মুক্তিযোদ্ধা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী: মানুষের রাজনীতির এক সহযোদ্ধার স্মরণে

প্রকাশিত: ১২:১৫ পূর্বাহ্ণ, এপ্রিল ১১, ২০২৬

মুক্তিযোদ্ধা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী: মানুষের রাজনীতির এক সহযোদ্ধার স্মরণে

Manual2 Ad Code

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা, ১১ এপ্রিল ২০২৬ : আজ ১১ এপ্রিল। বীর মুক্তিযোদ্ধা, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা এবং জনস্বাস্থ্য আন্দোলনের এক অগ্রপথিক ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকী।

২০২৩ সালের ১১ এপ্রিল তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেলেও তাঁর আদর্শ, কর্ম এবং সংগ্রামের উত্তরাধিকার আজও বাংলাদেশের সমাজ, রাজনীতি ও স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে চলেছে।

ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী ছিলেন এক অনন্য ব্যক্তিত্ব—যিনি একই সঙ্গে বীর মুক্তিযোদ্ধা, চিকিৎসক, সংগঠক, চিন্তাবিদ এবং সমাজসংস্কারক। তাঁর জীবনকে কোনো একক পরিচয়ে সীমাবদ্ধ করা যায় না। বরং তিনি ছিলেন মানুষের জন্য নিবেদিত এক জীবনযোদ্ধা, যার কাছে রাষ্ট্র, রাজনীতি এবং উন্নয়ন—সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু ছিল সাধারণ মানুষ।

মুক্তিযুদ্ধ ও মানবিক চিকিৎসা সেবার অনন্য দৃষ্টান্ত

১৯৭১ সালে যখন দেশ স্বাধীনতার সংগ্রামে লিপ্ত, তখন যুক্তরাজ্যে উচ্চশিক্ষারত জাফরুল্লাহ চৌধুরী পড়াশোনা ছেড়ে দেশে ফিরে আসেন। আগরতলার মেলাঘরে প্রতিষ্ঠা করেন ‘বাংলাদেশ ফিল্ড হাসপাতাল’—যা শুধু একটি হাসপাতালই ছিল না, বরং ছিল মানবিকতার এক উজ্জ্বল নিদর্শন। সীমিত সম্পদ, প্রতিকূল পরিবেশ এবং যুদ্ধের ভয়াবহতার মধ্যেও তিনি ও তাঁর সহযোদ্ধারা অসংখ্য আহত মুক্তিযোদ্ধাকে সেবা দিয়ে গেছেন।

এই উদ্যোগ প্রমাণ করে—চিকিৎসা শুধু পেশা নয়, এটি একটি মানবিক দায়িত্ব; এবং সংকটকালে এই দায়িত্বই সবচেয়ে বড় অস্ত্র হয়ে উঠতে পারে।

গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র: বিকল্প উন্নয়ন ভাবনার প্রতীক

স্বাধীনতার পর ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী যে কাজটি করে সবচেয়ে বেশি পরিচিতি পেয়েছেন, তা হলো ‘গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র’ প্রতিষ্ঠা। সাভারে প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠানটি ছিল তাঁর স্বপ্নের বাস্তব রূপ—একটি এমন স্বাস্থ্যব্যবস্থা, যেখানে দরিদ্র মানুষও কম খরচে মানসম্মত চিকিৎসা পাবে।

“চল গ্রামে যাই”—এই স্লোগান শুধু একটি আহ্বান ছিল না; এটি ছিল উন্নয়নের একটি বিকল্প দর্শন। শহরকেন্দ্রিক উন্নয়নের পরিবর্তে তিনি গ্রামকে কেন্দ্র করে একটি সমন্বিত সামাজিক কাঠামো গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, নারীর ক্ষমতায়ন—সব ক্ষেত্রেই গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র এক অনুকরণীয় মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।

বিশেষ করে নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা ছিল যুগান্তকারী। গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের কর্মীদের বড় একটি অংশ নারী হওয়া—তৎকালীন সমাজ বাস্তবতায় ছিল এক সাহসী ও প্রগতিশীল সিদ্ধান্ত।

জাতীয় ওষুধ নীতি: জনস্বার্থে সাহসী অবস্থান

ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর অন্যতম বড় অবদান ১৯৮২ সালের জাতীয় ওষুধ নীতি প্রণয়নে তাঁর ভূমিকা। এই নীতির মাধ্যমে দেশে প্রয়োজনীয় ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণ, মান নিশ্চিতকরণ এবং বহুজাতিক কোম্পানির অযৌক্তিক আধিপত্য কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়।

তিনি বিশ্বাস করতেন—স্বাস্থ্যসেবা কোনো বিলাসিতা নয়, এটি মানুষের মৌলিক অধিকার। আর এই বিশ্বাস থেকেই তিনি ওষুধকে মানুষের নাগালের মধ্যে আনার জন্য লড়াই করেছেন, যা আজও প্রাসঙ্গিক।

রাজনীতি ও ‘মানুষের রাজনীতি’

Manual6 Ad Code

ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী কখনো কোনো রাজনৈতিক দলে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত না হলেও দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে তাঁর প্রভাব ছিল সুস্পষ্ট। তিনি ছিলেন একজন স্পষ্টভাষী সমালোচক—যে কোনো সরকারের ভুল নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন।

২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠনে তাঁর ভূমিকা প্রমাণ করে—তিনি শুধু সমালোচকই ছিলেন না, বরং বিকল্প রাজনৈতিক ঐক্য গড়ার প্রচেষ্টাতেও সক্রিয় ছিলেন।

তাঁর একটি বহুল উদ্ধৃত উক্তি—“আমি মানুষের রাজনীতি করি”—তাঁর দর্শনের সারমর্ম তুলে ধরে। এই ‘মানুষের রাজনীতি’ ছিল ক্ষমতাকেন্দ্রিক নয়, বরং অধিকারভিত্তিক; দলীয় স্বার্থ নয়, জনস্বার্থই ছিল এর মূল।

সরল জীবন, উচ্চ আদর্শ

ব্যক্তিজীবনে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী ছিলেন অত্যন্ত সাদাসিধে। বিলাসবহুল জীবনযাপন থেকে তিনি নিজেকে দূরে রেখেছিলেন। দুটি কিডনি নষ্ট হওয়ার পরও তিনি থেমে যাননি—বরং জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সমাজের বিভিন্ন সংকট নিয়ে কাজ করে গেছেন।

কোভিড-১৯ মহামারীর সময় স্থানীয়ভাবে টেস্ট কিট তৈরির উদ্যোগও তাঁর সেই অদম্য মানসিকতারই বহিঃপ্রকাশ—যদিও তা শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি, তবুও তাঁর চিন্তার স্বাধীনতা ও উদ্ভাবনী সাহসকে প্রকাশ করে।

উত্তরাধিকার ও প্রাসঙ্গিকতা

Manual2 Ad Code

আজ, তাঁর তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকীতে প্রশ্ন জাগে—আমরা তাঁর দেখানো পথ কতটা অনুসরণ করছি? স্বাস্থ্যসেবার বাণিজ্যিকীকরণ, সামাজিক বৈষম্য, রাজনৈতিক বিভাজন—এসবের মধ্যে দাঁড়িয়ে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর চিন্তাধারা আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।

তিনি আমাদের শিখিয়েছেন—উন্নয়ন মানে শুধু অবকাঠামো নয়; উন্নয়ন মানে মানুষের জীবনমানের উন্নতি। তিনি দেখিয়েছেন—সীমিত সম্পদ নিয়েও বড় পরিবর্তন আনা সম্ভব, যদি থাকে সদিচ্ছা, সাহস এবং মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা।

উপসংহার

ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর মৃত্যু একটি শূন্যতা তৈরি করেছে, যা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। তবে তাঁর কর্ম ও আদর্শ আমাদের জন্য একটি পথনির্দেশনা হয়ে আছে। তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা—মানুষের পাশে দাঁড়ানোই সবচেয়ে বড় রাজনীতি।

এই দিনে তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে বলা যায়—তিনি কেবল একজন ব্যক্তি নন, তিনি একটি চেতনা। আর সেই চেতনা বেঁচে থাকবে, যতদিন এই দেশের মানুষ ন্যায়, সমতা ও মানবিকতার জন্য সংগ্রাম করে যাবে।

বীর মুক্তিযোদ্ধা জাফরুল্লাহ
—সৈয়দ আমিরুজ্জামান

বীরের নাম জাফরুল্লাহ—সময় ছাপিয়ে জাগে,
ধূলিমাখা পথের মাঝে আলোর দিশা লাগে।
তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকী—তবু মৃত্যু নয়,
মানুষের হৃদয়ে তুমি অনির্বাণ এক জয়।

রাত দশটা চল্লিশে থেমে গিয়েছিল শ্বাস,
তবু থামেনি স্বপ্ন, থামেনি মানবতার আশ।
গণস্বাস্থ্যের আঙিনায় নীরবতা নামে,
তোমার কণ্ঠ বাজে আজও মানুষেরই নামে।

চট্টগ্রামের মাটির গন্ধ শিরায় বয়ে যায়,
রাউজানের সেই শিশুটি স্বপ্ন বুনে চায়—
শুধু নিজের জন্য নয়, সবার জন্য পথ,
মানুষ হবে মূল, হবে মানবতার রথ।

ঢাকা মেডিকেলের সিঁড়ি পেরিয়ে একদিন,
জ্ঞান খুঁজতে গিয়েছিলে বিদেশেরই ঋণ।
কিন্তু যখন জ্বলে উঠল দেশের স্বাধীনতা,
ফিরে এলে বুকের টানে—এটাই সত্য কথা।

মেলাঘরের সেই মাঠে যুদ্ধেরই ধ্বনি,
রক্তাক্ত মুক্তিযোদ্ধা—তোমার আপন জনই।
স্টেথোস্কোপ হাতে নিয়ে দাঁড়ালে নির্ভীক,
মানুষ বাঁচানোই তখন তোমার একমাত্র দীক্ষা।

বাংলাদেশ ফিল্ড হাসপাতাল—স্বপ্নের প্রথম ঘর,
যেখানে জীবন লড়ত মৃত্যুর বিরুদ্ধে ঘোর।
বন্দুক নয়, ছিল হাতে সেবা আর মমতা,
সেইখানে রচিত হয় মানবতার গাথা।

স্বাধীনতার সূর্য ওঠে, বদলে যায় দৃশ্য,
তবু তোমার সংগ্রাম ছিল না কোনো নিস্তব্ধ।
ইস্কাটন থেকে সাভার—পথ বদলায় ঠিক,
গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রে তুমি গড়ো নতুন দিক।

“চল গ্রামে যাই”—তোমার ডাক ছিল প্রাণে,
শহরের দেয়াল ভেঙে গ্রাম দাঁড়াক সম্মানে।
কম খরচে চিকিৎসা—স্বপ্ন নয়, বাস্তব,
মানুষ পায় চিকিৎসা—হোক তা যত সহজ।

নারীর শক্তি দেখেছিলে সমাজ গড়ার মূলে,
অর্ধেক কর্মী নারী—স্বপ্ন ছিল ফুলে ফুলে।
সমতা ছিল তোমার চিন্তারই কেন্দ্রবিন্দু,
মানুষ মানেই মানুষ—নেই কোনো ভেদবিন্দু।

জাতীয় ওষুধ নীতির পেছনে তোমার হাত,
সস্তায় ওষুধ পাবে মানুষ—এই ছিল প্রভাত।
লাভের অঙ্ক নয়, ছিল মানুষের অধিকার,
স্বাস্থ্য হবে সবার—এই ছিল অঙ্গীকার।

Manual1 Ad Code

রাজনীতির মাঠেও তুমি নীরব ছিলে না,
সত্য বলার সাহস ছিল—ভয়কে মানোনি কোনো।
দল নয়, মানুষ ছিল তোমার রাজনীতি,
সেই কথায় আজও জাগে মানুষেরই স্মৃতি।

ঐক্য গড়ার প্রয়াসে ডাক দিয়েছিলে তুমি,
ভিন্ন কণ্ঠে খুঁজেছিলে একতারই ভূমি।
সমালোচনা ছিল তীক্ষ্ণ, ছিল সত্যের তীর,
ক্ষমতার সামনে দাঁড়িয়ে বলেছ নির্ভীক।

কিডনি যখন ক্লান্ত, শরীর যখন ক্ষয়,
তবু থামোনি তুমি—সংগ্রাম ছিল জয়।
মহামারীর দিনেও খুঁজেছিলে পথ,
মানুষ বাঁচানোর স্বপ্নে ছিলে অবিচল রত।

কোভিডের আঁধারে যখন বিশ্ব ছিল স্তব্ধ,
তুমি খুঁজেছিলে আলো—বিজ্ঞানকে করেছিলে দৃপ্ত।
হয়তো সব হয়নি সফল, তবু প্রচেষ্টা থামেনি,
মানুষের পাশে দাঁড়ানো—এই পথ থেমে থাকেনি।

স্বাধীনতা পুরস্কার, ম্যাগসাইসাই সম্মান,
তোমার কীর্তির কাছে সেগুলোও যেন ক্ষুদ্র দান।
বার্কলির স্বীকৃতি—বিশ্ব দেখেছে তোমায়,
মানবতার যোদ্ধা তুমি, ইতিহাসে রয়েছ ছায়ায়।

অতি সাধারণ জীবন—অসাধারণ চিন্তা,
তোমার প্রতিটি পদক্ষেপে ছিল আলোর বিন্দু।
কোনো বিলাস নয়, ছিল না কোনো অহংকার,
মানুষের জন্য বাঁচা—এই ছিল তোমার অধিকার।

“আমি মানুষের রাজনীতি করি”—এই উচ্চারণ,
আজও কাঁপায় সময়, ভাঙে অন্ধকারের বারণ।
এই বাক্যে লুকিয়ে আছে এক বিশাল দিশা,
মানুষই শেষ কথা—এই তোমার শিক্ষা।

Manual7 Ad Code

আজ তিন বছর পেরোয়, তবু তুমি আছো,
প্রতিটি দরিদ্র মুখে তোমার আলো বাঁচো।
গণস্বাস্থ্যের প্রতিটি দেয়ালে তোমার ছায়া,
প্রতিটি শপথে তুমি—প্রতিটি প্রেরণায় মায়া।

যতদিন অন্যায় থাকবে, ততদিন তুমি জাগো,
যতদিন মানুষ বাঁচে, ততদিন তুমি লাগো।
মৃত্যু তোমায় নেয়নি—নিয়েছে কেবল দেহ,
চেতনায় তুমি অমর—বাংলার হৃদয়ে রয়ে।

হে বীর, তোমার পথেই হোক আমাদের চলা,
মানুষের পাশে দাঁড়াক প্রতিটি আলোকতলা।
স্বপ্নগুলো বাঁচুক আবার নতুন প্রজন্মে,
তোমার নাম উচ্চারিত হোক প্রতিটি সম্মানে।

জাফরুল্লাহ চৌধুরী—একটি নাম নয় শুধু,
এটি এক আন্দোলন, এক অনির্বাণ রূদ্রসূ।
মানবতার শপথ নিয়ে যিনি গড়েছেন দিশা,
তাঁর স্মৃতিতে মাথা নত—বাংলার প্রতিটি নিশা।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ