শিক্ষাবিদ সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম স্মরণে

প্রকাশিত: ১২:১০ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ১০, ২০২৬

শিক্ষাবিদ সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম স্মরণে

Manual7 Ad Code
  • শিক্ষা, সাহিত্য ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় তাঁর অবদান স্মরণীয়

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা, ১০ অক্টোবর ২০২৬ : দেশের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, প্রাবন্ধিক, কথাসাহিত্যিক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ইমেরিটাস অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী আজ।

শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় অসামান্য অবদানের জন্য তাঁকে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছেন সহকর্মী, শিক্ষার্থী, লেখক, সংস্কৃতিকর্মী ও বিভিন্ন রাজনৈতিক-সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা।

২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর রাজধানীর ল্যাবএইড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৭৩ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। এর আগে ৩ অক্টোবর হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হলে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকেরা তাঁর হৃদ্‌যন্ত্রে দুটি রিং স্থাপন করেন। প্রাথমিকভাবে শারীরিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলেও পরে আবার অবনতি ঘটে। শেষ পর্যন্ত ১০ অক্টোবর বিকেলে চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

মৃত্যুর পর তাঁর মরদেহ বারডেমের হিমঘরে রাখা হয়। পরদিন সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য মরদেহ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে নেওয়া হয়। বাদ জোহর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে জানাজা শেষে তাঁকে মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে দাফন করা হয়।

শিক্ষা ও গবেষণায় অনন্য অবদান

Manual7 Ad Code

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বাংলাদেশের ইংরেজি সাহিত্যচর্চা, গবেষণা ও উচ্চশিক্ষার জগতে ছিলেন সুপরিচিত ব্যক্তিত্ব। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে চার দশকেরও বেশি সময় শিক্ষকতা করে তিনি অসংখ্য শিক্ষার্থীকে জ্ঞানচর্চা, মুক্তবুদ্ধি ও মননশীলতার পথে অনুপ্রাণিত করেছেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি বিভাগীয় সভাপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন একাডেমিক কার্যক্রমে দায়িত্ব পালন করেন। পরে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি ও মানবিক বিভাগেও অধ্যাপনা করেন।

তিনি কেবল একজন শিক্ষক ছিলেন না; ছিলেন কথাসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক ও শিল্পসমালোচক। তাঁর লেখায় বাংলাদেশের সমাজবাস্তবতা, রাজনীতি, সংস্কৃতি, নাগরিক জীবনের বৈপরীত্য এবং মানুষের অন্তর্দ্বন্দ্ব ও আত্মসংগ্রাম নানা মাত্রায় উঠে এসেছে। সাহিত্যকে সমাজ ও মানুষের জীবন বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে দেখার ক্ষেত্রে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল স্বতন্ত্র।

জন্ম, শিক্ষাজীবন ও সাহিত্যকর্ম

Manual6 Ad Code

১৯৫১ সালের ১৮ জানুয়ারি সিলেট জেলায় জন্মগ্রহণ করেন সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম। শৈশব ও কৈশোরের একটি অংশ কাটে সিলেট ও চট্টগ্রামে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর ইংল্যান্ডে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। দেশে ফিরে শুরু করেন শিক্ষকতা ও সাহিত্যচর্চা।

বাংলা ও ইংরেজি—দুই ভাষায়ই তাঁর লেখালেখি ছিল সমানভাবে সমৃদ্ধ। গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ ও সাহিত্যসমালোচনায় তিনি নিজস্ব ভাষাভঙ্গি ও চিন্তার পরিচয় দিয়েছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনার মধ্যে রয়েছে ‘দরজার ওপারে’, ‘ছায়া’, ‘কোনো একদিন হয়তো’ ও ‘রাতের যাত্রী’সহ বিভিন্ন গল্পগ্রন্থ এবং ‘অন্ধকারের গান’, ‘তৃতীয় পুরুষ’ ও ‘সেই তোমার ঠিকানা’সহ উপন্যাস। সাহিত্য, সমাজ, সংস্কৃতি ও লেখকের স্বাধীনতা নিয়েও তিনি লিখেছেন গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ।

Manual6 Ad Code

বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ১৯৯৬ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন। এ ছাড়া প্রথম আলো বর্ষসেরা বই পুরস্কার (২০০৫) ও কাগজ সাহিত্য পুরস্কার (২০০৬)সহ বিভিন্ন সম্মাননায় ভূষিত হন।

Manual2 Ad Code

বুদ্ধিবৃত্তিক ও সামাজিক পরিসরে সক্রিয়তা

শিক্ষা, সংস্কৃতি ও নীতিনির্ধারণী আলোচনার বিভিন্ন পরিসরে সক্রিয় ছিলেন সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম। তিনি সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বোর্ড সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর মৃত্যুতে প্রতিষ্ঠানটি গভীর শোক প্রকাশ করে তাঁকে প্রজ্ঞা ও প্রগতিশীল চিন্তার মাধ্যমে সংগঠনকে পথ দেখানো একজন অভিভাবক ও নেতা হিসেবে উল্লেখ করে।

জাতীয় দৈনিকে নিয়মিত কলাম লিখে শিক্ষা, রাজনীতি, তরুণ প্রজন্ম, সংস্কৃতি ও সমকালীন সমাজ নিয়ে নিজের বিশ্লেষণ তুলে ধরতেন তিনি। তাঁর লেখায় যুক্তিনিষ্ঠ চিন্তা, উদার দৃষ্টিভঙ্গি ও সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতার প্রকাশ ছিল স্পষ্ট। শিক্ষকতা ও লেখালেখির মধ্য দিয়ে তিনি যে মননশীলতার চর্চা গড়ে তুলেছিলেন, তা বাংলাদেশের শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক পরিসরে গুরুত্বপূর্ণ উত্তরাধিকার হয়ে রয়েছে।

বিভিন্ন মহলের শ্রদ্ধা

প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও শিক্ষাঙ্গনের প্রতিনিধিরা। বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি কমরেড মাহমুদুল হাসান মানিক ও ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক কমরেড নূর আহমেদ বকুল তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন।

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষক, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির মৌলভীবাজার জেলা সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য, ইংরেজি দৈনিক দ্য ফিনান্সিয়াল পোস্ট ও সাপ্তাহিক নতুন কথার বিশেষ প্রতিনিধি, আরপি নিউজের সম্পাদক এবং কলামিস্ট কমরেড সৈয়দ আমিরুজ্জামান তাঁকে স্মরণ করে বলেন, “সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম ছিলেন এমন এক শিক্ষক, যিনি শুধু পাঠদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিলেন না; তিনি ছাত্রদের মধ্যে চিন্তার আলো জ্বালিয়েছিলেন।”

এ ছাড়া সিলেটের ঐতিহ্যবাহী মুরারিচাঁদ কলেজের পদার্থবিজ্ঞান সম্মান প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী সৈয়দা হাজেরা সুলতানা (শানজিদা) এবং শ্রীমঙ্গল সরকারি কলেজের গণিত সম্মান তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ও সাবেক ইয়েস দলনেতা সৈয়দ আরমান জামিও তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন।

স্মৃতিতে অমলিন

সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের প্রয়াণে বাংলাদেশের শিক্ষা ও সাহিত্যজগতে যে শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে, তা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। তাঁর শিক্ষকতা অসংখ্য শিক্ষার্থীকে আলোকিত করেছে, আর তাঁর সাহিত্যকর্ম পাঠককে সমাজ, মানুষ ও সময়কে নতুনভাবে দেখার সুযোগ দিয়েছে।

প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁকে স্মরণ করার মধ্য দিয়ে নতুন প্রজন্মের কাছে তাঁর জীবন, চিন্তা ও কর্মের তাৎপর্য তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হয়েছে। শিক্ষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে তাঁর অবদান এবং মুক্তবুদ্ধির চর্চায় তাঁর ভূমিকা বাংলাদেশের মননশীল সমাজে দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ