মজুরি বাড়াতে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের আহ্বান শ্রমিক নেতাদের, ভিন্নমত বিজিএমইএর

প্রকাশিত: ১০:০৪ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১৪, ২০২৬

মজুরি বাড়াতে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের আহ্বান শ্রমিক নেতাদের, ভিন্নমত বিজিএমইএর

Manual6 Ad Code

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা, ১৪ অক্টোবর ২০২৬ : তৈরি পোশাকশ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মজুরি বৃদ্ধি এবং নতুন মজুরি কাঠামো প্রণয়নের দাবি জানিয়েছেন শ্রমিক নেতারা ও গবেষকেরা।

Manual7 Ad Code

তাঁদের মতে, বর্তমান বাজারদরের তুলনায় শ্রমিকদের খাদ্য, পরিবহন ও স্বাস্থ্য ভাতা অত্যন্ত অপ্রতুল। শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠায় ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের বিকল্প নেই। তবে মজুরি বোর্ড গঠনের আগেই রাজপথ অবরোধ করে আন্দোলন ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির বিরোধিতা করেছেন তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান।

বুধবার (১৪ অক্টোবর ২০২৬) জাতীয় প্রেসক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে ‘গার্মেন্টস শ্রমিকদের আশু মজুরি বৃদ্ধি ও নতুন মজুরি কাঠামো কেন জরুরি?’ শীর্ষক এক সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন। গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র এ সেমিনারের আয়োজন করে।

সেমিনারে শ্রমিকদের বর্তমান মজুরি কাঠামো পুনর্বিবেচনার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সাবেক গবেষণা পরিচালক ও নলেজ হাব ইনস্টিটিউটের সভাপতি খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, বর্তমান মজুরি কাঠামোয় খাদ্য, পরিবহন ও স্বাস্থ্য ভাতা শ্রমিকদের প্রয়োজনের তুলনায় পর্যাপ্ত নয়। জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মজুরি কাঠামো পুনর্নির্ধারণ করা জরুরি।

Manual3 Ad Code

তিনি বলেন, বর্তমানে শ্রমিকদের মাসিক খাদ্য ভাতা ১ হাজার ২৫০ টাকা, যা দৈনিক হিসাবে প্রায় ৪৬ টাকা। এ সামান্য অর্থ দিয়ে একজন শ্রমিকের নিজের খাবারের চাহিদা মেটানোই কঠিন; পরিবারের ব্যয় নির্বাহ করা আরও দুরূহ। অন্যদিকে মাসিক পরিবহন ভাতা ৪৫০ টাকা, অর্থাৎ দৈনিক প্রায় ১৫ টাকা। স্বাস্থ্য ভাতা ৭৫০ টাকা, দৈনিক হিসাবে মাত্র ২৫ টাকা। এসব ভাতা দিয়ে বর্তমান বাজারদরে প্রয়োজনীয় ব্যয় মেটানো সম্ভব নয়।

মজুরি কাঠামোকে আরও যুগোপযোগী করতে শিক্ষা ও বিনোদন ভাতা অন্তর্ভুক্ত করারও দাবি জানান তিনি।

কম মজুরির পক্ষে পিপিপির যুক্তি গ্রহণযোগ্য নয়

বাংলাদেশের পোশাকশ্রমিকদের মজুরি নিয়ে আন্তর্জাতিক তুলনার প্রসঙ্গে খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ক্রয়ক্ষমতার সমতা বা পিপিপির হিসাবে বাংলাদেশের দৈনিক মাথাপিছু ক্রয়ক্ষমতা ২৫ ডলার, ভিয়েতনামের ৪৫ ডলার এবং চীনের ৭২ ডলার। এ পরিসংখ্যানই দেখায়, জীবনযাত্রার মানের দিক থেকে বাংলাদেশের শ্রমিকেরা ওই দুই দেশের শ্রমিকদের তুলনায় পিছিয়ে রয়েছেন।

তাঁর মতে, ভিয়েতনাম ও চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের মজুরির তুলনা করার ক্ষেত্রে শুধু ডলারের অঙ্ক নয়, শ্রমিকদের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা ও জীবনযাত্রার মানও বিবেচনায় নিতে হবে। তবে কম মজুরি বজায় রাখার যুক্তি হিসেবে পিপিপির হিসাব ব্যবহার করা গ্রহণযোগ্য নয়।

তিনি আরও বলেন, তৈরি পোশাকশিল্পের মজুরির সঙ্গে অন্য কোনো অলাভজনক বা কম আয়ের শিল্পের তুলনা করে শ্রমিকদের কম মজুরি দেওয়ার যৌক্তিকতা প্রতিষ্ঠা করা যায় না। এ খাতের মালিকদের আয়, মুনাফা ও অন্যান্য খাতে বিনিয়োগের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করতে হবে। মালিকেরা ভালো মুনাফা করবেন, অথচ শ্রমিকেরা ন্যূনতম প্রয়োজন মেটাতে হিমশিম খাবেন—এ ধরনের বৈষম্য গ্রহণযোগ্য নয়।

রাজপথে বিশৃঙ্খলার বিরোধিতা বিজিএমইএর

সেমিনারে ভিন্নমত তুলে ধরে বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, মজুরি বোর্ড গঠনের আগেই রাস্তাঘাট অবরুদ্ধ করে আন্দোলন ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা হচ্ছে। তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে গঠনমূলক আলোচনা না করে রাজপথে বিশৃঙ্খলা তৈরি করা মালিক কিংবা শ্রমিক—কোনো পক্ষের জন্যই কল্যাণকর নয়।

বাংলাদেশের সঙ্গে ভিয়েতনাম ও চীনের মজুরি ডলারের অঙ্কে সরাসরি তুলনা করারও বিরোধিতা করেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, প্রতিটি দেশের মুদ্রার ক্রয়ক্ষমতা আলাদা। বাংলাদেশে ১১৫ ডলার দিয়ে যে পরিমাণ পণ্য ও সেবা পাওয়া যায়, ভিয়েতনাম বা চীনে একই অর্থে তেমন পরিমাণ পণ্য ও সেবা পাওয়া যায় না। তাই আন্তর্জাতিক মজুরি তুলনার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশের জীবনযাত্রার ব্যয় ও ক্রয়ক্ষমতা বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

‘শ্রমিকেরা বেঁচে থাকতে পারছেন না’—এমন বক্তব্যকে অতিরঞ্জিত বলে মন্তব্য করেন মাহমুদ হাসান খান। তিনি বলেন, করোনাকালে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে শ্রমিকদের বেতন দেওয়া শুরু হওয়ার পর দেখা গেছে, প্রায় প্রতিটি শ্রমিকের নিজস্ব মোবাইল ফোন, এমনকি স্মার্টফোন রয়েছে। তাঁরা এটিএমও ব্যবহার করতে পারেন। তাঁর মতে, এসব বিষয় শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মান কিছুটা উন্নত হওয়ার ইঙ্গিত দেয়।

শুধু পোশাকশিল্পে অতিরিক্ত মজুরি বাড়ানো হলে শ্রমবাজারে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন বিজিএমইএ সভাপতি। তাঁর ভাষ্য, অন্য শিল্প খাতের তুলনায় পোশাকশিল্পে মজুরি অনেক বেশি বাড়ানো হলে অন্যান্য খাতের শ্রমিকেরা এ খাতে চলে আসতে পারেন। এতে শ্রমিকের চাহিদার তুলনায় সরবরাহ বেড়ে যেতে পারে। উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ১০০ জন শ্রমিক প্রয়োজন এমন একটি কারখানার সামনে ৩০০ জন শ্রমিক উপস্থিত হলে অতিরিক্ত শ্রমিক সরবরাহের কারণে শ্রমিকেরা উল্টো শোষণের শিকার হওয়ার ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।

আন্দোলন ছাড়া অধিকার আদায় সম্ভব নয়

Manual4 Ad Code

সেমিনারে সভাপতির বক্তব্যে গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট মন্টু ঘোষ বলেন, শ্রমিকদের রক্ত, ঘাম ও শ্রমের ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছে দেশের তৈরি পোশাকশিল্প। শ্রমিকেরা নিজেরা পরিশ্রম ও আন্দোলন না করলে সরকার কিংবা মালিকপক্ষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রয়োজন অনুযায়ী মজুরি বাড়াবে না।

Manual1 Ad Code

তিনি বলেন, মালিকপক্ষ প্রায়ই শ্রমিকদের আন্দোলন থেকে দূরে থাকার কথা বলে। কিন্তু আন্দোলন ছাড়া শ্রমিকদের অধিকার আদায় সম্ভব নয়। বর্তমান মজুরি বৃদ্ধির আন্দোলনকে সাধারণ কোনো দাবি হিসেবে না দেখে প্রতিটি শ্রমিককে মৌলিক সংগ্রাম হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। ন্যায্য মজুরি আদায়ে শ্রমিকদের ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

সেমিনারে বক্তারা বর্তমান বাজারদর, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য এবং শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনায় নিয়ে নতুন মজুরি কাঠামো নির্ধারণের ওপর গুরুত্ব দেন। তাঁদের মতে, শুধু মূল মজুরি নয়, খাদ্য, পরিবহন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও বিনোদন-সংশ্লিষ্ট ব্যয় বিবেচনায় নিয়ে একটি বাস্তবসম্মত কাঠামো প্রণয়ন করা প্রয়োজন।

সেমিনারপত্র উপস্থাপন করেন গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সহসভাপতি কমরেড জলি তালুকদার। আলোচনায় অংশ নেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সভাপতি কমরেড মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক কমরেড আব্দুল্লাহ আল কাফী রতন, শ্রমিক নেত্রী মোশারেফা মিশু ও তাসলিমা আক্তার এবং শ্রমিক নেতা কমরেড বুলবুল ও প্রকাশ দত্তসহ অন্যরা।

সেমিনার সঞ্চালনা করেন গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক সাদেকুর রহমান শামীম।