতাতেই এসেছিল আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং ফলশ্রুতিতে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়। তাই আসাদের শাহাদতবরণ ইতিহাসের কালপঞ্জিতে এক বিশেষ ঘটনা। রক্তাক্ষরে লেখা এক বিশেষ দিন ২০ জানুয়ারি।
১৯৬৮ সালের শেষ দিক থেকেই অভ্যুত্থানের প্রস্তুতি পর্ব চলছিল। ১৯৬৮ সালের ৬ ডিসেম্বর পল্টনে জনসভা শেষে মজলুম জননেতা মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী গভর্নর ভবন ঘেরাও করেন। বর্তমানে যেটা বঙ্গভবন, তখন সেটাই ছিল গভর্নর মোনায়েম খানের সরকারি বাসভবন। ঘেরাও শেষে তিনি পরদিন হরতালের ডাক দেন। অভূতপূর্বভাবে হরতাল সফল হয়েছিল। জনতা-পুলিশ সংঘর্ষ চলেছিল। তার পরদিন ৮ ডিসেম্বর আবারও হরতাল। মাওলানা ভাসানী এবার হুমকি দিলেন ‘শেখ মুজিবকে মুক্তি না দিলে বাস্তিল দুর্গের মতো ক্যান্টনমেন্ট ভেঙে মুজিবকে মুক্ত করব।’ একই সঙ্গে তিনি গ্রামাঞ্চলে আন্দোলনকে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে হাট হরতালের ডাক দিয়েছিলেন। ২৯ ডিসেম্বর বিভিন্ন জায়গায় হাট হরতাল হয়েছিল। নড়াইলে এবং নরসিংদীর মনোহরদী থানার হাতিরদিয়া বাজারে পুলিশ গুলি করে মানুষ হত্যা করেছিল।
ছাত্রনেতা আসাদ একই সঙ্গে কৃষক আন্দোলনও করতেন। হাতিরদিয়া বাজারে হাট হরতাল করতে গিয়ে তিনি পুলিশের লাঠির আঘাতে আহত হয়েছিলেন। মাথা ফেটে গিয়েছিল। তখনকার দিনে মোবাইল ফোন ছিল না। গ্রামাঞ্চলের সঙ্গে ফোনেরও যোগাযোগব্যবস্থা ছিল না। কিন্তু হাতিরদিয়ায় পুলিশের গুলি এবং কয়েকজনের শহীদ হওয়ার খবরটি দ্রুত ঢাকায় পৌঁছানো দরকার। আসাদ আহতাবস্থায় মাথায় ব্যান্ডেজ বেঁধেই কিছুটা সাইকেলে করে, পরে ট্রেনে করে ঢাকায় পৌঁছান হাতিরদিয়ার গুলির খবর দিতে। তিনি বিভিন্ন পত্রিকায় নিজে গিয়ে খবর দিয়ে এসেছিলেন। তার মাত্র কয়েক দিন পর যখন আসাদ নিজেই ঢাকার রাস্তায় শহীদ হলেন, তখন দৈনিক পাকিস্তান-এ কর্মরত সাংবাদিক ও রাজনীতিবিদ নির্মল সেন লিখেছিলেন, ‘সেদিন আসাদ এসেছিল খবর দিতে, আজ এল খবর হয়ে।’
১৯৬৯ সালের জানুয়ারি মাসে ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন), ছাত্র ইউনিয়ন (মতিয়া), ছাত্রলীগ ও এনএসএফ-এর একাংশ নিয়ে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন এবং ১৪ জানুয়ারি ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে ১১ দফা কর্মসূচি ঘোষণা ছিল একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। সেই ১১ দফা সারা দেশে অভূতপূর্ব সাড়া পেয়েছিল। এই কর্মসূচিকে ব্যাপক প্রচারে নেওয়ার জন্য ১৭ জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সমাবেশ এবং ১৮, ১৯ ও ২০ তারিখে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মিছিল বের করা হয়েছিল। ১৮ তারিখ পুলিশ টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করেছিল। ১৯ তারিখ গুলি করেছিল পুলিশ। সেদিন আসাদুল হক নামে একজন (তিনি শহীদ আসাদ নন) গুলিবিদ্ধ হন। পরদিন ২০ জানুয়ারি ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে যে মিছিলটি বের হয়েছিল, তার প্রথম সারিতে ছিলেন আসাদুজ্জামান আসাদ। চানখাঁরপুল মোড় থেকে পুলিশের জিপ থেকে আসাদকে লক্ষ্য করে পুলিশ গুলি ছোড়ে। সঙ্গে সঙ্গে আসাদের রক্তমাখা প্রাণহীন দেহ রাস্তায় লুটিয়ে পড়ে।
আসাদের মৃত্যুতে সারা দেশ ক্ষোভে ফেটে পড়ল। আসাদ সাধারণ পথচারী ছিলেন না। তিনি ছিলেন সচেতন রাজনৈতিক নেতা ও কর্মী। তিনি ছাত্র ইউনিয়নের (মেনন গ্রুপ) অন্যতম নেতা ছিলেন। একই সঙ্গে কৃষক আন্দোলনের সংগঠক (প্রধানত শিবপুর এলাকায়) এবং গোপন কমিউনিস্ট পার্টির একাংশের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন।
আসাদের মৃত্যুর পর সারা দেশে স্লোগান উঠেছিল ‘আসাদের মৃত্যু বৃথা যেতে দেব না’।
বৃথা যায়নি। আসাদের রক্ত বেয়ে এবং তার সঙ্গে লাখ লাখ শহীদের রক্ত যুক্ত হয়ে অর্জিত হয়েছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা।
আসাদ, তোমার উচ্চারিত মুক্তির শ্লোগান বৈষম্যহীন জনগণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার ভূলি নাই।তোমাকে মুক্তিকামী জনগণ কোনো দিন ভুলবে না। তোমার মৃত্যু কোনো সাধারণ মৃত্যু নয়। তাইতো তোমাকেই অমর করে রেখেছে ইতিহাসের পাতায়।”
#
পরিশেষে, শহীদ আসাদ স্মরণে উৎসর্গ করে লেখা কবিতা —
(শহীদ আসাদ স্মরণে)
আজও ঢাকা জাগে ভোরে, রক্তমাখা ইতিহাসে,
কুয়াশা ভেদে ভেসে আসে এক নাম—আসাদ বুকে।
পল্টনের বাতাস কাঁপে, চানখাঁরপুল স্তব্ধ হয়,
সময় থমকে শোনে শুধু গুলির সেই শব্দটুকু।
ঊনসত্তরের জানুয়ারি—শীত নয়, আগুন জ্বলে,
ছাত্রের চোখে স্বপ্ন ছিল, মুষ্টিবদ্ধ প্রতিবাদ।
১৪৪ ভাঙা পায়ে পায়ে রাজপথে নেমে এলে,
শাসকের বুক কেঁপে উঠত, টলত লৌহ-ইবাদত।
গ্রাম থেকে শহর ছুঁয়ে যেত এক দ্রোহের আহ্বান,
হাটে হাটে, মাঠে মাঠে উঠত মুক্তির গান।
ভাসানীর বজ্রকণ্ঠে কাঁপত গভর্নর ভবন,
“মুজিব মুক্ত না হলে, ভাঙব ক্যান্টনমেন্ট জান।”
নড়াইল কাঁদে, হাতিরদিয়া রক্তে রাঙা পথ,
হাট হরতাল ভেঙে দেয় পুলিশের নৃশংসতা।
মাথা ফেটে ব্যান্ডেজ বাঁধা, তবু থামে না রথ,
খবর বয়ে আনে আসাদ—জ্বলন্ত বাস্তবতা।
সাইকেলের ক্লান্ত চাকা, ট্রেনের ঝাঁকুনিতে,
ঢাকার পথে আসে সে এক আগুন সংবাদ।
পত্রিকার দপ্তরে দপ্তরে সত্য লিখিতে,
নিজেই হয়ে ওঠে ইতিহাস—অদূর ভবিষ্যৎ-নাদ।
কয়েক দিন পরে সেই পথেই সে নামে মিছিলে,
প্রথম সারিতে বুক পেতে, চোখে দীপ্ত আলো।
চানখাঁরপুলে জিপ থামে, গুলি ছুটে এলে,
রাজপথে লুটায় আসাদ—রক্তে ভিজে কালো।
“সেদিন সে এসেছিল খবর দিতে”—কলম কাঁদে,
নির্মল সেন লেখেন বেদনা, ইতিহাস থামে।
আজ সে নিজেই খবর হয়ে ছড়িয়ে পড়ে দেশে,
শহীদের নাম জ্বলে ওঠে প্রতিরোধের নামে।
আসাদ ছিল না পথচারী, ছিল সচেতন সৈনিক,
শ্রমিক-কৃষকের দুঃখে ছিল তারই ভাষা।
গোপন স্বপ্নে, প্রকাশ্য লড়াইয়ে দৃঢ় নৈতিক,
সমতার লাল পতাকাই ছিল তার একমাত্র আশা।
তার মৃত্যুতে জেগে ওঠে জনতার দাবানল,
আইয়ুবের মসনদ কাঁপে, ষড়যন্ত্র ভেঙে পড়ে।
আগরতলার শেকল ছিঁড়ে মুক্ত হয় বঙ্গবন্ধু,
ঊনসত্তরের ঢেউ গড়ায় মুক্তিযুদ্ধের তীরে।
“আসাদের মৃত্যু বৃথা যেতে দেব না”—শপথ,
রাজপথে রাজপথে ধ্বনিত হয় সে গান।
একটি রক্তবিন্দু হয়ে গড়ে তোলে সহস্র পথ,
স্বাধীনতার মানচিত্রে আঁকে লাল চিহ্ন-চিহ্ন।
আজ পঞ্চান্ন, আজ সাতান্ন—সংখ্যা কেবল হিসাব,
আসাদ বেঁচে থাকে চেতনায়, প্রজন্মের রক্তে।
যতদিন বৈষম্য থাকবে, যতদিন থাকবে দাবী,
ততদিন আসাদ হাঁটে আমাদের প্রত্যেকের পায়ে।
হে শহীদ, তোমার শ্লোগান আজও অসমাপ্ত,
গণতন্ত্রের পথে পথে এখনো লড়াই।
ভুলি নাই তোমার অঙ্গীকার, ইতিহাস সাক্ষ্য রাখে,
তুমি অমর—কারণ তুমি ছিলে মানুষের পক্ষেই।
রক্তাক্ষরে লেখা দিন—২০ জানুয়ারি,
সময় যতই যাক, মুছে না সে দাগ।
আসাদ নামটি তাই কেবল নাম নয় আর,
এ এক জাতির জাগরণ, এক অনন্ত অনুরাগ।

সম্পাদক : সৈয়দ আমিরুজ্জামান
ইমেইল : rpnewsbd@gmail.com
মোবাইল +8801716599589
৩১/এফ, তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০।
© RP News 24.com 2013-2020
Design and developed by ওয়েব নেষ্ট বিডি