সিলেট ৬ই অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২১শে আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ১:২৯ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ৬, ২০২৬
বন্যপ্রাণী পাচারের কথা উঠলে আমাদের চোখে সাধারণত ভেসে ওঠে বনে শিকার, পাখি ধরা, কচ্ছপ পাচার কিংবা কোনো বিরল প্রাণী উদ্ধারের ছবি। কিন্তু একটি প্রাণী ধরা পড়ার পর তার পথ কোথায় গিয়ে শেষ হয়, সেই প্রশ্নটি কি আমরা যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে দেখি?
একটি প্রাণী ধরা পড়তে পারে বন, পাহাড় বা জলাভূমি থেকে। সেখান থেকে সেটি যেতে পারে সংগ্রাহক, পরিবহনকারী, বা কোনো শহরের চোরাবাজারে। তারপর সীমান্ত পার হয়ে পৌঁছে যেতে পারে বিদেশী ক্রেতার কাছে। এর সঙ্গে যুক্ত থাকে দালাল, বিক্রেতা, অর্থ জোগানদাতা এবং একাধিক দেশের অপরাধী চক্র।
তাই বন্যপ্রাণী পাচারকে শুধু বনের ভেতরের অপরাধ হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি পাওয়া যায় না।
দক্ষিণ এশিয়ার বন্যপ্রাণী অপরাধ দমনে কাঠমান্ডুতে অনুষ্ঠিত সাউথ এশিয়া ওয়াইল্ডলাইফ এনফোর্সমেন্ট নেটওয়ার্ক—এসএডব্লিউইএন-এর প্রথম সাধারণ পরিষদ এই প্রশ্নটিকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। ১০ ও ১১ সেপ্টেম্বর নেপালের কাঠমান্ডুতে অনুষ্ঠিত সভার শেষ দিনে সদস্য দেশগুলো ‘কাঠমান্ডু ঘোষণা’ গ্রহণ করে। ঘোষণায় অবৈধ বন্যপ্রাণী বাণিজ্যকে ক্রমেই জটিল হয়ে ওঠা আন্তঃদেশীয় সংঘবদ্ধ অপরাধের সঙ্গে যুক্ত হিসেবে দেখা হয়েছে। এর সঙ্গে অবৈধ অর্থের প্রবাহ, দুর্নীতি, ডিজিটাল প্রযুক্তির অপব্যবহার এবং সীমান্তের দুর্বলতার সম্পর্কের কথাও বলা হয়েছে।
এ কারণেই ঘোষণায় শুধু বন পাহারা বা শিকারি ধরার কথা বলা হয়নি। গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, সমন্বিত আইন প্রয়োগ, আর্থিক তদন্ত, অবৈধ অর্থের গতিপথ অনুসরণ, ডিজিটাল তদন্ত, ফরেনসিক সক্ষমতা এবং সীমান্তের দুই পাশে সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
কাঠমান্ডুর সভায় বাংলাদেশের পক্ষ থেকেও বিষয়টি স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু আঞ্চলিক গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, সমন্বিত আইন প্রয়োগ এবং যৌথ কার্যক্রম জোরদারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, পাচারকারীরা সীমান্ত, পরিবহনব্যবস্থা, বাণিজ্যিক পথ, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও আর্থিক ব্যবস্থাকে ব্যবহার করছে।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সভায় পাঁচটি অগ্রাধিকারও তুলে ধরা হয়েছে—আঞ্চলিক গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় জোরদার করা, ফলাফলভিত্তিক আইন প্রয়োগ, একটি আঞ্চলিক বন্যপ্রাণী অপরাধ তথ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা, অনলাইন অপরাধ মোকাবিলায় সক্ষমতা বাড়ানো এবং আর্থিক তদন্ত ও অবৈধ অর্থের গতিপথ অনুসরণ করা।
এই অগ্রাধিকারগুলোর বাস্তব মূল্য বোঝা যাবে তখনই, যখন একটি দেশে ধরা পড়া প্রাণী বা পাচারের চালান অন্য দেশের জন্যও তদন্তের সূত্র হয়ে উঠবে।
কাঠমান্ডু বৈঠকের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, ঘোষণার পাশাপাশি ২০২৬–২০৩০ মেয়াদের বাস্তবায়ন পরিকল্পনা এবং পরবর্তী কয়েক বছরের কর্মপরিকল্পনা ও বাজেট গ্রহণ করা হয়েছে। অর্থাৎ এখন শুধু অঙ্গীকার নয়, বাস্তবায়নের পর্যায়ও শুরু হওয়ার কথা। এখানেই বাংলাদেশের জন্য মূল প্রশ্ন—এই আঞ্চলিক সিদ্ধান্তগুলো দেশের মাঠপর্যায়ের কাজে কতটা যুক্ত হবে।
বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থানও বিষয়টিকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। স্থলসীমান্ত, সমুদ্রবন্দর, বিমানবন্দর ও নদীপথের কারণে দেশটি বন্যপ্রাণী পাচারের উৎস, গন্তব্য কিংবা মধ্যবর্তী পথ—যেকোনো ভূমিকায় থাকতে পারে। তাই শুধু বন এলাকায় নজরদারি বাড়িয়ে পুরো সমস্যার মোকাবিলা করা সম্ভব নয়।
এর একটি সাম্প্রতিক উদাহরণ ঢাকার রূপনগরের ঘটনা। ২ জুলাই ২০২৬ বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের অভিযানে একটি বাড়ি থেকে সাপ, কচ্ছপ, ট্যারান্টুলা, ব্যাঙ ও গেকোসহ ১ হাজার ১০৪টি বিদেশি প্রাণী উদ্ধার করা হয়। এর মধ্যে ২১টি প্রাণী মৃত ছিল। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আরও কয়েকজনের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া যায়।
এই ঘটনা শুধু অবৈধভাবে বিদেশি প্রাণী রাখার বিষয় নয়। বিদেশি প্রাণী কীভাবে দেশে ঢুকল, কার মাধ্যমে এলো, কোথায় বিক্রি হওয়ার কথা ছিল এবং এর সঙ্গে আর কারা যুক্ত—এসব প্রশ্নও তদন্তের অংশ হওয়া প্রয়োজন।
২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে মালয়েশিয়াগামী একটি ফ্লাইটে পাচারের সময় ১ হাজার ১৬৩টি দেশীয় কড়ি কাইট্টা কচ্ছপ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় একজনকে আটক করা হয়েছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি টাকার বিনিময়ে লাগেজ বহনের কথা জানিয়েছেন। এর পেছনে আরও বড় কোনো চক্র রয়েছে কি না, সেটিও তদন্তের বিষয়। উদ্ধার করা কচ্ছপগুলো প্রাথমিক পরিচর্যার পর নিরাপদ স্থানে অবমুক্ত করার কথা বলা হয়েছে।
বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের পরিচালক মোহাম্মদ মিজানুর রহমান জানিয়েছেন, বিদেশি প্রাণী দেশে আনার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় অনুমোদন, লাইসেন্স ও কোয়ারেন্টিন-সংক্রান্ত ব্যবস্থা না থাকলে রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে। কোনো বিদেশি প্রজাতি স্থানীয় পরিবেশে ছড়িয়ে পড়লেও জীববৈচিত্র্যের ওপর প্রভাব পড়তে পারে। ফলে বিদেশি প্রাণী পাচারের সঙ্গে সংরক্ষণের পাশাপাশি পরিবেশগত নিরাপত্তার প্রশ্নও জড়িত।
রূপনগরের ঘটনায় অনলাইন যোগাযোগের বিষয়টিও সামনে এসেছে। মিজানুর রহমানের বক্তব্য অনুযায়ী, এ ধরনের অনলাইন বেচাকেনা শনাক্ত করতে বাড়তি কারিগরি সক্ষমতা প্রয়োজন। ফলে বন্যপ্রাণী অপরাধের তদন্ত এখন বন ও বাজারের পাশাপাশি ডিজিটাল মাধ্যমেও নিতে হবে।
এখানেই কাঠমান্ডু ঘোষণার সঙ্গে বাংলাদেশের বাস্তবতার সরাসরি যোগ তৈরি হয়। ঘোষণা যদি গোয়েন্দা তথ্য, ডিজিটাল তদন্ত ও আর্থিক অনুসন্ধানের কথা বলে, তাহলে দেশের তদন্ত ব্যবস্থাকেও সেই দিকেই এগোতে হবে। শুধু জব্দ করা প্রাণীর সংখ্যা দিয়ে সাফল্য মাপলে অপরাধের মূল নেটওয়ার্ক অদৃশ্য থেকে যেতে পারে।
এই জায়গায় নতুন আইনও গুরুত্বপূর্ণ। ১০ এপ্রিল ২০২৬ বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০২৬ প্রণীত হয়েছে। আইনের ৩৩ ধারায় প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও সনদ ছাড়া বন্যপ্রাণী বা বিদেশি প্রাণী আমদানি-রপ্তানির ওপর নিয়ন্ত্রণের কথা বলা হয়েছে। ৩৪ ধারায় উদ্ধার করা প্রাণীর চিকিৎসা, নিরাপত্তা, অবমুক্তি এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে উৎস দেশে ফেরত পাঠানোর নির্দেশিকার কথা রয়েছে।
বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০২৬ এর ৩৫ ধারায় গুরুত্বপূর্ণ বিমানবন্দর, স্থলবন্দর এবং সমুদ্রবন্দরগুলোতে এই ইউনিটের বিশেষ ভূমিকা ও কার্যাবলি নিচে তুলে ধরা হলো:
১. বন্যপ্রাণী অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ইউনিট গঠন (ধারা ৩৫)
এই ধারার অধীনে বন্যপ্রাণী, বন ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বন অধিদপ্তরের অধীনে একটি বিশেষায়িত বন্যপ্রাণী অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ইউনিট গঠন করার বিধান রয়েছে।
২. বিমানবন্দর, স্থলবন্দর ও সমুদ্রবন্দরে বিশেষ নজরদারি ও দায়িত্ব
আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ রুটে বন্যপ্রাণী এবং বন্যপ্রাণী থেকে উৎপাদিত সামগ্রীর (যেমন: চামড়া, দাঁত, শিং, ট্রফি ইত্যাদি) অবৈধ পাচার ও চোরাচালান রোধে এই ইউনিট প্রধান প্রবেশদ্বারগুলোতে কাজ করে:
• চোরাচালান প্রতিরোধ:
লাইসেন্স বা পারমিট ছাড়া দেশের কোনো বিমানবন্দর, স্থলবন্দর বা সমুদ্রবন্দর ব্যবহার করে বন্যপ্রাণী বা এর অংশবিশেষ আমদানি, রপ্তানি বা ট্রানজিট করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এই ইউনিট বন্দরগুলোতে তল্লাশি ও নজরদারি জোরদার রাখে।
• জব্দ ও গ্রেপ্তার:
কোনো বন্দরে অবৈধভাবে বন্যপ্রাণী বা বন্যপ্রাণীর অঙ্গপ্রত্যঙ্গ পাওয়া গেলে তা জব্দ করার এবং সংশ্লিষ্ট অপরাধীদের ম্যাজিস্ট্রেটের আদেশ ছাড়াই গ্রেপ্তার করার ক্ষমতা বন কর্মকর্তা ও এই ইউনিটকে দেওয়া হয়েছে।
• সমন্বিত অভিযান:
কাস্টমস কর্তৃপক্ষ, বন্দর আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং বন্যপ্রাণী অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ইউনিট যৌথভাবে কাজ করে যাতে বাংলাদেশ কোনো আন্তর্জাতিক বন্যপ্রাণী পাচারের ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহৃত হতে না পারে।
#
শরীফ চৌহান
লেখক, পরিবেশ অধিকারকর্মী ও সমাজ পর্যবেক্ষক।

সম্পাদক : সৈয়দ আমিরুজ্জামান
ইমেইল : rpnewsbd@gmail.com
মোবাইল +8801716599589
৩১/এফ, তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০।
© RP News 24.com 2013-2020
Design and developed by ওয়েব নেষ্ট বিডি